জন্ম ঝড়ের বাংলাদেশ
‘একটি প্রামাণ্য মুক্তিযুদ্ধের গল্প’

প্রকাশঃ মে ১৬, ২০১৭

হাকিম মাহি-

একটি দেশকে পরাধীন রাখার জন্য দুটি কৌশলই যথেষ্ট; একটি দেশের নারীদের ধর্ষণ এবং বুদ্ধিজীবীদের হত্যা। তাহলে, স্বাধীনতা পরবর্তী হাজার বছরের জন্য অত্যাচারীদের কাছে শোষিতরা মাথা নত করে থাকবে। পাকিস্তানিরাও তাঁর ব্যাতিক্রম করেনি, একই সুত্রে যুদ্ধকালীন সবচেয়ে বেশি মা-বোনদের ধর্ষণ এবং ২৫ মার্চ কাল রাতসহ বিভিন্ন সময়ে গুনীদের হত্যা নিত্য কর্মসূচিতে পরিণত করেছিলো। যা পর্যালোচিত ‘জন্ম ঝড়ের বাংলাদেশ’ বইয়ের রাজাকার নামক প্রবন্ধে লেখকের প্রামাণ্য তথ্য বিবরণীতে ফুটে উঠেছে। বইটি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রত্যক্ষ আর্কাইভ ২২ টি ভিন্ন ভিন্ন গল্প ও শিরোনামে উপস্থাপন করা হয়েছে। পাঠক শুধু বইটি চোখ দিয়ে পড়বেন না, বরং বইটির পাতায় পাতায় মুক্তিযুদ্ধের প্রতিটি পদক্ষেপের রাজসাক্ষী হয়ে থাকবেন। মাঝে মাঝে মনে হবে বইটি যেন, ছবি ও ক্যাপশনে বাঁধাই করা পুস্তকাবদ্ধ একটি মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর।

বইটির লেখক ড. নূরুন নবী অর্ধশতাধিকের চেয়েও বেশি সম্মানে ভূষিত একজন প্রথম সারির বীর মুক্তিযোদ্ধা ও ঐতিহ্যবাহী জন্মস্থান টাঙ্গাইলের কাদের বাহিনীর সমর নায়ক। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাণরসায়ন বিষয়ে বিএসসি এবং এমএসসি, জাপানের ওসাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ডিপ্লোমা, ক্যিউশু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি, আমেরিকার নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ে পোস্ট ডক্টরাল ডিগ্রি অর্জন করেন। ৭০ দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং প্রথম সিনেটের সদস্য ছিলেন। ১৯৮০ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস। পেশায় গবেষক বিজ্ঞানী, বর্তমানে একটি বহুজাতিক কোম্পানির শীর্ষস্থানীয় বিজ্ঞানী হিসেবে অবসর গ্রহণ করেছেন। ড. নূরুন নবীর পেটেন্টকৃত আবিষ্কারের বর্তমান সংখ্যা ৫৫। বিজ্ঞানের পেশাদারী জার্নালে এ যাবৎ তাঁর ৫০ টি গবেষণা-নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। একই সাথে সফল একজন রাজনীতিবিদ, শিক্ষক, বিজ্ঞানী ও গবেষক সব মিলিয়ে ডঃ নূরুন নবী যেন সোনার বাংলার এক মহীয়সী নারীর রত্নগর্ভা সন্তান।

লেখক ‘শুরুতেই সংঘাত’ শিরোনামে যে অধ্যায়টি শুরু করেছেন, এখানে ১৬ ডিসেম্বর চূড়ান্ত বিজয় অর্জনের পর স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম ১৮ ডিসেম্বর বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বে ঢাকার পল্টনে জনসভার আয়োজন করা হয়। মঞ্চে আনোয়ারুল আলম শহীদ, বঙ্গবন্ধুর মেঝো ছেলে শেখ জামাল, গণপরিষদ সদস্য লতিফ সিদ্দিকী, বাছিত সিদ্দিকী এবং অধ্যক্ষ হুমায়ুন খালিদ আরও অনেকে, নব্য স্বাধীন রাষ্ট্রের অনিষ্ট কারীদের আত্মসমর্পণ করতে বললেন। কিন্তু কাদের সিদ্দিকী এর সাথে আরও যেটি বললেন, ‘ভাই ও বোনেরা, আপনারা কি শান্তি-শৃঙ্খলা বিঘ্নকারীদের সহ্য করবেন? আপনারা কি লুটেরাদের প্রশ্রয় দেবেন? লক্ষ্য কণ্ঠে জনতারা উত্তর দিলো, না না। আমরা যখন সভায় আসছিলাম, তখন এই চার জন, এই দুইটি মেয়ে ও পঞ্চাশ হাজার টাকা লুট করে তাঁদের বাবাকে বেঁধে নিয়ে যাচ্ছিল। আমরা তাদের হাতে নাতে ধরেছি। আপনারা বলুন, তাদের কী করা উচিৎ? জনতা উত্তেজিত হয়ে সমস্বরে চিৎকার করে উঠল, নারী হরণকারী লুটেরাদের আমরা মৃত্যুদ-চাই। হাজার হাজার লোক চিৎকার করে বললেন, ওদের গুলি করে মারা হউক। আপনাদের নির্দেশ মুক্তিবাহিনী অবশ্য পালন করবে। সভা শেষে মঞ্চের ডানদিকে চারজন দুষ্কৃতিকারীকে শতাধিক দেশি বিদেশি সাংবাদিকদের সামনে একটি করে গুলি ও বেয়নেট চার্জ করে মৃত্যুদ কার্যকর করা হল। এহেন ঘটনা বইটিকে করেছে কালের সাক্ষী।

২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় বিডিয়ার বিদ্রোহে ৫৭ জন সেনাবাহিনী নৃশংসভাবে হত্যা এটি নতুন কিছু নয় বরং ‘ইপিআর সদর দফতরে গোলাগুলি এবং রক্ষীবাহিনীর জন্ম’ অধ্যায়ে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তী একই মাস ১৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২ অধুনালুপ্ত ইপিআর সদর দফতর অর্থাৎ পিলখানায় একই ভাবে গোলাগুলি হয়। স্বাধীনতার মাত্র দুই মাসের মধ্যে এমন দুঃখজনক ঘটনা ছিল একটি অশনি সংকেত। আজকের বিডিআর ৭২এ ছিল ইপিআর, আর এখন বিজিবি নাম প্রবর্তন প্রতিবারের অপকর্মের ফল। ‘মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তাদের অন্তরদ্বন্দ্ব’ অধ্যায়ে লেখক ডঃ নূরুন নবী, স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় শহীদ দিবস উপলক্ষে বাংলা একাডেমির চত্বরে এক বিশেষ আলোচনা সভায় আধ্যাপক কবীর চৌধুরীর সভাপতির আসন গ্রহণসহ আরও অনেকে যেমন; কর্নেল ওসমানী, কর্নেল শফিউল্লাহ, লেফটেন্যান্ট কর্নেল জিয়াউর রহমান, লেফটেন্যান্ট কর্নেল খালেদ মশারফ, মেজর সিআর দত্ত ও মেজর মীর শওকত আলীদের মুক্তিযুদ্ধের অবদানের বর্ণনা দিলেন। কিন্তু এদের মাঝে লেফটেন্যান্ট কর্নেল জিয়াউর রহমানের ২৭, ২৮ মার্চে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠের স্বীকৃতি চলমান রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের সমাধান কল্পে বইটি হতে পারে অনন্য দৃষ্টান্ত।

লেখক বইয়ের পাতায় পাতায়, শব্দে শব্দে এঁকেছেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের মতো ১৯৭৪ এর দুর্ভিক্ষে ৩০ হাজার মানুষের অনাহারে মৃত্যুর করুণ দৃশ্য। যেটি অবিভক্ত বাংলার ১১৭৬, ১৯৪৩ এর ভয়াবহ দুর্ভিক্ষকেও হার মানায়। ৭৪ এর দুর্ভিক্ষের কারণ বর্ণনা করতে গিয়ে লেখক বলেন, সে বছর বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল ও সিলেট প্রবল বন্যায় প্লাবিত হয়। আউশ এবং আমন ধানের প্রচুর ক্ষতি ও দিনমুজুরের কাজের সুযোগ না থাকায় সৃষ্টি হয় সর্বনাশা দুর্ভিক্ষের। যার প্রভাব ২০১৭ তেও কাটিয়ে উঠতে পারেনি উত্তরাঞ্চলের কৃষক মহল। লিখেছেন দুর্ভিক্ষ থেকে ব্যাথিতপ্রায় বঙ্গবন্ধুর বাকশাল গঠিত করে বাংলাদেশের অসহায় মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের একধাপ এগিয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু সেটি আর হল কোথায়? ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যা পিছিয়ে দিল বাঙ্গালীর ভাগ্য ফেরার সুগম যাত্রাকে।

লেখক ড. নূরুন নবী বইটি রচনার সময় তাঁর প্রিয়তমা বকুলের কথাও প্রাণভরে স্মরণ করেছেন। তিনি শুধু তাঁর বীরত্ব গাঁথা মুক্তিযুদ্ধের কথাই লিখেননি, বরং জীবন যে ভালোবাসার বসন্ত দিয়েও গাঁথা, সেটিও শিক্ষক জীবনে শিক্ষার্থীদের অগোচরে একই সাথে তাঁর সহপাঠী ও সহকর্মীর সাথে প্রাণরসায়নের বিক্রিয়া করে প্রমাণ করেছেন। ভুলেননি উৎসর্গ করতে বইটিকে জীবনের চেয়েও বেশি প্রিয়নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। সর্বশেষ, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে পাওয়া-নাপাওয়ার হিসেব কষতে গিয়ে নামধারী মুক্তিযুদ্ধাদের সুযোগ সন্ধানী মনোভাবকে প্রতিবাদ কল্পে বলেছেন, ‘আজও আমার মুক্তিযুদ্ধের সার্টিফিকেট সংগ্রহ করা হয়নি’।

বইটি প্রকাশ করেছে প্রকাশনা সংস্থা ‘সময় প্রকাশন’। প্রাপ্তিস্থান, বিক্রয় কেন্দ্র, ৩৮/২ক, বাংলাবাজার, ঢাকা-১১০০। বইটির প্রকাশ কাল ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি। প্রচ্ছদকার শিব কুমার শীল, বইয়ের প্রচ্ছদে দিয়েছেন সবুজের মাঝে লাল বৃত্তে বঙ্গবন্ধুর জলছাপের প্রতিকৃতি, যা ৭১ এর ইতিহাসকে মনে করিয়ে দেয়। প্রচ্ছদ যেন পুরো বইয়ের একটি সারাংশ। ২২৪ পৃষ্ঠার বইটির মূল্য ৩৫০ টাকা।

লেখক- শিক্ষার্থী, সাংবাদিকতা বিভাগ।
স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ।

[email protected]

কমেন্টস