বাবু ও ফিঙে রাজা

প্রকাশঃ জুন ১৬, ২০১৬

আইরীন নিয়াজী মান্না-
বাবু জন্মদিনে অনেক উপহার পেলো। লাটিম, খেলনা ঘোড়া, ছবির বই। আরো কত কি! কিন্তু সবচেয়ে সেরা উপহারটি পেলো ছোট মামার কাছ থেকে। একটি পাখি ধরার ফাঁদ। এমন একটি উপহার পেয়ে আনন্দে সে যেন দিশেহারা হয়ে গেলো। চিৎকার করে সারা বাড়ি মাথায় তুললো।

পাখি ধরার ফাঁদটা খুবই চমৎকার। এক টুকরো কাঠের সঙ্গে একটা কাঠামো জুড়ে দিয়ে তার উপর একটা জাল ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। কাঠের উপর খাবারের দানা ছিটিয়ে দিয়ে জালটা উঠোনে পেতে দেয়া হয়। খাবারের লোভে কোনো পাখি উড়ে এসে কাঠের টুকরোটির উপর বসলেই সেটা উল্টে গিয়ে জালটা পড়ে যায়। পাখিটা বন্ধি হয়ে যায় জালে।

মাকে দেখাতে ফাঁদটা হাতে নিয়ে বাবু দৌড়ে গেলো মার কাছে। আনন্দে তখন ওর দু চোখ চিকচিক করছে।
মা দেখো, দেখো কি সুন্দর খেলনা দিয়েছে নিয়াজ মামা।
মা বললো, এই খেলনাটা মোটেও ভালো না। পাখি ধরে তুই কি করবি? তাকে কষ্ট দিবি? বনের পাখি ধরতে নেই।
মার কথা শুনে মোটেও ভালো লাগলো না ওর। মুখ গুমরা করে ও মার দিকে তাকালো।

পাখিগুলোকে খাঁচায় রেখে দেবো। আমি পাখি পুষবো। ওরা গান গাইবে আর আমি শুনবো। ওদের অনেক কিছু খেতে দিবো।
মা আবারো বললো, পাখিটাকে না পেয়ে ওর বাবা-মা কাঁদবে। তোকে বদদোয়া দিবে। তোকে যদি কেউ খাঁচায় আটকে রাখে আমার কষ্ট হবে না?
বাবু কিন্তু মার কথা শুনলো না। দৌড়ে পালিয়ে গেলো আড়ালে।

পরের দিন খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে গেলো সে। এক মুঠো শস্যদানা যোগাড় করলো রান্না ঘরের মিরসেফ হাতরে। তারপর সেগুলো কাঠের টুকরোটার উপর ছড়িয়ে দিয়ে বাসার সামনের বাগানে ফাঁদটা পেতে দিলো। কখন একটা পাখি আসবে সেই আশায় ফাঁদের কাছেই অপেক্ষা করতে লাগলো। কিন্তু পাখিতো আর আসে না। পাখিরা তাকে দেখে ভয়ে পালিয়ে গেলো। ফাঁদের কাছেই আসলো না।

এভাবে পাখির অপেক্ষায় কেটে গেলো তিনদিন। ফাঁদে পাখি আর ধরা দেয় না। মনে মনে খুব বিরক্ত হলো সে। কিন্তু একবারও বুঝতে পারলো না ফাঁদের পাশে স্থির হয়ে বসে থাকলে কোন পাখি আসবে না।
চতুর্থ দিন ফাঁদটা বাগানে রেখে সে দুপুরের খাবার খেতে ঘরে চলে গেলো। বিকেলে ফিরে এসে দেখলো অবাক কাণ্ড! প্রথমে নিজের চোখকেই যেন বিশ্বাস করতে পারলো না বাবু। জালটা পড়ে গেছে আর একটা চকচকে কালো রঙের ছোট্ট পাখি জালের ভেতর ছটফট করছে। এ দৃশ্য দেখে বাবু খুব উত্তেজিত হয়ে উঠলো। ওর নাক-মুখ লাল হয়ে গেলো মুহূর্তেই। দূর থেকে ঘরে শুয়ে থাকা মাকে ডাকার চেষ্টা করলো ও। কিন্তু গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না। কতোক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে বিষয়টা আত্মত্ব করার চেষ্টা করলো সে। তারপর আস্তে আস্তে ফাঁদটার কাছে গেলো। খুব সাবধানে পাখিটাকে জাল থেকে ছাড়িয়ে নিলো। পাখিটাকে হাতের মুঠোয় ধরে দৌড়ে গেলো ঘরের দিকে।

মা দেখ আমি একটা পাখি ধরেছি। এটা কি পাখি? উফ্ কি ভাবে জোরে জোরে ওর বুকটা ধুকধুক করছে দেখ মা।
মা বললো – এটা ফিঙে পাখি। পাখিদের রাজা সে। পাখিটাকে কষ্ট দিস না বাবু, গুনা হবে। ছেড়েদে বাবা।

না, ছাড়বো কেন? আমি ওকে পুষবো। ও পাখিদের রাজা হলে আমি ওকে রাজা বলে ডাকবো।
ফিঙে রাজাকে হাতে নিয়েই বাবু ছুটে গেলো স্টোর রুমের দিকে। স্টোর রুমে অনেক দিন ধরে একটা খাঁচা পড়ে ছিলো। বাবু সেটাকে বের করে আনলো। নিজে হাতে অনেকটা সময় ধরে ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করলো খাঁচাটাকে। তারপর ফিঙে পাখিটাকে খাঁচায় ভেতর ঢুকিয়ে রাখলো যতœ করে। পাখির খাওয়ার জন্য ছোট একটা বাটিতে করে কিছু শস্য দানা দিলো। অন্য একটা বাটিতে দিলো পানি। তারপর খুব যত্ন করে খাঁচাটাকে নিয়ে গিয়ে ঝুলিয়ে রাখলো ছাদের পাশের চিলেকোঠার ঘরে।

এখন ওর সারাদিন কাটে চিলেকোঠায় খাঁচার সামনে বসে থেকে। খাঁচার পাশে বসে সে সারাক্ষণই পাখিটার সঙ্গে কথা বলে। পাখি পাখা ঝাপটালে সে তাকে শান্ত করতে চেষ্টা করে। রাজা কিচিরমিচির শব্দে ডেকে উঠলে বাবু আনন্দে হাত তালি দিয়ে ওঠে। সারা দিন ফিঙে রাজার সঙ্গে খেলে খেলে নাওয়া-খাওয়া ভুলে গেলো বাবু।

প্রথম দুদিন পাখিটাকে খুব আদর-যত্ন করলো সে। তিন বেলা নিজ হাতে দানা খাওয়ালো। পানি বদলে দিলো। প্রতিদিন যত্ন করে খাঁচা পরিষ্কার করলো। কিন্তু তৃতীয় দিন সে রাজার কথা বেমালুম ভুলে গেলো। পানিটাও বদলে দেয়া হলো না।

তখন মা তাকে বললো – দেখলি ছোট্ট পাখিটার কথা তুই একেবারে ভুলে গেছিস। আমার মনে হয় ওটাকে ছেড়ে দেয়াই ভালো।

না। আমি ছাড়বো না। এক্ষুণই নতুন পানি এনে দিচ্ছি। খাঁচাটাও পরিষ্কার করে দিচ্ছি।
বলেই বাবু ছুটে গেলো একতলার ছাদে। খাঁচার ভেতর হাত ঢুকিয়ে এক মনে খাঁচা পরিষ্কার করতে লাগলো। পাখিটা ভয় পেয়ে খাঁচার ভেতর এলোমেলোভাবে ডানা ঝাপটাতে শুরু করলো। খাঁচা পরিষ্কার করে বাবু তাড়াতাড়ি করে পানি আনতে চলে গেলো।
দূর থেকে মা দেখলো সে খাঁচার দরজা বন্ধ করতে ভুলে গেছে। চেঁচিয়ে বলে উঠলো – বাবু খাঁচার দরজা বন্ধ করে যা, তা না হলে তোর রাজা পালাবে।
মার কথা শেষ না হতেই পাখিটা দরজা খোলা পেয়ে খাঁচা থেকে বেড়িয়ে গেলো। মনের সুখে ডানা মেলে উড়ে গেলো জানালার দিকে। কিন্তু বন্ধ জানালার কাঁচটা দেখতে না পেয়ে প্রচণ্ড গতিতে আছরে পড়লো কাঁচের উপর। সেখান থেকে পড়লো গিয়ে মেঝেতে। মূহুর্তে ঘটে যাওয়া ঘটনায় বাবু হতবিহ্বল হয়ে তাকিয়ে রইলো ব্যথাকাতর পাখিটার দিকে।
ছুটে এসে মা যখন বললো – বাবু ওটাকে পানি দে।
মার কথা কানে যেতেই ও যেন জ্ঞান ফিরে পেলো। দৌড়ে গেলো পাখিটার কাছে। পাখিটা বেঁচে আছে। কিন্তু ছোট্ট ডানা দুটো ছড়িয়ে উপুড় হয়ে পরে জোরে জোরে শ্বাস টানছে। বাবু কতক্ষণ তাকিয়ে রইলো। তারপর হাতের মুঠোয় পাখিটাকে ধরে ছুটে গেলো ছাদের কোনার কলতলায়। মাও এলো ওর পিছু পিছু। বাবুর চোখ দিয়ে তখন টলটল করে জল পড়ছে।
অনেকক্ষণ ধরে দুজনে মিলে পাখিটার মাথা আর ডানায় পানি দিলো। বাবু মুঠোয় করে ওকে পানি খাওয়ালো। অনেকক্ষণ ধরে সে পাখিটার যত্ন করলো। কিন্তু অসহায় ফিঙে রাজার কোনো উন্নতি হলো না। মার দিকে তাকিয়ে অসহায় ভঙিতে সে বললো মা, আমি এখন কি করবো?

তোর এখন আর কিছুই করার নেই।

সারা দিন বাবু চিলেকোঠার ঘর ছেড়ে গেলো না। খাঁচার ভেতর পাখিটাকে ঢুকিয়ে রেখে সে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো অসুস্থ্য পাখিটার দিকে। পাখিটা আগের মতোই উপুড় হয়ে পরে আছে খাঁচার ভেতর। থেমে থেমে শ্বাস টানছে। চোখ দুটো বন্ধ হয়ে আছে। হঠাৎ হঠাৎ কোনো শব্দ কানে গেলে ক্লান্ত ভঙ্গিতে সে চোখ খুলতে চেষ্টা করছে।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হলো, সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত। বাবু কিন্তু বসেই রইলো খাঁচার পাশে। পাখিটা তখনো বেঁচে আছে।
বেশ রাতে মা অনেক বুঝিয়ে খেতে নিয়ে গেলো বাবুকে।
রাত এগারোটায় ঘুমোতে যাওয়ার আগে ম্লান মুখে পাখিটিকে দেখে গেলো বাবু। অনেকক্ষণ খাঁচার পাশে বসে তাকিয়ে তাকিয়ে রাজাকে দেখলো সে। খাঁচার ভেতর হাত ঢুকিয়ে আবারো একটু পানি দিলো ওর মাথায়। ঘরের লাইটটি জ্বালিয়েই রাখলো। তারপর ঘুমাতে চলে গেলো। তখনও খাঁচায় নিথর ভঙিতে পরে রইলো ফিঙে রাজা।

অনেক রাত পর্যন্ত বাবুর চোখে ঘুম এলো না। চোখ বন্ধ করলেই ভেসে ওঠে সেই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটি। বুক ফেটে কান্না আসে। এপাশ ওপাশ করতে করতে সে এক সময় ঘুমিয়ে পড়লো। হঠাৎ খুব ভোরে ঘুম ভেঙে গেলো ওর। পাখিটির কথা মনে হতেই ছুটে গেলো চিলেকোঠায়।
দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই দেখতে পেলো পা দুটো গুটিয়ে ফিঙে পাখিটা খাঁচার ভেতর মরে পরে আছে। মরা পাখিটিকে দেখেই আঁতকে উঠলো বাবু। স্তব্দ হয়ে খাঁচাটার পাশে বসে রইলো অনেকক্ষণ। ওর ছোট্ট বুকটা অপরাধবোধে কেঁপে কেঁপে উঠছে। দু’চোখ ঘোলা হয়ে গেছে নোনা জলে। কেন এমন হলো অবাক বিস্ময়ে ভাবে বাবু। ছাদের কোনায় দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ মনের দুঃখে কাঁদলো সে। অনেকক্ষণ পর কান্না কমে মনটা কিছুটা শান্ত হলে মরা পাখিটাকে নিয়ে পুকুর পাড়ে গেলো। পুকুর পাড়ে হীজল গাছের গোড়ায় ছোট্ট একটা গর্ত খুড়ে পাখিটাকে মাটি চাপা দিয়ে দিলো। তারপর ভেজা ঘাসের ওপর বসে রইলো উদাস ভঙ্গিতে। অপরাধী চেহারা করে পাখির সমাধিটার দিকে তাকিয়ে রইলো নীরব দৃষ্টিতে।

সকাল গাড়িয়ে দুপুর হলো। ভর দুপুরে মাথার ওপর সূর্যের প্রখরতা বেড়ে গেলো অনেক। বাবুর শিশু মনে অপরাধবোধ হানা দিচ্ছে বারবার। তার অতৃপ্ত ছোট্ট হৃদয়টা হাহাকার করছে পাখিটার মৃত্যুতে। এই অপ্রত্যাশিত ঘটনার জন্য মনে মনে বারবার নিজেকেই দায়ি করছে সে। একটু শান্তি পাওয়ার জন্য ছটফট করছে তার মন। কি করলে শান্তি মিলবে, করা হবে পাশ্চিত্ব! হঠাৎ বাবু উঠে দাঁড়ালো। দৌড়ে ছুটে গেলো বাড়ির ভেতর। চিলেকোঠার তাকে রাখা পাখি ধরার ফাঁদটা হাতে নিয়ে হনহন করে সিড়ি ভেঙ্গে নেমে এলো উঠোনে। তারপর গেট পেড়িয়ে বেড়িয়ে গেলো বাইরে। বাড়ির পেছনের পথ ধরে শান্ত গতিতে হেটে গেলো গোমতি নদীর দিকে। নদীর তীরে দাঁড়িয়ে শান্ত দৃষ্টিতে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলো গভীর পানির দিকে। বিড়বিড় করে আপন মনে কি যেন বললো। তারপর গোমতির জলে ছুঁড়ে ফেলে দিলো ফাঁদটি। স্রোতের ধারায় মুহুর্তে সেটি ভেসে গেলো দূরে, বহু দূরে।
তারপর থেকে বাবু জীবনে আর কোনো দিনও পাখি ধরেনি।

কমেন্টস