Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ১৯ বুধবার, সেপ্টেম্বার ২০১৮ | ৩ আশ্বিন ১৪২৫ | ঢাকা, ২৫ °সে

যান্ত্রিক জীবনের অবসাদ ধুয়ে আসুন খৈয়াছড়া ঝর্ণায়

বিডিমর্নিং ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৫ ডিসেম্বর ২০১৭, ০৬:৪২ PM আপডেট: ১৫ ডিসেম্বর ২০১৭, ০৬:৪২ PM

bdmorning Image Preview


ইমাম হোসেন, মীরসরাই প্রতিনিধিঃ

প্রকৃতির অপূর্ব এক সৃষ্টি মীরসরাইয়ের খৈয়াছরা, নাপিত্তা ছরা, মহামায়া, বাওয়াছরা ও বড়কমলদহছরা জলপ্রপাত। খৈয়াছরা ঝর্ণায় টলমলে স্বচ্ছ পানির ধারা গড়িয়ে পড়ছে শক্ত পাথরের মতো পাহাড়ের শরীর লেপটে। নির্জন, শান্ত পাহাড়ের প্রায় আট’ ধাপ পেরিয়ে আছড়ে পড়া স্রোত ধারার কলকল শব্দে বয়ে যাচ্ছে সমতলে। নাম না জানা লতাপাতা-গুল্ম, বাঁশবন, বুনোফুল ও ফলের গাছ আগলে রেখেছে পরম মমতায় সৃষ্টির এই ঝর্ণাটিকে। যে বুনো ঝর্ণার অপরূপ সৌন্দর্য থেকে চোখ ফেরানো যায় না সহজে।

সৃষ্টির সৌন্দর্য্য আর প্রকৃতির মাধুর্য্য- এই দুই মিলে যখন তৈরি হয় এক অপরূপ মিশ্রণ, তখন তার দর্শনে বেঁচে থাকার ইচ্ছে হয়ে ওঠে আরেকটু প্রবল। প্রকৃতির পাহাড়ের বুক চিড়ে বয়ে চলেছে ঝর্ণা। দূর থেকে বাংলার প্রতি প্রান্তঘেরা সবুজ-শ্যামল মিলন যেন প্রকৃতির রূপের এক বিশাল ক্যানভাস। উঁচু নিচু অসংখ্য পাহাড় আর পাহাড়ের গায়ে নাম না জানা নানা রকম গাছের সবুজ পাহাড়কে মনে হয় যেন এক সবুজের অভয়ারণ্য। আর এই সবুজ পাহাড়ের বুক চিড়ে কল কল ধ্বনিতে নেমে আসছে বুনো ঝর্ণা খৈয়াছরা।

মীরসরাইয়ের ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে বড়তাকিয়া এলাকার খৈয়াছরা উচ্চ বিদ্যালয়ের উল্টো দিকের মূল রাস্তা থেকে পিচঢালা পথ চলে গেছে রেললাইন পর্যন্ত। সেখান থেকে মেঠোপথ আর খেতের আইলের শুরু। তারপর চলতে চলতে হঠাৎ করেই যেন মাটি সরে গিয়ে উদয় হবে একটা ঝিরিপথের। টলটলে শান্ত পানির চুপচাপ বয়ে চলার ধরণই বলে দিবে এর উৎস অবশ্যই বিশাল কিছু থেকে।

স্থানীয় লোকদের খেতের আইলের পাশে বেড়ে উঠেছে আম, নারকেল আর পেঁপের বাগান। এরপরে শুধু ঝিরিপথ ধরে এগিয়ে যাওয়া। কিছুক্ষণের মধ্যেই পর্যটকরা আবিষ্কার করবেন লাল আর নীল রঙের ফড়িংয়ের মিছিল। যতদূর পর্যন্ত ঝিরিপথ গেছে ততদূর পর্যন্ত তাদের মনমাতানো গুঞ্জন শোনা যায়। হাঁটতে হাঁটতেই শুনতে পাওয়া যায় পানি পড়ার শব্দ। চারপাশে মন ভালো করে দেওয়া সবুজ দোল খাচ্ছে ফড়িংয়ের পাখায়। মাঝে মাঝে এখানে হরিণের ডাক শুনা যায়।

কিছুদূর হেঁটে একটা মোড় ঘুরলেই চোখের সামনে নিজের বিশালতা নিয়ে হাজির হবে খৈয়াছরা ঝর্ণা। অনেক ওপর থেকে একটানা পানি পড়ছে। সৌন্দর্যের শুরু এখান থেকেই, পর্যটকরা এখান পর্যন্ত এসেই চলে যায়, ওপরের দিকে আর যায় না। এই ঝর্ণার ওপরে আছে আরও আটটা ধাপ।

এখানকার নয়টা ধাপের প্রতিটিতেই রয়েছে প্রশস্ত জায়গা; যেখানে তাঁবু টানিয়ে আরাম করে পূর্ণিমা রাত পার করে দেওয়া যায়। একটু চুপচাপ থাকলেই বানর আর হরিণের দেখা পাওয়া যায়। অদ্ভুত সুন্দর এই সবুজের বনে একজনই সারাক্ষণ কথা বলে বেড়ায়, বয়ে যাওয়া পানির রিমঝিম ঝর্ণার সেই কথা শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়া যায় নিশ্চিন্তে।

পাহাড়ের সবুজ রং আর ঝর্নার স্বচ্ছ জল মিশে মিশে একাকার হয়েছে মীরসরাইয়ের প্রাকৃতিক জলপ্রপাত খৈয়াছরা ঝর্ণায়। প্রকৃতির নান্দনিক তুলিতে আঁকা এ ছবি দেখে মুগ্ধ হচ্ছে দেশের ভ্রমন পিয়াসী মানুষ। যারা একবার খৈয়াছরা ঝর্ণা দেখেছেন তাদের মনে একটিই প্রশ্ন উঁকি দেয় বার বার ‘দেশে এমন সৌন্দর্যের ঝর্ণা দ্বিতীয়টি আর আছে কিনা’। এমনই এক নান্দনিক ঝর্ণা পর্যটকদের আকর্ষন করছে যা খৈয়াছরা ঝর্ণা নামেই পরিচিত।

খৈয়াছরা এলাকার পাহাড়ে অবস্থান বলে এর নামকরণ করা হয়েছে খৈয়াছরা ঝর্ণা। আর এই ঝর্ণা দেখতে এসে বিমুগ্ধ হচ্ছে দেশ বিদেশের পর্যটকরা। যাতে সত্যিই হতবাক হচ্ছে না কেউ এখন। কারণ ঝর্ণার পাশে গেলে দর্শনার্থীরা অবাক হচ্ছে এজন্য যে, এখানকার পাহাড়ী অরণ্যে এতোকাল লুকিয়ে ছিল এমন নান্দনিক অপরুপ সুন্দর ঝর্ণা। দেশের ভ্রমন পিপাসুদের মধ্যে তাই এই খৈয়াছরা ঝর্ণা এক নামেই পরিচিত।

এখানে আসা অনেক পর্যটকের মতে, ‘দেশের মাধবকুন্ড ও শুভলং ঝর্ণার থেকেও বেশি রূপ এটির।’ তাদের কথায়, ‘শুধুমাত্র সরকারের অবহেলায় এটি সর্বত্র অপ্রকাশিত রয়ে গেছে।’ চট্টগ্রাম জেলার মীরসরাই উপজেলার খৈয়াছরা ইউনিয়নের বড়তাকিয়া বাজারের উত্তর পার্শ্বে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ৪.২ কিলোমিটার পূর্বে ঝর্ণার অবস্থান। এর মধ্যে ১ কিলোমিটার পথ গাড়ীতে যাওয়ার পর বাকী পথ যেতে হবে পায়ে হেঁটে। বাঁশের সাঁকো, আঁকা-বাঁকা পাহাড়ী পথ, ছরা এবং ৪টি সু-পাহাড় পেরিয়ে যেতে হবে প্রকৃতির এই বিস্ময় সান্নিধ্যে।

খৈয়াছরা ঝর্ণা ছাড়াও নাপিত্তা ছরা, মহামায়া, বাওয়াছরা, বড়কমলদহছরা ঝর্ণা দেখতে ভীড় জমায় পর্যটকরা। তাদের অনেকেই এসেছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঝর্ণার অপরূপ দৃশ্যের ছবি দেখে। কুমিল্লা মামুন আব্দুল্লাহ, ফেনী আহমেদ সাহেদ, ঢাকার আনোয়ার, ফেসবুকে খৈয়াছরা ঝর্ণাসহ অন্যান্য ঝর্ণার ছবিদেখে মুগ্ধ হয়েছেন। তাই সবাই মিলে এসেছেন এখানে। মামুন আবদুল্লাহ বলেন, ‘দেশের বিখ্যাত অনেক প্রাকৃতিক ঝর্ণা আমি দেখেছি। খৈয়াছরা ঝর্ণার যে সৌন্দর্য তা দেশে দ্বিতীয়টি আর আছে কিনা আমার জানা নেই।’

প্রকৃতি এখানে খেলা করে আপন মনে; গহীন বনে ছলাৎ-ছলাৎ শব্দে বয়ে চলা ঝর্ণাধারা এখানে ছুটেই চলছে অবিরত। এখানে গা ভিজিয়ে মানুষ যান্ত্রিক জীবনের অবসাদ ধূয়ে যেন সজীব করে নিজেদের। পাহাড়ি এই ঝর্ণাগুলো ভ্রমণ পিপাসু পর্যটকদের হাতছানি দিয়ে কাছে ডাকছে প্রতিদিন।

Bootstrap Image Preview