‘সোনালী সুন্দরীর দেশে বিশ্বকাপ’ একটি অনিন্দ্য ভ্রমণ কাহিনী

প্রকাশঃ সেপ্টেম্বর ৬, ২০১৬

আবদুল হাকিম খাঁন মাহি-
“ভেরাতো ভ্যা ভ্যা করবে – মেইল করে কীভাবে। তোমরা একটা মানুষের স্পেলিংও করতে পার না!”- এমন মজার মজার কিছু বাক্য আর জ্ঞান-অভিজ্ঞতা নির্ভর বর্ণনায় সমৃদ্ধ ‘সোনালী সুন্দরীর দেশে বিশ্বকাপ’ বইটি। বিশ্বকাপ চলাকালীন ব্রাজিলে ভ্রমণ নিয়ে চমৎকার এবং সংগ্রহে রাখার মতো একটি বই। অত্যুক্তি হবে না যে, ব্রাজিল নিয়ে বাংলায় লেখা এটিই প্রথম বই, যেখানে অনেক বিস্তৃত আকারে স্বচক্ষে দেখা একটি দেশের পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা রয়েছে অত্যন্ত সহজ অথচ নিখুঁতভাবে।

সৈয়দ মুজতবা আলী তাঁর বিখ্যাত লেখা ‘বই কেনা’ প্রবন্ধে বলেছেন, “দু’ভাবে জ্ঞান অর্জন করা যায়; একটি বই পড়ে এবং অন্যটি ভ্রমণ করে।” তাঁর মতে ভ্রমণ করে যে জ্ঞান অর্জন হয় তা বই পড়ে জ্ঞান অর্জনের চেয়ে বেশি স্থায়ী এবং কার্যকর হয়। ‘সোনালী সুন্দরীর দেশে বিশ্বকাপ’ তেমনি এক বই, যা শুধু জ্ঞান নয়; পুরো ব্রাজিল ও বিশ্বকাপই যেন দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে বইটির পাতায় পাতায়। পাঠক শুধু বইটি চোখ দিয়ে পড়বেন না, বরং পায়ে হাঁটবেন ব্রাজিলের এ প্রান্তর থেকে ও প্রান্তর।

বইটির লেখক ডা. এ এম শামীম কুমিল্লা শহরে জন্ম গ্রহণ করেন। ছোট বেলা থেকেই যার স্বপ্ন মানবতার সেবা করা সে কি আর অবলীলায় ঘুমাতে পারেন! তাইতো তিনি মানুষের শারীরিক সেবার সাথে সাথে যেনো মানসিক সেবারও একটি বড় রকমের ব্যবস্থা করতে পারেন এজন্য ১৭ হাজার কি. মি. দূরে অবস্থিত পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর সোনালী নৈপূন্যে ঘেরা দেশ ব্রাজিল ঘুরে এসে লিখলেন একটি অনিন্দ্য ভ্রমণ কাহিনী। লেখক একা যাননি, স্ত্রী শর্মী, পুত্র সায়ের, সাকিফ এবং কন্যা পারিসাকে নিয়ে পাঁচজন বেল হরিজন্টা ও সাও পাওলো কাটিয়েছেন দশ দিন। আকার-ইঙ্গিত ও সংকেত দিয়ে যে পৃথিবী জয় করা সম্ভব তা কেবল কলম্বাসের আমেরিকা, পানি পথে ভাস্কো দ্য গামার ভারত গমন ও ইবনে বতুতার বঙ্গভূমিতে দেখা যায়নি, ডা. শামীমও দেখিয়েছেন ২০১৪ ফুটবল বিশ্বকাপ উপলক্ষে ব্রাজিলে ভ্রমণ করে।

আমরা আরো দেখেছি কোনো ইঙ্গিত নয়, শুধু ‘মহব্বত’ শব্দ দিয়েও একটি ভ্রমণ কীভাবে প্রাঞ্জল করা যায় প্রফেসর রোবায়েত ফেরদৌসের তুরস্ক গমন তার জ্বলন্ত প্রমাণ। পৃথিবীর ৫ম বৃহত্তম দেশ ব্রাজিল জনসংখ্যা ও আয়তন দুই হিসেবেই। এই দেশটির ভূপ্রকৃতি ও মানুষের ভাষা ও সংস্কৃতি এত অল্প সময়ে মাত্র দুটি শহর বেল হরিজন্টা ও সাও পাওলো ঘুরেই যে বর্ণনা দিতে পেরেছেন তা বিশ্বাসই হবে না, যদি না বইটি পড়া হয়। তাও নাকি এটি লেখকের কাঁচা হাতের প্রথম রচনা। লেখকের ব্রাজিলে যাত্রাটি ছিল ২০১৪ সালের ফুটবল বিশ্বকাপকে উদ্দেশ্য করে যদিও সে মনে মনে লালন করেছিলেন ব্রাজিলের প্রতিবেশীকে। ৫ই জুলাই শনিবার রওয়ানা করলেন। ৮ ও ১৪ ঘণ্টা যাত্রার মাঝে তার্কিস বিমান বন্দরে যাত্রা বিরতি। এই ক্ষণিক সময়ে তুর্কির বর্ণনা পড়ে মনে হবে পূর্ব জনমে লেখকের নারীর টানটা মনে হয় এখানেই ছিলো শাখের করাতের মতো। ৬ই জুলাই রবিবার তারা তুর্কি থেকে সাও পাওলোর উদ্দেশ্যে বিমানে উঠলেন, এ সময়টা ২/৩টা হিন্দি সিনেমা দেখলেন, একটির নাম “জিন্দেগী বহৎ মেহেঙ্গা হে”। যেখানে চাকরি থেকে অবসরের কাহিনী নিয়ে প্রামাণ্য চিত্রের মতো মনে হলো তাঁর। দেখতে দেখতে স্বপ্নের দেশ ব্রাজিলের সাও পাওলোতে পৌঁছে গেলেন তারা। বিমান থেকে নেমে আবহাওয়া ও তাপমাত্রার পরিবর্তন দেখে জন্মভূমি বাংলাদেশের কথা মনে পড়লো লেখকের। ৩০/৪০ গজ দূরে একজন মধ্যবয়সী মহিলা দাঁড়িয়ে হাসছে, হাত নাড়ছে। সাথে একজন কৃষাঙ্গ মানুষ দেখা যাচ্ছে না, শুধু সাদা দাঁত দেখা যাচ্ছে, বুঝলাম এই আমাদের ‘ভেরা’ হেসে বললাম ‘We are here’ কবি জসিম উদ্দিনের কবিতার নায়ক রাখাল রূপাইয়ের মত ভেরার বর্ণনা দিলেন তিনি।

ব্রাজিলে ফুটবল খেলা দেখার সুবাদে ঘুরলেন বেল হরিজন্টার বিখ্যাত মিউনিসিপ্যালিটি পার্কের অনেক বড় লন, ফোয়ারা ও খাবারের জায়গা। পাহাড়ের ৮ হাজার ফুট উপরে মেয়রের বাড়ি মেঘের কাছাকাছি। বেল হরিজন্টার বিখ্যাত রেস্তোরা ‘চুরাস্কো’ সেন্ট্রাল মার্কেট, মাল্টিপ্লেক্স শপিং সেন্টার এবং ফটো মিউজিয়ামগুলো তো এমনিতেই সুন্দর। আরো খেলা উপলক্ষে বর্ণিল সাজে সাজানো হয়েছে সারা ব্রাজিলকে। সবার গায়ে প্রিয় দলের জার্সি, মাথায় ব্রাজিলের ঐতিহ্যবাহী সিং ওয়ালা টুপি আরো কতো কী! সব মিলে পৃথিবীর সকল দেশ থেকে আসা ভ্রমণ প্রেমী মানুষের সাথে বসে খেলা দেখা ঐশ্বর্গিক আনন্দের মতো মনে হয়েছে লেখকের।

সাও পাওলোর নভোটেল মরুম্বি লেখক পরিবারের ক্ষণিক নিবাস, সেখানকার ইকুয়েডর মার্কেট বড় মার্কেটগুলোর একটি। সাও পাওলো ‘ফুটবল মিউজিয়াম’ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মিউজিয়াম, যেখানে ব্রাজিলের নিজস্ব জয় পরাজয় ও বিশ্বের ফুটবল বিষয়ক সকল রেকর্ডস রয়েছে। সবগুলো দেখলে মনে হয় শত বছরের ইতিহাস এখনোও জীবন্ত। ব্রাজিলের সংস্কৃতির সাম্বা নাচ ও বইয়ের বিভিন্ন খাবার সামগ্রির বর্ণনা পড়লে মনে হয় এখই পাড়ি দেই সোনালী সুন্দরীর দেশে। গোলাপী রঙের পাতা দিয়ে ছবির মতো আঁকানো গাছ “পিংক ট্রি” ব্রাজিলের অন্যতম দর্শণীয়। ভালোবাসার মানুষগুলোকে লেখক দূর্দেশে গিয়েও ভুলেননি তাঁর একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ ফয়েজ স্যারকে খোঁজছিলেন তার গাড়ির ড্রাইভারের মাঝে। তাই অল্প সময়ে আপন হয়ে ওঠা ‘ভেরা’কে কেন্দ্র করে বলা “ হারায়ে খুঁজি তারে, সাও পাওলো জুড়ে”।

 

Advertisement

কমেন্টস