রিমিঃ জীবন এক বিভীষিকার নাম

প্রকাশঃ নভেম্বর ২০, ২০১৬

আবু খায়ের আনিছ-
অগ্রাহায়ণের প্রথম সপ্তাহ, পৌষের শীতের আগমন বার্তা ভালোই উপলব্দি করিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। ঝাঁকিয়ে শীত পড়েছে। সন্ধ্যাটা একটু তাড়াতাড়ি চলে আসে, বিকাল তিনটার পর থেকেই যেন অন্ধকার ঘনিয়ে আসে, আর মাগরিবের আযানের সাথে সাথেই যেন অন্ধকারে ছেয়ে যায় পুরো এলাকা। যতটা না অন্ধকার তারচেয়ে বেশি কুয়াশা।

হাসপাতালের কম্পউন্ডারে আগুন ধরিয়ে আগুন পোহানোই একমাত্র কাজ হয়ে যায় এই সময়টাতে। চারটার পর রোগী তেমন আসে না, যদি না কোন দুর্ঘটনা হয়। বিশেষত সড়ক দুর্ঘটনা। ইমার্জেন্সি ছেড়ে নিজের রুমে বসেই বেশির ভাগ সময় পার হয়ে যায়। বই পড়া বা ফেজবুকিং করেই অলস সময় পার করা। আমার মত সরকারি ডাক্তারের বাইরে আর কিই বা করার থাকে, রোগী না থাকাটা আমার দোষ নয়। ইন্টার্নি করার সময় শহরে ছিলাম, রোগীর লাইন লেগে থাকত, মনে মনে তখন প্রার্থনা করতাম ঈশ্বর যেন আমায় কোন গ্রামের নিয়োগ দেয়।

ডাক্তার শব্দটার আগে যে মানুষ এবং জীবন আছে তা যেন একটু হলেও বুঝতে পারি। ঈশ্বর সহায় ছিলেন বটে নয়ত এমন সুযোগ কেউ পায় নাকি, ডাক্তারি করছি তাও নিজের উপজেলার হাসপাতালেই। অর্থের প্রতি লোভ কোনকালেই ছিল না, সরকারি বেতন পাচ্ছি আর তাতেই দিনকাল ভালো চলে যাচ্ছে বাবা-মা, বোনদের নিয়ে। রোগী দেখার পরে যতটুকু সময় পাচ্ছি তার সবটাই উপভোগ করার চেষ্টা করছি। বাড়তি চাপ নেই তা বলা ঠিক নয়, যখন কোন মানুষ এসে অসুস্থতার কথা বলে তখন আর মানবিক কারণে হলেও না গিয়ে উপায় থাকে না। নতুন ডাক্তার তাই খুব বেশি একটা পরিচিত নই, যতটুকু আছে তা কেবল কাছের মানুষের কাছেই।

রোগী নেই, বসে বসে স্কুল লাইফের বন্ধুদের ছবির অ্যালবাম দেখছি। হঠাৎ করেই ইমার্জেন্সি থেকে সহকারী এসে বলল, স্যার রোগী এসেছে।
নিজের চেয়ার ছেড়ে উঠতে উঠতে জিজ্ঞেস করলাম কিসের রোগী?
সুসাইড কেস, অবস্থা খুব খারাপ।

ঠিক আছে চল, বলেই দৌড়ে বের হয়ে এলাম। ইমার্জেন্সি রুমের সামনে ড্রেনের কাছে মানুষের জটলা সরিয়ে কাছে গিয়েই চমকে গেলাম। নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে, আমার স্কুলের বান্ধবী রিমি। আজ সকালেও তার সাথে আমার কথা হয়েছে ফেজবুকে, এমনকি একটু আগেও ছবিগুলোতে দেখছিলাম রিমিকে। সহকারী ডাক্তার ততক্ষণে সব ধরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে, তবু এগিয়ে গিয়ে রিমির মাথার নিচে হাত দেখলাম অবস্থা কেমন।

ডাক্তার সর্বাত্মক চেষ্টা করে চলেছে বমি করানোর, উৎসুক জনতা ভীড় করে আছে চারিপাশে। একজন কর্মচারিকে বললাম, সবাইকে বিদায় কর এখান থেকে। কর্মচারি একে একে সবাইকে বিদায় করে দিল। ডাক্তারকে বললাম, আপনি ভালো করে ওয়াশ করে 134 নাম্বার কেবিনে নিয়ে যান, বাকিটা আমি দেখছি।

রিমির বাবা পাশেই দাঁড়িয়েছিল, ভদ্রলোক আমাকে চিনে না, কোনদিন দেখা হয়নি আমাদের। আমিও চিনতাম না যদি রিমিও দেওয়া ফেজবুক ছবি না দেখতাম। বললাম আংকেল আমার সাথে আসেন।
উনাকে নিয়ে আমার রুমে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কি হয়েছিল?
উনি হাউমাউ করে কান্না শুরু করে দিলেন, উনাকে শান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা আমার নেই। তবু আবার বললাম, আপনি ভয় পাবেন না, এই যাত্রায় রিমি বেচেঁ যাবে আশা করি, আপনি আমাকে বলুন কি হয়েছে ওর।

আপনি রিমিকে চিনেন?
রিমি আমার স্কুল ফ্রেন্ড, আমি আর ও এক সাথে পড়াশোনা করেছি।
কান্না থামিয়ে ভদ্রলোক বলল, আমার মেয়েটাকে তুমি বাঁচাও। আমার মেয়েটা এমন ছিল না, হঠাৎ করেই সব কিছু এলোমেলো হয়ে গেল। আমি কি করব কিছুই বুঝতে পারছি না। বলেই কান্না শুরু করে দিল হাউমাউ করে। চেয়ার ছেড়ে উঠে গিয়ে বললাম, আংকেল আপনি শান্ত হোন আমি দেখছি।

স্যার কেবিনে পাঠিয়ে দিয়েছি, আর স্যালাইন চলছে। বাইরে থেকে বলল সহকারী।
ঠিক আছে।
চেয়ার ছেড়ে উঠে আংকেল বলল, আমি একটু দেখতে চাই মেয়েকে।
তিন তলায় আছে, সুকুমারকে বললাম নিয়ে যেতে।
চেয়ারে বসে ভাবতে থাকলাম, রিমির মত মেয়ে কি কারণে আত্মহত্যা করতে পারে? বিএ পাশ করেছে দুই বছর আগে, বিয়েশাদী করেনি। স্কুলের প্রথম দশজনের মধ্যে থাকত সে, কলেজ জীবনের কথা বলতে পারব না। কিন্তু যখন রিমির সাথে এক বছর আগে আমার আবার যোগাযোগ হয় তখন তো অনেক কথাই হয়েছে। ওর ম্যাসেজেই জেনেছিলাম, কাউকে ভালোবেসে ব্যর্থ হয়েছে কিন্তু এটাই কি শুধু আত্মহত্যার কারণ হতে পারে।

ব্যক্তিগত ইস্যু নিয়ে প্রশ্ন করতে ভালো লাগে না, তা ছাড়া রিমির সাথে আমার সম্পর্কটা ঠিক ততটা ঘনিষ্ঠ নয় যতটুকু হলে ব্যক্তিগত বিষয়েও প্রশ্ন করা যায়। মাঝে মাঝে ফেজবুক পোস্ট দেখে ধারণা করেছিলাম এমন কিছু হতে পারে যা হয়ত আমি জানি না বা আমরা জানি না যার কারণে সে হতাশায় ভুগছে। ভিন্ন সময় কথার মাঝে মরে যাওয়ার প্রসঙ্গ টেনে এনেছে, আর বারবার বুঝিয়েছি এটা কোন সমাধান হতে পারে না কিন্তু তারপরেও সে এমন কেন করল? আমি ডাক্তার আমার জন্য এই চিন্তাগুলো না করলেও চলে শুধুমাত্র বন্ধুত্বের জন্যই হয়তবা এমন চিন্তা আসছে মাথায়।

আত্মহত্যাপ্রবণ ব্যক্তিদের অধিকাংশই কোনো না কোনো মানসিক রোগে আক্রান্ত। আত্মহত্যার জন্য অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ মানসিক রোগটি হচ্ছে বিষণ্নতা। গুরুতর বিষণ্নতা বা মেজর ডিপ্রেসিভ ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ১৫ শতাংশই আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। অন্যান্য মানসিক রোগ, যেমন সিজোফ্রেনিয়া, বাইপোলার মুড ডিসঅর্ডার, মাদকাসক্তি, বিপর্যয়-পরবর্তী মানসিক চাপ বা পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার, জেনারালাইজড অ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডার বা অত্যধিক দুশ্চিন্তাজনিত রোগ এবং কিছু ব্যক্তিত্ব-বৈকল্য বা পারসোনালিটি ডিসঅর্ডারে আক্রান্তদের মধ্যেও আত্মহত্যা-প্রবণতা সাধারণের চেয়ে বেশি।কিন্তু রিমির মত মেয়ের কাছে এটা প্রতাশ্যা করা যায় না।
রাত সাড়ে বারটার উপরে বাজে, আধ ঘণ্টা পরে ডিউটি শেষ হয়ে যাবে, হাসপাতাল থেকে বাড়ির দূরত্ব এক কিলোমিটার। কোয়াটারে থাকার ব্যবস্থা আছে কিন্তু এত কাছে নিজের বাড়ি রেখে কোয়াটারে উঠতে মন চায় না, তা ছাড়া বাড়িতে থাকার মাঝে একটা শান্তি বিরাজ করে। রাত যত গভীর হোক, ঘরে ফিরে দেখব ঠিক একটা কান খাঁড়া করে জেগে আছে মা, নিজের কাছে থাকা চাবি দিয়ে গেইটের তালা খুলতে গেলেও টের পেয়ে যায়, আর ঠিক উঠে এসে টেবিলে পাশে বসে খাওয়া শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত বসে থাকবে। গল্প করবে, আজ কয়টা রোগী দেখলি, কার অবস্থা কেমন ইত্যাদি খোঁজ খবর নিবে।

চেয়ার ছেড়ে তিনতলার সিড়িঁ বেয়ে উপরে উঠতে যাব, ফোন বেজেঁ উঠল। বের করে দেখলাম, মহারাণী ফোন করেছেন। আমার একজনই মহারাণী, মুন্নি। ফোন ধরতেই বলল, তোমার ডিউটি শেষ হয়েছে?
এই তো শেষ হওয়ার পথে।
শোন!

মিষ্টি কণ্ঠের এই শোন এর মানে বুঝতে আমার একটু অসুবিধা হয় না, কোন আবদার থাকলেই এমন স্বরে প্রথমে বলবে শোন, তারপর একটু সময় নিয়ে আবদার উপস্থাপন করবে। বললাম, কি?
আজ বাড়ি না ফিরে একবার বাসায় আসবে?

তোমার মাথা খারাপ হল নাকি? এত রাতে বাসায় কেন? আন্টি আংকেল কি ভাববে?
সেটা তোমার চিন্তা নাকি? আমি বলছি তুমি আসবে।
মা জেগে অপেক্ষা করবে, কি হয়েছে বল।
আমি মাকে ফোন করে বলে দিচ্ছি, তুমি চলে আস তারপর বলব।
শোন
কি?
আমার স্কুলফ্রেন্ড রিমি হাসপাতালে ভর্তি, ওর কাছেই যাচ্ছি দেখি কি অবস্থা তারপর জানাবো।
কি হয়েছে?
আত্মহত্যার চেষ্টা।
বল কি? কি জন্য?
জানিস না, কথা বলতে হবে।

আপুকে দেখতে এসেছিল কয়েকজন, এখন বলছে আজ রাতেই বিয়ে পড়িয়ে নিয়ে যাবে, ব্যস্ততার জন্য তোমাকে জানাতে পারিনি। মনে করলাম তুমি আসবে, কিন্তু…।
দেখি কি হয়, অবস্থা যদি ভালো হয় তাহলে আসব।
আমি তাহলে মা কে ফোন করে বলে দেই।
কিছু করতে হবে না, আমি বাসায় গিয়ে তারপর আসব।
ঠিক আছে রাখি, লাভ ইউ।

ফোনের স্কিনের দিকে তাকিয়ে না হেসে পারি না, প্রতিবার ফোন করবে আর এই কথাটা বলতে দেরী হবে কিন্তু ফোন কাটতে দেরি হবে না। কখনো উত্তরের অপেক্ষাটুকু পর্যন্ত করে না, একবার জিজ্ঞেসও করেছিলাম, কেন তুমি এমন কর? বাচ্চা বয়সের আবেগীয় ভাব নিয়ে বলে, আমি হৃদয় দিয়ে শুনার চেষ্টা করি, মুখে বলার বা কানে শুনার চেয়ে।

চেয়ারে হেলান দিয়ে রিমির মা মেয়ের বেডে মাথা রেখে ঘুমাচ্ছে, বারান্দায় পায়চারি করছে রিমির ভাই, কানে ফোন, আমাকে দেখেই অন্য দিকে সরে গিয়েছে। দরজায় টোকা দিতেই রিমির মা উঠে দরজা খুলে আমায় দেখে বলল, ডাক্তার সাহেব! আসেন।
আমি কিছু বলার আগেই রিমি চোখ তুলে তাকালো আমার দিকে, ওর অবস্থা খুব কাহিল, অবসন্ন হয়ে পড়েছে, পয়জন বের করতে গিয়ে অনেক দূর্বল হয়ে পড়েছে, তবু মাথাটা উচু করে আমার দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, নিলয় তুমি?

আমি এগিয়ে গিয়ে বললাম, হ্যাঁ আমি, কেমন লাগছে এখন?
ভালো। রিমির চোখে মুখে লজ্জা, মস্ত বড় একটা লজ্জার কাজ করেছে, আর সেই জন্য মুখ লুকানোর চেষ্টা করছে। কি হয়েছে রিমি?
রিমির মা আমায় চিনতে পারেনি, আর পারার কথাও না। কখনো আমি রিমিদের বাসায় যায়নি, আর উনাদের কারো সাথেই দেখা হয়নি কখনো। এবার উনি এগিয়ে এসে বলল, দেখ বাবা মেয়েটাকে কিছুতেই বোঝাতে পারি না, তুমি যদি একটু চেষ্টা করে দেখতে। আমি উনার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, ভিষণ দুশ্চিন্তার ছাপ উনার মুখে, এক মুহুর্ত বোধ করি উনি চিন্তা মুক্ত থাকতে পারেন না, আমি বললাম আন্টি আমি চেষ্টার ক্রুটি রাখব না। আপনি বরং এখন একটু ঘুমিয়ে নিন, আমি নার্সকে বলে দিচ্ছি আপনার জন্য ঘুমের ব্যবস্থা করতে।

উপজেলা হাসপাতাল, ওয়ার্ডের বেড খালি পড়ে আছে, আর কেবিন প্রায় সারা বছর দুয়েকটা খালি পড়ে থাকে। রুম থেকে বের হয়ে রিমির ভাইকে ডাক দিয়ে বললাম, উল্টো দিকের করিডোর পেরিয়ে নার্সের রুম, গিয়ে বলতে যেন এখানে আসে।

আন্টি আমায় ডেকে বাইরে নিয়ে এসে বলল, তুমি রিমির বন্ধু, সাথে ডাক্তার তোমার কথা যদি রিমি শুনে, ওরে একটু ভালো করে বুঝিয়ে বল বাবা, মেয়েটাকে নিয়ে অশেষ যন্ত্রনায় আছি। নিশ্চিন্ত হয়ে এক বিন্দু দাঁড়াতে বা ঘুমাতে পারি না। আমি বললাম, আমি কথা বলছি আপনি টেনশন করিয়েন না, আগে জানতে হবে কি হয়েছিল।

আন্টি কিছুটা বিব্রতবোধ করলেন, কিছু লুকানোর চেষ্টা করছেন বুঝতে পারলাম, আবার ভয় করছেন যদি মেয়ে কিছু বলে দেয় এমন একটা ভাব। অবস্থা বুঝে আমি আর কথা না বাড়িয়ে রুমে গিয়ে ঢুকলাম, চেয়ার টেনে সীটের পাশে বসতেই নার্স এসে বলল, স্যার ডেকেছেন?
পাশের কেবিনে উনার ঘুমের ব্যবস্থা করেন, আর একজন আয়াকে বলবেন এখানে থাকতে আমি চলে যাওয়ার পর।

নার্স রিমির মাকে নিয়ে বের হয়ে গেল, আমি রিমির কাছে গিয়ে বললাম, রিমি তুমি আমার একজন ভালো বন্ধু, আশা করি আমার কাছে কিছু লুকাবে না, কি হয়েছে আমাকে খুলে বল।
তুমি আমার স্যালাইন এর লাইনটা খুলে দিবে? আমি একটু বসে কথা বলতে চাই তোমার সাথে।
তোমার শরীর এমনিতেই দূর্বল, উঠে বসতে হবে না, শুয়েই বল আমি শুনছি।

বিছানার অন্যপাশের বালিশটা এক হাতে টেনে নিয়ে মাথার নিচে দিয়ে একটু উচুঁ করে হেলান দিয়ে বলল, তুমি ডাক্তার তোমার কাছে কিছুই লুকানোর মত নেই, তা ছাড়া তুমি যেমন আমায় ভালো বন্ধু মনে কর, আমিও তেমনি মনে করি। আমায় বলত নিলয়, একটা মানুষ কয়বার মরে?

কিছুটা বিব্রতবোধ করে বললাম, একবার।
আমি তিনবার মরেছি, আজ নিয়ে চতুর্থ বার।
আমি হচকচিয়ে গিয়ে বললাম মানে?
আজ কয় তারিখ?
নভেম্বর এর বিশ।

গত চার বছর ধরে এই দিনে আমি আত্মহত্যার চেষ্টা করেছি। শুনেছি যে মানুষ একবার বিষ খায় সে দ্বিতীয়বার ভুলেও বিষ স্পর্শ করে না, কিন্তু আমি এত চেষ্টা করেও বারবার ব্যর্থ হই আবার খাই। আমি মরতে চাই নিলয়, আমাকে মরতেই হবে।
কেন?
আমি বাচঁতে চাই না।
কিন্তু কেন?
শুনে কি করবে? আমায় জ্ঞান দিবে?
না
তুমি তো অনেক কিছুই জান, তাহলে আবার প্রশ্ন করছ কেন?
না আমি কিছুই জানি না।
কেন অস্বীকার করছ? আমি তোমাকে বলেছি না।
বলেছ, তোমার একটা রিলেশন হয়েছিল, তারপর ব্রেকআপ। ব্যাস এই কারণে কোন মানুষ আত্মহত্যা করতে পারে না। তা ছাড়া একটা সম্পর্ক ভেঙ্গে গিয়েছে মানে আহামরি কিছু হয়নি।
মুন্নি সাথে তোমার সম্পর্ক কয় বছর?
পাচঁ বছর।

মুন্নি যদি তোমাকে ছেড়ে চলে যায় তাহলে তুমি কি করবে?
কিছুই করব না, আর সে আমাকে ছেড়ে যাবে না।
এত বিশ্বাস, কোথা থেকে পাও।
বিশ্বাস আছে বলেই তো সম্পর্কটা আছে, তুমি কথা ঘুরানোর চেষ্টা করছ।

খুব নিচু গলায় এতক্ষণ কথা বললেও এবার আরেকটু উপরের দিকে উঠে স্বরটা একটু উচুঁ করেই বলল, না চেষ্টা করছি তোমাকে শুধু কষ্টটা বুঝানোর চেষ্টা করলাম মাত্র।
দুঃখ কষ্ট নিয়েই মানুষের জীবন, তার মানে এই নয় যে, জীবন দিয়ে দিতে হবে।

আমার কষ্টটা চিরস্থায়ী, আর চিরস্থায়ী কষ্ট থেকে মুক্তির পথ একটাই,মৃত্যু।
এটা তোমার ভুল ভাবনা, একটা সম্পর্ক ভেঙ্গে গিয়েছে, তারচেয়ে ভালো কাউকে বিয়ে করে নাও সব কিছু ঠিক হয়ে যাবে।
কখনো হবে না, আমি কোন ভাবেই অন্য কাউকে বিয়ে করতে পারব না।

এটা তোমার আবেগ, দেখ তুমি প্রাপ্ত বয়স্ক, নিজের ভালো মন্দ বুঝতে পার, সুতরাং এমন কথা তোমার অপরিপক্কতার পরিচয় বহন করে।
তুমি বুঝতে পারবে না, সব ছেলেই এমন।
আমি নিরব হয়ে রইলাম।
রিমি আবার বলল, আমার সাথে যা হয়েছে তা আমি ভুলব কি করে?
মানুষ চাইলে পারে না এমন কিছু নেই।
আমার পক্ষে সম্ভব নয়।
রিমি,
হ্যাঁ
তুমি কি চাও তোমার জন্য অন্য কেউ কষ্ট পাউক? তুমি কি বিশ্বাস কর এই জীবনটা শুধু তোমার নয়, এই জীবনের সাথে আরো অনেকগুলো মানুষের জীবন, হাসি আনন্দ, দুঃখ, সুখ জড়িয়ে আছে। তোমার বাবা অসুস্থ তুমিই বলেছিলে কিছুদিন আগে। তার কথা একবার ভেবেছ?
ভেবেছি বহুবার, আর তার কথা ভেবেই বেচেঁ থাকতে ইচ্ছা করে কিন্তু এই দিনটা আমার জীবনে এলেই সব কিছু এলোমেলো হয়ে যায়। তাছাড়া উনার সব কিছুই জানে, শুধু উনারা নয়, আমার পুরো পরিবার, আত্বীয়-স্বজন সবাই জানে।
কি জানে?
বাদ দাও সেই কথা, তোমার কথা বল, অনেকদিন পর মন খুলে কথা বলতে ইচ্ছা করছে।
বল, আমি শুনছি।
তোমার কথা বল।
কি কথা শুনবে,
এখানে এলে কবে? তোমার ডাক্তারি কেমন চলছে?
মাস দেড়েক হলো এখানে এসেছি, বেশ চলে যাচ্ছে দিন। ঘরের সন্তান ঘরে ফিরে এসেছে। বাবা-মা বৃদ্ধ হয়েছে, বোনদের বিয়ে দিয়ে শেষ করেছি, এবার নিজের একটা সংসার গোছানোর চেষ্টা করছি। মুন্নির কথা তো জানোই, সামনে ওর পরিক্ষা, শেষ হলেই বিয়েটা সেরে ফেলব ভাবছি।

স্কুল ছাড়ার পর হঠাৎ করেই তুমি নিরুদ্দেশ, তারপর হঠাৎ শুনি ডাক্তারী পাশ করে ফেলছ, আমি ত অবাক, রিইউনিয়ন এর পর তোমাকে পেলাম ফেইজবুকে। বিশ্বাস কর, আমাদের ব্যাচের তুমিই সবচেয়ে সারপ্রাইজ, যে এত বড় একটা অবস্থানে এসেছে। কিন্তু হঠাৎ করেই এমন নিরুদ্দেশ এর কারণ কি জানতে পারি?

আস্তে করে একটা হাসি দিয়ে বললাম, কোন কারণ ছিল না, কলেজে ভর্তি হওয়ার পর আর তেমন সুযোগ হয়ে উঠেনি কারো সাথে যোগাযোগ করার। ডাক্তারী পড়ার সময় তো আরো সুযোগ পাইনি, তার উপরে আমার পরিবারের অবস্থা তো জানোই, টুকটাক কাজ করে নিজের খরচ চালাতে হয়েছে, সাথে পড়াশোনা, প্রাকটিক্যাল, পরে ইর্ন্টানি। যখন প্র্যাকটিস এ ঢুকলাম তখন মনে হল এই দুনিয়াটা অনেক এগিয়ে গিয়েছে, আমি অনেক পিছিয়ে পড়ছি। ফেইজবুক খুলেছিলাম আরো কিছুদিন পরে, তারপর একেঁ একেঁ সবার সাথেই কম বেশি যোগাযোগ।

এখানেই থাকবে নাকি আবার শহরে চলে যাবে?
না এখানেই থেকে যাওয়ার চিন্তা আছে, বাড়ি ছেড়ে আর বাইরে থাকতে ইচ্ছা করেনা। সে যাইহোক রিমি, আমি কিন্তু তোমার কাছে এটা আশা করি নাই।
মানুষ যা চিন্তাও করে না তা হয়ে যায় অনেক সময়। আমিও কি চিন্তা করেছিলাম কখনো আমার সাথে এমন হবে। আমাকে দেখে মানুষ এখন খারাপভাবে, বিশ্বাস কর আমি কিন্তু খারাপ নয়। আমি কখনো খারাপ কিছু করি নাই।
কি হয়েছে খুলে বলবে?
নিলয় তোমার মনে আছে, আমাকে দেখে ক্লাসের সব ছেলেরা ভয় পেত?
হ্যাঁ মনে আছে।

আমি কখনো ভাবতেও পারি নাই কোন ছেলের সাথে এভাবে আমি সম্পর্কে জড়িয়ে যাব। যখন বিএ দ্বিতীয় বর্ষে পড়ি তখনকার ঘটনা।
বাবার সাথে কোন একটা বিষয় নিয়ে আমার খুব ঝগড়া হয়, তখন আমি রাগ করে বাড়িতে বলে দেই আমার জন্য পাত্র দেখার কথা। এমনকি আমার আত্বীয়-স্বজন, আন্টি- আংকেল, চাচা সবাইকে বলি। সেই সময় আমার এক বন্ধু এক ছেলের সন্ধান দিয়ে বলে সেই ছেলে মেয়ে খুজঁছে বিয়ে করার জন্য। আমার নাম্বার সেই ছেলেকে দিয়ে বলে আমার সাথে যোগাযোগ করতে, আমি ও যোগাযোগ শুরু করি। প্রথম প্রথম ফোনে কথা বলে, পরে দেখা করি।

আমার ফ্যামেলির সাথে কথাও হয় ছেলের পরিবারের, হঠাৎ করেই একদিন ছেলে আমাকে বলে, সে আমার সাথে লিভ টু গেদার করতে চায়, আমি রাজী হই না, তখন সে বলে তুমি খাটো, তোমার বাবাকে বল আমার নামে যদি ফ্ল্যাট লিখে দেয় তাহলে আমি বিয়ে করব।
আমি বুঝতে পারি এই ছেলের সাথে আমার সম্পর্ক হবে না, তাই আমি যোগাযোগ বন্ধ করে দেই, আর ফ্যামিলিকেও না বলে দেই।

সেই সময় আমার সাথে পরিচয় হয় মারুফ এর, মারুফ সেই ছেলের বন্ধু, প্রথমে আমি তা জানতে পারি নাই।
কথা বলতে বলতে রিমির কন্ঠস্বর অস্বাভাবিকভাবে কাপা শুরু করে, বুঝতে পারি রিমির কষ্ট হচ্ছে তবু আমি তাকে না থামিয়ে শুনতে থাকি, ওর ভিতরের কথাগুলো বের হয়ে আসুক এটাই চাইছিলাম আমি। রিমি বলতে থাকে।

মারুফের সাথে আমার সম্পর্ক মাত্র দুই বছরের। আর এই সময়টাতেই সে আমার সমস্ত ধ্যানজ্ঞান হয়ে যায়।
প্রথমে ফোনে কথা বলা, তারপর দেখা, এক সাথে ঘুরাঘুরি করা। ধীরে ধীরে আমি তার পরিবারে যুক্ত হয়ে যাই, ওর বাবার কাছে আমি তার নিজের মেয়ের মত হয়ে যাই। ওর বোন, মা, বাবা সবার সাথেই আমার পরিচয় হয়, উনারা আমাকে তাদের একজন করে নেন। এই দিকে আমাদের দুই পরিবারের মাঝেও যোগাযোগ বেড়ে যায়, আর দুই পরিবারের সবাই বিষয়টা জেনে যায়। আমিও চাইনি বিষয়টা লুকিয়ে রাখতে, আমি আমার মায়ের সাথে সব কিছুই শেয়ার করতাম, তাই এই বিষয়টাও লুকায়নি।

হঠাৎ একদিন কি থেকে কি হয়ে গেলে, আমি যা জীবনে কল্পনাও করতাম না তাই করে বসলাম। তুমি বুঝতেই পারছ, এর চেয়ে খুলাখুলি বলা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।

আমি বললাম, ঠিক আছে বলতে থাক আমি বুঝতে পারছি।
তারপর হঠাৎ করেই মারুফ আমাকে এড়িয়ে চলা শুরু করে। আমি বিষয়টা প্রথমে তার বোনকে জানাই কিন্তু তাতেও কিছু হয় না। তার দুই মাস পরে আমি বুঝতে পারি আমি কনসেপ্ট করেছি। আমার পৃথিবীটা তখন শুধুই অন্ধকারে ডেকে আসতে শুরু করে। এই কথাটাও আমি ওর বোনকে জানাই। এই দিকে মারুফের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেও বারবার ব্যর্থ হই। শেষ পর্যন্ত মারুফ আমায় গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানায়।

আমি সম্পূর্ণ ঘটনা আমার মায়ের কাছে খুলে বলি।
এই পর্যন্ত বলে রিমি কান্নায় ভেঙে পড়ে, মাথার নিচের বালিশ উপরে নিয়ে মুখ ডাকার চেষ্টা করে। আমি বললাম, শান্ত হও রিমি।
নিলয় তুমি একটু বাইরে থেকে ঘুরে আস, আমি তারপর তোমার সাথে কথা বলি।

বুঝতে পারলাম, রিমি আমার সামনে মন খুলে কাদঁতেও পারছে না, কোন কথা না বলে বের হয়ে বারান্দার রেলিং ধরে দাঁড়াইলাম। ঘড়ির কাটায় আড়াইটা বাজে। কুয়াশা ভেদ করে আকাশে সুন্দর একটা চাদঁ উঠেছে। বিষন্নতায় ঘিরে ধরেছে আমার মন, সাথে চাদঁটাকেও আজ বিষণ্ন লাগছে।

এই ধরণের ঘটনার সাথে আমি আজ প্রথম পরিচিত নয়, কিন্তু রিমির কান্না আমার হৃদয় স্তব্দ করে দিয়েছে। তিন বছরের ডাক্তারি জীবনে এমন ঘটনার মুখমুখি হয়েছি বহুবার। অবৈধ গর্ভপাত করাতে গিয়ে ঝামেলা পাকিয়েছে অনেকে, আবার কেউ কেউ সুসাইড এর মত কাজও করেছে। কেউ কেউ গর্ভপাত করাতে গিয়ে মারা গিয়েছে। কখনো এতটা খারাপ আমার লাগেনি, ডাক্তারের খারাপ লাগতে নেই তাই হয়ত লাগেনি তবে যতবার এই ধরণের ঘটনার মুখমুখি হয়েছি ততবার শুধু ভেবেছি মানুষের পক্ষে কি করে সম্ভব হয় এমন একটা নোংরা কাজ করা।

যৌনতার প্রয়োজন আছে জীবনে কিন্তু এর পরিণাম এত ভয়াবহ জেনেও কেন এই ধরণের অবৈধ সম্পর্ক স্থাপন করে বুঝতে পারি না। একটা নারীর গর্ভাশয়ে বীর্যপাত করার মাঝে কোন ধরণের বীরত্ব প্রকাশ পায় অবৈ ভাবে? পুরুষ রূপী পশুদের দিয়েই এই ধরনের কাজ সম্ভব। যেখানে বিয়ের পরেও জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধত্বি অবলম্বন করতে বলা হয়, সেখানে এই ধরণের সম্পর্কে কিভাবে এতটা নিরাপদ বোধ করে। যে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না তার উচিত বিয়ে করা। কাকে দায়ী করব ভেবে পাই না, আবেগের বসেই হোক আর উত্তেজনায় হোক অন্তত নিজের সম্মান নষ্ট হয় এমন কিছু করার আগে দ্বিতীয়বার ভাবা উচিত।

ভাবনার অন্ধকার ঘরে আলো জ্বলে উঠে মুন্নির ফোনে, রিসিভ করতেই অপরপ্রান্তে অভিমানের সুর, তুমি এখনো এলে না। আপুর বিয়ে পড়ানো হয়ে গিয়েছে, ঘণ্টা খানের এর মধ্যে ওরা আপুকে নিয়ে চলে যাবে। ফেইজবুকে দেখ আপুর বরের ছবি দিয়েছি, দেখে জানাও কেমন হল আপুর বর।

মোবাইলটা কানে ধরেই অন্য ফোনটা বের করে ফেইজবুকে ঢুকেই চমকে গেলাম, বরের যে ছবি আমি দেখছি তাকে আমি খুব ভালো করেই চিনি। স্তব্দ হয়ে গেলাম কিছু সময়ের জন্য, ওপাশ থেকে মুন্নি হ্যালো হ্যালো করছে। কিছু সময় নিয়ে ভাবলাম আমি কি বলব, ওপাশ থেকে মুন্নি বলল, ছেলের নাম মারুফ, ব্যবসা করে।
কণ্ঠস্বর নিচু করে বললাম, আমি জানি।
তুমি আগে থেকেই চিনতে ভাইয়াকে?
হ্যাঁ, কলেজ লাইফে একসাথে পড়াশোনা করেছি জেলা স্কুলে।
আচ্ছা তুমি আসবে কখন?
মুন্নি আমি রিমির সাথে কথা বলছি, তোমাকে পরে জানাই।
শোন, তুমি ভাইয়ার সাথে কথা বলবে?
না, সামনাসামনি কথা বলব।
সেটাই ভালো হবে, একটা সারপ্রাইজও হবে হাজার হলেও তোমরা কলেজ বন্ধু।
আমি একটু হাসির ভান করে বললাম হ্যাঁ।
আচ্ছা আমি রাখি, লাভ ইউ।
আমার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ল, মারুফকে আমি খুব ভালো করেই চিনি। কলেজে ভর্তি হয়েই মারুফের সাথে আমার পরিচয়। ক্লাসের মাঝারি মানের ছাত্র, কিন্তু সুদর্শন আর বাপের অগাধ সম্পদ এর জোরে বেশ রংচটা হয়েই চলাফেরা করত। প্রথম ক্লাসেই ক্লাসের এক মেয়েকে পটিয়ে ফেলে। প্রথর্ম বর্ষ যেতে না যেতেই বিয়েও করে ফেলে, আর সেই গল্প ক্লাসে বসে বুক ফুলিয়ে বলেও বেড়ায়। বিশেষত বন্ধুদের আড্ডায় মুখরোচক আলোচনা হয়ে ঘুরে ফিরে। ফাইনাল পরীক্ষা পর ব্যস্ততার কারণে কোন খোজঁ খবর রাখতে পারিনি কারো সাথে, যখন রেজাল্ট বের হল তারপর কলেজে গিয়ে শুনেছিলাম মারুফের সাথে নাকি মেয়েটার ডির্ভোস হয়ে গিয়েছে।

মেয়ের ভাইকে রাস্তায় ফেলে মেরে ছিল মারুফ ও তার বন্ধুরা। বিস্তারিত জানার কোন ইচ্ছা তখন ছিল না, কিন্তু দুই বছর এক সাথে পড়াশোনা করায় তার আচার ব্যবহার নিয়ে জানার কিছু বাকী ছিল না।

ভেতর থেকে নিচু স্বরে ডাকল রিমি। তখনো কাঁদছিল সে, আমি বললাম রিমি তুমি ঘুমাও আমি বরং অন্যদিন শুনব বাকীটা।
নিলয় আমি একটা খুনি, আমি আমার বাচ্চাকে খুন করেছি, বলেই আবার হাউমাউ করে কেঁদে উঠল সে। কিছুটা সময় নিয়ে কান্না জড়িত কন্ঠেই বলা শুরু করল, আমি যখন কোন বাচ্চাকে দেখি তখন আমার বুকটা হাহাকার করে উঠে, একজন মেয়ের কাছে তার সন্তানের চেয়ে আপন কেউ হতে পারে না, আমি আমার সেই সন্তানকে হত্যা করেছি।

তুমি বুঝতে পারবে না, এই কষ্টটা একমাত্র সেই বুঝে যার সন্তান পৃথিবীর আলো দেখার আগেই তাকে মেরে ফেলা হয়। আমি আমার সন্তানকে নিয়ে বাঁচতে চেয়েছিলাম, কিন্তু সমাজের ভয়ে আমার বাবা মা তা হতে দিল না। রিমির কান্নার আওয়াজ রীতিমত বৃদ্ধি পাচ্ছে, আমি তাকে শান্ত করার জন্য বললাম, রিমি শান্ত হও।

আমার হার্টবিট বেড়ে যাচ্ছে বুঝতে পারছি, কখনো এভাবে উপলব্দি করতে পারি নাই করার সুযোগও ছিল না, কিন্তু যখন এত কাছের মানুষের উপর দিয়ে এই ঝড়টা গিয়েছে তখন তা যেন আমার হৃদয়টাকেও কাপিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। ডাক্তার হয়েও আমি আমার নিজের নিঃশ্বাস প্রশ্বাস স্বাভাবিক রাখতে পারছি না রিমির কান্নার সামনে, দম বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম আমার। জিজ্ঞেস করলাম, কতমাস হয়েছিল?
ভাঙ্গা গলায় জবাব দিল তিন মাস।
কি শিখলে?
এখনো অনেক কিছু শিখার বাকী আছে।
এই ঘটনা মারুফ জানেনা?
ওর বোন জানে।
আর কেউ জানে?
না। জানো, ওর বাবা এখনো আমাকে তার মেয়ের মত ভালোবাসে। এখনো আমার খোঁজ খবর নেয়।

এমন একটা মানুষকে তুমি ভুলতে পারছ না, কোথায় এই লোকটা সম্পর্কে তোমার ঘৃণা হওয়া উচিত সেখানে তুমি এখনো তাকে ভালোবাসো কি করে সম্ভব রিমি? এই লোকটাই তোমার জীবনটাকে এলোমেলো করে দিয়ে গেল আর তুমি তাকেই ভুলতে পারছ না। যে মানুষটা তোমার সাথে সাথে তোমার পরিবারের উপরে এত বড় একটা কষ্টের বোঝা চাপিয়ে দিয়ে গেল তুমি তাকে ভালোবাস এখনো। আমি ভাবতেও পারি না।

চোখ মুখে রিমি বলল, তুমি আমাকে কি বুঝাবে? আমার বাবা মা আমাকে বলেছে, কত মেয়ের স্বামী মারা যায় বিয়ের পরে, ডিভোর্স হয়ে যায় তারা কি সংসার করে না, তুই কেন পারবি না? কিন্তু বিশ্বাস কর আমি তার জায়গায় অন্য কাউকে কল্পনাও করতে পারি না। আমার চোখ বন্ধ হলেই আমি তাকেই দেখতে পাই, কারো সাথে কথা বললে অন্য পাশে আমি তার উপস্থিতি টের পাই।

কিন্তু তুমি যা করছ সেটা ভুল করছ এটা বুঝতে পার?
পারি, কিন্তু আমার কোন উপায় নেই, আমি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না।
তোমার বাবা হার্টের রোগী, তুমিই বলেছ। তোমার এই ধরনের আঘাতে উনি যদি স্টোক করেন তাহলে কিন্তু তুমি নিজেকে আরো ক্ষমা করতে পারবে না।
সেই জন্যই ত আমি মরে যেতে চাই।
রিমি মৃত্যু কোন সমাধান নয়।
নিলয়, আমাকে বুঝিও না। আমি ওরে ভুলতে পারব না কোনদিন।
ঠিক আছে ভুলতে হবে না, তুমি শুধু তার কথা ভাবা বাদ দাও। সে যেখানে আছে সেখানেই থাকুক, তাকে আর টেনে সামনে আনা বা ধাক্কা দিয়ে পিছনে ঠেলে দেওয়ার প্রয়োজন নেই।

আমি পারব না কিছু করতে, আমি আমার সন্তানের কাছে অপরাধী হয়ে রইলাম। রিমির কান্না কয়েকগুলো বেড়ে গিয়েছে।
বললাম, মারুফের ঠিকানা দিতে পারবে?
কেন? তুমি তার কাছে যাবে। গিয়েও কোন লাভ হবে না,ও আর ফিরে আসবে না, তবে আমি অপেক্ষা করব যতদিন বেঁচে থাকব।
বালিশের পাশ থেকে মোবাইল বের করে মারুফের একটা ছবি বের করে আমার হাতে দিল মোবাইলটা। সাথে সাথে আমার মাথায় বজ্রপাত হলো, নির্বাক চোখ দুটো শুধু তাকিয়ে রইল মোবাইলের স্কিনের দিকে। রিমির কান্নার আওয়াজও আর আমার কানকে স্পর্শ করছে না। মোবাইলটা বেডের উপর রেখে বললাম, রিমি তুমি শান্ত হও, ঘুমাও কাল কথা হবে।
রুম থেকে বের হয়ে এলাম,রিমির কান্নার আওয়াজ স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি তখন। নার্সের রুমে গিয়ে বললাম পেশেন্টকে ঘুমিয়ে রাখার ব্যবস্থা করুন।

মাথাটা ভনভন করছে, সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামার মত শক্তি যেন আর নেই আমার। রেলিং ধরে ধরে নিচে মেনে রুমে গিয়ে বাথরুমে গেলাম। চোখে মুখে জল দিয়ে বের হয়ে এলাম হাসপাতাল থেকে, হাসপাতালের কম্পাউন্ড পার হয়ে গেইটের কাছে এসে দাঁড়াইলাম। মেইন রোড ধরে কিছুদূর এগিয়ে গেলেই রিক্সা পাওয়ার কথা। পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে ফোন করলাম মুন্নিকে।

তুমি এলে না শেষ পর্যন্ত, ওরা আপুকে নিয়ে চলে গিয়েছে। কাল বৌ ভাতের নিমন্ত্রণ দিয়ে গেছে। সকালে বাবা যাবে তোমার ওখানে, তুমি কিন্তু চলে আসবে বাবার সাথে। এক দমে কথাগুলো শেষ করল মুন্নি। নির্বাক হয়ে শুনে গেলাম কথাগুলো, ফোন রেখে দিলাম কোন কথা না বলেই। মারুফের কুলষিত চেহেরাটা যদি আজ মুন্নি জানতে পারে বা আপু জানতে পারে তাহলে সে কি করবে? হয়ত রিমির মতই আগামীকালের রাতটা কোন হাসপাতালের বেডে কাটবে বা কবরে।
মানুষের প্রতি একটা ঘৃণার জন্ম নিচ্ছে ক্রমে, আর সেটা ঘণীভূত হয়ে নিজের দিকেই অগ্রসর হচ্ছে। আমার নিঃশ্বাস ক্রমেই ভারী থেকে আরো ভারী হয়ে উঠছে। এই সমাজ রিমির এই ঘটনার জন্য রিমিকেই দায়ী করবে, দোষ ধরবে রিমির। মারুফরা পার পেয়ে যাবে পুরুষ নামের আড়ালে রিমিরা সমাজ, পরিবার, মানুষ সবার কাছে দোষী হয়ে নিজের জীবন দিবে নয়ত সারাটি জীবন অনুশোচনার আগুনে জ্বলে পুড়ে তিলে তিলে নিঃশেষ হয়ে যাবে।

পুনশ্চ: এই গল্প পড়ার পড়ে অধিকাংশ পাঠক রিমির দোষ ধরবে, কেউ কেউ তার পরিবারের দোষের কথা বলবে কিন্তু খুব কম মানুষ মারুফকে দোষারূপ করবে। আমিও স্বীকার করে নিব দোষ রিমির আছে, কিন্তু সেটা শুধু রিমির নয়। রিমি, মারুফ, তার পরিবার, সমাজ কেউ এই দোষ থেকে বাইরে নয়। এই গল্পটা শুধু গল্প হলেই আমি খুশি হইতাম কিন্তু সেই সুযোগ নেই আমার। ইদানীং পত্র-পত্রিকায় এই ধরণের খবর অহরহ আসছে, কিন্তু সেই সংখ্যাটা কত? হাজারে একটা। এমন হাজারও রিমির গল্প আড়ালেই থেকে যাচ্ছে। আর পুরুষ রূপী কিছু রাক্ষস রিমিদের আস্ত গিলে খাচ্ছে প্রতিনিয়ত।

কমেন্টস