জাহানারার ঠিকানা

প্রকাশঃ নভেম্বর ১৭, ২০১৬

আবু খায়ের আনিছ।।
তৈয়ব আলির সংসারে দুই ছেলে, তিন মেয়ে। তার সংসারের ইতিবৃত্তের গভিরতাও প্রখর। পঞ্চাশের দশকের বাংলাদেশে মেয়ের বয়স পনের সে বিশাল ব্যাপার, যদি বিয়ে না হয় তাহলে আর রক্ষে নেই, ধর্ম যাবে জাত যাবে। কুড়ির আগেই বুড়ি হওয়ার প্রবাদ এর উৎপত্তি নিয়ে গবেষণা করার প্রয়োজন পড়ে না, শুধু এই অবস্থার কথা চিন্তা করলেই বলে দেওয়া যায়।
বাপের অঢেল সম্পদের একমাত্র উত্তরাধীকার তৈয়ব আলি বিয়েটা তৎকালীন সময় মেনেই করেছিলেন, কুড়ির আগেই। মেয়ের বয়স চৌদ্দ।

বছর ঘুরেও যখন তৈয়ব আলির ঘরে কোন সন্তান এলো না, তখন দোষটা গিয়ে পড়ে বউ এর উপর। বছর ঘুরে ঘুরে এক, দুই,তিন চলে যায় কোন সন্তান হয় না। নিঃসন্তান দম্পতির শেষ উপায় হয় পাশের গ্রামের মকবুল মিয়া। বছর বছর মেয়ে সন্তান জন্ম দিয়ে উনার সংসারে এখন মেয়ের সংখ্যা নয় এর কোটা পার হয়ে যাচ্ছে। দশমবারের মত মা হতে যাচ্ছে মকবুলের বউ।

তৈয়ব আলি স্ত্রীর উপর ভরসা ছেড়ে দিয়ে মকবুলের ছোট মেয়েকে পালক হিসাবে গ্রহণ করে। বিষণ্ন সংসারে প্রাণের ছোঁয়া লাগে এবার, আর বছর ঘুরতে না ঘুরতেই এবার তৈয়বের ঘরে আসে সন্তান। নিজের সন্তান বলে কথা, তৈয়ব আলির আনন্দ যেন আর ধরে না। সন্তান দুনিয়ার মুখ দেখার সাথে সাথেই সন্তানের নামে বিঘাখানেক জমি লিখে দিয়ে মেয়ের মুখ দেখেন।

তার বছর ঘুরতেই আসে আরেক ছেলে, তারপরের বছর আবার ছেলে। বিয়ের দিন কয়েক পরেই বাপ হারিয়ে সংসারে বড় একা হয়ে পড়েছিল তৈয়ব এখন তার সংসারে ছেলেমেয়ে মিলিয়ে ছয়জন, চাকরবাকর নিয়ে সংখ্যা দশে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। বাপ দাদার পৈত্রিক আলিশান বাড়ি এখন সব সময় মানুষের পদচারণায় মুখর।

ক্রমান্নয়ে আরো এক মেয়ের জনক হন তৈয়ব অালি। তৈয়ব আলির সংসারের বৃত্তান্ত দিতে গেলে এই গল্প তার সমাপ্তি রেখা কোথায় নিয়ে যাবে তা আমার অজানা, গল্প যাকে নিয়ে সেই ছোট মেয়ে জাহানারার কথাই বলি আমি।

পালক মেয়েসহ তৈয়ব আলির সংসারে মেয়ে তিনজন, বেগম, রাশেদা, আর জাহানারা। ছেলে দুইজন, শাহজাহান, শাহকামাল। আদি পুরুষের পেশা কৃষিকাজ, আর বাজারে গুদামের ব্যবসা করে বেশ সুখেই কাটে তৈয়ব আলির সংসার।

ষাটের মাঝামাঝি থেকে সত্তরের মাঝের সময় পুরো জীবনটাকেই পাল্টে দেয় তৈয়ব আলির জীবনটাকে। শুধু তৈয়ব না, পুুরো দেশের মানুষের জীবন মানকেই পাল্টে দেয় এই যুদ্ধ। স্বাধীনতার পতাকা উড়ে দেশে কিন্তু কিছু মানুষ পরাধীন হয়ে যায় মুষ্ঠিমেয় কিছু মানুষের হাতে। তৈয়ব আলি তাদের একজন, রাজাকার আলবদর বাহীনির হাতে নিজের সহায় সম্পদ সব খুয়ে পথে বসার মত অবস্থায় পড়ে যান। যুদ্ধ এবং পরবর্তী সময়ে সন্তানদের নিয়ে পড়েন বিপাকে, কোথায় যাবেন কি করবেন কোন কিছুই যেন ঠিক করতে পারেন না।

মেয়ে বড় হচ্ছে বিয়ে দিতে হবে এই ভাবনায় ক্রমশ আরো ভারাক্লান্ত হয়ে উঠে মন। পাড়ার মৌলভী থেকে শুরু সবাই কথা শোনানো শুরু করে দিয়েছে বড় দুই মেয়েকে নিয়ে। দুই মেয়েকে কয়েক মাসের ব্যবধানে বিয়ে দিয়ে সমাজের মুখে কুলুপ একেঁ দেন তৈয়ব আলি।
দেশে তখন গণহারে পুলিশে নিয়োগ চলছে, শাহকামাল আর শাহজাহান দুইজনের পুলিশে চাকুরি হয়ে যায় সেই গন নিয়োগ এ। মাত্র ক্লাস ফাইভ পাশ করে সরকারি চাকরি, চারিপাশে তাদের নিয়ে রব রব উঠে যায়। তৈয়ব অালি খুশিতে আটখানা। দুই ছেলে চাকুরি পেয়ে ঘর ছেড়ে কর্মস্থলে পাড়ি জমায়। ভরা বাড়ি আবার খালি হয়ে যায়, পাশে থাকার মত মানুষ তখন শুধুই দশ বছরের জাহানারা।

বেশি দিন এই শূণ্য অবস্থা বিরাজ করে না তৈয়ব আলির ঘরে, শাহজাহান শাহকামালকে বিয়ে করান বছর দুই এর মাঝেই। আর তার বছর দুয়েক পড়েই বিয়ে দেন জাহানারা।

ছেলে মুক্তিযোদ্ধা, কাচামালের ব্যবসা করে, দেখতে শুনতে ভালোই এমন ছেলে হাত ছাড়া করা যাবে না, তার উপরে মেয়ের বয়স পনের এর কোটা পার হয়েছে, দুইদিন আগে পরে মেয়েকে বিয়ে দিতেই হবে, তাই আর দেরি না করে বিয়ে দিয়ে দেন।

সুখের সংসার শুরু হয় জাহানারার। স্বামী শফিকুলের তিন কুলে কেউ নেই, মেয়ের বিয়ের সময় তৈয়ব আলি নগদ দশহাজার টাকা ও এক বিঘে জমি দেন। তা দিয়ে এবং ব্যবসা করে যা আয় হয় সেটা দিয়ে সংসার বেশ ভালোই কেটে যায়।

সুখের ঘরে অথিতি আসে তাড়াতাড়ি, বিয়ের বছর না যেতে যেতেই প্রথম মেয়ের জন্ম দেয় জাহানারা এবং পরপর তিন মেয়ের জন্ম দিয়ে ছেলে সন্তান হওয়ার হাল ছেড়ে দেয় দুইজনেই। যা হয়েছে তাই অনেক, এবার মেয়েদের মানুষ করতে হবে। তিন মেয়েকে নিয়ে সুখেই দিন যাপন করতে থাকে জাহানার। তিন মেয়েকেই একে একে স্কুলে দিয়ে পড়াশোনা করাতে শুরু করে। পূর্ব আকাশে সুর্য় উঠে, দিনের শুরু হয়, মেয়েদের স্কুলে পাঠানো, স্বামীর ব্যবসার কাজে বাইরে যাওয়া, আর ঘরদোর গুছানো রান্নাবান্না এই করে দিনের সূর্য আবার অস্ত যায়। নিত্যদিনকার কাজে কোন ব্যতয় ঘটে না, নিয়মমাফিক সব কিছুই স্বাভাবিকভাবেই চলতে থাকে জাহানারার জীবনে।

মেঘের আড়ালে যেমন সূর্য হাসে, সূর্যের পিছনে তেমনি মেঘ থাকে এবং যে কোন সময় সেই মেঘ গ্রাস করে নিতে পারে সুর্যকে। জাহানারার সুখের পিছনে মেঘের যে আনাগোনা ছিল তাই যেন এবার গ্রাস করতে চলে এলো সুখকে। ব্যবসার কাজে ঢাকা থেকে ফিরতি পথে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে এক মাস চিকিৎসার পর পরলোকের পথে পা বাড়ায় জাহানারার স্বামী। বিষয় আশয় যা ছিল তার সর্বস্ব বিক্রি করে চিকিৎসা করিয়েও তাকে আর ধরে রাখতে পারে না এই পৃথিবীতে।

অন্ধকার ছায়া এসে ঘিরে বসে জাহানারার জীবনে। তিন মেয়েকে নিয়ে শেষ ভরসা বাবা ভাই। বাবার কাছেই শেষ আশ্রয়টা খুঁজে পায় জাহানারা। বাবার ভিটের এক পাশে মায়ের ঘরের সাথে একটা ঘর তুলে সেখানেই বসবাস শুরু করে সে। কিন্তু এই সংসারে সে তার আপন জায়গাটা আর খুঁজে পায় না। বাবা মায়ের সেবা আগের মতই করে কিন্তু তবু এখানে যেন পরপর। ভাই বউদের আচরণই তা প্রমাণ করে। উঠতে বসতে অপয়া, অলক্ষুণে বলে খোঁচা দেওয়া থেকে শুরু করে সংসারের কোন কাজে পান থেকে চুন খসলেই শুরু হয় নানা কথা।
ক্রমান্নয়ে জাহানারা ভুলে যেতে শুরু করে এই সংসারের মেয়ে সে, বরং এখন তার নিজের পরিচয় হয়ে যায় কাজের মেয়ের মত। তৈয়ব আলি বৃদ্ধ হয়েছেন, এখন আর তার কথার গুরুত্ব কেউ দেয় না। ছেলেরা নিজেরা স্বনির্ভর কারো কথা শুনার প্রয়োজন মনে করে না। নিজেদের স্ত্রী সন্তান হয়েছে, তাদের দিকেই খেয়াল রাখার সময় হয় না, সেখানে অন্যের সন্তানদের খেয়াল রাখবে কি করে।

জাহানারা মুখ বুঝে সব সহ্য করে, তার কিছু করার উপায় নেই। ভাইদের দয়ায় বেচেঁ আছে এই যেন তার কাছে অনেক কিছু।
তৈয়ব অালিও অসহায় হয়ে পড়েন, ছেলেদের কিছু বললে পাছে বউয়েরা শুনে নানান কথা শুনিয়ে দেয়, এই ভয়ে কিছু বলতেও পারেন না। জমি থেকে যা ফসল আসে তার কিছু অংশ দিয়ে মেয়েকে সাহায্য করেন এই যা।

বড় দুই নাতির বিয়ে দিয়ে তৈয়ব আলি পরলোকগমন করেন। তৈয়ব আলির প্রস্থান জাহানারার জীবনে আরেকবার কালো মেঘের আড়ালে নিয়ে যায়। এবার এই সংসারে টিকা দায়, উঠতে বসতে কথা শুনতে হয় ভাই বউদের কাছে। তবু টিকে থাকার সংগ্রামে তাকে সংগ্রাম করতে হয়। ভাইদের সংসারের কাজ করে, মায়ের সেবা করে এবার নিজে কিছু করার জন্য পাশের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ নেয়। ছোট মেয়ে স্বপ্নাকে স্কুলে পড়ায়, আশা যদি আবার কখনো উপরওয়ালা মুখ তুলে তাকায়।

ভাইয়েরা বাপের দালান ভেঙ্গে আলাদা ঘর তুুলে আর জাহানারার জায়গা হয় ভিটের এক পাশে জঙ্গলের পাশে, মায়ের সাথে। তবু জাহানারা খুশি, তাড়িয়ে যে দেয়নি তাই তার কাছে পরম সৌভাগ্য।
স্বপ্নার থেকে কয়েক বছরের ছোট আরো ‍দুই মেয়ের বাস এই সংসারে। শাহ কামালের মেয়ে নিপা, শাহজাহানের মেয়ে তানিয়া। নিপা আর তানিয়া একই ক্লাসের কিন্তু স্বপ্না এক ক্লাস উপরে। স্বপ্না মেট্রিক পাশ করতেই নিপা, তানিয়ার মায়েদের ব্যস্ততা বেড়ে যায়। মেয়ে বড় হয়েছে বিয়ে দিতে হবে, নয়ত এই মেয়ে তাদের মেয়েদের কপালে অশনি সংকেত হয়ে দেখা দিবে। এই মেয়েকে বিদায় করতে হবে, আর তা কেবল সম্ভব মেয়ের মামাদের দিয়ে কিছু একটা ব্যবস্থা করানো।
ইন্টার পরীক্ষা চলাকালীন সময়েই স্বপ্নার বিয়ে দিয়ে দেয় দুই মামা। আর সাথে সাথে একা হয়ে যায় জাহানারা। নিয়তিকে মেনে নেওয়া ছাড়া যেন তার আর কিছুই করার নেই। মেয়ের বিয়ে দুইদিন আগে আর পরে দিতেই হবে। তবু শুধু দুঃখবোধটা থেকে যায়, অপ্রাপ্ত বয়সে মেয়ের বিয়ে দিল তার আপন দুই পুলিশ কর্মকতা ভাই, যারা নাকি আইনের রক্ষক।

অসুস্থ মায়ের সাথে জাহানারার নতুন ঠিকানা হয় বড় ভাই শাহজাহান এর ঘরের বারান্দার রুমে। অসুস্থ মায়ের সেবা করে, মানুষের দেওয়া সাহায্য নিয়েই দিন চলতে থাকে।

কিছুদিন যেতে না যেতেই মায়ের মৃত্যু হয়, আর জাহানারার জীবনের শেষ অন্ধকারটা ঘনিয়ে আসে। মায়ের মৃত্যুর কিছুদিনের মধ্যেই নিপার বিয়ের কথা শুরু হয়। এক সময় বিয়েও হয়ে যায় নিপার, কিন্তু বিয়ের পরেই শুরু হয় জাহানারাকে তাড়ানোর চিন্তা ভাবনা। এতদিন যা অপ্রকাশিত ছিল তা প্রকাশ হয়ে যায় এবার। মেয়ের জামাই আসবে, আর এসে যদি এই বিধবাকে এমন অবস্থায় দেখে তাতে মানসম্মান সব যাবে, একে আর রাখা যাবে না। তানিয়ার বিয়ে দিতে হবে, অন্য ছেলেমেয়েদের বিয়ে করাতে হবে। জাহানারা হয়ে যায় সবার চোখের বিষ ফোড়া।

সর্বশেষ জাহানারা এই অবস্থা দেখে বাড়ি ত্যাগ করি। শুনেছিলাম তখন জাহানারা মুখেই, বড় ভাইজান বলেছে এই বাড়ি ছেড়ে অন্য কোথাও গিয়ে থাকতে। স্বামীর ভিটায় ফিরে যেতে। বড় বোন এক খণ্ড জমি কিনেছিল পাশের গ্রামে, সেখানে থাকতে দিতে চেয়েছিল কিন্তু ভাইজান তা চায় না। আমাকে এই গ্রামেই আর থাকতে দিবে না। কোথায় যাব এখন এই বৃদ্ধ বয়সে, জানি না।

এবার গ্রামে যাওয়ার পথে, হঠাৎ রাস্তায় এক মাঝ বয়সী বৃদ্ধা ভিক্ষা চাইতেই জাহানারার কথা মনে পড়ে গেলে। খোঁজ নিতে গিয়ে জানতে পারলাম জাহানারার কোন ঠিকানা কেউ জানে না। নিপার মেয়ে বাচ্চা হয়েছে, তিনমাস বয়স। তানিয়ার বিয়ের কথা চলছে, শাহজাহানের বাড়ি এক তলা থেকে তিনতলায় উঠে গিয়েছে। শাহ কামাল হজ্ব করে চাকরি থেকে অবসর নিয়েছে।

কত মানুষের কত কিছু হল, শুধু কেউ জাহানারার খবর দিতে পারল না। জানি না জাহানারা কোথায় আছে, হয়ত কোন পথের বাকেঁ পড়ে আছে ভিক্ষুক বা অন্য কিছুর বেশে।

সুতপার ঠিকানা সিনেমা নিয়ে বন্ধুদের সাথে কথা হচ্ছিল, এক বিধবা মেয়ের জীবন সংগ্রাম নিয়ে রচিত সেই সিনেমায় পরিচালক দেখাতে চেষ্টা করেছেন সুতপা নামের মেয়ের জীবনের নানা ঘটনা। আমাদের বাস্তব জীবনে এমন হাজার সুতপা আশেপাশেই পড়ে আছে, তার কতগুলোর খবর আমরা জানি?

Advertisement

কমেন্টস