ভালোবাসা বনাম স্বজনপ্রীতি

প্রকাশঃ সেপ্টেম্বর ২৪, ২০১৬

ছবি প্রতীকী

হাকিম মাহি-
মানব সভ্যতার শুরু থেকে পৃথিবী নামক স্টেডিয়ামে ভালোবাসা বনাম স্বজনপ্রীতির একটি প্রীতিম্যাচের আয়োজন করা হয়েছে। যেখানে চলবে মানবতা হরণের একটি সম্মুখ লড়াই। খেলায় অংশগ্রহণ করছে দুটি দল-একটি উত্তর পাড়ার ভালোবাসা স্মৃতি সংঘ ও অন্যটি দক্ষিণ পাড়ার স্বজনপ্রীতি ক্রীড়া চক্র।

চিরাচরিত এই খেলার মাঝে মনে হচ্ছে ভালোবাসা নামক দলটির জেতার কোনো সম্ভাবনা নেই, কারণ স্বজনপ্রীতি দলের খেলোয়াড় ও কোচ যতটা না দক্ষ তার চেয়ে ঢের করালগ্রাসী। এই যেন বাংলাদেশ বনাম ভারত অথবা আর্জেন্টিনা বনাম জার্মানির বিশ্বকাপের ম্যাচ। তেমনি বাস্তবমুখী এক প্রতিযোগিতার মধ্যে ভালোবাসা নামক দলটির একজন মেধাবী কিন্তু সহজ-সরল খেলোয়ার তপু।

তপু হতদরিদ্র ঘরের সন্তান। ছোট বেলা থেকে তাঁর ইচ্ছা বিচারপতি হবেন। তাই শিক্ষা ব্যবস্থার অসংগতি ভেবে কওমি মাদরাসা ছেড়ে সরকারি কারিকুলাম ভিত্তিক আলিয়া মাদরাসায় ভর্তি হলেন। আলিয়া এবং স্কুলশিক্ষা একাডেমিক সার্টিফিকেটের ক্ষেত্রে সমমান। তপুরা ৩ ভাই ২ বোন ও বাবা-মা মিলে ৭ জনের সংসার চালাতে তপুর বাবা রহমত আলির একার পক্ষে অনেকটা রথে এনে পথে খাবারের মত। তাই ছেলে-মেয়েদের পড়া-লেখা করাতে এক রকম অপারগ। তবুও বড় দু’মেয়েকে প্রাথমিক শিক্ষা দিয়ে দক্ষিণ পাড়ার দিনমজুরদের বাড়িতে বিয়ে দিয়ে দেন। আর বড় ছেলেকে এসএসসি পাশ করিয়ে গ্রাম্য ডাক্তারদের সংস্পর্শে রেখে কোনো রকমের হাতুড়ি ডাক্তারদের তালিকায় নাম লেখান।

রহমত আলির অনেক স্বপ্ন মেঝো ছেলে অনেক মেধাবী তাঁকে পড়ালেখা করিয়ে বিচারপতির বাবা হবেন তিনি কিন্তু ছেলেকে আর সে পথে হাঁটতে দেখার সময় পেলেন না। সারা দিন রাত মুসলমানদের উপাসনালয়ে কাজ করে কোনো রকমের দিনাতিপাত করতেন। একদিন অসুস্থ হওয়ায় শহরের কোন এক সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসা নিয়ে জানলেন তাঁর ব্লাড ক্যান্সার হয়েছে। সেই দূরারোগ্য রোগ থেকেই একদিন হঠাৎ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন রহমত আলি। এমনিতেই অভাবের সংসার তার ওপর তপুর বাবার মৃত্যু সব মিলে দুঃখের অকুল দরিয়ায় বুঝি কূল নাইরে।

তপুর গানের কণ্ঠ সুন্দর থাকায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা অনেক স্নেহ করতেন তাঁকে। তাই শিক্ষকরা তাঁর সমস্ত খরচ বহন করতেন। মাধ্যমিক পর্যায়ে এসে বুঝতে পারে ভালো রেজাল্ট না করলে তাঁর এবং তাঁর বাবার স্বপ্ন সে পূরণ করতে পারবে না। সেজন্য পড়ালেখার পেছনে উঠেপড়ে লাগলেন এবং প্রত্যেকটি ক্লাসে সব সময় ফাস্ট সেকেন্ড হতেন। এসএসসি পরীক্ষায় সে নিজ উপজেলার চারজন কৃতি শিক্ষার্থীর একজন হলে মিডিয়ার চোখে পড়ে যায়। তাঁকে নিয়ে লেখালেখি হতে থাকে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায়। দেশের স্বনামধন্য মানুষ ও স্বপ্রতিষ্ঠানের আর্থিক সহযোগিতায় উচ্চ মাধ্যমিকে সর্ব প্রথম ঐ উপজেলায় জিপিএ পাঁচ পায় সে। অনেক আশা ও দেশের মানুষের উপর ভরসা নিয়ে তপু দেশের রাজধানী শহরে চলে আসেন উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য।
ঢাকায় এসে প্রথম উচ্চশিক্ষার রীতি অনুযায়ী দেশের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠগুলোতে ভর্তি পরীক্ষা দেন। শিক্ষা ব্যবস্থায় অসংগতির জন্য সে তাঁর প্রত্যাশিত সাবজেক্ট পায়নি, তাই অন্য কোনো বিষয়ে ভর্তি হলেও নিজের স্বপ্ন বিলীন হওয়ার ভয়ে ঐবিষয়ে পড়া বন্ধ করে দেন। কিছু দিন হন্য হয়ে ঘুরতে থাকে তপু। একদিন তাঁর কোন এক বন্ধুর কাছে জানতে পারে তাঁর ভগ্নিপতি যুক্তরাজ্যে থাকে, সে যদি চায় তাহলে তাঁকে বিদেশে পড়তে নিয়ে যাবে। এ কথা শুনে তপু আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেলেন। এখন তাঁর স্বপ্ন শুধু বিদেশে পড়তে যাওয়া।

বন্ধুর ভগ্নিপতির কথা অনুযায়ী অনেকের কাছ থেকে টাকা দেনা করে পেপার্সগুলো রেডি করে ফেললেন। ভগ্নিপতি জানালেন ৬ লক্ষ টাকা লাগবে, এ কথা শুনে তপু চিন্তায় পড়ে গেলেন আর মনে মনে বললেন তাহলে কি আর বিদেশে পড়তে যাওয়া হলো না। কারণ তপুদের বাড়ীর যায়গা ছাড়া আর কোনো সম্পত্তিও নেই।

এ কথা ভগ্নিপতিকে বলা হলে তিনি বললেন তপুরতো সব কিছু প্রস্তুত, এখন টাকা জমা দিতে পারলেই যেতে পারে। তপুর মা সেফালি বেগমকে বললেন বাড়ীর যায়গাটা বিক্রি করে দিতে। সেফালি ছেলের ভবিষ্যতের জন্য ন্যায্য দামের অর্ধেক টাকায় জমি বিক্রি করে টাকা জমা করে দিলেন। কিন্তু ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস’ এ কথাটি বলবো না, শুধু বলবো সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব কতটা নিকৃষ্ট হতে পারে তার নজীর এই অপকর্মটি। তাকে না নিয়ে অন্য কাউকে বেশি টাকার বিনিময়ে নিয়ে নিলেন। তপুর হতাশা বাড়তে শুরু করল দিনের পর দিন। তপু ঢাকায় ভাষা শিক্ষার উপর বিভিন্ন শর্টকোর্স করলেন, এ সময়ে কোনো এক সহপাঠির সাথে তাঁর ভালো বন্ধুত্ব হয়ে যায়। কিছু দিন পরে তপু জানতে পারে ওর বড় ভাই কানাডা থাকে, ও নাকি লোক নিবে, যারা ওখানে পড়তে যেতে চায়। তপু এখানেও রাজী হয়ে গেলেন। কারণ তপুর স্বপ্ন পূরণ করা দেশেতো আর সরকারের শিক্ষা নীতির বৈপিরিত্যের কারণে সম্ভব হল না, তাই তাকে এ দেশ ত্যাগ করতে হবেই। এখানেও অনেক আশা দিয়ে বছর খানেক সময় নষ্ট করলো, যদিও ওর সে বন্ধু ওর টাকা দিয়েই বিদেশ চলে গেলো। তপুর আর যাওয়া হলো না।

এভাবে চলতে লাগলো প্রতারণার পালা। অনেক দিন হলো তপু ঢাকায়, এখন আর খেয়ে থাকার মত অর্থ তাঁর নাই। তাই চিন্তা করলেন যত নিন্মমানেরই হোক না কেন তাকে একটি কাজ করতে হবে। তাই তিনি কাজ খুঁজতে লাগলেন এবং পেয়েও গেলেন, যাকে বলে ‘যেখানে বাঘের ভয়-সেখানেই সন্ধ্যে হয়’। কাজটি পেলেন একটি ভিসা প্রোসেসিং কোম্পানির অফিসে রিসিপ্সনিস্ট হিসেবে। তপুর আনন্দ আর বাঁধ মানে না, এবার সে যাবেই। কিছু দিন কাজ করার পর মালিক বললেন, তপু তুমি অর্ধেক টাকা দাও আমি তোমাকে আমেরিকা পাঠিয়ে দেই, আর তুমি IELTS কর। তপু অধ্যাবশায়ী মানুষ ‘যেই কথা সেই কাজ’, করেও ফেললেন। কিন্তু কিছু দিন পরে জানলেন কোম্পানির মালিক নিজেও কখনো বিদেশ চোখে দেখেনি। মালিকের নিকট থেকে টাকা উঠাতে গিয়ে চাকরি চলে গেলো তপুর। ‘যাকে বলে গাছ তলায় শুয়ে কোটি টাকার স্বপ্ন দেখা’ তপু এতদিন তাই করছিলেন।

তপু এখন বেকার, কিছু দিন পরে তাঁর গ্রামের উপজেলার কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষকরা তপুকে ডাকালো এবং বললো তুমিতো অনেক সুন্দর লেখা-লেখি করো, তাহলে কয়েকটি পাঠ্য বইয়ের সহায়ক বই আমাদের করে দাও আমরা তোমার বই আমাদের প্রতিষ্ঠানে চালিয়ে দেই। কারণ, লেখক হিসেবে তপুর অনেক নাম-ডাক ছিলো এলাকার সবার কাছে। তপু তাদের প্রস্তাব সাদরে গ্রহণ করলেন এবং কিছু বই ছেপে দিলেন। তপু প্রতিষ্ঠানে বই চালানোর জন্য যে নগদ উৎকোচ বা ঘুষ দিতে হয় তা দিতে না পারায় ঐ শিক্ষকরা অন্য কোম্পানির বই ঘুষের টাকা হাদিয়া হিসেবে নিয়ে তাঁদের প্রতিষ্ঠানে চালিয়ে দেয়। কিন্তু অন্য এলাকায় বইগুলো সাদরে গ্রহণ করলে যে পরিমাণ ক্ষতি হওয়ার কথা ছিলো তা উঠে আসে।

তপুর বর্তমান অবস্থাও যে খুব ভালো তা নয়; এখনও সে হেরে যাচ্ছে ৭/৫ গোলে স্বজনপ্রীতির কাছে। এতদিনে তাঁর জীবনের কোন এসপার ওসপার না হওয়ায় সে দেশের কোনো একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে এবং জীবিকার তাগিদে যে যা করতে বলছে সে তা আপন মনে করে চলছে। আশ-পাশের হিতাকাঙ্খিরা তাঁকে কি ভালোবেসে এগিয়ে আসছেন নাকি আবারও কোন ভালোবাসা নামক স্বজনপ্রীতিতে ফেলে দিচ্ছেন-তা প্রশ্নই থেকে যাচ্ছে। শেষ পর্যন্ত তা কি বাংলা সিনেমা “বেলা শেষে” এর গল্প টানাপোড়নের মত হয়ে যাবে? কিন্তু জীবনের সময়তো আর বসে থাকে না, সে তার নিজস্ব গতিতে তপুদের মত হতাশাগ্রস্থদের পেছনে ফেলে খড়কুটোর ন্যায় চলে যায়। পড়াশোনা শেষে তপুর মত যারা তাঁদের কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছতে চায় তাঁরা কি পারবে পৌঁছতে? প্রশ্নটি থাকলো মানবতাবাদী বিবেকের কাছে।

Advertisement

কমেন্টস