একটি ছুরি

প্রকাশঃ জুন ২০, ২০১৬

আবু খায়ের আনিছ-
নিরবের ছেলে আরিফ তার ছেলে সজিব, তিন পুরুষের সংসারে তিনজন মানুষেরই বসবাস। নিরব বার্ধক্য আর পক্ষাঘাতে শয্যাগত, আরিফ তার কার্পোরেট চিন্তায় মগ্ন, ষোল বছরের সজিব ইন্টার ফাস্ট ইয়ারের ছাত্র। সংসারে আর কোন মানুষের উপস্থিতি নেই, একজন কাজের বুয়া ছাড়া। বুয়া সকালে আসে সন্ধ্যে হলেই চলে যায়। বুড়ো নিরব ঘরের কোণে পড়ে পড়ে চিৎকার চেচামেচি ত করেই সাথে এই কাজ ঐ কাজ এর হুকুম, সাথে জ্ঞান বিতরণ ত আছেই। মোটেই সন্তুষ্ট নয় সজিব দাদুর এই ব্যবহারে, বরং বিরক্তই হয়ে গেছে। সন্ধ্যার পর পড়তে বসলেও শান্তি নেই, একটু পর পর ডাকাডাকি, সজিব একটু এটা এনে দে, ফ্যানের পাওয়ারটা একটু বাড়িয়ে দে, আমার ঔষুধ খেতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি।

কথার একটু নড়চড় হলেই জ্ঞানের সিন্ধুক খুলে যায়, এই করিস না এই হবে, ঐ করিস না সেটা হবে। মনে বুড়োর প্রতি বিরক্ত হয়ে মরণ কামনা করে সজিব। এই বুড়ো মরলেই শান্তি, কেন যে মরে না তাও বুঝি না। রক্তের একটা সম্পর্ক আছে তাই প্রকাশ্যে এই দোয়াটা করতে পারে না, নয়ত তাই করত।

বিরক্তির এই মাত্রাটা বেড়ে যায় বাপ-বেটার প্রেম ভালোবাসা দেখে। রাত দশটা-এগারটা কখনো বা বারটা দিকে বাড়ি ফিরে প্রথম কথাটা হবে, বাবা ঘুমিয়েছে? রাতের খাবার খেয়েছে? ঔষধ খেয়েছে? কখন ঘুমিয়েছে হাজার প্রশ্ন। প্রতিদিন এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে দিতে বিরক্ত হয়ে গেছে সজিব। যে দিন একটু আগে অথাৎ দশটার মধ্যে বাড়ি ফিরবে তখন হাতে করে ফলমূল নিয়ে আসবে আর সোজা গিয়ে ঢুকবে বাবার ঘরে। নিজের হাতে বাপকে ফল খাওয়াবে, গল্প করবে তারপর ফ্রেশ হয়ে সজিবকে জিজ্ঞেস করবে পড়াশোনা কেমন চলছে? কোন কিছু লাগবে কিনা? পিতা পুত্রের সম্পর্কটাও একটা বিজনেস এর মত হয়ে গেছে। সপ্তাহের ছুটির দিন ছাড়া পিতা পুত্রের কথা এই কয়েক কথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ, ছুটির দিনগুলোতে ও পড়াশোনার খোজঁ খবর নেওয়া, একসাথে বসে খাওয়া আর বিকেল বেলা হুইল চেয়ারে করে নিরবকে নিয়ে তিনজন মিলে বাইরে ঘুরতে যাওয়া এই জীবন।

কোরবানী ঈদের সাতদিন বাকী এমনি এক সময়ে আরিফ আর সজিব দুই বাপ বেটা মিলে কোরবানীর গরু কিনে বাড়ি ফিরার পথে রাস্তার পাশে দা-ছুরির দোকানে চোখ পড়ে সজিবের। বাপকে বলে, গরু কাটার জন্য ত ছুড়ি কিনতেই হবে, আজকেই কিনে বাড়ি ফিরলে কাজটা এগিয়ে থাকল। পুত্র এর কথায় সম্মত হয়ে দোকানে গেল ছুড়ি কিনতে। সজিবের দৃষ্টি পড়ল একটা ছোরার উপরে, চকচক করছে একটা ছোরা আর ছোরাটা ধরার জায়গাও বেশ সুন্দর ডিজাইন করা। বেছে বেছে সেটাই কিনল সজিব। ছুড়ি না বলে ছোড়া বলাই মানানসই, একটা ছুরি যতটা বড় হয় ঠিক ততটা বড় নয়, আবার ছোরার মত ছোটও নয়। মাঝারি সাইজের ছুরিটা হাতে নিতেই গায়ে একটা শিহরণ খেলে গেল সজিবের। ছুরিটা যেন কানে কানে এসে বলে উঠল, কি হাতে নিয়েছ তুমি জানো? আমার ব্যবহার তুমি করতে পারবে?

নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে বাড়ি ফিরে এল পিতা-পুত্র। বিকেল গড়িয়ে তখন সন্ধ্যা। ছুরিটা কোমরে গুজে বাড়ি থেকে বের হয় সজিব। ঈদের ছুটিতে কলেজ বন্ধ, বাড়ি ফিরার কোন তাড়া নেই, বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিয়ে তবেই ঘরে ফিরে। বাড়ি থেকে বের হয়েই ছুরিটা হাতে নিতেই ছুরিটা যেন তাকে বলল, কি হলো তোমার? আমার প্রয়োগ দেখবে না, আমাকে হাতে নিয়েই কি শান্তি, তাহলে আমার আর প্রয়োজনটা কি?
সজিব সামনের দিকে তাকিয়ে দেখল, সামনেই কলাগাছের ঝুপড়ি। সোজা এগিয়ে গিয়ে কলাগাছে চালিয়ে দিল ছুরিটা। ঘ্যাচ ঘ্যাচ করে বার কয়েক ছুরিটা দিয়ে কোপাতেই কলাগাছটা পড়ে গেল। একটা মানসিক প্রশান্তি তার এল বটে কিন্তু তাতে শান্তি মিলল না, কলাগাছে ছুরি চালিয়ে কি আর পূর্ণ আনন্দ পাওয়া যায়। ছুরিটা একটা কাগজ দিয়ে মুছে আবার কোমরে গুজে নিয়ে চলে গেল সে। রাত প্রায় দশটার দিকে ঘরে ফিরল সে, ছুরির আনন্দ যেন আর তাকে ধরে না। মহা এক বস্তু পেয়েছে হাতে, তাই ঘিরেই তার ভাবনা চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে। কি করবে এটা দিয়ে, কি করা যায়, শুধুই কি গরু কেটে আনন্দ পাওয়া যায়। ঘরে বসতে পারল না সে, কিছু একটা করতেই হবে। বাইরে একটা কুকুর ঘেউ ঘেউ করছে, কুকুরটাকে লক্ষ্য করে এগিয়ে গেল সে। ছুরিটা কোমর থেকে বের করে এক হাতে নেয়, অন্য হাতে একটা বিস্কুট বাড়িয়ে কুকুরটা কে ডাকতে শুরু করল। আয়, বিস্কুট খাবি, আয় এই দিকে আয়। পথের কুকুর এমন আদরে অভ্যস্ত নয়, কেউ তাকে আদর করে খাওয়াচ্ছে এটা সে ভাবতেও পারে না, বিস্কুটের লোভ সামলাতে না পেরে ঘেউ ঘেউ বন্ধ করে হাতের কাছে এল। এক মুহুর্ত সময় নষ্ট করে কুকুরের বুকে ছুরি চালিয়ে দিল সজিব, ঘ্যাচাং ঘ্যাচাং করে বার কয়েক চালিয়ে দিয়ে ক্ষান্ত হল সে। রক্ত গড়িয়ে পড়তে লাগল কুকুরের শরীর থেকে, একটু দৌড়ে গেল কুকুরটা, তার পর একটা বিদঘুটে আওয়াজ তুলে পরে গেল রাস্তায়। সজিব আর এক মুহুর্ত দাঁড়িয়ে থাকল না সেখানে, সোজা আবার ঘরে ফিরে গেল।
ছুরিটা ধুয়ে বালিশের নিচে রেখে শুয়ে পড়ল না ঘুমিয়েই।

বিছানায় শুয়ে এপাশ ওপাশ করতে করতে এক সময় ঘুমিয়ে গেল সে। তার খাওয়া না খাওয়াতে কারো কিছু আসে যায় না, আর না খেয়ে শুয়ে পরার পরেও কেউ যে ডাকবে না এটাও জানে সে। পরেরদিন খুব সকালে ঘুম ভাঙ্গে সজিবের। ঘুম থেকে উঠেই কোমরে আবার ছুরিটা গুজে দিয়ে বের হয়ে পড়ে। রাস্তায় গিয়ে দেখে কুকুরটা মরে পরে আছে, মানুষজন যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলে যাচ্ছে, কারো কোন ভ্রুক্ষেপ নেই সেই দিকে। রক্তাক্ত কুকুরের ক্ষতস্থানগুলোর চারপাশে মাছি ভন ভন করে ঘুরছে। নিজের নাক চেপে ধরে বাড়ি ফিরে এল সে। মনের মাঝে কোন অনুশোচনা নেই এহেন কর্মের জন্য তার, বরং বেশ ভালোই লাগছে, মনের মাঝে এক ধরণের পৈশাচিক প্রশান্তি কাজ করছে, তবু মনে শান্তি নেই। ছুরিটা যেন তাকে বারবার বলে যাচ্ছে, আমার ব্যবহার করলে পারলে না, তুমি একটা আহাম্মক। সামান্য একটা কুকুরের গায়ে আঘাত করেই তুমি প্রশান্তি ভোগ করা শুরু করেছ। ভেবে দেখ, একটা নরম মাংস,আর সেই নরম জায়গায় ছুরি চালিয়ে যাচ্ছ তুমি।

সেই দিন রাতে ঘুমাতে গেল সজিব, কিন্তু ঘুম আসছে না। চোখ বন্ধ করলেই তার মনে হচ্ছে, একটা নরম মাংস, ছুরি বিদ্ধ করে চলেছে সে, রক্তে রঞ্জিত হচ্ছে হাত, ছুরি সব। চোখ বন্ধ করতেই ছুরিটা তার কানে কানে বলল, ঘুমিয়ে পড়লে? উঠে বের হও দেখ রাস্তার উপর কত মানুষ ঘুমিয়ে আছে, কত মানুষ একা পথে হেটে যাচ্ছে। আমাকে প্রয়োগ কর, নিজেকে শান্তি দাও।

সজিব চোখ মেলে তাকায়। বিড়ালের মত নিঃশব্দে ঘর থেকে বের হয়ে গলি ছাড়িয়ে রাস্তার দিকে যায়।
পরের দিন সকালে পত্রিকায় খবর বের হয়, রাস্তায় এক অজ্ঞাত লোকের লাশ পাওয়া গেছে। লাশের গায়ে এলোপাথাড়ি ছুরির আঘাত। হত্যার মোটিভ বা কারণ সম্পর্কে কিছু বলা যাচ্ছে না। কি কারণে কে বা কারা খুন করেছে তাও নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
পরের রাত্রে একই ঘটনার পূণরাভিত্তি ঘটল। নিরবে ঘর থেকে বের হয়ে কিছু সময় পরে ফিরে আসে সজিব। পরের দিন সংবাদপত্রে খবর বের হয়, পরপর দুইদিন শহরের অজ্ঞাত পরিচয়ে খুন। লাশের গায়ে ছুরির আঘাত। পুলিশ কিছুই বলতে পারছে না। পুলিশের ধারণা ছিনতাইকারী থাকবে এই খুনের পিছনে। খবর দেখে সজিবের মনে কোন প্রতিক্রিয়াই সৃষ্টি হল না। মানুষ হত্যার নেশাটা তাকে পেয়ে বসল। রাত হলেই তার মাথায় অস্থিরতা সৃষ্টি হয়, রক্তের নেশা চেপে ধরে তাকে।

শহরের পরিস্থিতি খারাপ দেখে রাত দশটার মধ্যেই ঘরে ফিরে আরিফ। সজিবকে সাবধান করে দেয় ঘর থেকে বের হওয়া নিয়ে। সজিব বাবার কথায় মাথা নেড়ে সায় দেয়, আর রাতের বেলা বাইরে যাবে না সে।
সন্ধ্যা রাত পেরিয়ে গভির রাত হয়। সজিব উঠে বসে বিছানার উপরে, বালিশের নিচ থেকে ছুরি বের হাতে নিয়ে ঘুরাতে থাকে। চকচকে ছুরিটার দিকে তাকিয়ে ভাবতে থাকে, আজ কার নরম মাংসে বিদ্ধ হবে সে। বিছানা ছেড়ে উঠে এগিয়ে যেতে থাকে সদর দরজার দিকে। পাশের রুম থেকে বাবার কাশীর শব্দ শুনে দাঁড়িয়ে যায় সজিব। ছুরিটা আবার তার কানে কানে বলে, এই বিরক্তিকর মানুষগুলোকে বাদ দিয়ে কেন তুমি প্রতিদিন বাইরে যাচ্ছ, তারচেয়ে এদেরকেই শেষ করে দাও না। ভাবনাটা মাথার মধ্যে ঘুরে যায়। সজিব নিশ্চুপ হয়ে বাবার রুমে ঢুকে। উদ্দাম গায়ে শুয়ে আছে আরিফ, ধীর পায়ে এগিয়ে যায় খাটের দিকে। স্বল্প আলোর লাইটে নিজের বাপের মুখটা দেখে সে। রক্তের নেশা তাকে পেয়ে বসেছে, কোন খেয়াল নেই তার সে কি করছে। হাতের ছুরিটা বসিয়ে দেয় বাপের বুকের উপরে। অন্য হাত দিয়ে মুখটা চেপে ধরে, কোন শব্দ করতে পারে না আরিফ। একটা, দুইটা, তিনটা ছুরি চালিয়েই যাচ্ছে সজিব। নিষ্পলক চোখে একবার ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে ঘাড়টা ছেড়ে দেয় আরিফ। নিথর দেহটা পড়ে থাকে রক্তাক্ত বিছানার উপর। সজিব দেরি না করে নিঃশব্দে বেড়িয়ে যায় রুম থেকে। পাশের রুমেই নিশ্চিত ঘুমে ঘুমাচ্ছে বুড়ো নিরব। পা টিপে টিপে রুমে ঢুকে, একটা বালিশ বা হাতে নিয়ে বুড়োর বুকে ছুড়ি চালিয়ে দেয় সজিব। আবার সেই একই পদ্ধতি, বালিশ মুখে চাপা দিয়ে ধরে বুকের উপর উঠে বসে ছুরি চালাতে থাকে সে। রক্তে ভেসে যায় বিছানা। খুব সন্তর্পণে উঠে নিজের ঘরে যায় সজিব। বাথরুমে ঢুকে ছুরিটা পরিষ্কার করে বিছানার উপর গিয়ে বসে। মাথাটা একটু ঠাণ্ডা হতেই তার ভিতরে ভাবনা ঢুকে যায় কি করল সে এটা? এখন কি হবে। কাল সকালে পুলিশ আসবে, তাকে ধরে নিয়ে যাবে, ফাঁসি হবে তার, ইতিহাসে এক কলঙ্কিত সন্তান হয়ে থাকবে সে। ছুরিটা হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়ায় সে। বাবার রুমে গিয়ে ড্রয়ার থেকে টাকা বের করে, মায়ের গয়নাঘাটি যা ছিল সব বের করে পকেটে ঢুকায়। দাদুর রুমে গিয়ে সবকিছু এলোমেলো করে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখে, মূল্যবান সব কিছু নিয়ে বের হয়ে যায় ঘর থেকে। রাস্তা পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় ছুরিটা ফেলে দেয় পয়নিষ্কাশনের ড্রেনে।

কমেন্টস