সাগরের পানির কি সুন্দর রঙ!

প্রকাশঃ ফেব্রুয়ারি ৯, ২০১৭

নাফিয়া হাসেন রিতি-

থাইল্যান্ড প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি। সৃষ্টির সেরা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে উপভোগ করতে থাইল্যান্ডের জুড়ি নেই। সারা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার পর্যটক ছুটে আসে থাইল্যান্ডে আর প্রকৃতিকে প্রাণ ভরে উপভোগ করে।

কোথাও পাহাড় ঘেরা গ্রাম আবার নদ-নদী খাল বেষ্টিত শহর আর সাগরবিধৌত দ্বীপমালা। স্বপরিবার বেড়ানোর মত চমৎকার দেশ। আমারও ইচ্ছে হল দেশটিতে বেড়ানোর। পত্র-পত্রিকা আর ম্যাগাজিন থেকে অনেক ভাল ভাল জায়গার বিবরণ পড়ে দেখলাম আর ইউ টিউবের কল্যাণে ভিডিও দেখে আরও শিহরিত হলাম। আমি ভেবে দেখলাম ভার্সিটির সেমিস্টার শেষ করে যে গ্যাপটা থাকে সেটাকে কাজে লাগাতে হবে। হলও তাই। প্রস্তুতিটা আগেই সেরে নিয়েছিলাম। ইন্টারনেট ঘেটে সব তথ্য নিয়ে নিলাম যে কোথায় কোথায় আকর্ষণীয় দর্শনীয় স্থান আছে, কিভাবে যাওয়া যায় আর খরচ কেমন হবে। আমরা বরাবরই বিভিন্ন ট্রাভেল এজেন্সিগুলোর দেওয়া প্যাকেজ অফার এ্যাভয়েড করে নিজ এরেঞ্জমেন্টেই ভ্রমণ করতে পছন্দ করি কারণ এত খরচ কম পড়ে আর নিজের ইচ্ছেমত বেড়ানো যায়। এবারেও তার ব্যতিক্রম ঘটল না। ভিসার জন্য আগেই আবেদন করে রেখেছিলাম।

সাত দিন লেগেছে থাই ভিসা পেতে। দেশের নিজস্ব ক্যারিয়ার বিমান বাংলাদেশ এয়রলাইন্স আমার প্রথম পছন্দের বাহন। বিমানের টিকিট বুক করে শুরু হল আমাদের টুর প্ল্যান। প্রথমত যেহেতু দেশটি পরিবার নিয়ে ঘুরে বেড়ানোর জন্য কত খানি উপযোগী হবে এ ব্যাপারে তেমন কোন ধারণা ছিলা না তাই, আমরা আমাদের ট্যুর প্লানটি করলাম এমনভাবে যাতে করে অপ্রত্যাশিত ঘটনার সম্মুখিন কম হতে হয়। আমাদের ট্যুরটি ছিল ১১ দিনের। আমরা প্লানটি করেছিলাম ৫ দিন ব্যাংকক, ২ দিন ফুকেট, ১ দিন জেমস বন্ড আইল্যান্ড, ১ দিন ফি ফি আইল্যাড, আর যদি সময় হয় তাহলে ব্যাংকক থেকেই পাতায়া যেয়ে ১ রাত থাকব।

তারপর পরিকল্পনা মত ৫ই জানুয়ারি ২০১৭ তারিখে আমার আব্বু, আম্মু, ভাইয়াসহ আমি নির্ধারিত দিনে পৌঁছে গেলাম বিমানবন্দরে। বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে অপেক্ষা করছি প্লেনে উঠার জন্য। যথাসময়ে প্লেনে উঠার ঘোষণা আসলো। আমরা উঠে পরলাম প্লেনে। সকাল ১১-৪০মিঃ এ ঠিক সময় অনুযায়ী ব্যাংককের উদ্দেশ্যে প্লেন রওনা হল।

ঢাকা থেকে বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইটে করে ‍প্রায় ২ ঘণ্টা ২০ মিনিট যাত্রা করে অবশেষে আমাদের বিমান ঠিক দুপুর ৩টায় (ব্যাংকক সময়) ব্যাংককের সুবর্ণভূমি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ে স্পর্শ করলো। সেখান থেকে ট্যাক্সি পেতে কোনও কষ্ট হল না কারণ এয়ারপোর্ট থেকেই ট্যাক্সি সার্ভিসের সুবিধা আছে। হোটেল বুকিং আগেই দেয়া ছিল অনলাইনে তাই সমস্যা হল না। ব্যাংকক এ আমরা যে হোটেলটিতে উঠেছিলাম সেটার আশেপাশে হতে গোনা কয়েকটি বাঙালি রেস্তোরা ছিল। তাই খাবার নিয়ে আমাদের তেমন ভাবতে হয়নি।

থাইল্যান্ডে বেড়ানোর মতো প্রচুর দর্শনীয় স্থান আছে। থাইল্যান্ড প্রধানত সমুদ্রসৈকত এবং অজস্র দ্বীপপুঞ্জের জন্যে বিখ্যাত। যদিও সময় স্বল্পতার জন্যে সব জায়গায় বেড়াতে পারিনি তারপরেও যেসব স্থানগুলিতে ঘুরে বেড়িয়েছি তা দেখার মত।

2

১। ব্যাংকক সিটি ট্যুরঃ ব্যংককের রাস্তায় অনেক ট্যাক্সি, টুকটুক, মাইক্রোবাস ভাড়া পাওয়া যায়। তবে দাম দস্তর করতে না পারলে আপনাকে চড়া দাম গুনতে হবে। ওরা বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে নিয়ে যাবার অফার দেয়। এইসব অফার ভাল করে জেনে বুঝে নিয়ে দরদাম করতে হয়। আমরা ব্যাংকক শহরের উপর দিয়ে প্রবাহিত চাওপ্রায়া নদী ও তার তীরে অবস্থিত বৌদ্ধমন্দির দেখার ইচ্ছে নিয়ে ট্যাক্সিভাড়া করে নৌঘাটে আসলাম। বলে রাখি, ট্যাক্সি অথবা টুকটুক চালকের কথামত কোন সুভেনির শপে যেতে হবে অথবা কোন টুরিস্ট স্পটের টিকিট তাদের মাধ্যমে কাটতে হবে যেখানেই যেতে চাই না কেন কারণ তারা সেখান থেকে ভাল কমিশন পেয়ে থাকে। আর তাতে যদি আপনি রাজী না থাকেন তবে আপনাকে তিনগুণ ভাড়া দিয়ে যেতে হবে। নইলে “ আই দোন গো “ বলে চোখের নিমিশে হাওয়া হয়ে যাবে তারা। যাই হোক, নৌকায় করে উত্তাল চাওপ্রায়া নদীর মধ্য দিয়ে আমরা প্রথমে গেলাম ওয়াট ফ্রা কাও টেম্পেল (Wat Phra Kaew) এ। এরপর সেখান থেকে আমরা গেলাম গ্র্যান্ড প্যালেস এ। রাজা ভুমিবল এখানে থাকতেন। বর্তমানে তার লাশ এখানে থাকায় রাজপ্রাসাদটি নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। পর্যটকদের গ্র্যান্ড প্যালেস এ আস্তে হলে অবশই সাথে পাসপোর্ট রাখতে হবে আর এন্ট্রি ফি ৫০০ থাইবাথ জন প্রতি। নৌপথ পাড়ি দিয়ে আমরা এবার ৩টি ঐতিহাসিক টেম্পেল দেখার উদ্দেশে রওনা দিলাম ৪০০ থাইবাথ একটি টুকটুক ভাড়া করে সারা দিনের জন্য। এটি একটি প্যাকেজ ট্যুর এর মতো ছিল। প্রথম টেম্পল টি ছিল ওয়াট ইন্ট্রাহুইয়ান (Wat Intharawihan)। এরপর গেলাম পরবর্তী টেম্পেল ওয়াট বেঞ্চামাবফিত (Wat Benchamabophit)। এই টেম্পেলে যাওয়ার আগে জেমস গ্যাল্যারি নামক একটি সুভেনির শপে যেতেই হবে কিছু কিনি বা নাই কিনি।
কারণ ট্যাক্সি চালকের সাথে সেটাই ছিল আমাদের চুক্তি। এই শপের সব পণ্যই অনেক ব্যয়বহুল। সর্বশেষ টেম্পেল টি ছিল ওয়াট ফো টেম্পেল (Wat Pho Tempel)। এই টেম্পেল টিতে গৌতম বুদ্ধের সবচেয়ে বড় মূর্তি টি রয়েছে। এই টেম্পেল এ যাওয়ার সময়ও জেমস গ্যাল্যারি নামক আরও একটি জুয়েলারি শপ এ নিয়ে যাবে চালক। বাধ্য হয়েই যেতে হবে।

3

২। ব্যাংকক সাফারি ওয়ার্ল্ডঃ আমার ব্যাংকক এ কাটানো সুন্দর সময়গুলোর মধ্যে স্মরণীয় একটি দিন হলো এই সাফারি ওয়ার্ল্ড। সকাল সকাল হোটেল থেকে বের হলাম আমরা। কয়েক জন ট্যাক্সিচালক হুড়মুরি খেয়ে পড়লো তাদের প্যাকেজ ট্যুর দেখানোর জন্য। আমাদের প্রথম ইচ্ছে ছিল জুরাসিক ওয়ার্ল্ড দেখার কিন্ত একজন ট্যাক্সিচালক আমাদের সাফারি ওয়ার্ল্ডের কথা বললো। অনেক দরদাম করে ট্যাক্সি ঠিক করলাম। ব্যাংকক থেকে সাফারি ওয়ার্ল্ড যেতে লাগে ৪০ মিনিট। চালক নিজেই আমদের টিকেট কাউন্টার এ নিয়ে গেলো তখনি বুঝলাম কাহিনী কি। সেই চুক্তি। সাফারি ওয়ার্ল্ডটি অনেক বিশাল। এটির ২ টি অংশ। প্রথমটি হল মেরিন পার্ক আর দ্বিতীয় টি হল সাফারি ওয়ার্ল্ড। সাফারি ওয়ার্ল্ড এ সব বন্য পশুপাখির অবাধ বিচরণ আর দর্শনার্থীর যানবাহনের ভিতর অবস্থান। ভাল লাগলো আমাদের দেশের রয়েল বেঙ্গল টাইগারগুলোকে দেখে। প্রায় ডজন খানেক আছে ওদের দেশে। ফটোসেশনের সুবিধার্থে বাসচালক বাস কিছুটা ধীর গতিতে চালায়। মেরিন পার্কে অনেকগুলো পশুপাখি ছাড়াও বিভিন্ন প্রাণীর শো রয়েছে যেমন- ডলফিন শো, এলিফান্ট শো, পাখির শো, শীল মাছের শো, অরাং ওটাং শো, ফিডিং শো। সবচেয়ে আকর্ষণীয় হল জীবন্ত জিরাফকে নিজ হাতে খাওয়ানো। আর হরেক রকম পাখিতো আছেই। টিয়া পাখিগুলো আপনার হাতে, ঘাড়ে আর মাথায় বসে পরবে যদি আপনার কাছে কোন খাবার থাকে।

4

৩। ফুকেটঃ ব্যাংকক দেখা শেষ করে আমরা চলে এলাম সুবর্ণভুমি এয়ারপোর্ট এ ফুকেটের উদ্দেশে রওনা দেওয়ার জন্য। ব্যাংকক এয়ারলাইনসে করে ১ ঘণ্টা ২০ মিনিটে পৌঁছে গেলাম ফুকেটে। এক অপরুপ দৃশ্য দেখলাম এয়ারপোর্ট থেকেই। একদম খুব কাছেই আন্দামান সাগর। বহু দূরে অনেক দ্বীপ। এয়ারপোর্ট থেকে আমরা সোজা গেলাম পাতং নামক এক স্থানে। এয়ারপোর্ট থেকে পাতং যেতে লাগে প্রায় ৫০ মিনিটের মত। ফুকেটেও আমরা হোটেল বুক করে রেখেছিলাম অনলাইনেই। হোটেল থেকেই পাতং সী বিচ দেখা যায়। দেখতে পাচ্ছিলাম প্যারাসেলিং করা। পাতং সমুদ্রসৈকত (Patong Sea-beach) ফুকেটের সমুদ্রসৈকতগুলোর মধ্যে অন্যতম। এখানে এলে দেখা যায় সুনীল সাগরের জলরাশি ঝকঝকে নীল আকাশের সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। সমুদ্রসৈকতটি আকারে বেশ ছোট আর এর দুইপাশ ঘিরে আছে উঁচু উঁচু পাহাড় যা দেখলে যে কারোর মন মূহূর্তে কোথায় যেন হারিয়ে যাবে। সমূদ্রসৈকতটি একটি বলয়রেখার মধ্যে নির্দিষ্ট করা আছে যেখানে শুধু নিরাপদে গোসল করা যায়। তাই সেখানে তেমন বড় বড় ঢেউ নেই বললেই চলে যেমন আছে আমাদের কক্সবাজার সৈকতে। আর এর পানি বলতে গেলে এতো পরিষ্কার যে জলজ প্রাণী বিশেষ করে ছোট ছোট মাছ ও কাঁকড়া পানির তলেই দেখতে পাওয়া যায়।

এছাড়া এখানে প্যারাসেলিং (Parasailing), স্নোর্কেলিং (Snorkeling), ব্যানানা রাইডিং (Banana Riding), জেট স্কি (Jet Ski) ইত্যাদিতে চড়ার সুযোগ আছে।
আমরা এয়ারপোর্ট থেকেই ২টা আইল্যান্ড দেখার প্যাকেজ ট্যুর ঠিক করে নিয়েছিলাম। এতে এয়ারপোর্ট থেকে পাতং এ আসার ফ্রী গাড়ি সার্ভিসও পেয়েছিলাম। প্যাকেজ ট্যুর নেওয়াই ভালো আইল্যান্ড দেখার জন্য এতে খরচ অনেক কম হয়।

5

জেমসবন্ড আইল্যান্ডঃ পরের দিন সকাল ৭ টায় ট্যুরের কোচ এসে হোটেল থেকে আমাদের নিয়ে গেলো নৌঘাট আও পর পিয়ের (Ao Por Pier) এ। বোট ছাড়ার ৪০ মিনিট আগে। সেখানে আমাদের মতো আরও অনেক পর্যটক ছিল যারা পরিবার নিয়ে বেড়াতে এসেছে বিভিন্ন দেশ থেকে। সবাই একসাথে হওয়ার পর আমাদের বোটে উঠানো হল। ২টি বড় ইঞ্জিন চালিত বোট ছিল। এরপর ৯-৩০ টায় আমাদের যাত্রা শুরু হল। আন্দামান সাগরের বুক পাড়ি দিয়ে রাশি রাশি ঢেউয়ের মধ্য দিয়ে দেখলাম কত সারি সারি পাহাড়ের দ্বীপ, একেবারে অবাক করার মতো সব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দ্বীপ। সবাই ছবি তুলতে থাকল। আমাদের যে গাইড ছিলেন তিনি আমাদর ট্যুর এর ছোটো একটা বিবরণ দিলেন। সাগরের পানির কি সুন্দর রঙ এই নিল এই সবুজ। দ্বীপগুলো সামনে থেকে দেখলে কেমন জানি বিস্ময় সৃষ্টি হয়। কিভাবে ছোটো ছোটো কিছু দ্বীপ পানির মধ্যে বছরের পর বছর দাঁড়িয়ে আছে। বোটের মধ্যেই আমাদের সকালের নাস্তা দেয়া হল। পৌঁছালাম ফাং ঙ্গা বে তে (Phang-nga Bay)। এরপর ১০ঃ২০ এ আমরা আসলাম কোহ পানাক (Koh Panak) নামক আইল্যান্ড এ। এটি ব্যাট কেভ (Bat Cave) নামেও পরিচিত কারন এর গুহায় অসংখ্য বাদুর বাস করে। আমরা বোট ত্থেকে নেমে ক্যানই (Canoe) করলাম ছোটো একটি রাবারের বোট এ। এক বোট এ ৩ জন বসা যায়। ১৫ মিনিট এখানে কাটিয়ে আমরা আবার বোটে ফিরে আসলাম। এরপর ১১-২০ এ গেলাম কোহ হং (Koh Hong) এ। এখানে অনেক ছোটো বড় আইল্যান্ড আছে। অনেক সুন্দর জায়গা ক্যানই (Canoe) এর জন্য। আমরা আবার নামলাম। এই কেভে ২টা বড় বড় গুহা আছে। একটি দিয়ে বোট নিয়ে আমরা ঢুকলাম আর একটি দিয়ে বের হলাম। পুরাটাই রোমাঞ্চকর অ্যাডভেঞ্চার। কেভে আমরা অনেক লাল রঙয়ের কাকড়া দেখেছি। এক একটি আইল্যান্ড এক এক রকম। এক কেভের ভিতর দিয়ে অন্য কেভে যাওয়া যায়। বোট থেকে নেমে ছবিও তোলা যায় কিছু জায়গায়। এরপর আমাদের বোটে ফিরে আসলাম। দুপুরের খাবার খেলাম। থাই ফুড। অনেক মজাদার ছিল খাবারগুলো। আমাদের বোট আগাতে লাগলো আরো অনেক ছোট বড় দ্বীপ কে ছাড়িয়ে। অবশেষে ১২-৪০ এ দেখা পেলাম মূল আকর্ষণ যে আইল্যান্ড টা কে নিয়ে ছিল সেটার। কাও পিং গান (Kao Ping Gun) যা জেমস বন্ড আইল্যান্ড (James Bond Island) নামেও পরিচিত। বড় বোট থেকে আমাদের ছোটো একটি বোটে নেয়া হল। সেটায় করে আমরা আইল্যান্ড এর বিচ এ গেলাম। কি বিশাল পাহাড়! এখানে অনেক সুভেনিরের শপ আছে। একটি পাহাড়ের মধ্যে অনেক ছোটো ছোটো গুহা আছে। আমরা দেখলাম সেই জেমস বন্ড আইল্যান্ড যেটাকে আজ পর্যন্ত ক্যালেন্ডার এর পাতায় দেখেছি, মুভি তে দেখেছি। অনেক বিস্ময়কর এই আইল্যান্ড টি। সরু একটা পাথর কিভাবে এখনো দাঁড়িয়ে আছে পানির মধ্যে। এই আইল্যান্ড টাকে জেমসবন্ড আইল্যান্ড বলার কারণ হল এইখানে জেমসবন্ড মুভির “দ্যা ম্যান উইথ দ্যা গোল্ডেন গান” এর শুটিং হয়েছিল। ৪০ মিনিট কাটানোর পর আমরা ফিরে এলাম আমাদের বোটে। জেমসবন্ড আইল্যান্ড কে বিদায় জানিয়ে পাড়ি দিলাম লাওয়া আইল্যান্ড এর উদ্দেশে। পথের মধ্যে আমরা একটি ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট আইল্যান্ড দেখেছি। এই আইল্যান্ড এ অনেক বানর থাকে। একটি গুহার ভিতর দিয়ে গেলে ম্যানগ্রোভ বন দেখা যায়। গুহার ভিতর হাটু পানি। অনেক অন্ধকার ভিতরে তাই গাইড আমাদের টর্চ লাইটের সাহায্যে নিয়ে গিয়েছিল। এরপর আমরা আরো ২ টি আইল্যান্ড দেখেছি যেখানে কাহোনা পেয়ার হ্যাঁ মুভির শুটিং হয়েছিল। অসাধারণ সেই আইল্যান্ড গুলো। ঠিক ১-৪০ মিঃ এ আমরা পৌছালাম লাওয়া আইল্যান্ড বা নাকা আইল্যান্ড এ। এই আইল্যান্ড এ নেমে আমরা পানিতে কিছুখন সাঁতার কেটেছি, কেও গোসল করেছে, কেউ সানবাথ, কেউ রাবারের বোট নিয়ে ঘুরেছে। কেউ বসে বসে প্রকৃতির অপরুপ দৃশ্য দেখেছে। ১ ঘণ্টা সময় এই আইল্যান্ড এ কাটানোর পর আমরা আবার আমাদের বোটে ফিরে এসেছিলাম। ২-৪০ মি এ আমরা রওনা দিলাম পাতংয়ের উদ্দেশ্যে। বিকালের নাস্তাও দেওয়া হয়েছিল। আও পর পিয়ের (Ao Por Pier) নৌঘাটে ফিরলাম বিকাল ৪-৩০ এ সেখান থেকে মাইক্রোতে পাতং।

15965219_1283516325088936_4344830222127639166_n

কোহ ফি ফি আইল্যান্ডঃ পরের দিনই সকাল ৭ঃ৩০ টায় আগের দিনের মতো আমাদের পিক করতে চলে এলো ট্যুরের কোচ। এবার আমাদের অন্য একটি ঘাট এ নিয়ে যাওয়া হল। এইখানে অনেক বড় বড় জাহাজ ভেড়ানো ছিল। সবাইকে টোকেন দিয়ে উঠানো হল একটি জাহাজে। জাহাজটির নাম ছিল সি আঞ্জেল ক্রুজ। জাহাজের তৃতীয় তলার রুমে আমাদের বসানো হল। গাইড আমাদের ট্যুরের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিলো। জাহাজে অনেক মানুষ ছিল। ডেকে, ছাদে সব দিকেই ট্যুরিস্ট। আমাদের যাত্রা শুরু হল। উত্তাল সাগর। সেই আন্দামান সাগর। বিশাল বিশাল ঢেউ কারণ জাহাজ সাগরের মাঝখান দিয়ে যাচ্ছিল। আমার লাইফ এ ফার্স্ট টাইম এই অ্যাডভেঞ্চার। আমি অবাক হয়ে চারিদিক দেখছিলাম। চারিদিকে নীলাভ জলরাশি শুধু পানি আর পানি চারদিকে কোথাও তীরের দেখা নেই। মনে হচ্ছিল পানি আর আকাশ একসাথে হয়ে গিয়েছে। অনেক পাখি আমাদের জাহাজের সাথে পাল্লা দিয়ে উড়ছিল। আহ! কি দৃশ্য! প্রায় ১ ঘণ্টার পর আমরা কিছু দ্বীপ দেখতে পেলাম। দ্বীপের খুব কাছ দিয়ে আমাদের জাহাজটি যাচ্ছিল। একটি দ্বীপের কাছে এসে একটা নৌ ঘাটে আমাদের জাহাজ পরিবর্তন করতে হল। দ্বিতীয় জাহাজটি তে করে আমাদের যাত্রা পুনরায় শুরু হল। আমাদের প্রথমে দেখানো হল মায়া বে (Maya Bay)। এইখানে অনেক ছোটো বড় আইল্যান্ড আছে। আমরা ঘুরে ঘুরে সব আইল্যান্ড দেখলাম। এরপর আমাদের নিয়ে যাওয়া হল মাঙ্কি বিচ (Monkey Beach) এ। অনেকে বানরের সমাগম। সেখানে স্নোরকেলিং (Snorkelling) এর ব্যবস্থা আছে। আমরা পানির তলে অনেক মাছের ঝাঁক দেখছি মনে হল যেন একটা বড় আ্যকুরিয়াম যাতে রংবেরং এর মাছ চড়ে বেড়াচ্ছে। খাওয়া দিয়েছি, ওরা খেয়ে আবার পানির নিচে চলে যাচ্ছে। এরপর আমরা জাহাজের ছাদ থেকে দেখলাম ফি ফি ডোন আইল্যান্ড। গাইড আমাদের ফি ফি আইল্যান্ড সম্পর্কে বিবরণ দিলো। আমাদের জাহাজ ফিরল ফি ফি পিয়ার ঘাট এ। পাহাড়ে ঘেরা স্বর্গীয় সৌন্দর্য্যের ছোট্ট একটি দ্বিপ কোহ ফি ফি। থাইল্যান্ডে যতগুলো দ্বীপ আছে তার মধ্যে অন্যতম হলো কোহ ফি ফি দ্বীপ। সাগরের সুনীল জলরাশি কেটে আমরা যখন এই দ্বীপে পৌঁছুলাম তখন মনে হলো যেন কোন এক স্বর্গরাজ্যে চলে এসেছি। সুন্দর সাজানো গোছানো এই কোহ ফি ফি দ্বীপ। চতুর্দিকে পাহাড় সন্নিবেশিত এই দ্বীপটি কে সবচেয়ে আকর্ষনীয় করে তুলেছে। তাইতো এর সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্যে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বহু পর্যটক ছুটে আসেন। যারা একটু নিরিবিলি সময় কাটাতে পছন্দ করেন তাঁদের জন্য এই দ্বীপটি আদর্শ স্থান। স্কুবা ডাইবিং (Scuba Diving) থেকে শুরু করে থাকা খাওয়া এমনকি শপিং করার সুব্যবস্থা রয়েছে। এখানে অনেক সুন্দর সুন্দর রিসোর্ট আছে। প্যাকেজ ট্যুর এ আসায় আমাদের দুপুরের লাঞ্চের ব্যবস্থা করা ছিল আইল্যান্ডে। থাই ফুড আর ইন্ডিয়ান ফুড দুই ধরনেরই ছিল। লাঞ্চ করার পর আধা ঘণ্টা সময় দেয়া হয়েছিল ফি ফি ঘুরে দেখার জন্য। দ্বীপে কোন যানবাহন নেই তাই পায়ে হেটেই দ্বীপ ঘুরতে হবে। সময় লাগবে ৩০ মিনিট এর মতো। এত স্বচ্ছ পানি আমি আগে কখনও দেখি নি। সাগরের তলদেশে কি আছে তা দেখা যাচ্ছিল স্পষ্টভাবে। ঘুরাফিরা শেষে আমরা আবার আমাদের পূর্বের প্রথম জাহাজটি তে উঠলাম। আর যারা রাত্রিযাপন করবে তারা থেকে গেলো। বিদায় জানালাম ফি ফি আইল্যান্ডকে। মন যেন রাজি হচ্ছিল না এই দ্বীপগুলো কে ছেড়ে যেতে। আমাদের জাহাজটি আবার পূর্ণগতিতে চলা শুরু করল। একটি একটি করে দ্বীপগুলো হারিয়ে যেতে থাকল। সমুদ্রের গর্জন শুনা যাচ্ছিল। কয়েকটি ডলফিন লাফাতে, আর জেলি ফিশ ভাসতে দেখেছি আমি। বিকেলে আমাদের নাস্তা দেওয়া হল। ৫ টার মধ্যেই পোঁছে গেলাম নৌ ঘাটে। মাইক্রোতে করে আমাদের আবার হোটেলে নামিয়ে দেওয়া হল।

ফুকেটে থাকার শেষের দিন ৩টা বিচ ঘুরে দেখেছি। কাটা বিচ, কারন বিচ আর পাতং বিচ। কারনে একটি সুন্দর ভিউ পয়েন্ট আছে। সেখানে একটি হিল টপ এ উঠলে ৩টি বিচ একসাথে দেখা যায়। এই দৃশটি দেখার মতো। ফুকেটের বিচগুলো ঘুরে দেখতে চাইলেও ট্যাক্সি অথবা টুকটুক চালকেরা তাদের প্যাকেজ নিয়ে ছুটে আসবে। বিচ তো দেখাবেই সাথে তাদের নিয়ে যাওয়া কিছু পার্ক এ বাধ্যতা মূলক টিকেট কাটতেই হবে। যার খরচ অস্বাভাবিক। এ ছাড়াও ফুকেটে দেখার মতো একটি টেম্পেল আছে যা পাহাড়ের উপরে অবস্থিত।

15966247_1282821628491739_3684697256779521800_n

ব্যাংকক আর ফুকেটের এই দিন গুলি ভুলার মতো না। চোখের সামনে দেখা অপরুপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য কি ভুলা যায়! তার পরদিন ফিরে এলাম ব্যাংকক এ ব্যাংকক এয়ারওয়েজ এ চড়ে। সময় না হওয়ায় পাতায়া যাওয়া হয়নি। আর যারা একবার ফুকেট দেখবে তাদের পাতায়া ভাল লাগবে না। ঢাকায় ফিরার আগের দিন ব্যাংককেই কাটালাম। বিভিন্ন শপিং মল ঘুরে দেখেছি। শপিং মল গুলর মধ্যে বেস্ট হল Indra Square, MBK, Robinson, Pratunam Area, Platinum Shopping Mall।

এছাড়া আছে Chatuchak Weekend Market যা শুধুমাত্র শনিবার এবং রবিবারে খোলা থাকে। এই মার্কেটের অবস্থা আমাদের গুলিস্থান এর মতো, অনেক ভিড়। থাইল্যান্ড সফর বেশ ভালই কেটেছে আমাদের। কিছুটা সমস্যা হয়েছে ট্যাক্সি আর টুকটুক ভাড়া করার সময় আর থাই লোকেরা ইংরেজি বেশি বুঝে না তাই কথা বুঝাতে অনেক সমস্যা হয়। ইংরেজির কমন শব্দ গুলো বললে তারা বুঝতে পারে। আর তারা দ্বিগুণ ভাড়া চায়। মিটারে যেতে চায় না সহজে। তবে থাই লোকেরা অনেক ফ্রেন্ডলি। ঘুরাঘুরির জন্য প্যাকেজে যাওয়াই ভালো, খরচ কম হয় সময়ও বাঁচে। আইল্যান্ড ট্যুরে লাইফ জ্যাকেট ব্যবহার করা বাধ্যতামূলক। সময় খুব ভালো ভাবে মেইনটেন করে এরা। ১৬ জানুয়ারি দুপুর ১২-২০ এ বাংলাদেশ বিমানে উঠলাম ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেওয়ার জন্য। দুপুর ৩-৩০ টায় ঢাকায় পৌঁছে গেলাম। শেষ হল আমার জীবনের আরও একটি অ্যাডভেঞ্চার ট্যুর।

কমেন্টস