সঞ্চিতার চোখে মোশরেফাকে দেখা

প্রকাশঃ এপ্রিল ১০, ২০১৭

সঞ্চিতা দাস ও মোশরেফা খন্দকার

ফারুক আহমাদ আরিফ-

শিল্পের জন্যে নিত্য নতুন চিন্তায় আমাদের ডুবতে হয়। কখনো নিজে ডুবি, আবার কখনো কখনো আমাদের ডুবানো হয়। ২০১৬ সালের ১৪ এপ্রিল ছিল ১৪২৩ বঙ্গাব্দের পহেলা বৈশাখ। পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠান পালনের জন্যে দায়িত্ব দেওয়া হয় স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের জার্নালিজম, কমিউনিকেশন অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগের লেকচারার আফরোজা সোমা ম্যামকে।

কিন্তু ম্যামের চিন্তা হলো আমাকে দিয়ে প্রেমের কবিতা আবৃত্তি করাবেন। কবিতা আমার সবচেয়ে প্রিয়বিষয় হলেও প্রেমের কবিতা কখনো আবৃত্তি করিনি। সেই ছোটকাল থেকেই বিদ্রোহের কবিতায় আমার পছন্দের জিনিস। এর বিপরীত কাজ কখনো আমার দ্বারা হয়নি। কিন্তু বন্ধু মোশরেফা খন্দকারের সাথে প্রেমের কবিতা আমাকে আবৃত্তি করতেই হবে এটি ম্যামের নির্দেশ। আমি বিষয়টি সম্পূর্ণ এড়িয়ে যেতে শত বাহানা ধরলেও ম্যাম নাছোড়বান্দা আমাকে দিয়ে তিনি প্রেমের কবিতা আবৃত্তি করাবেনই। অগত্যা যখন পালানোর কোন পথ পেলাম না তখন রাজী হলাম ম্যামের সেই প্রস্তাবে। আমি কখনো প্রেমের কবিতায় দুর্বল ছিলাম না। কোন মঞ্চে এ নিয়ে হাজিরও হয়নি। বেশিরভাগ আবৃত্তি হতো একক। তবে কখনো মেয়েদের সাথে আবৃত্তি করলেও সেগুলো কখনো প্রেমের কবিতা নয়।

13443300_1072469309486442_4433612703346776690_o

অনুষ্ঠান শেষে সোমা ম্যামের সাথে

আজ ম্যামের হাতেবন্দি। যেভাবেই হোক তিনি আমাকে দিয়ে কবিতা করাবেই। বললাম ম্যাম ‘নো ভ্যাট অন এডুকেশন’ আন্দোলনে আমার গলার উপর দিয়ে যে ঝড় গেছে এখন আমি কবিতা পড়তে পারি না। আবৃত্তি করতে না পেরে আমার কান্না আসে। আবৃত্তি করতে গেলে গলায় প্রচণ্ড ব্যথা পাই। খুব কষ্ট হয়। চোখে পানি আসে। আমি আবৃত্তি করবো না। ম্যাম শেষ পর্যন্ত বললেন-‘আমি আপনাকে মঞ্চে চাই, আর কিছু বুঝি না’। কবিতা আমার কাছে মায়ের শাড়ীর মতো।

নির্ধারণ হলো পূর্ণেন্দু পত্রীর কথোপকথনের অংশ বিশেষ করবো আমরা। রাগিব আর রাইসা আপুও করবেন অংশ বিশেষ। কিন্তু সমস্যা বাধলো আমাকে নিয়ে। কোন মেয়ের সাথে প্রেমের অভিনয় এ যেন আমাকে চিতায় জীবন্তনিক্ষেপ করে আনন্দে বসে থাকার অভিনয় করানো। ৬ এপ্রিল মোশরেফার সাথে রিহার্সেল করালেন ম্যাম। মোশরেফা খুব ভালো কাজ করছেন কিন্তু আমি ত লাড্ডু। ৭ এপ্রিল ম্যাম আমার আবৃত্তি দেখে দায়িত্ব দিলেন মোশরেফার চোখে টানা ৫ মিনিট তাকিয়ে থাকতে। কিন্তু আমি ত ২ সেকেন্ডও তাকিয়ে থাকতে পারিনি, পারি না। কারণ কখনো মেয়েদের চোখে তাকিয়ে থাকা জীবনেও আমার হয়নি, কখনো চিন্তাও করিনি। পড়লাম মহাবিপদে। ম্যাম বললেন-‘আমি বসে রইলাম আপনারা দুজন দুজনের দিকে টানা ৫ মিনিট তাকিয়ে থাকবেন’। আমি দ্বিতীয় বারও লাড্ডু মারলাম। মোশরেফা বিজয়ী হলো। সে খুব ভালো অভিনয় করছে, আবৃত্তি করছে। চরিত্রের মধ্যে ঢুকে গেছে। আমি বেচেরা বালুচরে ঘুরে বেড়াচ্ছি। বিডিমর্নিং এ কাজ করছি। নিশান ভাই এর কাছে বলে অফিসে কম সময় দিচ্ছি কিন্তু চরিত্রে ঢুকতে পারছি না।

কাজের ফাঁকে, খাবার সময়, হাঁটার সময় এমনকি সব সময় চরিত্র নিয়ে চিন্তা করি, ভাবি। মোশরেফার বন্ধুত্বের হাত আরো প্রসারিত হয়েছে। তার মিষ্টি ব্যবহার, সুন্দর কাজ আমাকে চিন্তারাজ্য বিচরণ করাচ্ছে। সে বিজয়ী আমি মিস্টার ফেলটুস।

ম্যাম বললেন-‘মোশরেফাকে আপনি ভালোবাসেন। এমন একটি চরিত্রই আপনাকে সৃষ্টি করতে হবে। আপনি তাকে যে কোনভাবেই বিজয় করতে চান এটাই আপনার কাম্য এমন অভিনয়ই আপনার কাছে চাই’। কিন্তু আমি বার বারই ফেলটুস ফেলটুস…।

৮ এপ্রিল বিকাল। আনারস কিনে অফিসের দিকে যাচ্ছি। পথে বন্ধু সঞ্চিতা দাসের সাথে দেখা। সঞ্চিতা আমার কণ্ঠশীলনের বন্ধু। ওর নাকের তিলটা আমার খুব পছন্দ। অমায়িক ব্যবহারের মিষ্টি মেয়ে। অনেকদিন পর দেখা।

বললাম, চলুন কোথাও বসি। সেও আমাকে পেয়ে আনন্দিত। গিয়ে বসলাম কালাম বাবুর্চির রেস্টুরেন্টে। কাবাব খেলাম। পরে আনারস। কিন্তু আমার মাথায় খাবারের চেয়ে মোশরেফাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মত চরিত্র ঢুকতে চাই আমি।

13490703_1072463866153653_4272848429730753493_o

মোশরেফার সাথে মঞ্চে

হঠাৎ সঞ্চিতার চোখে আমি মোশরেফাকে চিন্তা করলাম। গভীরভাবে চিন্তা করলাম। হয়তো বিন্দু সেকেন্ড হবে! এমনি সময় সঞ্চিতা বলে উঠলেন কি দেখছেন? বললাম-সঞ্চিতা আপনার চোখে মোশরেফাকে খোঁজছিলাম। সঞ্চিতা আবার জিজ্ঞাসা করলো কে সে? সব খুলে বললাম…। সঞ্চিতা মিষ্টি একটি হাসি দিলেন। সঞ্চিতার চোখে আমি কীভাবে যেন মোশরেফাকে আবিষ্কার করে ফেললাম সেই তাকানোতে। আমার কাছে মনে হচ্ছে আমি যেন মরুভূমিতে ঝরনাধারা সৃষ্টি করে ফুল-ফলের বাগান তৈরি করে ফেললাম। তার সুবাসে চারদিকে মৌমাছিদের মৌ মৌ মিছিল। সঞ্চিতার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে অফিসে এসে কাজে না বসে আবৃত্তিতে লেগে গেলাম।

কি এক স্বর্গীয় আনন্দে বুক ভরে গেল। তারপর ৯ এপ্রিল থেকে আবৃত্তির মোড় ঘুরে গেল। এখন আমি মোশরেফাকে স্মরণ করছি পিপাসিত পথচারীর মত। সমস্ত আবেগ দিয়ে চরিত্রে ঢুকে গেলাম। প্রতিমুহূর্তে তাকে নিজের ভিতরে ভাবতে থাকলাম। এখন অভিনয়ে মোশরেফাকে পিছনে ফেলে এগিয়ে যাচ্ছি। মোশরেফার সেই হাত বাড়ানো সহযোগিতা আমার মনে আত্মবিশ্বাস এনে দেয়। ম্যামও মহাখুশি। কাজের গতি বেড়ে যায়।

১৪ এপ্রিল বৃহস্পতিবার পহেলা বৈশাখে আমাদের আবৃত্তিটি অসাধারণ একটি স্থান অর্জন করে। যদিও ১৩ এপ্রিল আমাদের বঞ্চিত করা হয় ক্যােরিওগ্রাফি দিতে।

এত কষ্ট করলাম অথচ আমাদের চাহিদা ও অধিকার হিসেবে যা দেওয়ার তার কিছুই দেওয়া হলো না।

আমার চোখে কান্নার ভান নেমে আসে। সিদ্ধান্ত নিলাম অনুষ্ঠানে থাকবো না। ম্যাম ও ফরচুন স্যার অনেক বুঝালেন। তাদের বুঝ আমি নিলাম না। সবশেষে ম্যাম আমাকে আর মোশরেফাকে সোহান স্যারের রুমে একা রেখে আমাকে বুঝাতে মোশরেফাকে দায়িত্ব দিয়ে চলে এলেন। মোশরেফাও বুঝাতে থাকলেন, সেই বুঝ আমি নিচ্ছি না। আমার চোখের পানি অবিরল বইছে।

প্রফেসর ড. আশরাফুল ইসলাম স্যার, বন্ধু বাশার, আবিদের সাথে

প্রফেসর ড. আশরাফুল ইসলাম স্যার, বন্ধু বাশার, আবিদের সাথে

মোশরেফার করুণ মিনতি তার দিকে তাকে বাধ্য করলো। মোশরেফার দিকে তাকালাম। তার চোখ যেন কি বলছে? আর সেই তাকানোতে আমার মাঝে মোশরেফার সকল পরিশ্রম ভেসে উঠলো। তাঁর অভিমান, রাগ, অনুরাগ, সহযোগিতা সব আমাকে চারদিক দিয়ে জড়িয়ে ধরছে।

বললাম-আমি থাকবো। মোশরেফার চোখে-মুখে অসাধারণ আনন্দ। পহেলা বৈশাখে আবৃত্তি হলো। সেখানেও অবিচার, অত্যাচার। কিন্তু আমরা ভালো করলাম। ম্যাম অনেক কিছুই বললেন। সোহান স্যার যিনি আমাদের মাঝে মধুর সহযোগিতা করছিলেন তিনিও আনন্দিত। আমি সোমা ম্যাম, সোহান স্যার, বিডিমর্নিং আর মোশরেফা ও সঞ্চিতার প্রতি কৃতজ্ঞ।

আজ আবার ২০১৭ সালে ১৪২৪ বঙ্গাব্দের পহেলা বৈশাখ ১৪ এপ্রিল শুক্রবারে। সোহান স্যার নিজেই এবার কাজ করছেন। প্রত্যেকটি ক্লাবকে দায়িত্ব দিয়েছেন নিজ নিজ পছন্দ মতো কাজ করতে। আমরা আবৃত্তির কাজ হাতে নিয়েছি। তন্দ্রা, সপ্ত দীপা, মাহরীন ও আমি এক অভাগা।

আবার সেই পূর্ণেন্দু পত্রীর কথোপকথেনর অংশবিশেষ। আজও আমি ফেলটুস, তন্দ্রা ভালো করছে। সে অনেকটা চরিত্রে ঢুকে গেছে। আমি আবার সেই মরুভূমিতে পানি খুঁজছি। তন্দ্রাকে আমি অনুভব করতে পারছি না। কোনভাবেই চরিত্রে ঢুকতে পারছি না। এখন তন্দ্রাকে নিয়ে আমার চিন্তারাজ্যে ঘুরে বেড়াতে হচ্ছে, হবে। হৃদয়ে করতে হবে অনুভব। চোখ বন্ধ করেও তাকে হৃদয়ে অনুভব করতে পারি না, পারছি না। আবছা একটি ছবি আসে। ফেসবুকে ছবি দেখলাম কিছুটা অনুভব করা যায় কিনা। দেখলাম সেখানেও ফেল্টুস। কিন্তু চরিত্রে ঢুকতে হলে আমাকে তাকে অনুভব করতে হবে। সজীব স্যারকে জানালাম কবিতা আবৃত্তির জন্যে আমি তন্দ্রাকে অনুভব করতে পারছি না। শুধু শব্দগুলোই মুখস্ত করেছি। অথচ মোশরেফাকে আমি অনুভব করতে পেরেছিলাম। ভিসি ও রেজিস্ট্রার স্যারের ধন্যবাদ পেয়েছিলাম।
স্যার বললেন, ‘একসাথে বসুন, নতুন করে ভাবুন, সময় নিন, সমস্যাগুলো চিহ্নিত করুন। ভালো করবেন এখনো সময় আছে।’ কবিতা শুধু কয়েকটি শব্দের সমষ্টি নয় বরং একটি অনুভবের বিষয়।

আমি সব সময় বিশ্বাস করি ‍‌’শিল্প ও সৃষ্টির জন্যে প্রয়োজন পবিত্র মন আর সুন্দর স্বপ্ন’। আর সেই স্বপ্ন নির্মাণে তন্দ্রাকে বিজয় করতে হবে আমাকে যেমনটা করতে হয়েছিল মোশরেফা খন্দকারকে। এখন চরিত্রের মধ্যে ঢুকতে পারাই প্রধান লক্ষ্য আর শিল্পীর কাজই হচ্ছে শিল্পে ডুবে যাওয়া।

   ৯ এপ্রিল ২০১৭

লালমাটিয়া, মোহাম্মদপুর, ঢাকা।

রাত ১১ টা ৫৫ মিনিট

কমেন্টস