সত্যকে যেভাবে জানেন সেভাবে প্রকাশ করুন: খুশবন্ত সিং

প্রকাশঃ অক্টোবর ১, ২০১৫

বিডিমর্নিং ডেস্ক-

 

৮৭ বছর খুশবন্ত সিংয়ের আত্মজীবনী Truth, Love and a little Malice প্রকাশিত হয়। এই প্রকাশনাকে উপলক্ষ করে একটি সাক্ষাৎকার নেন শিলা রেড্ডি। সেখানে তিনি বলেন, সত্যকে যেভাবে জানেন সেভাবে প্রকাশ করুন। সর্বাধিক পঠিত এই সাক্ষাৎকারের নির্বাচিত অংশ তুলে ধরা হলো।

 

প্রশ্ন : আপনি যেমন খোলামেলা আত্মজীবনী লিখেছেন ভারতে এ ধরনের আত্মজীবনী লেখার সমস্যা কোথায়?

 

খুশবন্ত : সত্যকে আপনি যেভাবে জানেন সেভাবে প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললে, এটা তেমন কোনো সমস্যা নয়। আমি নিজের জন্য কোনো অজুহাত সৃষ্টি করিনি, সেটাও কোনো কঠিন কাজ নয়, কারণ আমার নিজের সম্পর্কে খুব উঁচু ধারণা নেই। আমার আত্মজীবনী লেখার সমস্যা একটাই- আমার জীবন তেমন কৌতূহলোদ্দীপক কিছু নয়। কিন্তু পাঠকের কাছে তা মজার করে তুলে ধরতে হয়েছে। তবে লেখাকে মজার বিষয় করে তোলার শিল্পের চর্চা আমি বহু বছর ধরে করে যাচ্ছি।

 

প্রশ্ন : কিন্তু আপনার লেখা যখন সমাজের উঁচু ও ক্ষমতাসীনদেরও অন্তর্ভুক্ত করবে, তখন এর প্রকাশনা কি দুরূহ নয়?

 

খুশবন্ত : আমি তো এর মধ্যেই খেসারত দিয়েছি। এই বইটি প্রকাশ করতে আমাকে ছয় মাস অপেক্ষা করতে হয়েছে। কিন্তু যেসব ক্ষমতাসীন মানুষ ক্ষমতার অপব্যবহার করে আমি তাদের বিরুদ্ধে মুগুর হাতে নিতে তৈরি। যারা প্রত্যাঘাত করতে পারে, তাদের বিরুদ্ধে লেখা মজার কোনো বিষয় নয়।

 

প্রশ্ন : আদালতের অভিজ্ঞতা কি আপনাকে সতর্ক করতে পেরেছে?

 

খুশবন্ত : তেমন পারেনি। নসিহতকারী রায় শুনে আমি ক্ষুব্ধ হয়েছিলাম, রায়ে নসিহত করা হয়েছে আমার মতো বিশাল অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন মানুষের কী লেখা উচিত আর কিভাবে তরুণ প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করা উচিত। আমি মনে করি এটি একটি হাস্যকর রায়।

 

প্রশ্ন : আমরা কি আমাদের রাজনৈতিক নেতাদের অন্য দেশের নেতাদের চেয়ে বেশি বীরপূজা করি?

 

খুশবন্ত : আমরা সবাই ‘আইকন’ খুঁজি। বীরপূজা করার জন্য ঈশ্বরের মতো অবয়ব খুঁজি। এমনকি আমিও। গান্ধী এমন একটি আইকন যার সামান্য একটু ক্ষতও আমি মেনে নিতে রাজি নই। গান্ধী নিজে যা বলে গেছেন সেই দুর্বলতাগুলো এবং আমাদের চোখে চারিত্রিক যে দুর্বলতা পড়েছে এর সবগুলোর দিনেই আমি চোখ মুদে থাকি। তিনি যেসব পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন বিশেষ করে বিছানায় যুবতী নারী নিয়ে কেন তাকে নগ্ন হয়ে ঘুমোতে হবে। আমি তার সুরাহা করতে পারিনি। তারপরও তিনি আমার কাছে ‘আইকন’ই রয়ে যান, আমি তাকে দেখি খাঁটি মানুষ হিসেবে যা তিনি কখনো ছিলেন না। তিনি নিজের ছেলেদের সাথে যে আচরণ করেছেন-দাম্ভিক ও ক্ষমাহীন-এসব মেনে নেয়া যায় না।

 

প্রশ্ন : ভারতীয়রা কি অন্য দেশীয়দের চেয়ে বেশি ভণ্ড?

 

খুশবন্ত : এটা যে সত্যি সে বিষয়ে আমি সম্পূর্ণ নিশ্চিত। আমরা যতো কথা বলি অন্য দেশের কাউকে এমন বলতে শুনিনি। বিশেষ করে ক্ষমতাসীন ব্যক্তিরা সবচেয়ে বড় মিথ্যাবাদী। ক্ষমতায় ঝুলে থাকার জন্য তারা তাদের নীতিজ্ঞান ও বন্ধুবান্ধব বিসর্জন দিতে রাজি।

 

প্রশ্ন : লেখাকে মজার করে তুলতে কখনো কখনো সত্যকে কি কিঞ্চিৎ বিকৃত করতে হয়?

 

খুশবন্ত : সত্যকে বিকৃত করার কাজ আমি সচেতনভাবে করিনি কিন্তু সচেতনভাবে নিজেকে উন্মুক্ত করেছি। আমার এই প্রক্রিয়া অবশ্যই কাউকে আঘাত করে থাকবে। আমার যে ক’জন বন্ধু আছে তার মধ্যে কয়েকজনকে হারানোর ঝুঁকি আমি নিয়েছি। আমার সাথে অনেকের যোগাযোগ আছে কিন্তু অনেক বন্ধু নেই। তাদের একজন ইকবাল সিং তার সম্পর্কে যা লিখেছি তাতে ক্ষুব্ধ হয়ে আমাকে লিখলেন, ‘আমি জানতাম না আপনার ভেতর এত বিষ আছে।’ আমি ভেবেছিলাম আমি তার সম্পর্কে যা লিখেছি তা খুব মজার, প্রতিহিংসাপরায়ণ কিছু নয়। এটা একজন বন্ধুকে চুনোপুঁটি বলে ডাকার মতো। আদরটা তো বন্ধুকে বুঝতে হবে।

 

প্রশ্ন : খোলামেলা স্মৃতিকথা কেন প্রকাশিত হয় না?

 

খুশবন্ত : পশ্চিমের দেশগুলোতে কিছু হয়েছে। যেমন আর্থার কোয়েনলোরের দুই বা তিন খণ্ডের স্মৃতিকথা। আমি যতটা করতে পারব তার চেয়েও অনেক সুলিখিত এই স্মৃতিকথা। ভারতের এ ধরনের আত্মকথার কথা আমি চিন্তাই করতে পারি না। অধিকাংশ স্মৃতিকথাতেই আত্মগরিমা প্রকাশ করা হয়ে থাকে।

 

প্রশ্ন : এত বছর পর আপনার ও সাক্ষাতের এত খুঁটিনাটি বিবরণ স্মরণ করেন কেমন করে?

 

খুশবন্ত : আমি বছরের পর বছর ডায়েরি লিখেছি। তবে এই বই লেখার সময় সেসব ঘাঁটতে হয়নি। আমার সাথে রয়েছে তুলনামূলক সতেজ অনেক স্মৃতি। আমি যখনই কারো কথা মনে করি তার মুদ্রাদোষ ও আচরণের বিভিন্ন দিক আমার সামনে ভেসে ওঠে। হাস্যকর মানুষ সব সময়ই আমাকে আকৃষ্ট করতে পেরেছে। তাদের স্মৃতি চিরদিনই থেকে যায়। এটা একধরনের বাছাই করা স্মৃতিচিত্র- সে কারণেই অনেক নোংরা মানুষ স্মৃতিতে রয়ে যায় কিন্তু ভালো মানুষের স্মৃতি মুছে যায়। কিছু মানুষ ও কিছু ঘটনা চিরদিনের। যেমন জ্ঞানী জৈল সিং একবার আমাকে রাষ্ট্রপতি ভবনে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। তিনি সাদামাটা পোশাকে, মাথায় হলুদ পট্টি বাঁধা। আমাকে তার বেডরুমে নিয়ে ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে দিলেন। তারপর তার খাটের তলা থেকে আমার জন্য বের করে আনলেন এক বোতল স্কচ ও সোডা। যে প্রেসিডেন্ট তার চারপেয়ের তলা থেকে আপনার জন্য সোডা বের করে আনেন তাকে ভুলবেন কেমন করে? আর এ ধরনের বোতলও আমি অনেক দিন দেখিনি, বোতলের গলায় মার্বেল ঢুকানো।

 

প্রশ্ন : আপনার আত্মজীবনী কি তরুণ প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে?

খুশবন্ত : নিজের গুণগান না করে সৎভাবে লিখতে পারলে তা মানুষ গ্রহণ করে। পাঠকই ঠিক করে থাকেন তারা লেখকের সত্যটা গ্রহণ করবেন, না রাজনীতিবিদের সত্যটা নেবেন।

কমেন্টস