জাদুকরী শিল্পীসত্ত্বা ‘সিকদার আবুল বাশার’

প্রকাশঃ জুলাই ২৮, ২০১৭

মো. সোহেল রানা-

সিকদার আবুল বাশার বর্তমান বাংলাদেশের শিল্প-সাহিত্য জগতে এক আলোচিত নাম। কেবল প্রকাশক হিসেবেই নন, লেখক, গবেষক-প্রচ্ছদশিল্পী হিসেবেও সারাদেশে সমাদৃত। সুগভীর সমাজ-চেতনা, সুন্দরের আরাধনা। যে মেধা ও গভীর দক্ষতায় তিনি সৃজনশীল গ্রন্থ, প্রচ্ছদ ও পাঠক সৃষ্টি করে যাচ্ছেন, তার নিবিড় অনুষঙ্গ পেতে হলে আমাদের সেই ‘গতিধারা’র ‘সিকদার-তীর্থে’ যেতে হবে। দয়া নয়, বিদ্যা নয়, তাঁর চরিত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো তাঁর অজেয় পৌরুষ- অক্ষয় মনুষ্যত্ব।

তিনি পাঠকের কাছে ভক্তি-ভাব-জীবন সাধনার, এককথায় বইমনস্ক মানুষের হৃদয়ের মূর্ত প্রতীক। তিনি ছাপার অক্ষরে বাংলাদেশের ইতিহাসকে শ্যামল, সরস করে তুলেছেন, তিনি বহু মতের বহু পথের সমন্বয় সাধন করে প্রকাশনা জগতকে প্রসারিত করে যাচ্ছেন।

ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় সারাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস প্রকাশের উদ্যোগ নিয়ে তিনি মানব হৃদয়ের সুখ-দুঃখ ও আনন্দ-বেদনার পালা রচনা কওে চলেছেন। তাঁর প্রকাশনা জগতে ব্যথাহত পাবে ব্যথা বিজয়ের প্রেরণা, গবেষক পাবেন প্রকৃত সত্যের সন্ধান, রাজনীতিক পাবেন নির্ভুল পথের নির্দেশ, মৃত্যুপথযাত্রী পাবেন মৃত্যুঞ্জয়ী সান্ত্বনা। ‘গতিধারা’ তাই আজ একটি ‘কল্পতরু’। তিনি অক্লান্ত সাধনায় গড়ে তুলেছেন তাঁর আকাক্সক্ষার ‘গতিধারা’, প্রকাশ করে চলেছেন অনবদ্য সৃষ্টিকর্ম। প্রতিনিয়ত নানা সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ঘটনাবর্ত তাঁর জীবনের উপকূলে প্রতিহত হয়ে সৃষ্টি করছে নতুন নতুন স্বপ্ন। বাইরের ও ভেতরের সৃষ্টিকর্ম তাঁর সেই স্বপ্ন ভাব-স্পন্দনের স্পর্শে অপরূপ ও অনির্বচনীয় হিসেবে আলোর আভার মতো দ্যুতি ছড়াচ্ছে। তাইতো প্রকাশনা জগতে তিনি একজন ‘কৃতি বইশিল্পী।’

সিকদার আবুল বাশারকে আমি কাছ থেকে যতটুকু জেনেছি, সৃজনশীল প্রকাশক-গবেষক-প্রচ্ছদশিল্পী হিসেবে সমাজের অনতিক্রম্য অস্তিত্বকে তিনি অস্বীকার করতে পারেননি। সমাজ মানে তো কেবল স্থান, কাল এবং মানুষ নয়, সমাজ মানুষের বিশ্বাস-অবিশ্বাস, আচার-সংস্কার, বিচার-অবিচার, মহত্ত্ব-নীচতা সবকিছুর এক যোগফল। সেখানে যেমন রাজনীতির ঘূর্ণাবর্ত আছে, তেমনি আছে অর্থনীতির ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া, সেখানে যেমন দুর্বলের ওপর প্রবলের অত্যাচার আছে, তেমনি আছে মানুষের উদার মানবিকতা। তিনি সমাজের সেই বৈচিত্র্য থেকে আহোরণ করেছেন তাঁর সৃষ্টির উপকরণ। দেশের বিস্তীর্ণ প্রান্তর থেকে খড়কুটো (প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আঞ্চলিক ইতিহাস ও লোকজ সংস্কৃতি) সংগ্রহ করে তিনি গড়ে তোরেন তাঁর সৃষ্টির ঘর। তিনি একাধারে নান্দনিক প্রকাশক হিসেবে দ্রষ্টা এবং বিজ্ঞানমনস্ক শিশুসাহিত্যিক হিসেবে একজন স্রষ্টাও।

সমাজের ঘটনাপুঞ্জ, বস্তুসম্ভার এবং বহুবিচিত্র মানব-জীবনকে তিনি প্রত্যক্ষ করেন। তাঁর অনুসন্ধিৎসু ‘তৃতীয় নয়ণ’ আমাদেরকে মুগ্ধ করে। সেই ‘তৃতীয় নয়ণে’র দ্বারা তিনি জীবন-প্রবাহের ভাবরূপ বা ভাবসত্যকে আবিষ্কার করেন এবং তাকে তাঁর সৃষ্টিশীল জীবন্ত ভাষা-শৈলীর সাহায্যে রূপদান করেন। তাই তিনি সাধারণের মধ্যে অনন্য সাধারণ, কোটর মধ্যে একক- স্বতন্ত্র।

কর্মযজ্ঞের বিশালত্বের আঙ্গিনায় সিকদার আবুল বাশার নিজেকে মেলে ধরার জন্য উন্মুখ। তাই তিনি অসাধারণ অনুভব ক্ষমতা ও উপলদ্ধি শক্তির অধিকারী। ফলে তাঁর অনিবার্য প্রভাব দেশের মানুষের বহির্জীবন ও অন্তর্জীবন- উভয়ক্ষেত্রেই সঞ্চারিত হয়। তাঁর চেতনালোকে পান্না হয় সবুজ, গোলাপ হয় সুন্দর। তিনি এক আশ্চর্য জাদুকরী শিল্পীসত্ত্বা। তিনি তাতে ডুব দেন, ঘট ভরেন এবং সংগৃহীত উপাদানে গড়ে তোলেন সৃষ্টির অভিনব শস্য। অভিজ্ঞতা ও সৃষ্টিশীল দৃষ্টিভঙ্গি তাঁর অন্তরের অন্তস্থলে সঞ্চিত হয়ে প্রকাশের মহাবেদনায় ব্যাকুল হয়ে ওঠে। এভাবেই অপরূপ শিল্পকর্ম নির্মাণের প্রাণপুরুষ হিসেবে তিনি বাংলাদেশের লেখক, পাঠক ও সাধারণ মানুষের হৃদয়ে এবং প্রকাশনা জগতে একজন প্রথিতযশা ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছেন।

লেখক: গবেষক, বাংলা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
প্রভাষক-বাংলা, লাহিড়ী ডিগ্রি কলেজ, বালিয়াডাঙ্গী, ঠাকুরগাঁও

কমেন্টস