জাদুর বাঁশির সুরে বিমোহিত মন, যেন জীবনের আর্তি

প্রকাশঃ আগস্ট ১৮, ২০১৭

আলতাফ হোসাইন:

বাঁশি। দুই অক্ষরের এই ফুৎকার বাদ্যযন্ত্রটি একই সঙ্গে প্রেম ও প্রলয়, জীবন ও মৃত্যুর প্রতীক। এই শহরে একজন বাঁশিওয়ালা বসবাস করেন, যার বাঁশির শব্দে নর-নারীর হৃদয়ে প্রেম-বিরহের ঝড় উঠে, যার বাঁশি বেজে উঠলে প্রলয় আতঙ্কে সব কিছু ধ্বংস হয়ে যাবে। তারপরও বাঁশি। বাঁশি বড় প্রিয়। রাজা-প্রজা, ধনী-গরিব, চোর-সাধু এক কথায় সবার প্রিয় বাঁশি। সেই কবে কোন ইতিহাস অন্ধকার যুগে প্রথম বাঁশি বেজেছিল, তারপর মহাকালের পথ ধরে কত জানা-অজানা, শ্যাম-নীরুর হাত পেরিয়ে সে বাঁশি আজও বেজে চলছে প্রসাদে, জীর্ণ কুটিরে, রাজপথ, মেঠোপথে, সুরের জলসায়, মাঠে-ঘাটে, মানুষের জন্ম-মৃত্যু-বিবাহে, মেলা-পালা-পার্বণে।

বাঁশির প্রতি আমার এ দুর্বলতা ছিল না এক সময়। এইতো কিছু দিন আগে গিয়েছিলাম বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের একটি অনুষ্ঠানে। সেখানে অতিথি হিসেবে ছিলেন বিশিষ্ট লেখক ও ইতিহাসবিদ অধ্যাপক ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন, কবি হেলাল হাফিজসহ বেশ কয়েকজন শিল্পী, কবি ও সাংবাদিক।আমি সেখানে ক্ষুদ্র এক সাংবাদিক হিসেবে গিয়েছিলাম সংবাদ সংগ্রহের জন্য।দর্শক সারিতে বসে অনুষ্ঠান উপভোগ করছি। অনুষ্ঠানের নাম ছিলো “অধিবর্ষ সন্ধা”।তবে আমার কাছে সেই সন্ধ্যাটি ছিলো এক আশ্চর্য স্মরণীয় সন্ধ্যা।অনুষ্ঠানের ফাঁকে ঘোষণা হলো গান আর বাঁশি নিয়ে আসছেন শিল্পী মিলন।মিলন ভাইয়ের গান আমার মতো অনেকেই শুনে থাকবেন, কিন্তু সেই সন্ধ্যায় তাঁর জাদুর বাঁশিতে আমি সত্যিই বিমোহিত হয়েছিলাম।সত্য বলতে আমি জানতাম না তিনি এতো সুন্দর বাঁশি বাজাতে পারেন।গানের তালে তালে শিল্পী নিজেই যখন পাগল করা বাঁশির সুর তুললেন তখন শুধু আমি নই সবাই মুগ্ধ হয়েছিলেন নিঃসন্দেহে, কিন্তু আমি হারিয়ে গিয়েছিলাম অজানায়। মোটেই বাড়িয়ে বলছি না! সত্যিই আমি হারিয়ে গিয়েছিলাম ভালবাসার সাগরে। সেদিন থেকে আমি বাঁশি প্রেমিক। নিজে পারি না বাঁশি বাজাতে।নানা সীমাবদ্ধতায় সেটা হয়তো সম্ভবও না, তবে সেদিন থেকে বাঁশির প্রতি আমার যে ভালবাসা সৃষ্টি হয়েছে তা আজীবন মনে থাকবে।(সেদিনের মিলনের বাঁশির সুরের একটি ভিডিও লিংক লেখাটির শেষে দেওয়া হলো) তার আগে বাঁশি সম্পর্কে আমি যতোটুকু অধ্যয়ন করেছি তার কিছু আপনাদের সাথে শেয়ার করছি।

বাঁশি প্রসঙ্গ এলেই আমার মনের পর্দায় ভেসে উঠে একটি নাম। হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা। তাঁর বাঁশির সুর-মাধুর্য এত আকর্ষণীয় এবং চিত্তাকর্ষক ছিলো যে, ঘরের চারদেয়ালে বন্দি মুগ্ধ শ্রোতাকে ঘরে আটকে রাখতে পারতো না। হ্যামিলনের পুরো শহরে ইঁদুরের বাড়-বাড়ন্ত আর অত্যাচার এতই বেড়ে গিয়েছিল যে, শেষ পর্যন্ত এই মূষিকুলকে ঝাড়ে বংশে নির্মূল করার জন্য মেয়র পুরস্কার ঘোষণা করেন। বিচিত্র পোশাক পরিহিত বংশীবাদক তার বাঁশি নিয়ে হাজির হয়েছিলেন শহরের মেয়রের কাছে। মেয়র পারিশ্রমিক দেয়ার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করায় বংশীবাদক রাস্তায় এসে তার বাঁশিতে অপূর্ব মোহনীয় সুর বাঁজালো। যেখানে যত ইঁদুর ছিল, সব দলে দলে রাস্তায় নেমে এসেছিল এবং হ্যামেলিনের বংশীবাদক তাদের নদীতে ফেলে মেরে ছিল। হ্যামেলিনবাসী স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিল; কিন্তু সেই নিঃশ্বাস বেশিদিন স্থায়ী হতে দেননি মেয়র। কারণ, উপযুক্ত পারিশ্রমিক সে বংশিবাদককে দিতে অস্বীকার করলো। ক্ষুব্ধ বংশীবাদক আবার বাঁশিতে সুর তুলল। তার বাঁশির সুর এতই পাগল করা ছিল যে, শেষ পর্যন্ত শহরের ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা বংশীবাদকের পিছু পিছু ছুটতে লাগল এবং নদীর জলে ইঁদুরের মতো তাদের সলিল সমাধি হলো।

বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম অগ্নিবীণা কাব্যের উৎসর্গ পত্রে লিখেছিলেন- ‘সর্বনাশা বাঁশির’ কথা। তিনি লিখেছিলেন- ‘দুর্বাসা হে! রুদ্র তড়িৎ হানছিলে বৈশাখে/ হঠাৎ সে কার শুনলে বেণু কদম্বের ঐ শাকে/ বজ্রে তোর বাজল বাশী।নজরুলের জীবনে বাঁশি কখনো এসেছে প্রেমের, আবার কখনো সংগ্রামের প্রতীক হিসেবে। তাই তো তিনি ব্যক্তিগত জীবনে বাঁশি বাজাতে ভালোবাসতেন। মোহন বাঁশি দিয়ে খেলা করতে গিয়ে তিনি স্বাদ গ্রহণ করেছেন ঝড়ের বাঁশি, সর্বনাশা বাঁশি, মধুর বাঁশির সাধ; কিন্তু বিষের বাঁশি তাকে আর বেঁচে থাকতে দেয়নি।

সৃষ্টির উৎস থেকে বাঁশি কান্নার কথা, বিরহের কথা বলে। বাঁশির সুর দিয়ে বেদনা এবং চেতনাকে একই ক্ষেত্রে গ্রন্থিত করা যায়। বাঁশির সুরের সঙ্গে বেদনার উপলব্ধি এবং চেতনার বহিঃপ্রকাশ দুয়ের কোনো তফাত নেই। বাঁশির সুর রূঢ় বাস্তবকে ভুলিয়ে দিতে পারে এবং এক স্বপ্নময়, ছায়াময়, মোহময় জগতে উত্তরণ ঘটাতে পারে। বাঁশির কান আছে, বুকের ভেতরের যে কথাটি অন্য কাউকে বলা যায় না তা বাঁশিকে বলা যায়, অর্থাৎ বাঁশির সুরে সেই না বলা কথা ফুটে ওঠে। এভাবে একটি ভাবনা থেকে আরেকটি ভাবনার সৃষ্টি হয়। মনে হয় বাঁশি নারীর প্রতিচ্ছবি হয়ে চোখের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু আমাদের লোকজীবন এখন যন্ত্রদানবের চাকায় পিষ্ট, যমুনার ঘোলা বালিতে হারিয়েছে অঙ্গ-সৌরভ। প্রকৃতি আর ভয়ঙ্কর মারণাস্ত্রের অবিশ্বাস্য বিস্তারের ফলে বাঁশির সুমধুর ধ্বনি শোনার আর অবকাশ নেই। এ অবস্থায় কোনো বিরহী প্রেমিকের বাঁশির সুর নিঃসঙ্গ, যন্ত্রণাদগ্ধ কোনো প্রেমিকার মনের দুয়ারে না হোক কানের দুয়ারে প্রবেশ করবে না। তারপরও বলতে হয়, বাঁশির ভালোবসার প্রতীক, জীবনের আর্তি। পৃথিবীর সব জরাজীর্ণকে পেছনে ফেলে গাঁ গ্রামে, শহরে-বন্দরে, পথে-ঘাটে বেজে উঠুক বাঁশির সুমধুর সুর।

মিলনের বাঁশির সুরের দুটি ইউটিউব লিংক:

কমেন্টস