ভালোবেসে পালিয়ে বিয়ে? জেনে নিন আইনি জটিলতা ও প্রতিকার

প্রকাশঃ ডিসেম্বর ২২, ২০১৭

বিডিমর্নিং ডেস্ক-

ভালোবাসার সম্পর্ক সব সময় যে বিয়ে অবধি গড়ায় তা নয়। অনেক সময়েই বিয়ে পর্যন্ত ভালোবাসার সম্পর্ক নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না। বাবা-মায়ের অসম্মতির কারণে অনেক ভালোবাসার সম্পর্কে সমাপ্তি ঘটে। অনেকেই বাবা-মায়ের অসম্মতির পরও নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন বিয়ে করার জন্য। ঘর পালিয়ে বিয়ে করতে রাজি হয়ে যান দুজনেই। করে ফেলেন পরিবারকে ছেড়ে যাওয়ার দুঃসাহসিক কাজটি। তারপরই শুরু হয় আসল বিপত্তি। এই পরিস্থিতিতে বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় মেয়ের বাবারা থানায় গিয়ে ছেলের বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দেন; এবং মামলার এজাহারে উল্লেখ করেন তার নাবালিকা মেয়েকে অপহরণ করা হয়েছে। এরপর যথারীতি চলে আইনি প্রক্রিয়া। কিন্তু এক্ষেত্রে আইনি সমাধান কি …

আমাদের দেশের আইন-আদালত সম্পর্কে যাদের ধারণা কম তাদের এই লেখা কাজে আসতে পারে। আর এই লেখার উদ্দেশ্য পালিয়ে বিয়ে করতে উৎসাহিত করা নয়, বরং পালিয়ে বিয়ে করার পর আইনি ঝুঁকির বিষয়ে সাবধান করা। পালিয়ে বিয়ে করতে গেলে আপনাদের, মুসলিম ছেলেমেয়েদের অনেকের মনে নানা প্রশ্ন দেখা দেয়। যেমন- বিয়ের পরে কোনো সমস্যা হবে না তো বা বিয়েটার বৈধতা কেমন হবে। বিয়েটাই বা কোথায় করতে হবে? কোর্টে নাকি কাজি অফিসে?

বিশেষ করে ছেলেরা ভাবে- মেয়ের বাবা যদি মামলা করে দেয় নারী নির্যাতনের? তাহলে কি জেল খাটতে হবে? ইত্যাদি। অনেকে ভাবেন- এসব ক্ষেত্রে হয়ত কোর্ট ম্যারেজ করতে হবে।

কোর্ট ম্যারেজ টার্মটা আমরা প্রায়ই শুনে থাকি। কিন্তু এটা নিয়ে অনেকের একটু ভুল ধারণা আছে। অনেকে যারা অভিভাবকের সম্মতি ছাড়া বা পালিয়ে বিয়ে করতে চায় তারা কোর্ট মারেজ করতে যায় বা করতে চায়। অনেকে মনে করেন কোর্ট ম্যারেজ হয়তো কোর্টে গিয়ে বিয়ে করা। অথবা মাজিস্ট্রেটের সামনে বিয়ে করা। আসলে তা নয়।

কোর্ট ম্যারেজ করতে হলে আপনাকে যেতে হবে কোনো নোটারী পাবলিকের (সরকারি রেজিস্টার্ড উকিল) কাছে। তিনি আপনাদেরকে (বর-কনে) ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে একটি হলফনামায় সই করাবেন যাতে লিখা থাকবে আপনারা প্রাপ্তবয়স্ক এবং সজ্ঞানে, স্বেচ্ছায় বিয়ে করেছেন। তার মানে কী দাঁড়ালো?

বিয়ে আপনাদেরকে আগেই করতে হবে। কোথায়? যথারীতি কাজী অফিসে। রেজিস্ট্রি কাবিনমুলে। কাজী অফিসে কাবিননামায় সই করতে হবে। কাজী সাহেবকে আপনাদের এসএসসি পরীক্ষার সার্টিফিকেট বা ন্যাশনাল আইডি কার্ড দেখাতে হবে বয়স প্রমাণের জন্য। বয়স অবশ্যই আঠারো (মেয়ে) ও একুশ (ছেলে) হতে হবে। আর লাগবে দুজন সাক্ষী। আর ওই কাবিননামাই আপনাদের বিয়ের প্রধান আইনি দলিল।

আর নোটারী পাবলিকের কাছে গিয়ে আপনি শুধু ওই দলিলের আরও একটা সম্পূরক আইনি দলিল করে রাখলেন ভবিষ্যতে মামলায় একটু সুবিধা পেতে। তবে জেনে রাখবেন, নোটারী পাবলিকের কাছে করা হলফনামার কোনো দাম নেই যদি আপনার কাবিননামা না থাকে। কাবিননামা থাকলে আপনার বিয়ের পক্ষে আর কোনো ডকুমেন্টই লাগবে না। কাবিননামাই সব।

এক পক্ষ হিন্দু বা মুসলিম কিংবা অন্য ধর্মের হলেও, ধর্ম পরিবর্তন না করেই বিয়ে করা সম্ভব। Special Marriage Act-III of 1872 এর আওতায়। এর জন্য কাজীর মত আলাদা ম্যারেজ রেজিস্ট্রার আছেন।

বিয়ে হয়ে গেলে অনেক সময় পরে দুই পক্ষের বাবা-মা মেনে নেন,অনেক সময় মেনে নেন না। অনেক সময় মেয়ের বাবা ক্ষেপে গিয়ে ছেলের বিরুদ্ধে মামলা করে বসেন। মামলাগুলো হয় সাধারণত অপহরণপূর্বক ধর্ষণের। এই মামলাগুলোর জামিন বা রিমান্ড শুনানি এবং বিচার হয় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে। মামলার ধারাগুলো জামিন-অযোগ্য এবং আমলযোগ্য, পুলিশ এসব ক্ষেত্রে ম্যাজিস্ট্রেট বা আদালতের অনুমতি ছাড়াই আসামিকে গ্রেফতার করতে পারে।

পুলিশ ধরে নিয়ে গেলে কিন্তু প্রথমেই জামিন হবে না। আর মানসিকভাবে শক্ত থাকুন, দুজনেই। মামলা (উক্তরূপ) হওয়ার পর তদন্ত শুরু হবে। ভিকটিমের (মেয়ের বাবার চোখে মেয়েটি এখানে ভিকটিম)জবানবন্দি দিতে হবে জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে। এটি ২২ ধারার জবানবন্দি, ম্যাজিস্ট্রেট চেম্বারে হয়। কেউ কোনো প্রভাব খাটাতে পারে না।

জবানবন্দিতে মেয়েকে বলতে হবে, ‘আমি স্বেচ্ছায় বিয়ে করেছি। আমাকে কেউ অপহরণ করেনি।’ ব্যাস, তাহলে মামলায় পুলিশ আর চার্জশিট দেবে না। আসামি (ছেলে) অব্যাহতি পাবে।

তবে  যা মনে রাখতে হবেঃ  ভালোবাসার মানুষকে নিয়ে ঘর বাঁধার স্বপ্ন কে না দেখে। তাই বলে স্বপ্নে একেবারে অন্ধ হয়ে গেলে হবে না। অনেক সময় ভালোবাসার মানুষটিই হয়ে যেতে পারে প্রতারক। দু-একটি ঘটনায় দেখেছি, বিয়ের নামে ভুয়া বিয়ের দলিল তৈরি করে মেয়েটির সঙ্গে কয়েক দিন স্বামী-স্ত্রীর মতো একান্ত সময় কাটিয়ে ছেলেটি সরে পড়ে। হয়ে পড়ে নিরুদ্দেশ। তখন মেয়েটি পড়ে যায় বিপদে। অনেক সময় মেয়েটি গর্ভবতীও হয়ে পড়ে। ফলাফল, বিয়ে প্রমাণ করতে না পেরে সইতে হয় অপমান-বঞ্চনা। তাই ভালোবাসায় আস্থা থাকবে, কিন্তু তার সঙ্গে সঙ্গে হতে হবে একটু সচেতন। বিয়ে করলে কাবিননামা বা বিয়ের দলিল দুজনের কাছেই রাখতে হবে। আর শুনতে খারাপ লাগলেও ভালোবাসার মানুষটির হাত ধরে বেরিয়ে আসার আগে একটু ভালো করে খোঁজখবর নিয়েই নেন না। বিয়ে তো আর ছেলেখেলা নয়।

কমেন্টস