মনভোলানো নাম দিয়ে ভারতীয় পোশাকের রমরমা ব্যবসা বাংলাদেশের ঈদ বাজারে

প্রকাশঃ জুন ১৮, ২০১৭

হাসনা হেনা কাকলীঃ 

সময়ের সাথে সাথে বদলেছে নারীদের পোশাকের ধরন আর চাহিদা। একটা সময় ছিলো যখন ঈদের পোশাক বলতে বাঙালি নারীরা ঐতিহ্যবাহী কাতান, জামদানী, সুতি তাঁতের শাড়িকেই বোঝাতো। ধীরে ধীরে বাঙালি নারীর পোশাকের তালিকায় এসেছে কামিজ। কিন্তু তখনও দেশীয় ফ্যাশন হাউজগুলোর জয়জয়কার ছিলো। আর এখন ঈদের পোশাক মানেই ভারতীয় সিরিয়ালের নায়িকা অথবা সিনেমার নায়িকার নামের নানান রকমের পোশাক।

এর জন্য মূলত অনেকটা দায়ি ভারতীয় হিন্দি সিরিয়াল । ভারতীয় সিরিয়ালের প্রভাবটা শুরু হলো প্রত্যেক বাড়ি বাড়ি ভারতীয় চ্যানেলগুলো পৌঁছানোর পর থেকেই। ভারতে আমাদের কোনো চ্যানেল দেখানো হয়না কিন্তু আমাদের দেশের প্রায় প্রতিটি বেডরুমেই ঢুকে পড়েছে ভারতীয় সিরিয়ালগুলো। এক একটা সিরিয়াল দীর্ঘদিন ধরে দর্শকদেরকে মন্ত্র মুগ্ধের মতো করে ধরে রাখা শুরু করলো। সিরিয়ালের নায়িকাদের গ্ল্যামার, দামী দামী পোশাক, খোলামেলা চালচলন আর ঘটনার নানান মোড় বাঙালি নারীদেরকে আকৃষ্ট করে নিলো চুম্বকের মতো।

এর ফায়দা নিচ্ছে আমাদের দেশের নামীদামি ফ্যাশন হাউজ আর ছোট বড় শপিং মোলের পোশাক বিক্রেতারা । ঈদ আসলেই শুরু হয়ে যায় সিরিয়ালের নামে পোশাক বিক্রির ধুম। তারা মনে করে সিরিয়াল বা বছরের হিট কোন ছবির নাম অনুসারে পোশাকের নাম দেয়া হলে ক্রেতাদের সহজে আকৃষ্ট করা যায় । কিন্তু এসব পোশাকের সাথে নামের কোন মিলই থাকে না ।

ঈদের বাকি আর মাত্র ৮ দিন ।ঈদকে সামনে রেখে রাজধানীর বিপণীবিতানগুলো জমজমাট হয়ে উঠেছে ঈদের পোশাকে। প্রতি বছরের মতো এবারো ভারতীয় বিভিন্ন সিরিয়াল আর ছবির নামে ঝলমলে পোশাকে সয়লাব রাজধানীর বিপণীবিতানগুলো। অন্যান্য বছরের মতো পাখি, ঝিলিক, কারিজমা, মাসাককালির মতো এ বছরেও ভারতীয় নাটক বা ছবির নামের পোশাকে ছেয়ে গেছে ছোট বড় শপিং মল।

রাজধানী বসুন্ধারা, নিউমার্কেট ঘুরে দেখা গেছে এ বছরের নতুন হিট কালেকশন লেহেঙ্গার অ্যারিস , সেলফি সারারা , সারারা লংগাউন সাথে ভারতীয় ছবি বাহুবলি-২ নামে নতুন পোশাক। শপিং মল গুলোতে সেলফি,  সেলফি সারারা বিক্রি হচ্ছে ৫০০০ টাকায়। সারারা লং গাউন্ বিক্রি হচ্ছে ৫০০০-৭০০০ টাকায়,  বাহুবলি-২  বিক্রি হচ্ছে ৫০০০-৬০০০ টাকায় ।

পোশাকের নামকরণ সম্পর্কে বিক্রেতা রুহুল জানান, এবার ঈদ ফ্যাশন হিসেবে গাউন ধরনের পোশাক মেয়েরা বেশি পছন্দ করছে। বাজারে এ ধরনের পোশাক হুররাম, বাহুবলী ২ , সেলফি সারারা নামেও পরিচিতি পাচ্ছে।

বসুন্ধারা শপিং মলের দোকান আল্পনার সামনের ডিসপ্লে করা পোশাক দেখছিলেন এক ক্রেতা। জানতে চাইলে তিনি বলেন, লেহেঙ্গা ধরনের পোশাকগুলোই এবার কিনব ভাবছি। তবে এগুলোর নাম একেক দোকানদার একেক রকম বলে। নামের কোনো ঠিক নাই।

নিউমার্কেটে কথা হল ক্রেতা তানজিনা ইরার সঙ্গে। তিনি বলেন, এ বছর বেশিরভাগ তরুণীদের পছন্দ গাউন জাতীয় পোশাক। নিউমার্কেটে পোশাকের দোকানগুলো ঘুরে এমনটাই মনে হল।
প্রসঙ্গত প্রতিবছর ঈদ আসার আগে নানা ধরনের গুজব শোনা যায় এবং ফলাফল স্বরূপ দেশীয় পণ্যর দশ এবং কয়েক জনের শাররিক,মানাসিক,আত্মহত্যা।

২০১৪ সালে চুয়াডাঙ্গা জেলা সদরের একটি গ্রামে শিলা খাতুন নামে ১৫ বছরের একটি মেয়ে আত্মহত্যা করে৷ আত্মহত্যার কারণ বাবা ঈদের জন্য তাকে ‘পাখি’ পোশাকটি কিনে দিতে পারেননি৷ এদিকে ঈদে ‘পাখি’ থ্রি-পিস কিনে না দেয়ায় খুলনার পাইকগাছার এক স্ত্রী শারমিন আক্তার তার স্বামী মোঃ সাইদুল ইসলামকে তালাক দিয়েছেন।

সর্বশেষ ২০১৬ রামগঞ্জ উপজেলায় কিরন মালা জামা কিনে না দেয়ায় তাছলিমা আক্তার (১২) নামের এক স্কুল ছাত্রী ঘরের আড়ার সাথে ওড়না পেঁছিয়ে আত্মহত্যা করে।

ভারতীয় চটকদার পোশাকের বিরুদ্ধে আমাদের রুখে দাড়াতে হবে। তৈরি করতে হবে গণমত। দেশীয় পণ্যের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার স্বার্থে ঈদে ভারতীয় পোশাক বর্জনের জন্য এখন দরকার সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা।

Advertisement

কমেন্টস