আর্তচিৎকার

প্রকাশঃ জুন ২৭, ২০১৬

আবু খায়ের আনিছ-

ঘুমাতে দেরি হয়ে যায় এমনিতেই। শেষ রাতের দিকে আবার অঘোরে ঘুমানো আমার বদঅভ্যাসগুলোর মধ্যে অন্যতম। মরার মত ঘুম বলে একটা শব্দ আছে, সেটা বোদ হয় আমার জন্য প্রযোজ্য নয়। সামান্য শব্দ হলেও আমার ঘুম ভেঙ্গে যায়।

বালিশের কাছে মোবাইল রেখে ঘুমানোটা আমার অভ্যাস। সেদিনও ঘুমিয়ে পড়েছিলাম রাত আড়াইটা নাগাদ। হঠাৎ ফোনের শব্দে ঘুম ভেঙ্গে যায়। এত রাতে আবার কে ফোন করল? পাশ থেকে আমার বন্ধু বলে। আমি বললাম মা ফোন করেছে।
ঘটনা কি এত রাতে ফোন?
দেখি কি বলে।
খবরটা এতটাই খারাপ যে ঘুম আমার চোখ, মন সব কিছু ছেড়ে দৌড়ের রেসে ফাষ্ট হয়ে হারিয়ে যায়। ছোট বোনের জীবন বিপন্ন। রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে হাসাপাতালে নেওয়ার মত গাড়ি নেই। তড়িঘড়ি করে উঠে ফোন করলাম এক বন্ধুকে।
হ্যালো, এত রাতে?
আমার বোন মরে আর তুই ঘুমাস।
কেন কি হয়েছে?
তুই বাড়িতে থাকিস না আমি থাকি।
আচ্ছা দেখছি।

চোখে মুখে পানি দিয়ে শুয়ে আছি। শরবিন্দুর একটা বই নিয়ে কয়েকটা পাতা উল্টেছি কিন্তু পড়া হয়নি একটা অক্ষর। ঘণ্টা খানেক পড়ে ফোন করলাম, আন্টিকে।
আন্টি, আপনি কোথায়?
কেন বাড়িতে?
আপনার ভাতিজিকে হাসপাতালে নিয়ে গেছে।
আচ্ছা আমি যাচ্ছি।

সকাল গড়িয়ে দুপুর কোন খবর নাই, বারবার ফোন করছি কিন্তু ব্যস্ত। বিকাল তিনটার দিকে ফোন এল, আজ রাত আটটায় অপারেশন। রক্ত লাগবে। আমি বললাম, ঠিক আছে আমি আটটার আগেই পৌছে যাব।
বাসা থেকে বের হলাম সন্ধ্যের ঠিক আগ মুহুর্তে। বাসের কন্ট্রাক্টরকে কোন রকম হাতে পায়ে ধরে একটা টিকিট ম্যানেজ করে চড়ে বসলাম।
উইংস অফ ফায়ার হাতে তখন। অসস্থি কাজ করছে মনে মনে, ঠিক সময় মত পৌঁছাতে পারব ত?
সাতটা পয়তাল্লিশ, চাচার ফোন। তুই কতদূর আর কত সময় লাগবে?
আর পনের মিনিট এর মধ্যেই চলে আসব।
সাতটা পঞ্চান্ন, বাবার ফোন, আর কত সময় লাগবে?
এইত আর দশ মিনিট। সব কিছু রেডি আছে?

আছে, তুই তাড়াতাড়ি চলে আয়। মনে মনে বললাম মানুষ বিপদে পড়লে কান্ডজ্ঞান সব কিছুই লোপ পায়। আমি যাচ্ছি বাসে করে, বাস যেভাবে যাবে আমি ত সেভাবেই যাব, তাড়াতাড়ি করার মত কিছু কি আমার হাতে আছে?
আটটা। অসুস্থ বোনের ফোন, ভাইয়া তোমার আসতে কি দেরি হবে?
আরে না তুই অপারেশন থিয়েটারে যেতে থাক আমি চলে আসছি। কোন ভয় পাবি না, আমি ত আছি তোর পাশেই।
আটটা পাচঁ, বোনের বন্ধুর ফোন, ভাইয়া আপনি কোথায়?
তুমি কোথায়?
ওয়ার্ডে, অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাবে এখন।
কত নাম্বার ওয়ার্ডে আছ।
২৭ নাম্বার ওয়ার্ডে, দুই তলায়।

থাক আসছি। বলেই দিলাম দৌড়। সরকারি হাসপাতালের ফ্লোরগুলো এমন ভাবে মোজাইক করা থাকে যেখানে রোগীকে বয়ে নিয়ে যাওয়ার ট্রলিগুলো যাতে ভালো করে চলতে পারে। মানুষ হেটে গেলেও আছাড় খাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আগে থেকেই কিছুটা অভ্যস্ত ছিলাম বটে কিন্তু সেখানে দৌড়াতে গিয়ে কষ্ট হয়েছে। হাজারে হাজার মানুষ এর ভীড় ঠেলে উঠে গেলাম দোতলায়। আমার জন্য দাড়িয়ে আছে আমার বোন সহ পরিবারের লোকজন। ডাক্তার আমার বোনের বান্ধবী, পূর্ব পরিচিত। বললাম, আপু আপনি থাকবেন অপারেশন থিয়েটারে?
হ্যা ভাইয়া, আপনি কোন টেনশন করবেন না।

আচ্ছা, বোনকে নিয়ে গেলাম ওটিতে। অপেক্ষার প্রহর শুরু হল। সাথে সবার মুখে উৎকন্ঠা। পরিবারের লোকজন, আত্বীয়-স্বজন, বন্ধু,বান্ধবী মিলিয়ে প্রায় জনা পঞ্চাশ এর মত মানুষ। রাত সাড়ে নয়টায় অপারেশন শুরু হয়ে চলল, সাড়ে দশটা পর্যন্ত। ডাক্তার আপুটি হঠাৎ আমায় বলল, ভাইয়া একটু ভিতরে আসবেন।

ডাক্তার অপারেশন করছে, আমি দাঁড়িয়ে দাড়িয়ে দেখছি। কথা বলছেন ডাক্তার, দেখুন রোগীর অবস্থা খুব খারাপ। এমন রোগী খুব রেয়ার। আমার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ল। বললাম, ডাক্তার আমার বোন ভালো হবে ত।
বলল, সৃষ্টিকর্তাকে স্মরণ করুন।

রাত দেড়টায় অপারেশন থিয়েটার থেকে বের করল। নিবিড় পর্যবেক্ষণ কক্ষে রাখা হল তাকে। সাথে আরো কয়েকজন রোগী। আমি গেলাম সেখানে। বোন তখন অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে। পাশের বেডের রোগী বলল, আমার স্বামী আছে বাইরে, তাকে একটু ডেকে দিবে ভাই?
আমি বললাম, আপনার স্বামীর নাম কি? উনি নাম বললেন, তাকে ডেকে দিলাম। আস্তে আস্তে হাসপাতাল ত্যাগ করল সব আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব। রুমে তখন কয়েকজন রোগী যাদের জীবন অর্ধেক আছে অর্ধেক নেই তাদের সাথে আমি সুস্থ সবল একটা মানুষ। ডাক্তার বান্ধবীর কল্যাণে আর রোগীর এই অবস্থার দরুণ সেখানেই জায়গা হল আমার।
রুম থেকে বের হয়ে পকেটে হাত দিলাম। একটা সিগারেটও নেই, ভাবলাম এখন অজ্ঞানই আছে সিগারেট কিনে নিয়ে আসি।

বের হয়ে সোজা হাটা দিলাম, দোতলা থেকে নেমে দুইটা মোড় ঘুরে রাস্তার পাশেই মর্গ, তার পাশেই ঝোপের মত একটা জায়গা। ল্যামপোস্টের আলো ঠিক মত পৌঁছায় না সেখানে। তারপরেই ক্যান্টিন। শীতের রাত, কনকনে ঠান্ডা হাওয়া বইছে, হাত পাগুলো শীতে থরথর করে কাপছে। সবগুলো দোকান অর্ধেক বন্ধ। একটা দোকান এ গিয়ে বললাম, ভাই এক প্যাকেট গোল্ডলিফ সিগারেট দেন ত।

সিগারেট এর প্যাকেটটা হাতে নিয়েই একটা সিগারেট ধরিয়ে হাটা শুরু করলাম। জুরুরি বিভাগ অতিক্রম করে ঝোপটা পেছন ফেলে মর্গ এর সামনে যেতেই দেখলাম একটা ট্রলিতে করে রোগীকে আনা হচ্ছে। সাথে একজন মহিলা আর একজন পুরুষ। মহিলাটা গলা ছেড়ে চিৎকার করছে। চিৎকার শুনে বুঝতে পারলাম, লোকটা মারা গেছে। লাশটা আরো কাছে আসতেই মুখটা স্পষ্ট হয়ে উঠল আমার কাছে। একটা বিভৎস মৃত্যু। মাথাটা দুই খন্ড হয়ে বিভক্ত হয়ে রয়েছে। তাজা রক্তগুলো ঝড়ে পড়ছে এখনো। ভয়, ডর আমার সব সময় একটু কম। কিছুটা সময় দাড়িয়ে তাদের সাইট দিয়ে চলে আসলাম সেখান থেকে। সিড়ির কাছাকাছি এসে আবার আমাকে ধমকে যেতে হল। লিফট খুলে কেউ বের হচ্ছে, পুরু হাসপাতাল মানব শুন্য, না মানব শূন্য নয় কিন্তু জাগ্রত মানুষ শূণ্য। যে যেখানে জায়গা পেয়েছে সেখানেই ঘুমাচ্ছে। হাসপাতালের এই দিকটা মানব শূণ্য থাকে, ওটির সামনে কোলাহল নিষিদ্ধ তাই এখানে কাউকে থাকতে দেওয়া হয় না। একটা ট্রলি বেরিয়ে আসে লিফট থেকে। অর্ধেক ডাকা একটা যুবতী মেয়ের লাশ। গলা কাটা লাশটা দেখে আমার অন্তর আত্মা একটু কেপে উঠে, গলা থেকে চুয়ে চুয়ে তাজা রক্ত গড়িয়ে পড়ছে ফ্লোরে। আমার পাশ দিয়ে লাশটা নিয়ে চলে গেল হাসপাতালের কিছু বয়। আমি এড়িয়ে গিয়ে সিড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেলাম। মোড়টা ঘুরে সোজা গিয়ে আরো দুইটা মোড় ঘুরতে হবে, তারপর ওটি।

এগিয়ে গিয়ে একটু ফাঁকা জায়গা দেখে আরেকটা সিগারেট ধরিয়ে একটা টান দিয়েছি মাত্র ততক্ষনাৎ কেউ যেন আমাকেই উদ্দেশ্যে করে বলছে, আগুন নিভাও, এখানে সিগারেট খাবে না। আমি ভাবলাম সিসি টিভি ক্যামেরা লাগানো আছে হয়ত সেখান কার কেউ এলাউন্স করছে। সিগারেট ফেলে দিয়ে আবার এগিয়ে গেলাম, দ্বিতীয় মোড় ঘুরেই মেডিকেল কলেজ গেইট। দারোয়ান পর্যন্ত নেই এখানে। এগিয়ে যাচ্ছি পূর্ব দিকে। উত্তর দিকের বিল্ডিং ভাঙ্গা হচ্ছে নতুন করে করা হবে। তৃতীয় মোড় ভাঙ্গা বিল্ডিং এর যন্ত্রপাতি সব রাখা আছে করিডোর ধরে। সোজা গিয়ে ঢুকে পড়লাম নিবিড় পর্যবেক্ষণ রুমে। হাতের বইটা নিয়ে দাঁড়িয়ে দাড়িয়ে পড়া শুরু করলাম বোনের পাশে। কিছু সময় সব কিছু শান্ত নিবিড়। হঠাৎ একটা হাত আমার হাটুতে ছুয়ে দিল। বই থেকে চোখ সরিয়ে দেখলাম আমার বোনের জ্ঞান ফিরেছে, আমাকে ডাকছে। মুখের কাছে কান নিয়ে জিজ্ঞাস করলাম কেমন লাগছে এখন?

কানে কানে বলল, ভালো। আমাকে একটু পানি খাওয়াবে ভাইয়া।
আমি বললাম, ডাক্তার ত নিষেধ করেছে।
বলল, আমার খুব গরম লাগছে। একটু বাতাস করবে।
বই এর পিছনের মোলট ছিড়ে বোনকে বাতাস করছি, সে চারিদিকে তাকিয়ে দেখছে। বললাম, ঘুমানোর চেষ্টা কর। মাথায় হাত বুলিয়ে দিলাম। কিছু সময় পরেই ঘুমিয়ে পড়ল সে। আমি বাতাস করে যাচ্ছি আর পুরুনো একটা লেখার কথা ভাবছি। লেখাটা শেষ করতেই হবে, অনেক ত হলো এবার এক খানা বই প্রকাশ করতেই হয়। পিছনের বেডের রোগীটা আবার আমায় ডাকল, ভাইয়া আমার স্বামীকে একটু ডেকে দিবেন? আমি বললাম আচ্ছা। বোন ঘুমিয়ে আছে ভেবে এক পা এগিয়েছি, তখনই বলল ভাইয়া আমার খুব ভয় করছে, তুমি এখান থেকে কোথাও যেও না। আমি বললাম ভয় কিসের, আমি ত আছি, আর কিছু হবে না তোর। আমি শুধু যাব আর উনার স্বামীকে ডেকেই চলে আসব। বোন বলল, আচ্ছা যাও তাড়াতাড়ি চলে আসবে।

কথাটা শেষ করে পিছন ঘুরতেই একটা শব্দ হল, শ্বাস-কষ্টের রোগীরা যেমন করে শব্দ করে শ্বাস নেয় তেমন। পিছনের আপুটা হাত পা গুলো একটা টানা দিয়ে ঘাড়টা একপাশে ছেড়ে দিল। আমার বোন পিছন থেকে আমার হাতটা জড়িয়ে ধরে টান দিল। আমি গিয়ে দাঁড়াইলাম ওর মুখের সামনে। চোখ দুটো বন্ধ করে বললাম আর দেখতে হবে না, চোখ বন্ধ করে রাখ। সেই অবস্থাতেই বলল, ভাইয়া আমার খুব ভয় করছে। আমি হাতটা ছাড়িয়ে বইটা ওর চোখের উপরে রেখে বললাম, চোখ বন্ধ করে রাখ আমি এখানেই দাঁড়িয়ে থাকব।

আস্তে আস্তে হাত বাড়িয়ে পাশের বেডের আপুর হাতটা ধরে হৃদস্পন্দন দেখলাম। নাকের সামনে আঙুল ধরেও দেখলাম। যা ভেবেছিলাম তাই হয়েছে, মৃত্যু আমি আগেও দেখেছি তাই আমার অনুমান মিথ্যে হওয়ার ছিল না। তবু পা টিপে টিপে নার্সের রুমের সামনে গিয়ে দরজায় টোকা দিলাম। নার্স কিছুটা রাগত্ব স্বরে বলল, কি হয়েছে? আমি বললাম মরেছে।
কে মরেছে?
এসেই দেখুন না।

নার্স বেড়িয়ে এল, তার আগেই আমি পা টিপে টিপে আগের জায়গায় ফিরে গেলাম। নার্স গিয়ে সব পরিক্ষা করে আমার দিকে মুখ তুলে এমন ভাবে তাকালো যেন সব কিছু শেষ হয়ে গিয়েছে উনার। বললাম, কি করবেন এখন?
আমার বোন বই সরিয়ে চোখ মেলে আবার তাকালো আমাদের দিকে। কি হয়েছে ভাইয়া?

নার্স কিছু বলার আগেই বললাম, পাশের আপুটা অজ্ঞান হয়ে গেছে। নার্সকে ইঙ্গিত করে বুঝানোর চেষ্টা করলাম যাতে সত্যটা না বলে, কিন্তু গর্দভ নার্স আমার ইঙ্গিত বুঝল না। বলে বসল কি আর হবে, মরে গেছে। আমি বোনের দিকেই তাকিয়ে ছিলাম। আমার হাতটা খুব শক্ত করে ধরে একটা টান দিয়ে প্রায় তার উপরে ফেলে দিল। আমি মাথাটা জড়িয়ে ধরে বললাম ভয় পাবি না, আমি তোর হাত ধরে আছি। নার্স আমাকে বলল, এই বেডির জামাইরে দেখছুইন (ময়মনসিংহ এর আঞ্চলিক ভাষা)। আমি বললাম পাশের করিডোরে শুয়ে আছে।

আন্নে এট্টু ডাইক্কা দিবাইন?
পারব না, আপনি যান।
আমার ঠেহা পড়ছে। যার বই হেই বেডা আইয়া খুইজ্জা লওক।
আমি চুপ করে রইলাম। নার্স চলে গেল। কিছু সময় পরে ফিরে এল সেই লোক সহ। সাথে আরো কয়েকজন। সবাই হাউমাউ করে কান্না শুরু করে দিল। পকেট থেকে ইয়ার ফোন বের করে বোনের কানে গুজে দিলাম। ভলিউমটা একটু বৃদ্ধি করে দিলাম যাতে বুঝতে না পারে রুমে কি হচ্ছে। হাত দিয়ে চোখ ধরে রাখলাম। বললাম ঘুমিয়ে পড় আমি এখানেই আছি।

আধ ঘণ্টার মধ্যেই লাশ বের করে নিয়ে গেল। সকল কোলাহল পরিণত হল এক নিস্তব্ধতায়। সব কিছু নিরব নিস্তব্ধ। বোন ঘুমিয়ে পড়েছে। বইটা নিয়ে আবার পড়া শুরু করলাম।” যে কাজ আমি তাদের জন্য ঠিক করে দিয়েছিলাম, সে কাজ তারা পরম যত্নে,পরম সাধুতায়, সম্পূর্ণ আত্মনিবেদন সহকারে সম্পন্ন করে আমার কাছে ফিরে এসেছে। আজ তাদের কাজ যে সম্পূর্ণ হল তা নিয়ে তুমি শোক করছ কেন? তোমার সামনে যে কর্তব্য, সেই দিকে মনঃসংযোগ করো। তোমার কাজ দিয়ে আমার মহিমা তোমার জীবনে প্রকাশ পাক। এই সব কথা কেউ উচ্চারণ করেনি, কিন্তু আমি স্পষ্ট শুনলাম। আত্মার দেহত্যাগ বিষয়ে কোরআনের একটি বাণী আমার অন্তরাত্মা পূর্ণ করে ধ্বনিত হল, তোমার ধন সম্পদ, তোমার সন্তান-সন্ততি, এ সব প্রলোভন ছাড়া আর কিছুই নয়, আল্লাহ-র কাছেই আছে অনন্ত পুরুস্কার।” এই অংশটুকু পড়তেই বিদ্যুত চলে গেল। হাসপাতালের জেনারেটর চালু হওয়ার কথা, আমি মোবাইল না খুজে চুপ করে দাঁড়িয়েই রইলাম। হঠাৎ করেই একটা সাদা আলো আমার চোখের সামনে দিয়ে চলে গেল। আলোর গতি বেগের চেয়েও দ্রুতগতিতে চলে গেল বলেই আমার মনে হল। তবু চোখের পলকে আমি দেখতে পেলাম। হয়ত কেউ লাইট ঘুরিয়েছে ভেবে বোনের দিকে মুখ ঘুরিয়ে তাকিয়েছি জানালায় দেখলাম একটা মানুষের ছায়া পড়ে আছে। আমার পিছনে দাড়িয়ে থাকলে আর তার পিছনে লাইট থাকলে যেমন দেখাত ঠিক তেমন। হঠাৎ বোনের গুঙ্গানীর শব্দ টের পেলাম। মুখের কাছে কান নিয়ে জিজ্ঞাস করলাম ব্যাথা করছে?
হ্যাঁ,

আমি বললাম দাড়া আমি দেখছি, নার্সকে ডেকে আনি। মোবাইলের টর্চ লাইটা ওর হাতে জ্বালিয়ে দিয়ে চলে গেলাম নার্সের রুমের সামনে। বললাম ব্যাথা করছে, একটা ইঞ্জেকশন আছে যদি দিয়ে দিতেন।নার্স কিছুটা রাগত হলেও কিছু বলল না বরং টর্চ জ্বালিয়ে আসতে যাবে তখনই বিদ্যুত চলে আসে। দুইজনেই ফিরে আসি বোনের কাছে। নার্স ক্যানোলা দিয়ে ঔষুধ দিয়ে চলে যায়। বোন কিছু সময় পড়েই ঘুমিয়ে পড়ে। আমি ডাকি তোর কি গরম লাগছে,কোন সাড়া শব্দ নেই। বুঝলাম ইঞ্জেকশন দেওয়াতে ঘুমিয়ে পড়েছে। দাঁড়িয়ে থেকে আমারও পা একটু ব্যথা শুরু করেছে। একটু হেটে আসব সাথে একটা সিগারেটও খাওয়া হবে এই ভেবে বেরিয়ে প্রথম করিডোর পেরিয়ে প্রথম মোড়টা ঘুরে করিডোর এর রেলিং এ গিয়ে বসলাম। একটা সিগারেট ধরিয়ে দুই টান দিতেই দেখলাম কিছু মানুষ উল্টো দিক থেকে আসছে। আমি উঠে নেমে দাঁড়ালাম।একটা দিখণ্ডিত মানুষকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে কিছু মানুষ।ঠিক মানুষ নয় মানুষ আকৃতির কিছু প্রাণী। উদ্ভট চেহেরা মানুষগুলো দিকে তাকিয়ে যে কেউ ভয় পাবে।

আমিও তাদের পিছু পিছু হাটা শুরু করলাম। এক ফোটা রক্তও পড়ছে না দেখে বিস্মিত হলাম। হঠাৎ কেউ যেন আমার সামনে এসে দাঁড়াল।কোথায় যাচ্ছেন?
কোথায় আবার, ওটিতে
কেন?
আমার বোন সেখানে আছে।
কে বলল,
কে বলবে আবার আমি ওখারে রেখে আসছি। আপনি কে?
মিথ্যে বলছেন কেন? আপনার বোন ত সেখানে নেই।
পথ ছেড়ে দাঁড়ান আর ফালতু কথা বলবেন না।

আমি পথ ছেড়ে দিচ্ছি কিন্তু আমি যা বলছি তার এক বিন্দুও মিথ্যে নয়। কিছু সময় আগে যারা এদিক দিয়ে গেল তারা আপনার বোনকে নিয়ে গেছে।

এই তুই কে? সরে দাড়া বলছি। মেজাজ হারিয়ে হাত মুষ্ঠি করে দিব এক ঘুষি এমন সময় কারেন্ট চলে গেল। ঘুষি গিয়ে ঠেকল দেয়ালে। আমিও উল্টে পড়ে গেলাম। কিন্তু মনের ভিতরে ততক্ষণে ভয় কাজ করা শুরু করছে। সত্যিই আমার বোনের কিছু হল না ত। দৌড়ে গেলাম রুমে, না আমার বোন ত ঠিকই আছে, হাফ ছেড়ে বাচঁলাম। অন্ধকারে দৌড়াতে গিয়ে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল তাই দীর্ঘশ্বাস ছাড়লাম। মোবাইলের টর্চটা জ্বালানোই ছিল, সেটা নিয়েই এগিয়ে গেলাম। বোনের মাথায় হাত রাখলাম। ভাইয়া আমি মনে হয় আর বাঁচব না, আমার খুব ভয় করছে।
এমন কেন বলছিস, আমার চোখ জলে ভরে গেল। বললাম এমন কিছু হবে না। আমি বেঁচে থাকতে তোর কিছু হতে পারে না।
সত্যি বলছ ভাইয়া?
হুম সত্যি।
আচ্ছা ভাইয়া, তোমার উন্যাসটা লেখা শেষ হয়েছে?
হ্যাঁ হয়েছে, নতুন আরেকটা শুরু করেছি।
তোমার উপন্যাসের নায়িকা শেষে মারা যায় তাই না?
হ্যাঁ কিন্তু তুই জানলি কেমন করে।
তুমি যখন বাড়িতে এসেছিলে তখন আমি পড়েছিলাম।
ভালো করেছিস।
আচ্ছা ভাইয়া আমি যদি না থাকি তবে কে তোমার গল্প লুকিয়ে লুকিয়ে পড়বে?
কেন তুই পড়বি, আমার গল্প প্রকাশ হওয়ার আগে তোর কাছে প্রকাশ হবে।
নায়িকাটা যখন মারা যায় তখন ওর ভাই খুব কাদঁছিল তাই না ভাইয়া?
হ্যাঁ অনেক কেঁদেছিল।
ভাইটার পাশে একটা মেয়েও ছিল, ওর প্রেমিকা। কিন্তু দেখ তোমার পাশে কেউ নেই।
কে বলেছে কেউ নেই, তুই আছিস। আমার বোনের চেয়ে কে আমাকে বেশি ভালোবাসতে পারবে?
ভাইয়া সত্যিই আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি। কোন মেয়ে এসে যদি আমাদের পর করে দেয়?
আমি সেই মেয়েকে ঘরেই রাখব না।
মোবাইলের আলোতে স্পষ্ট দেখতে পেলাম, আমার বোনের চোখগুলো ছোট ছোট হয়ে উল্টে গেল। আমি আর সহ্য করতে পারলাম না। হাতের মধ্যে ওর হাতটা ঠান্ডা থেকে আরো ঠান্ডা হতে শুরু করল। আমি চিৎকার করলাম, নার্স আমার বোনের কি হয়েছে? নার্স নার্স……….
ভাইয়া, বাবা-মাকে কষ্ট দিও না। আমাকে ভুলে যেও না, আমি তোমাদের সবাইকে অনেক ভালোবাসি, তোমাকে অনেক ভালোবাসি ভাইয়া। আস্তে আস্তে কথাগুলো অস্পষ্ট হয়ে আমার কানে আসল।

Advertisement

কমেন্টস