চলুন ঘুরে আসি কুষ্টিয়ার দর্শনীয় স্থানগুলো

প্রকাশঃ ডিসেম্বর ২৪, ২০১৭

অভিজিত কুমার সিংহ।।

কুষ্টিয়া জেলার নাম শুনলেই প্রথমে লালন শাহের মাজার আর বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এর কুঠীবাড়ির কথা মাথায় চলে আসে। লালন শাহ্কে অনেকেই লালন ফকির নামে চিনে থাকেন। লালন শাহ্‌ ছিলেন একাধারে বাউল, কবি, গায়ক, সাধক ও সমাজচিন্তাবিদ।

লালনের মাজার আর লালনের আখড়া এই কুষ্টিয়াতেই অবস্থিত। তার সাথে বিশ্বকবি রবি ঠাকুরের কুঠীবাড়ি এর কুষ্টিয়াতেই অবস্থিত। বিশ্বকবি রবি ঠাকুর নিয়ে বলার কিছু নেই। সবাই তার সম্পর্কে জানেন কম বেশি।

ভারতবর্ষে সেই আমলে তিনিই ছিলেন একমাত্র নোবেল পুরষ্কার বিজয়ী ছিলেন। তিনি নোবেল পুরষ্কার পান ১৯১৩ সালে। এই দুইজন সম্মানী মানুষের অনেক স্মৃতি আছে এই কুষ্টিয়াতে। ঘুরতে গেলেই এইসব জায়গা চোখে পড়বে।

ঢাকা থেকে যেভাবে যাবেনঃ

ঢাকা থেকে কুষ্টিয়া যাওয়ার জন্য যে কেও কল্যাণপুর বাস কাউন্টারে গেলেই টিকেট পেয়ে যাবেন। নরমাল টিকেট এর দাম পড়বে ৪৫০ টাকা আর আরামে যেতে চাইলে এসিতে পড়বে ১০০০ টাকা। টাকা বাঁচাতে চাইলে নরমালএ যাওয়ার পরামর্শ দিবো আমি। ছুটির দিনগুলোতে ভিড় বেশি থাকে, তাই আগে থেকে টিকেট কেটে রাখলে বুদ্ধিমানের পরিচয় দিবেন। ঢাকা থেকে কুষ্টিয়া যেতে সময় লাগে ৬-৭ ঘণ্টা। কিন্তু আপনার কপালে যদি শনি থাকে, তাহলে আপনার আরো সময় লাগতে পারে। তাই রাতের বেলা যাওয়া তা বুদ্ধিমানের কাজ হবে। যতই দেরি হোক, সকালেই পৌছাবেন।

সকালে পৌঁছানোর পর আসে-পাশেই হোটেল পেয়ে যাবেন। বাসস্ট্যান্ডের পাশে কমদামি হোটেল প্রায় সবগুলাই। যদি ভালো হোটেল এ থাকতে চান তাহলে কয়েকটা নামকরা হোটেল আছে সেগুলাতে থাকতে পারবেন। হোটেল এর জন্য ৪০০-৮০০০ টাকা বাজেট রাখলে হবে। কুষ্টিয়া শহরেই ইলেক্ট্রিসিটির ভালোই প্রবলেম আছে। তাই মোবাইল ফোন, ক্যামেরা, ল্যাপটপ, যা যা দরকার সবই চার্জ দিয়ে দিবেন ইলেক্ট্রিসিটি থাকার সময়।

লালনের মাজারঃ

লালনের মাজারে যাওয়া সবচেয়ে সহজ হোটেল থেকে। দুই ভাবে হোটেল থেকে লালন এর মাজারে যাওয়া যায়। টমটমে করে মাজারে চলে যাওয়া। আর টমটমে প্রতিজনে ভাড়া নিবে ১০ টাকা। অন্যদিকে, রিক্সাতে করে সরাসরি মাজারে চলে যাওয়া আর রিক্সাতে ভাড়া নিবে ৩৫-৪০ টাকা। ভাড়া নিয়ে অবশ্যই দামাদামি করে নিবেন। যদিও বাঙালিদের এসব নিয়ে নতুন করে বলার কিছুনেই। লালনের মাজারের ভিতরে ঢুকে দেখবেন অনেক কবর সারিসারি করে দাফন করা। কবরের পাশে লেখা আছে কে কি ছিলেন। এখানে কবরের অধিকাংশই লালন ফকিরের আপনজন। এদের মধ্যে অনেকে লালনের গানের লেখক, গীতিকার, তাদের অর্ধাঙ্গিনী। লালনের মাজারের উপরে দেখবেন একটা বিরাট সাদা গম্বুজ। মাজারের পাশেই একটা ছোট জাদুঘর আছে, যার প্রবেশ মুল্য ৫ টাকা। ভিতরে অনেক কিছু না থাকলেও কয়েকটা দেখার মতো জিনিস আছে। লালনের মাজার থেকে বের হওয়ার পর একটু সামনেই আছে আখড়া। এখানে সন্ধ্যায় লালন গীতির চর্চা করা হয়। তাছাড়া লালনের বাজারের সামনে কয়েকটা পর্যটক আকর্ষণী দোকানপাট আছে,  চাইলে ওখান থেকেও ঢুঁ মেরে আসা যায়। সব ঘুরে দেখা হয়ে গেলে আর কেনাকাটা হয়ে গেলে, যেভাবে হোটেল থেকে আসা হয়েছিলো, ঠিক সেভাবে ফেরত চলে যাওয়া যাবে হোটেলে।

বিশ্বকবি রবি ঠাকুরের কুঠীবাড়ীঃ

লালন শাহের মাজারে যাওয়া অপেক্ষা কুঠীবাড়ী যাওয়াটা একটু জটিল। হোটেল থেকে নেমে রিক্সা নিয়ে চলে যেতে হবে ঘোড়ারঘাট এ আর রিক্সা ভাড়া নিবে ২৫ টাকা। সেখানেই গড়াই নদী। বর্ষাকালে নৌকা দিয়ে পার হতে হয়, সেক্ষেত্রে ভাড়া নিবে প্রতিজনে ১০ টাকা। আর শীতকালে পানি কম থাকে, হেটে হেটে পার হওয়া যাবে। সেক্ষেত্রে ভাড়া নিবে প্রতিজনে ৩ টাকা। গড়াই নদীর বর্ষাকালের রুপ আর শীতকালের রুপ আলাদা, কিন্তু তাদের নিজনিজ সৌন্দর্য আছে। গড়াই নদী পার হয়ে সিএনজি পাওয়া যাবে। মানুষ বেশি থাকলে রিজার্ভ নেয়া যায়, কম থাকলে লোকাল ভাবেও যাওয়া যায়। লোকালভাবে গেলে প্রতিজনে ৩০ টাকা আর রিজার্ভ নিলে ১৫০-২০০ টাকা নিতে পারে।

মানুষ কম থাকলে লোকাল ভাবে যাওয়া ভালো। সিএনজি থেকে নেমে একটু হেটে গেলেই কুঠীবাড়ী ঢুকার দরজা চোখে পড়বে। ঢুকতে হলে প্রতিজনে ২০ টাকা টিকেট কেটে ঢুকতে হবে। একটা জিনিস খেয়াল রাখতে হবে যে দুপুর ১২ টা থেকে ১.৩০ পর্যন্ত লাঞ্চ টাইম থাকে। সে সময় গেইট বন্ধ থাকে। যদিও গেইট বন্ধ থাকলে, আশেপাশের পরিবেশ খুবই সুন্দর। পাশেই আছে একটা পুকুর, যার মধ্যে আছে বসার জায়গা আর দুইটা ঘাট। সেখানে কয়েকজন গায়ক বসে থাকেন, তাদের রিকুয়েস্ট করলে তারা গান গেয়ে শুনান, যদিও তারা কিছু সম্মানী চায় সেখান থেকে। এরপর কুঠীবাড়ি এর ভিতরে ঢুকে কবির ব্যবহার্য খাট, টেবল, সিন্দুক আর হাতের লেখা অনেক কবিতা, গান, পত্র আর সেই সাথে কবির নিজের হাতের চিত্রকল্প দেখতে পাওয়া যাবে। সব শেষ করে হোটেলে ফেরত আসা যাবে ঠিক যেভাবে কুঠিবাড়ি যাওয়া হয়েছিলো সেভাবে।

কুষ্টিয়া বিখ্যাত কিছু জিনিসঃ কুষ্টিয়াতে বিখ্যাত বলতে তিলের খাজা আর কুমারখালির গামছা, চাদর, লুঙ্গি আছে। কুমারখালি হচ্ছে রবি ঠাকুরের কুঠীবাড়ি যেখানে অবস্থিত সেখানেই। যে কাওকে দেখিয়ে দিলেই আপনাকে যেখানে গামছা, চাদর, লুঙ্গি বানানো হয় ওখানে নিয়ে যাবে। অন্যদিকে তিলের খাজা কুষ্টিয়াতে সব জাইগায় পাবেন। তেমন কস্ট করে খুজতে হবে না।

সত্যি বলতে কুষ্টিয়া ঘুরতে আপনার একদিন সময় লাগবে হাতে অনেক সময় নিয়ে ঘুরার পর। সকালের দিকে ঘুরতে যাবেন রবি ঠাকুরের কুঠিবাড়ি আর সেখানে ২-৩ টা পর্যন্ত থেকে চলে আসবেন লালনের মাজারে। লালনের মাজারে আর আখড়াতে তার ৭-৮ টা পর্যন্ত থেকে আপনি রাতের ১০-১০.৩০ এর বাস ধরে ছলে আসতে পারেন ঢাকা। লেখা শেষ করার আগে একটা কথা বলতে চায় যে, কোথাও ঘুরতে গেলে যাতে জায়গাগুলো অপরিষ্কার করে না আসা হয়।

কমেন্টস