ছায়া মানবী

প্রকাশঃ জুন ১২, ২০১৬

আবু খায়ের আনিছ-

ঢাকায় প্রকাশনার কাজ ছাড়া তেমন একটা আসা হত না আমার কোন সময়েই। হঠাৎ করেই ঢাকায় স্থানান্তর হয়ে গেলাম। ঢাকায় তেমন পরিচিত বলতে কয়েকজন প্রকাশক আর পত্রিকার সম্পাদক ছাড়া আর কেউ নেই।

আগে পাবনার ঈশ্বরদীতে থাকতাম। মিরপুরে একখানা বাসা পেয়েছি মাত্র এক-হাজার টাকা ভাড়ায়। পাচ তলা বাড়ির চিলে কোঠায়। বগুড়া থেকে মালপত্র নিয়ে এসে উঠে পড়লাম সেই চিলে কোঠায়। বিশাল বাড়ির প্রকাণ্ড ছাদ, রাতের বেলা মন্দ হবে না। হেমন্তের সময় দিনের বেলায় একটু গরম লাগলেও রাতের আকাশের ঝলমলে তারা, আর মৃদু বাতাসে ছাদে বসে অনায়াসে রাত পার করে দেওয়া যায়। আশে পাশের সবগুলো বিল্ডিং পাচ তলা। দেখতে ভালোই লাগে।

নিচ তলা থেকে পাঁচ তলায় জিনিসপত্র তুলে খুব ক্লান্ত লাগছিল, সন্ধ্যে হওয়ার সাথে সাথেই ঘুমিয়ে পড়লাম। সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে ছাদের উপর পায়চারি করছিলাম, হঠাৎ খেয়াল করলাম ছাদের সাথে লাগোয়া অন্য বাসার ছাদের কার্নিশে এক যবুতী মেয়ে বসে আছে এদিকটাই খেয়াল করে। আমার চোখে চোখ পড়তেই খেয়াল করলাম আমাকে ডাকছেন। ছাদের এ দিকটায় পুরুনো কিছু জিনিসপত্র আর কয়েকটা টবে ফুল ও ছোট ছোট ফলের গাছ। এগুলো পেরিয়ে ওদিকটায় যাওয়া খুব মুশকিল। আমি টবের এ পাশেই দাড়িয়ে বললাম, আমাকে কিছু বলছেন?

আপনি লেখক পথিক রহমান। আমি কি ঠিক বলেছি? এই ধরণের প্রশ্নে বিব্রতকর পরিস্থিতি পড়তে হয়, আমি কিছু না বলে নিশ্চুপ থাকলাম। মেয়েটি আবার বলল, আমি সুনয়না। আপনি যে বাসায় উঠেছেন সেই বাসার পাঁচ তলায় ভাড়া থাকতাম এক সময়। এখন এই বাসায় আছি। সুনয়না দম নিয়ে আবার বলা শুরু করল। ঐ বাসাটা আমার খুব প্রিয়, জানেন এই ফুলের টবগুলো দেখছেন এগুলো আমার লাগানো।
আমি বললাম, খুব সুন্দর। কিন্তু এই বাসাটা তাহলে ছেড়ে দিয়েছেন কেন?

সুনয়না বলল, সে এক লম্বা কাহিনী। পুরু একটা সাসপেন্স গল্প হয়ে যাবে। আচ্ছা আমি যদি আপনাকে ঘটনাটা বলি তাহলে কি আপনি লিখে দিবেন।

মেয়েটার মাথায় কি কোন গণ্ডগোল আছে নাকি? অবশ্য প্রত্যেকটা মানুষই ভাবে তার জীবন একটা রুমানঞ্চ উপন্যাস হয়ে যাবে। আমি বললাম, আচ্ছা শুনব অন্য কোন এক সময় এখন একটু ব্যাস্ত আছি।

ছাদের দরজা খোলার শব্দে পিছন ফিরে দেখলাম এক ভদ্রলোক এদিকে এগিয়ে আসছেন। নতুন বাসা কারো সাথেই পরিচিত হতে পারিনি এখনো। মাত্র উঠলাম আস্তে আস্তে পরিচিত হওয়া যাবে, এই ভেবেই কারো সাথে দেখা সাক্ষাৎ করা হয়নি। লোকটা এই দিকে এগিয়ে এসে বলল, আপনি নতুন ভাড়াটিয়া? হাত বাড়িয়ে বলল, আমি নিলকান্ত রায়।

উনার হাতে হাত রেখ বললাম আমি পথিক রহমান, গতকাল রাতেই উঠেছি। শুনলাম কারো সাথে কথা বলছেন, কিন্তু কার সাথে কথা বলছিলেন?

আমি পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখি সুনয়না সেখানে নেই। কিছুটা লজ্জিত বোধ করছিলাম কথাটা বলতে, কারণও ছিল যথেষ্ট। প্রথম দিন বাসায় উঠেই পাশের বিল্ডিংয়ের এক মেয়ের সাথে কথা বলছি এটা ঠিক হজম করা কঠিন। ভাবলাম হয়ত সুনয়নাও চাই না বিষয়টা কেউ জানুক তাই হয়ত চলে গেছে।

নীলকান্ত বলল, ও মশাই কি দেখছেন ওদিকে ফিরে?
আমি কথা এড়িয়ে যাওয়ার জন্য বললাম, ফুলগুলো খুব সুন্দর তাই দেখছিলাম।

তাই বলেন, গাছগুলো আমার মেয়ে লাগিয়েছিল, বাড়িওয়ালা থাকে না এই বাড়িতে, দূর সম্পর্কের আত্বীয় হন উনি আমার। সেই সুবাধে বাড়ির দেখাশুনার দ্বায়ীত্বটাও আমার।

আমি মাথা নেড়ে বুঝানোর চেষ্টা করলাম যে আমি উনার কথা খুব গুরুত্ব দিয়েই শুনছি। উনি দম নিয়ে আবার বললেন, প্রকাশক সাহেব আপনার কথা আমাকে বলেছিল, শুনেছি আপনি লেখক মানুষ নিরিবিলি থাকতে পছন্দ করেন তাই আমি আর উনার কথায় দ্বি-মত করি নাই। ভাড়া দিয়ে দিলাম আপনার কাছে।

আমি বললাম, আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ, আসলে এমন একটা পরিবেশ আমি মনে মনে আশা করেছিলাম। এত সহজে পেয়ে যাব তা ভাবতে পারিনি তাও আবার এত সস্তায়।

ভদ্রলোক মুচকি হাসি দিয়ে বলল, আপনি প্রকৃতি দেখতে থাকুন আমি বরং গাছগুলোতে পানি দেওয়ার ব্যবস্থা করি। নীলকান্ত পানির বালতি এগিয়ে নিয়ে মগ দিয়ে গাছের গোড়ায় পানি ঢালছেন, আমি একটু সরে গিয়ে হাত-পাগুলো নাড়ছিলাম। নীলকান্ত হঠাৎ করেই বলে উঠলেন, বুঝলেন মশাই ঢাকায় এখন চাকর পাওয়া খুব মুশকিল হয়ে গেছে। কোন চাকর-বাকর ঠিক মত কাজ করতে চায় না, এ নিয়ে কিছু বলতে গেলেই কাজ করব না বলে উল্টো হুমকি দেয়।

আমি মাথা নেড়ে বিস্ময় সুচক একটা ভঙ্গি করে বললাম, আমাকে একটু যেতে হবে।

অব্যশই যান, পড়ে আবার কোন সময় কথা হবে। সেখান থেকে সোজা ঘরে ফিরে এলাম। খাতাটা খুলে বসলাম টেবিলে কিন্তু মাথা ত একদম ফাঁকা। কিছুই আসছে না মাথায়। নতুন জায়গায় গেলে এরকম হয়, তাই উঠে বেরিয়ে পড়লাম।

সারাদিন কয়েকটা পত্রিকার অফিস আর প্রকাশদের সাথে আড্ডা দিয়েই পার করে সন্ধ্যে হওয়ার সাথে সাথেই বাসায় ফিরে আসি। খুব বেশি পুরুনো না হলেও বছর দশ পনের ত হবেই এই বাড়ির বয়স। সিড়ি বেয়ে উপরে উঠে আসছিলাম, হঠাৎ দেখি পঞ্চম তলার এক নাম্বার ফ্ল্যারের সামনে সুনয়না দাড়িয়ে আছে। একটু ভ্যাবাচেকা খেয়ে বললাম, আপনি এখানে?

বেড়াতে আসলাম বলেই একটু মুচকি হাসল সুনয়না।
আমি বললাম, ও আচ্ছা। চলে যাচ্ছেন মনে হয়।
হ্যা যেতেই চেয়েছিলাম কিন্তু আপনার সাথে দেখা হয়ে ভালোই হল কি বলেন।

আমি কিছুই বললাম না, শুধু তাকিয়েই রইলাম।
চলুন আপনার ঘরে যাই, গল্পটা শুনবেন না?
আমি ভাবলাম মনে হয় মাথায় কোন ঝামেলা আছে নয়ত এই সন্ধ্যায় একজন পরপুরুষের ঘরে যেতে মেয়ে মানুষের সাহস হওয়ার কথা না। অবশ্য আধুনিক শহরের মেয়ে এদের ভয়-ডর একটু কম। আমি বললাম, আজ না অন্য দিন।

সুনয়না বলল, আজ কি আপনি খুব ব্যস্ত?
আমি বললাম, ব্যস্ত না খুব কিন্তু মাথা কাজ করছে না। এখন শুনলে কিছু লিখতে পারব না।
সুনয়না বলল, চলুন তাহলে ছাদে কিছু সময় আপনার সাথে পায়চারি করি।
আমি কিছু বলার আগেই, পঞ্চম তলার দ্বিতীয় ফ্ল্যাটের দরজা খুুলে গেল। লক্ষ করলাম পয়ত্রিশ বয়সি এক ভদ্রলোক আমার উপর থেকে নিচ একবার চোখ বুলিয়ে বললেন, আপনি কে? আপনাকে ত আগে কখনো দেখিনি এই বাসায়?

আমি বললাম, আমি ছাদের চিলোকোঠা ভাড়া নিয়েছি, গতকাল উঠেছি।
ও শুনেছিলাম নীলকান্ত চাচার মুখে আপনার কথা, আপনার গল্প পড়েছিলাম পত্রিকায়, ভালো লেখার হাত আপনার।
প্রশংসার বিপরীতে কি বলতে হয় তা আমার আজো বোধ্যগম্য হয়নি, তাই চুপ করেই রইলাম, একটা মুচকি হাসি দিয়ে।

আপনি কার সাথে যেন কথা বলছিলেন?
পিছন ফিরে আমি আবার সকালের মত দেখতে পাই সুনয়না নেই। আমি বললাম, আগে এই ফ্ল্যাটে ভাড়া থাকত সুনয়না উনার সাথে কথা বলছিলাম।
আমার কথাটা ‍শুনে ভদ্রলোক কাঁধটা একটু ঝাকি দিয়ে বলল, সুনয়না? আপনি নিশ্চিত।
আমি বললাম হ্যাঁ কিন্তু কেন বলুন ত?
না কিন্তু গেল কোথায়?
আমি বললাম হয়ত ঘরে ঢুকে গিয়েছে?
ভদ্রলোক ইশারা করে ঘরের দরজার দিকে তাকাতে বলল, আমি দেখলাম ঘরে দরজায় বাইরে থেকে তালা দেয়া। আমি স্তব্দ হয়ে গেলাম, এতদ্রুত একটা মেয়ে কিভাবে নিঃশব্দে সিড়ি বেয়ে নিচে নেমে যেতে পারে।
ভদ্রলোক বলল, চলুন আপনার ঘরে গিয়েই গল্প করা যাক।
আমি বললাম চলুন।

ঘরে চা বানানোর সকল সরঞ্জাম ছিল আগে থেকেই শুধু হিটার ছেড়ে পানি বসিয়ে দিয়ে উনার সামনের চেয়ারে গিয়ে বসলাম। ভদ্রলোক বলল, ঘর ত বেশ ঘুছিয়েছেন। তা একাই থাকবেন নাকি?
আজ্ঞে আমি অবিবাহিত।
ভদ্রলোক বলল, আমিও এই বাড়িতে একাই থাকি। স্ত্রী মারা গেছে বছর দুয়েক হল। একটা ছেলে আছে পাচঁ বছরের। গ্রামের বাড়িতেই থাকে। আমি এখানে একটা অফিসে চাকুরি করি।
ভদ্রলোক এবার পশ্ন করলেন, আপনি লেখালেখি ছাড়া আর কিছু কি করেন?

আমি বললাম, আপনি আমাকে তুমি করেই বলতে পারেন, আমি আপনার চেয়ে বয়সে ছোট হব। আর আমি এই লেখালেখি নিয়েই আছি, আর কোন কর্ম নেই।
ও আচ্ছা, শোন তাহলে যা বলতে চেয়েছি, নীলকান্ত রায় এর সাথে পরিচয় হয়েছে তোমার?
আমি বললাম হ্যাঁ, আজ সকালে একবার কথা হয়েছিল উনার সাথে।
আচ্ছা ভালো, শোন তুমি যে মেয়ের কথা বললে তাকে এই বাসার অনেকেই দেখেছে এমনকি আমি নিজেও দেখেছি।

আমি বললাম, তাহলে ত ভালোই আপনিও চিনেন।
আরে শোন না, চিনলে কি হবে সবাই তাকে ভয় পায়।
আমি বললাম, কেন ভয় পাওয়ার কি আছে?
ভদ্রলোক বলল, আত্মাকে ভয় পায় না এমন মানুষ আছে নাকি?
আমি বললাম, দূর কি বলছেন মশাই, একটা জলজ্যান্ত মানুষকে দেখলাম আর আপনি তাকে বলছেন আত্মা।

ভদ্রলোক একটু চটে গিয়ে বলল, আমি তোমার সাথে ইয়ারকি মারতে যাব কোন দুঃখে বল?
আমি বললাম তা অবশ্য বটে, আচ্ছা তারপর বলুন।
শোন তাহলে বলে ভদ্রলোক বলা শুরু করল, আমি তেমন একটা ভয়-টয় পাই না। নিজের চোখের সামনে স্ত্রীকে মরতে দেখেছি তারপর থেকেই ভয়-ডর হারিয়ে গেছে। আমি যখন প্রথম এই বাসায় উঠি তাও মাস ছয়েক আগে তখনকার ঘটনা। সারাদিন অফিস করি আর রাতে এসে মরার মত ঘুম দেই। প্রথম মাসে আমি কিছু টের পাইনি। পরের মাসে একদিন শরিরটা খারাপ লাগছিল তাই অফিস না করে বাসায় থেকে যাই।

সন্ধ্যার দিকে বাথরুমে যাওয়ার জন্য দরজা খুলে আমি থতমত খেয়ে যাই। আমি দেখি বলেই ভদ্রলোক কাঁধটা আবার আগের মত করে একটু ঝাকুনি দিয়ে নিশ্চুপ হয়ে গেল। আমি একটা সিগারেট দিয়ে বললাম টানতে থাকুন আমি চা করে নিয়ে আসছি বলে উঠে চলে গেলাম। চা করে নিয়ে এসে দেখি উনি সিগারেট না ধরিয়ে ঘরের চারিপাশ দেখছেন। আমি বললাম তারপর…।

ভদ্রলোক একটু চমকিত হয়ে বলল, দেখলাম বাথরুমের মেঝেতে একটা লাশ পড়ে আছে, নগ্ন দেহ। গলাটা কাটা হা করে আছে, তখনো রক্ত পড়ছে কলকলিয়ে। আমি চিৎকার করলাম। পাশের ফ্ল্যাট থেকে নীলকান্ত রায় ছুটে এল।
আমি সব ভীতস্ত্র কণ্ঠে খুলে বললাম, উনি এগিয়ে গিয়ে দরজা বাথরুমের দরজা খুলে বলল, কোথায় কিছু ত নেই এখানে।
আমি বললাম হয়ত এটা আমার হ্যালোসিনেসন।
নীলকান্ত বলল, ভয় পাবেন না, আপনার শরীরটা খারাপ হয়ত তাই এমন হয়েছে। এই বলে নীলকান্ত চলে গেল।
আমি রাতের খাবার খেয়ে বিছানায় গেলাম ঘুমানোর প্রয়োজনে। গিয়ে দেখি বিছানার উপর পা তুলে বসে আছে সেই মেয়েটা। আমি বললাম কে আপনি?
মেয়েটা উত্তর দিল আমি সুনয়না।
আমি বললাম, কি চান?
সুনয়না বলল, কিছু চাই না, এমনিতেই দেখতে এলাম আপনার ঘর।
আমি বললাম, আপনি চলে যান। আমি আপনাকে দেখতে চাই না।
ভদ্রলোক আবার একটু থামল। চায়ে দীর্ঘ চুমুক দিয়ে বলল, সেই রাতে আর আমি তার দেখা পাইনি।
আমি বললাম তারপর কি আরো দেখা পেয়েছেন?
ভদ্রলোক বলল, না তারপর আর দেখা পাইনি কিন্তু ঘুমাতে গেলে বারবার মনে হত বিছানায় পাশে যেন কেউ শুয়ে আছে।
আমি বললাম এটা আপনার হ্যালোসিনেসন।
ভদ্রলোক রাগত স্বরে বলল, যদি হ্যালোসিনেসন হয় তাহলে প্রতিদিন এমন হত কেন?
আমি বললাম এখনো কি হয়?
ভদ্রলোক বলল, এখনো হয় মাঝে মাঝে তবে এখন আর ভয় পাই না।
আমি বললাম কেন?
ভদ্রলোক বলল, মানুষ আর আত্মা যখন খুব কাছাকাছি চলে আসে তখন আর সেটাকে আত্মা মনে হয় না।
ভদ্রলোক চায়ে শেষ চুমুক দিয়ে বলল, আজ তাহলে উঠি। ও আচ্ছা আপনি একা থাকেন তাহলে রান্না কে করে দেয়।
আমি বললাম, সামনের হোটেল থেকে খেয়ে আসি।
ভদ্রলোক কোন উত্তর না দিয়ে বলল, আচ্ছা আজ তাহলে আমি আসি, আপনি একটু সাবধানে থাকবেন।
ভদ্রলোককে বিদায় করে আমিও নিচে চলে গেলাম খাওয়ার জন্য। হোটেলে খেয়ে বাসায় ফিরতে ফিরতে রাত সাড়ে দশটা বেজে গেছে।

ঘরে ফিরে একটা চেয়ার বের করে ঘরের সামনেই বসলাম। হেমন্তের কোয়াশাছন্ন জোছনা দেখতে খুবই মনোরম হয়। সেই সাথে উজ্জল আকাশে সাদা মেঘ ভেসে বেড়ায়। রাতের আধারকে ঠিক আধার বলা যায় না। এমনিতেই ঢাকা শহরের বৈদ্যুতিক আলোয় রাতের অন্ধকার অনেকটা মিলিয়ে যায়।

আমি লক্ষ্য করলাম সকাল বেলা ঠিক যে জায়গায় সুনয়নাকে দেখেছি ঠিক সেই জায়গাটাতেই বসে আছে সুনয়না। দুই ছাদের মাঝে দুরত্ব মাত্র অর্ধ হাত। ইচ্ছে করলেই এই ছাদ থেকে ঐ ছাদে যাওয়া যায়।
এতক্ষণ ভদ্রলোকের বলা কথাগুলো মাথায় ছিল না, কিন্তু হঠাৎ করেই সুনয়নাকে দেখে কথাগুলো মনে পড়ে গেল। আমি চোখ ফিরিয়ে নিলাম। এমন হতেই পারে না, একটা জ্যান্ত মানুষ আবার কিভাবে আত্মা হতে পারে। বিড়বিড় করে কথাটা বলে শেষ করতে পারিনি পিছন থেকে ডাক দিল, লেখক এর ব্যাস্ততা কি কমেছে?
আমি পিছনে ফিরে তাকিয়ে দেখি, মাত্র এক হাত দুরত্বে দাড়িয়ে আছে সুনয়না। আমি বললাম চেয়ার এনে দিচ্ছি বসুন তারপর গল্প শোনা যাবে।
আপনি সত্যিই আমার গল্প শুনবেন?
আমি বললাম হ্যা শুনব কিন্তু তার আগে বলুন আপনি জীবিত না মৃত্য?
যদি বলি মৃত্য তাহলে কি খুব ভয় পাবেন?
আমি কিছুটা থতমত খেয়ে ভাঙ্গা শব্দে বললাম, তা কি-ছু-টা পা-ও-য়া স্বা-ভা-বি-ক নয় কি?
ভয় পাওয়ার কিছু নেই, আমি ত আপনার কোন ক্ষতি করছি না।
আচ্ছা আপনি বসুন আমি আরেকটা চেয়ার নিয়ে আসি।
ভয় পেয়ে আবার পালাবেন না ত?
পালিয়ে যাব কোথায়?
সেটা অবশ্য ঠিক। আচ্ছা যান চেয়ার নিয়ে আসুন।
আমি ঘরে গিয়ে এক গ্লাস পানি হুড়হুড় করে এক দমে খেয়ে নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম, যা ঘটছে ঘটতে থাকুক, এর সাথে বিরুদ্ধাচরণ করা যাবে না। কোন ভাবে আজকের রাতটা পার করতে পারলেই কাল এখান থেকে বিদায়।
একটা চেয়ার নিয়ে গিয়ে খানিক দূরত্ব বজায় রেখে বসলাম আমি, ভয়ে তখন আমার কলিজা কাপছে কিন্তু নিজেকে সাহস দেওয়ার চেষ্টা করছি তখনো। আমি বসতেই সুনয়না বলল, আপনি কাল চলে যাবেন? ভয় পাচ্ছেন কেন? আপনি না চাইলে আমি আর কখনোই আপনার সামনে আসব না।
আমি বললাম, আমি কাল চলে যাব আপনাকে কে বলল?
থাক সে কথা, সময় নষ্ট না করে আমি আমার গল্প বলি কি বলেন।
আমি বললাম, আপনার মৃত্যুর রহস্যটা বলেন, বাকিটুকু পড়ে শুনব।
সুনয়না বলা শুরু করল, নীল কান্ত আমার বাবা, বাবা এখন যে ফ্ল্যাটে থাকে তার পাশের ফ্ল্যাটে থাকত অন্তত বিজয় দাশ নামের এক ছেলে। আমরা একই কলেজে পড়াশোনা করতাম এই সুবাধেই পরিচয়। আমিই বাবাকে বলে এই বাসায় তাকে ভাড়া দেই। সত্যি বলতে কি আমি অনন্তকে ভালোবাসতাম আর সেও আমাকে ভালোবাসত।
আমি লক্ষ্য করলাম সুনয়না একটু উদাস চোখে আকাশের ‍দিকে তাকিয়ে নিশ্চুপ হয়ে আছে। আমি বললাম, তারপর?
বাবা বাসায় না থাকলে আমি প্রায় সময় অনন্ত এর রুমে গিয়ে আড্ডা দিতাম, কথা বলতাম, তাকে রান্না করে দিয়ে আসতাম।
জানেন, প্রায় রাতেই আমরা ছাদে হাটাহাটি করতাম।
আমি বললাম আমি আপনার রুমান্টিকতার কথা পরে শুনব আগে বলেন, আপনার মৃত্যু কি করে হয়েছিল?
আপনি ত শুনেছেন, আমার গলা কেটে হত্যা করা হয়েছিল আমাকে? সুনয়না বলল।
আমি বললাম না শুনিনি, আপনি বলেন।
সুনয়না বলল, একদিন বাবা শহরের বাইরে গেল। আমি খালি বাসায় একা থাকতে ভয় পাই এই জন্য অনন্ত এর বাসায় গিয়ে থাকি। কিন্তু আমি জানতাম না সেই রাতে অনন্তের বন্ধূরা তার বাসায় ছিল।
আমি বললাম তারপর…?

ওরা সংখ্যায় ছয়জন ছিল, রাতের খাওয়া দাওয়া শেষ করে আমি অনন্তকে বললাম, অনন্ত আমার খুব ভয় করছে একা থাকতে। তুমি আমার ঘরে চলে এস।
অনন্ত বলল, তুমি এখানেই থেকে যাও।
আমি বললাম, আমার ভয় করছে এতগুলো ছেলের মাঝে আমি একা একটা মেয়ে।
অনন্ত বলল, আরে ভয়ের কিছু নাই, ওরা আমার বন্ধু কিছু হবে না।
আমি বললাম না হলেই ভালো।
আমি আর অনন্ত তার রুমে আর অন্যরা গেস্ট রুমে গিয়ে শুয়ে পড়ল। সেই রাতে অনন্তকে খুব কাছে পাওয়ার জন্য আমার মন ব্যাকুল হয়ে উঠল। আমরা দুইজন একে অপরকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে পড়লাম। হঠাৎ মাঝ রাতে আমার ঘুম ভেঙে গেল, হাত দিয়ে অনন্তকে না পেয়ে।
সুনয়না আবার নিশ্চুপ হয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। ঘটনা কিছুটা আচঁ করতে পারলেও আমি বললাম তারপর কি হল?
সুনয়না কিছু সময় নিশ্চুপ থেকে বলল, চোখ মেলে দেখলাম ঘরের লাইট জ্বালানো, আর অনন্ত এর হাত পা বাধাঁ অবস্থায় মেঝে পড়ে আছে, পাশে তার বন্ধুরা দাড়িয়ে আছে। আমি চিৎকার করতে চেষ্টা করলাম কিন্তু পারলাম না, আমার মুখে টেপ দিয়ে আটকানো। হঠাৎ করেই নরপশুগুলো আমার উপর ঝাপিয়ে পড়ল।
হাত দিয়ে চোখ মুখ ডেকে ফুপিয়ে কান্না শুরু করল সুনয়না। আমি নিথর হয়ে বসে রইলাম। আমার মুখ দিয়ে একটা কথাও আর বের হচ্ছে না।
সুনয়না আবার বলা শুরু করল, সারারাত ওরা আমার উপর নির্যাতন করল। খুব সকাল বেলা বাসা থেকে বের হওয়ার আগে ওরা আমাকে জবাই করে বাথরুমে রেখে চলে গেল।
এবার আমি চিৎকার করে উঠলাম, চুপ করুন আর শুনতে চাই না। আমার হাত পা কাপা শুরু করল। সনয়না বলল আপনার জ্বর আসবে মনে হয়, ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ুন। আমি বললাম, আপনি চলে যান আমি যেতে পারব। আমি লক্ষ্য করলাম সুনয়না এই ছাদ থেকে পাশের বাসার ছাদের দিয়ে এগিয়ে গিয়ে আস্তে আস্তে বাতাসের সাথে মিলিয়ে গেল।

পরেরদিন আমার গায়ে প্রচন্ড জ্বর এল। প্রচণ্ড জ্বরে বিছানায় পড়ে গেলাম আমি। কিন্তু প্রতিদিন রাতে লক্ষ্য করলাম সুনয়না আমার ঘরের দরজার সামনে এসে দাড়িয়ে থাকে। নীল কান্ত রায় ডাক্তার এর কাছ থেকে ঔষুধ এনে দিয়েছিল, মাঝেমাঝে এসে খোঁজ খবরও নিত। কিন্তু আমি কিছুতেই সুনয়নার সেই বিভৎস মুহুর্তের কথা কিছুই মন থেকে মুছে ফেলতে পারছিলাম না। ঘটনার কয়েক সপ্তাহ পর সব কিছু আবার স্বাভাবিক হওয়া শুরু করল। সুনয়না এখনো আসে, ছাদের কার্নিশে বসে গল্প করে। জীবনের গল্প, শুনতে ভালোই লাগে।

কমেন্টস