তুম ঝুট বলতা হায়

প্রকাশঃ ডিসেম্বর ২৪, ২০১৫

পাঠানুভূতি

আবুল হাসান-
পাকিস্তানি মিলিটারি নিয়ে একটা জোক বলি।
১৯৫৮ সালে দেশে চোরাচালান ব্যাপকহারে বেড়ে যায়।
পাকিস্তান সরকার সেনাবাহিনী নামায় চোরাচালানী ধরতে।
সৈনিকরা সর্বত্র চোরাকারবারী খুঁজে বেড়াচ্ছে। কিন্তু
মুশকিল হচ্ছে এরা বাংলা ভালো বুঝে না।
“বাজারে একজন দোকানদারকে এইগুলি কি জিনিষ জিজ্ঞাসা করলে দোকানদার মিলিটারিকে বলে যে, এগুলি-‘বোম্বাই মরিচ’ ‘বোম্বাই’ (মুম্বাই) শুনেই মিলিটারি ‘তুম বোম্বাইকা মরিচ এধার চালান করতা হায়’ বলে মাইর শুরু করে।
আর একজন মিলিটারি-গুড়ওয়ালাকে এ জিনিসগুলি কি জিঞ্জাসা করায় সে বলে “গুড়”।
মিলিটারি ঐ গুড় হাতে নিয়ে মুখে দেয় এবং বলে যে ’এ তো মিঠা হায়’।
তারপর ‘তুম ঝুট বলতা হায়’ বলে তাকেও মারপিঠ শুরু করে দেয়।” পৃ:৮-৯
১৯৫৮ সালে চিত্তরঞ্জন সুত্র এই ঘটনা দুটো বর্ণনা করেছিলেন National Assembly বা জতীয় পরিষদে। তিনি এই ঘটনা দুটোর উল্লেখ করে স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেছিলেন যে বাংলায় পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর কাজকর্ম
নানা কারণে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং জনজীবনেও তারা বিরুপ প্রভাব ফেলছে।
বিশেষত সেনাবাহিনীর বাড়াবাড়ি সীমা অতিক্রম করেছিল।
তারা রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দদের থোরাই কেয়ার করতো।
প্রশাসনিক কর্মকর্তারা মান সম্মান হারানোর ভয়ে তাদের সাথে কথা বলতো না। সেনাবাহিনীর যখন এই অবস্থা তখনো সাধারণ মানুষ সেনাবাহিনীকে ভয় করতো।
এমনকি ন্যাশনাল এ্যাসেম্বলির সদস্যারা পর্যন্ত তাদের সমীহ করতো।
এই চিত্তরঞ্জন সুত্র প্রথম ব্যক্তি যিনি এর প্রতিবাদ করলেন।
তিনি জাতীয় পরিষদে খোলামেলা আলোচনা করলেন।
বললেন যে সেনাবাহিনীর এই বাড়াবাড়ি সুবিধাজনক না।
তারা কথায় কথায় বন্দুকের ভয় দেখায়। রাজনৈতিক নেতাদের গ্রেফতারের হুশিয়ারী দেয়।
এসব শুভ লক্ষণ নয়।
মুখে বলতে বলতে না জানি কবে তারা বাস্তবায়ন শুরু করে দেয়। পরিষদের অন্য মেম্বাররা চিত্তরঞ্জনের কথায় অবাক হলেন, প্রতিবাদ করলেন।
তাদের মতে সেনাবাহীনী নিয়ে এ ধরণের কথা বলা আপত্তিকর, তারা দেশের রক্ষক। জাতীয় পরিষদে সেদিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন না।
কারণ তার সাথে Chief Minister এর কি যেন মনোমালিন্য ছিল।
বেশী না, এই ঘটনার মাত্র ৬ মাস পরে দেশের রক্ষকরা (!)
আইয়ুব খানের নেতৃত্বে গনতন্ত্রের ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হল। ১৯৫৮ সালের ৭ই অক্টোবর সেনাবাহিনী পাকিস্তানের ক্ষমতা দখল করে মার্শাল ল’ জারি করল।
শুরু হল সামরিক শাসন। ৬ মাস আগে চিত্তরঞ্জনের কথায় তার সহযোদ্ধারা গুরুত্ব দিলে পাকিস্তানের ইতিহাস হয়তো অন্যরকম হতো। চিত্তরঞ্জন কয়েকদিন যাবত জাতীয় পরিষদে তার অলোচনা বহাল রাখেন। সেই দীর্ঘ অলোচনা বই আকারে আছে।
বইটার নাম-“পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ক্ষমতাদখলের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে প্রথম হুঁশিয়ারী।”
পূর্ব পাকিস্তান আইন পরিষদ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত।
সেদিন স্পিকার পর্যন্ত ক্ষেপে গিয়েছিলেন চিত্তরঞ্জনের প্রতি। তিনি তাকে বললেন-
Mr.Sutar, You have kindled a fire, it must burn you.
স্পিকারের নাম আ. হাকিম।
তার কথা অর্ধেক সত্য প্রমাণিত হইছিল।
আগুন শুধু চিত্তরঞ্জন সুত্রকে জ্বালায়নি পুরো পাকিস্তানকে জালিয়েছিল।
অথচ এই আয়ূব খানকে পূর্ব এবং পশ্চিম পাকিস্তানের
সবাই মনে করত গণতন্ত্রের কান্ডারী, রক্ষক।
সেই তিনি গোগ্রাসে গণতন্ত্র ভক্ষণ করলেন।
আসলে এই উপমহাদেশের ইতিহাস বড়ই গোলমেলে।
বইয়ের ভূমিকার একটা কথা ভাল লেগেছে। সেখানে বলা হয়েছে:
“…দেশ ভাগের মূল কারণ হিন্দু মূসলমানের বিরোধ যতটা,
তার চাইতে অনেক বেশী সম্রাজ্যবাদী চক্রান্ত এবং স্বার্থ।
দেশ ভাগের পর ভারত পাকিস্তান বিরোধেরও মূল কারণ আন্তর্জাতিক চক্রান্ত এবং স্বার্থ।…পাকিস্তানের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী জিন্নাহর বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু,
লিয়াকত আলী হত্যা, ফাতেমা জিন্নাহ এবং শহীদ সোহরাওয়ার্দীর রহস্যজনক মৃত্যু-
এই সব কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় বা মূলত পাকিসন্তানের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারও নয়।
ইহা পাকিস্তানে আন্তর্জতিক একটি শক্তির প্রস্থান এবং একটি নতুন শক্তির প্রবেশ।
উপমহাদেশে সামগ্রিকভাবে বন্দরনায়েক, বঙ্গবন্ধু,
ভুট্টো এবং শ্রীমতি গান্ধীর হত্যা ইহা আদৌ উপমহাদেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারও নয়। ইহা উপমহাদেশে বৃহৎ শক্তির ব্যাপার।” পৃ. ভূমিকা।
উপমহাদেশ নিয়ে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের বিষয়ে আর একটু বলি। গতকালকে আর একটা বই পড়লাম। নাম: ‘কালো পঁচিশের আগে ও পরে।’ লেখক আবুল আসাদ। সেখানে জেনারেল ওসমানীর একটা সাক্ষাৎকারের অংশবিশেষ আমাকে আকৃষ্ট করেছে। ১৯৮৩ সালের ২৪ নভেম্বর বিচিত্রা এক সাক্ষাৎকার নেয়ার সময় তাকে প্রশ্ব করে,
“পাকিস্তানী সৈন্যদের আত্মসমর্পণ আপনার কাছে হলো না কেন?” জেনারেল ওসমানি বলেন,
“মুক্তিযুদ্ধের এমন অনেক ঘটনাই আমি জানি,
যাতে অনেকের অসুবিধা হবে। আমি একটা বই লিখছি।
তাতে সব ঘটনাই পাবেন।”
চিকিৎসার জন্যে লন্ডনে যাওয়ার প্রাক্কালে সি এম এইচ হাসপাতালে দেয়া জীবনের সর্ব শেষ সাক্ষাৎকারে অসুস্থ জেনারেল জানান:
আমার একটা দুঃখ আছে-আমি বাংলা ভাষা দিয়ে লিখতে পারি না। ইংরেজি স্কুলে লেখাপড়া করেছি তাই। তবে আমি বসে নেই-আমি অনেক ঘটনার নোট টুকে রেখেছি। ইংরেজীতে। একটা আত্মজীবনী লিখবো।
অনেক অজানা ইতিহাস থাকবে তাতে। জেনারেল ওসমানির জীবনীগ্রন্থ হবে না সেটা-সেটা হবে বাংলাদেশ জন্মের ইতিহাস। দেশবাসীর কাছে আমি রুনী ।
অনেক আগের পাওনা তাদের বইটা শেষ করে প্রকাশ করতে না পারলে আমার মৃত্যুর সাথে সাথে আমার লাশের মতো অনেক অজানা কথা অনেক অপ্রকাশিত ইতিহাস মাটিতে চাপা পড়বে। এটা হওয়া উচিত না।….
ভাবছি ভালো হয়ে ফিরে এসে অবশ্যই বইটি লিখব-আর কিসের ভয়। কারে ভয়?
এক বঙ্গবন্ধুরে ভয় করতাম। সেই লোকটারে কথা দিছিলাম কিছু কিছু কথা লিখবো না, বলবো না। তিনিও নাই আমার দেওয়া কথাও নাই।
এই সব কথা বর্তমান ও আগামী দিনের নাগরিকদের জানা দরকার। হাঁ আমি লন্ডন থেকে ফিরেই লিখবো নিয়মিত।” পৃ: ১৮১-১৮২।
কিন্তু জেনারেল আর লন্ডন থেকে ফিরে আসেননি।
এসেছিল তার লাশ।
বঙ্গবন্ধুর প্রতি মওলানা ভাষানীর পিতৃস্নেহের একটা ঘটনা বলে এই বই শেষ করি।
৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণের ২ দিন পরে ৯ই মার্চ ১৯৭১।
পল্টন মাঠে বক্তৃতা দিচ্ছেন মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাষানী।
২ দিন আগে বঙ্গবন্ধু ভাষন দিয়েছেন, তবু ছাত্রনেতাদের একাংশ মনে করত বঙ্গবন্ধু ইয়াহিয়ার সাথে ৬ দফা বিষয়ে আপোষ রফা করতে পারে।
তাদের এ অমূলক ধারণা ভেংগে দিতে ভাষানী বললেন :
“…ইয়াহিয়া ঢাকায় এলে মুজিব তার সাথে বাঙালির দাবী নিয়ে আপোস করতে যেতে পারে না।
শেখ মুজিব বঙ্গবন্ধু বা যে বন্ধুই হোক না কেন আপোষ করতে গেলে পিঠের চামড়া তুলে ফেলবো।…আমি ৩১ টি সমিতির সভাপতি ছিলাম, তার একটি সমিতির সেক্রেটারি ছিল মুজিব। শেখ আমার ছেলের মতো। আমি, তাকে হাতে খড়ি দিয়ে রাজনীতি শিখিয়েছি। আকে আপনারা অবিশ্বাস করবেন না।…” পৃ: ৯০ দৈনিক পাকিস্তান ১০ মার্চ ১৯৭১
এই জায়গাটা পড়ে আমি সত্যি অশ্রুসিক্ত হয়েছি।
মনে হয়েছে একজন মানুষের মনে কত দরদ…
দেশের প্রতি মানুষের প্রতি…
ভাষানীর অনেক সীমাবদ্ধতা ছিল।
মুক্তিযুদ্ধের পুরাটা সময় ভারত তাকে বন্ধী করে রাখে ।
কিন্তু তার মনে ছিল দেশের প্রতি অগাধ ভালোবাসা।
সেই ভালবাসা থেকে তিনি আজীবন লড়ে গেছেন।
ব্রিটিশ থেকে বাংলা….
এতবড় রাজনীতিবীদ হয়েও এক মূহুর্তের জন্য রাজনীতি করেননি।
তিনি আসলে রাজনীতিবিদ হতে চাননি কখনো।
সেই কারণেই তার মৃত্যুর পরে তার দলও একপ্রকার মারা গিয়েছে।
যাই হোক, কালো পঁচিশের আগে ও পরে বইটা পড়ার আগে আর একটা বই পড়েছি।
সেটার নাম:
‘একাত্তরের ঘাতকদের কেন বিচার চাই।’
লেখক: আমান-উদ-দৌলা। ভূমিকা লিখেছেন-জাহানারা ইমাম।
এই বইটা এবং ১ম বইটা আউট অব্ প্রিন্ট, দুস্প্রাপ্য।
এইটা মূলত বের করা হয়েছিল শহীদ জননী জাহানারা ইমাম ১৯৯২ সালে গণআদালত গঠন করার এক বছর পরে।
আন্দোলনকে আরো বেগবান করার লক্ষই ছিল বইটার উদ্দেশ্য।
বইয়ে এমন অনেক তথ্য আছে যা সত্যিই জানা ছিল না।
কবি নবারূণ ভট্টাচার্যের একটা কোটেশন আছে বইয়ে সেটা দিয়ে এই লেখার ইতি টানি।
“…যে পিতা সন্তানের লাশ সনাক্ত করতে ভয় পায়
অামি তাকে ঘৃণা করি।
যে শিক্ষক-বুদ্ধিজীবী-কবি ও কেরানী প্রকাশ্যে
এই হত্যার বিচার চায় না-
আমি তাকে ঘৃণা করি।
যে ভাইটি এখনো নির্লজ্জ স্বাভাবিক হয়ে
চুপকরে বসে আছে-
আমি তাকে ঘৃণিা করি” কবি নবারূণ। পৃ: ১১।

hasan
(লেখক-আবুল হাসান। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী। পাঠক ও চরচ্চিত্রের সমালোচক, লেখাটি ফেসবুক থেকে সংগ্রিহীত। সেখানে পাঠানুভূতি নামের পোস্ট করা ছিল।)

কমেন্টস