সময়ের প্রয়োজনে গল্পটার নাম ‘ছেলেমানুষী’

প্রকাশঃ জুলাই ২৯, ২০১৭

ছবিঃ শাহরিয়ার নিশান

শাহরিয়ার নিশান।।

অনেক দিন পর বোন-ভাইয়ার সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম তাদের অফিসে! বাসায় যেতে পারি না সময় মত! কারণ অনেক ব্যস্ত! তাই তারা এখন আর ফোন দিয়ে আগের মত জ্বালায়ও না। যাই হোক… মূল কোথায় আসি… নতুন অফিস নিয়েছে তারা। সব কিছু খুব গোছানো। তাই মনোযোগ সহকারে দেখলাম বা দেখালো। এই কথা… সেই কথা… নানা কথা বলতে বলতে অনেক সময় পার করে দিলাম। তবে মজার বিষয় ছিল, আমরা প্রায় সব কথাই বলেছি কাজের কথা! সময়ের প্রেক্ষাপটে সত্যিই অনেক কিছুই বদলে গেছে। বদলে গেছে স্থান, কাল, পরিস্থিতি। আমরা যেন পৃথিবীর ভিন্ন জীবমাত্র! কারণ এতো দিন পর দেখা হলেও আমরা কেউ কাউকে একেবারের জন্যেও জিজ্ঞাস করিনি ‘তুই কেমন আছিস?’

ওর অফিস থেকে বের হয়ে কিছুক্ষণ একা একা ধানমণ্ডি লেকে হাঁটলাম। নিজের সাথে নিজে প্রশ্ন-উত্তর খেলা শুরু করলাম। আচ্ছা… সমস্যাটা কোথায়?

আমরা কেন দিন দিন কাছের মানুষদের থেকে দূরে সরে যাই? নাকি সময় আমাদের বাধ্য করে… যে যুদ্ধ আমি বনাম আমার, পরিশেষে অনুভবের অপচয়। দিন শেষে সবটাই আপেক্ষিক, কাল্পনিক না অলৌকিক ব্যাখ্যা দেওয়া আর হয় না।

ধানমণ্ডি লেকের নির্দিষ্ট একটি জায়গায় আমি মাঝে মাঝে বসি। কিন্তু আজ গিয়ে দেখি দু’টি ছেলে-মেয়ে মন খা্রাপ করে আমার জায়গাটা দখল করে বসে আছে। তাই আর কি করার? বাধ্য হয়ে তাদের থেকে একটু দূরে গিয়ে বসলাম। হঠাৎ কানে তাদের কথা আসতে লাগলো… কানেরই বা কি দোষ? বর্তমানে যে পেশায় আছি সেখানে সব সময় চোখ-কান খোলা রেখে কাজ করতে হয়। যেখানে-সেখানে কান দিয়ে কথা শুনাটাও এখন একাটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাঝে মাঝে এজন্য এখন নিজেকে নিয়ে খুব চিন্তা হয়। যদিও কিছু করার নেই। বাঁচতে হবে তো…

মূল কোথায় আসি…মেয়েটি ছেলেটিকে বলছে, দেখ আমাদের এতোদিনের সম্পর্ক কিন্তু এই সময় আমাদের কিছুই করার নেই। আমরা তো একজন-অন্যজনকে ভালোবাসার অনেক চেষ্টা করলাম কিন্তু পারছি কই?

ছেলেটি চুপচাপ বসে আছে। ঠিক যেন খুব মনোযোগ সহকারে মেয়েটির কথা মন্ত্রমুগ্ধের মত শুনছে…

মেয়েটি আবার বলতে শুরু করলো… আমার পড়াশুনা শেষ। আর বাসা থেকেও বিয়ের কথা বার্তা হচ্ছে, তুমি কি বল?

ছেলেটিকে দেখলাম সে তখনও মনোযোগ দিয়েই শুনছে। কিন্তু উত্তর দেওয়ার কোন তাড়া নেই!

আমি জানি আমি তোমাকে ভালোবাসি না আর ভালোবাসতেও পারবো না। তাই তুমি না বললেও আমি বাবা-মার পছন্দ মতোই বিয়ে করব।

এবার ছেলেটিকে দেখলাম চুপচাপ। কোন কথা বলছে না। তার কোন উত্তর না পেয়ে মেয়েটি রেগে গিয়ে বলতে শুরু করলো তোমার কি ধারণা আমি তোমার সাথে মজা নিচ্ছি!

ছেলেটি এবার মুখ খুললো… হাঁসি মুখেই বলল আমরা দু’জন এই পৃথিবীর ভিন্ন জীব মাত্র। এখনও আমরা দু’জন দু’জনকে চিনতে পারিনি! তাই দু’জন দু’জনকে ছাড়াই বাঁচতে শিখে গিয়েছি। আমাদের সম্পর্কের মাঝে যোগ্যতা এসে গিয়েছে। তাই তো সময়ের প্রয়োজনে আমাদের ভালোবাসার গল্পটার নাম হয়ে গেছে ‘ছেলেমানুষী’।

যখন সিধান্ত নিলাম না আর শুনবো না তাদের কথা, সেই সময় মেয়েটি চিৎকার করে বলছে তোমার কি আমার কথাগুলো কানে ঢুকছে না? ছেলেটি কোনও উত্তর দেয়নি। না শোনার ভান করে আবারও বসে আছে। শুধু এইটুকু বলল তোমার যদি এখানে ভালো না লাগে চলে যেতে পারো। কিন্তু আমাকে প্রশ্ন করবে না। আমি উত্তরও দেব না। তোমার যা ভালো মনে হয় তুমি তাই কর … আর কেউ চলে যাওয়ার সময় ধরে রাখা যায় না।

তাদের আলাপচারিতার বাকি অংশ না শুনে উঠে দাঁড়ালাম। আবার হাটতে শুরু করলাম। বুঝি না এই অকৃত্রিম ভালোবাসার খেলা, বুঝতে চাই না বুঝতে কখনো হয়তো চেষ্টাও করবো না।

নিজেকে নিজে প্রশ্ন করলাম, নিশ্চুপ দুপুরের তন্দ্রাবিলাসের মায়াতে পড়ে মানুষ কতই পাগলামি না করে। সাময়িক পাওয়া না পাওয়া নিয়ে কত যুদ্ধ। কিন্তু কি লাভ… কত দিনই বা ধরে রাখা যায়? আর তাই, যে চলে যাচ্ছে তাকে যেতে দিন। আটকে রাখার চেষ্টা করে কোন লাভ নেই, কেন না মৃত্যু হোক বা দূরত্ব- কোনটার সাথেই যুদ্ধ করে জিততে পারবো না আমরা। যে চলে যেতে চায় তাকে কি আর ধরে রাখা যায়? তাই ধরেই যখন রাখতে পারবেন না, তখন কষ্ট আর না বাড়িয়ে চলে যেতে দিন।

জীবনে সম্পর্ক থাকলে ভাঙ্গা- গড়াও থাকবে। আমাদের জীবনের সবচাইতে বড় কষ্টের ব্যাপারটা হচ্ছে প্রিয় মানুষগুলোর থেকে বিচ্ছেদ। কখনও মৃত্যু, কখন বা দূরত্ব। তবে এটা সত্য, বিচ্ছেদের কারণ যাই হোক না কেন প্রিয় মানুষের বিরহ আমাদের হঠাৎ শুন্য করে ফেলে। হয়তো আমরা মনের জোরে প্রাণপণে চেষ্টা করি তাকে ঠেকাবার। কিন্তু লাভ হয় কি? একদমই তো না!

সময়ের গল্পগুলি এমনি। অনেকের চোখের জল শুকিয়ে গেছে, কাঁদতে পারে না। বুকের পাঁজরগুলো সঙ্কুচিত হয়ে আসছে, ক্রমেই মনে হচ্ছে এখুনি ভেঙ্গে যাবে। তারা এক প্রকার চাঁপা কষ্ট চেপে ধরে রেখেছে। বড় শুন্য মনে হয় সবকিছু, তাই তো তারা আঁকড়ে ধরেছে এই শুন্যকেই।

হঠাৎ বজ্রপাতের মত আমার আকাশে বজ্রপাত হল! না… চমকে উঠার কিছুই হয়নি। মোবাইলে রিং বেজে উঠেছে। ফোন রিসিভ করতেই অপরপ্রান্ত থেকে জানান দিল মিটিং আছে… বেইলী রোড চলে আয়। কি আর করা। মিটিং বলে কথা।
রিকশায় করে বেইলী রোড যাওয়ার সময় পরিবাগ হয়ে যেতে হয়। আর রাস্তাটাও সবসময় নিশ্চুপ থাকে। ভালই লাগে। আর এই রাস্তা নিয়ে অনেক মজার ঘটনা লুকিয়ে আছে। একটা সময় অনেক আড্ডা দিয়েছি বেইলী রোড আর পরিবাগে।

যথা সময়ে নির্দিষ্ট জায়গায় এসে জানতে পারলাম মিটিং রাত সাড়ে ৯ টায়। কি আর করার? হাঁটা শুরু করলাম আবার, খুঁজতে লাগলাম পরিচিত কাউকে।

আচমকা অনেক পুরানো এক বড় ভাই সামনে হাজির! এসেই বলল চুল-দাড়ি রেখে কি সন্ন্যাসী হওয়ার চেষ্টা শুরু করলি?

আমাকে আরও অবাক করে দিয়ে বলল, চল সিগারেট খাই! তোর সাথে দেখা কতদিন হবে বলতো? না থাক, বলার দরকার নেই অনেক কিছুই বলা হয়ে যাবে যা ফেলে এসেছি। তোর সেই সব আছে এখনো? কাপ-প্লেটের টুংটাং এবং জনতার অসংলগ্ন হইচই-এর মধ্যে হঠাৎ বলল, জানস ওর সাথে আবার দেখা হয়ছে ৭ বছর পর!

মুচকি হাঁসি দিয়ে বললাম, কে?

কেন এখন যার অস্তিত্ব অনুভব করি সে আর তার প্রেতাত্মা!

ঝড় শুরু হয়েছিলো রূপকথার দানবের মত। তার প্রস্থান যেন ঠিক এ রকমই … মাঝে মাঝে এমন কষ্ট শুরু হয় যে কাউকে বলতে পারি না। নীরবে নিভৃতে অন্ধকারে ঢুকরে কেঁদে উঠি। শত চেষ্টা করেও ফেরাতে পারি না নিজেকে, বুক চেপে আসে রাজ্যের যত কষ্ট। কাঁদতে ইচ্ছে হয়। কিন্তু লজ্জা !!! তাই ভুলে থাকি মনের কষ্টটাকে।

তার সাথে শেষ দেখা হয়েছিল ২০১০ সালের জুলাই মাসের কোনো এক দুপুরে। বহু সংশয় আর ভয়ের সাথে নির্বাক-যুদ্ধ করার পরেও তার চলে যাওয়া দেখেছি….কিছুই বলতে পারিনি, সেদিন কেবল চেয়ে চেয়ে দেখেছি…! তার দেওয়া প্রতারণাময় সময়গুলো আমাকে কাঁদিয়েছে বহুদিন-বহুরাত…! তবুও জীবনের তাগিদে বাস্তবিক জীবনের বাঁকে তার ভাবনা আমাকে ভাবিয়েছে বহুবার! আমাকে পুড়িয়েছে! বিশ্বাস হারানোর যন্ত্রণায় পৃথিবীর চোখের আঁড়ালে আমাকে ভাসিয়েছে শ্রাবণবর্ষায়….! কেউ তা জানে না।আর কেউ দেখেনি তার দেয়া ভালোবাসার নামে মিথ্যে অভিনয়গুলো।

সম্মত হয়েছিলাম ঠিকি। কিন্তু সেই দিনের কথাগুলো আমাকে পুড়িয়েছে সব সময়। এমনকি এখনো পুড়ায়। সব সৃতিগুলো ভুলে গিয়েছি কিন্তু পারিনি তার কথা! হয়তো একটু বেশি ভালোবাসি বলে। তার দেয়া কষ্ট, দুঃখ, কাল্পনিক সব ভাবনা, অপূর্ণ সব স্বপ্ন, মধুর কিছু কথোপকথন, সুখময় কিছু স্মৃতি নিয়ে হয়তো কেটে যাবে আমার অলস সময়। এর মাঝেই হঠাৎ একদিন হয়তো হারিয়ে যাবো আমি।

হুম… এমনটি যদি তোমার চিন্তা থাকে তাহলে তো এমনি হওয়ার কথা। ভাইয়া আমার কথা শুনে একটা হাঁসি দিয়ে বলল, সব কিছু ফিরত আসে। শুধু অপেক্ষা করতে হয়…।

বুঝছনি তো… শুন… সেদিন দেখি এক স্বপ্নময় সন্ধ্যায় ওর সাথে আমার রাস্তায় দেখা। সেই সন্ধ্যা ছিল অনেক প্রতীক্ষার। বহু অপেক্ষার অবসান হওয়া এক বাস্তবে রূপ নেয়া রঙিন সন্ধ্যা। সেই সহাস্যমুখ, সেই মানসিক টান সবকিছু যেন সেই পুরনো। শুধু আমিই ছিলাম না…!

ছেলের হাত ধরে হাটছিল সে। আমি চাইতেই চোখা-চোখি। আহ! কি যে আনন্দের সেক্ষণ তা বোঝাতে পারবো না। বহুদিনের স্বপ্ন-বাস্তবায়ন হওয়ার আনন্দে মেতে উঠেছিল আমার কাঙাল হৃদয়। আমি চেয়ে আছি অপলক আর তার চলে যাওয়া দেখছি….।

আমি বললাম তারপর…আর কি? এমন প্রশ্নে তার চোখে দেখি মুগ্ধনয়ন কিঞ্চিত আপন ক্ষণের সুখের তৃপ্তির তন্দ্রাচ্ছন্ন!

বাকিটা বুঝে নিয়ে বিদায় নিলাম আমিও। আর একান্তে নিজেকে নিজে বললাম… ভুল মানুষেরই হয়। কিছু ভুল ইচ্ছায়, আর কিছু ভুল নিজের অজান্তেই। আর জীবন নাটক এতোই বৈচিত্রময় না হলে কি সুখের এই মর্মটুকু বুঝতে পারবো?

কমেন্টস