বাদশাহ সালমানের প্রভাবে পাল্টে যাচ্ছে সৌদি আরব

প্রকাশঃ অক্টোবর ১৩, ২০১৭

বিডিমর্নিং ডেস্ক-

সাম্প্রতিক সময়ে ঘটা বেশ কিছু ঘটনার মধ্য দিয়ে আলোচনা-সমালোচনার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে রক্ষণশীল দেশ সৌদি আরব। কেউ কখনও ভাবতে পারেনি রক্ষণশীল এই দেশটিতে এসব পরিবর্তন আসবে! দেশটিতে ইতিমধ্যে নারীদের গাড়ি চালানোর অনুমতি দেওয়া, স্টেডিয়ামে ঢুকে কনসার্ট দেখা, সিনেমার অনুমতি দেওয়া, পশ্চিমাদের মতো সমুদ্রের পরিবেশ তৈরির ঘোষণা দিয়ে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

আসলেই কি বাদশাহ সালমানের প্রভাবে পাল্টে যাচ্ছে রক্ষণশীল দেশখ্যাত সৌদি আরব?

এদিকে সৌদির শাসকরা একসময় ধর্মীয় নেতাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা শিক্ষা ও আইনি ব্যবস্থায়ও সংস্কার আনতে শুরু করেছেন। এ ছাড়া ধর্মের বাইরে গিয়ে জাতীয় পরিচয়ের বিষয়গুলোকে উৎসাহ দিতে শুরু করেছেন তাঁরা। এর আগে সৌদিতে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে জাতীয় দিবস পালনের বিরোধিতা করে আসছিলেন প্রভাবশালী আলেমরা। তবে সেই জায়গা থেকে বেরিয়ে বর্তমানে দেশটি শুধু দিবস উদযাপনই নয়, অন্য ধর্মাবলম্বীদের কিছু ঐতিহাসিক স্থাপনা সংস্কারেও নজর দিয়েছে। আর জাতীয় দিবসের চার দিনের পুরো আয়োজনটা সবার জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে।

অপরদিকে রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ৮৭তম বার্ষিকীতে স্টেডিয়ামে প্রথমবারের মতো নারীদের প্রবেশ করতে দিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রভাবশালী দেশ সৌদি আরব।

১৯৩২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর সৌদি রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর চলতি বছরের (২৩ সেপ্টেম্বর) গত শনিবার জাতীয় একটি স্টেডিয়ামে প্রবেশ করেন নারীরা। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর নজিরবিহীন এই আয়োজনে ছিল কনসার্টসহ বর্ণাঢ্য কর্মসূচি। জাতীয় মর্যাদা ও মানুষের জীবনমানের উন্নয়নে সরকারি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এসব কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।

এমনকি জাতীয় দিবস উপলক্ষে শনিবার রাতে রাজধানী রিয়াদের স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত একটি ক্ষুদ্র গীতিনাটিকা দেখার সুযোগ পান নারীরা। একই দিনে লোহিত সাগর তীরবর্তী শহর জেদ্দায় একটি কনসার্ট অনুষ্ঠিত হয়, যাতে অংশ নেন ১১ আরব শিল্পী। পাশাপাশি ফাটানো হয় আতশবাজি, প্রদর্শন করা হয় ঐতিহ্যবাহী লোকনৃত্য।

এরপর গত ২৬ সেপ্টেম্বর গাড়ি চালানোর ক্ষেত্রে নারীদের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে সৌদি আরব। এখন থেকে দেশটিতে নারীদের গাড়ি চালাতে আর কোনো বাধা নেই। এর আগে বিশ্বের মধ্যে সৌদি আরব একমাত্র দেশ যেখানে নারীদের গাড়ি চালানোর ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা ছিল। দেশটির অধিকার সংগঠনগুলো বছরের পর বছর নারীদের গাড়ি চালানোর পক্ষে অনুমোদন আদায়ের জন্য কাজ করেছে। এমনকি আইন অমান্য করায় কিছু নারীকে কারাগারেও যেতে হয়েছে।

নারীদের গাড়ি চালানোর অনুমতি প্রদানের পর গত (২৮ সেপ্টেম্বর) প্রথমবারের মতো দূতাবাসে নারী মুখপাত্র নিয়োগ দিয়েছে সৌদি আরব। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে সৌদি দূতাবাসের মুখপাত্র হিসেবে ফাতিমা বাইশেন নামে এক নারীকে এই নিয়োগ দেয়া হয়েছে।

এরপর গত ৩০ সেপ্টেম্বর সৌদি আরবের নারীদের গাড়ি চালানোর অনুমতি দিয়ে রাজকীয় ফরমান জারির পর এবার তাঁদের ফতোয়া দেওয়ার ক্ষমতা দিতে একমত হয়েছে দেশটির শুরা কাউন্সিল। এর আগে সৌদি শুরা কাউন্সিলের ১০৭ সদস্য নারীদের ফতোয়ার ক্ষমতার দেওয়ার পক্ষে ভোট দেন। ফতোয়া দেওয়ার জন্য নারী মুফতিদের রাজকীয় ফরমান জারি করে নিয়োগ দেওয়া হবে।

এর আগে দেশটির ফতোয়া কর্তৃপক্ষ সূরা কাউন্সিলের সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক করে। সেখানে এক সদস্য ফতোয়া দানে নারীদের ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব আনেন। চলতি বছর মার্চে সৌদি নারীরা দাবি করেন, ফতোয়া দেওয়ার ক্ষমতা শুধু পুরুষদের হাতে দেওয়া যাবে না।

বাদশাহ সালমানের শাসনামলে সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতিতে এসব তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তনগুলো সকলের চোখেই ধরা দিয়েছে। সৌদি আরব সত্যি বদলে যাচ্ছে কি না, তা নিয়ে নানান বিচার-বিশ্লেষণ চলছে।

এছাড়া আরবের পরিবর্তনে তরুণ প্রতিরক্ষামন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। ২০১৫ সালের মার্চে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ইয়েমেনে হুতি বিদ্রোহী ও তাদের মিত্রদের বিরুদ্ধে বিমান হামলা শুরু করে। এই অভিযান দেখভালের দায়িত্বে আছেন মোহাম্মদ বিন সালমান।

ইয়েমেনে বিমান হামলায় বেসামরিক লোকজনের ব্যাপক প্রাণহানিতে সমালোচিত হচ্ছে সৌদি আরব। তবে এই সমালোচনায় কান দিচ্ছে না রিয়াদ। ইয়েমেন সংকটে সৌদি আরবের ভূমিকা রিয়াদের অধিক আগ্রাসী নীতি অনুসরণের ইঙ্গিত দেয়।

২০১৭ সালের মে মাসে ট্রাম্প তাঁর প্রথম বিদেশে সফরে সৌদি আরব যান। ট্রাম্পের প্রথম বিদেশ সফরের জন্য সৌদি আরবকে বেছে নেওয়ার বিষয়টি রিয়াদের জন্য একটা বড় কূটনৈতিক বিজয়। ট্রাম্পের এই সফর আয়োজনে কারিগরের ভূমিকায় ছিলেন মোহাম্মদ বিন সালমান।

ট্রাম্পের সৌদি আরব সফরে ওয়াশিংটন ও রিয়াদের মধ্যে কয়েক শ কোটি ডলার মূল্যের চুক্তি হয়। এর মধ্যে সৌদি আরবের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের ১১০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের অস্ত্র বিক্রির চুক্তিও আছে। এই সফরের পর বিশ্বরাজনীতির মঞ্চে এক নতুন সৌদি আরবের আত্মপ্রকাশ ঘটেছে। তারা বিশ্বকে তাদের গুরুত্ব বুঝিয়ে দিয়েছে।

গত জুনে সৌদি আরব ও তার কয়েকটি মিত্র দেশ একযোগে কাতারের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছেদ করে। তারা কাতারের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদে মদদ ও ইরানের খুব ঘনিষ্ঠ হওয়ার অভিযোগ আনে। তারা কাতারের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে। কাতারের সঙ্গে স্থল, নৌ ও আকাশপথের যোগাযোগ বন্ধ করে দেয় সৌদি আরব। সৌদি জোটের আনা অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে দোহা। কাতারকে একঘরে করার পদক্ষেপ আরব বিশ্বে সৌদি আরবের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টারই অংশ।

আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে নিজের অবস্থান আরও জোরদার করতে সৌদি আরবকে ইদানীং বেশ তৎপর দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে প্রতিপক্ষ ইরান ও তার মিত্রদের জব্দ করতে রিয়াদ সব ধরনের চেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছে। নিজের দল ভারী করতে সামরিক ও আঞ্চলিক জোট করছে সৌদি আরব।

নারীর অধিকারের প্রশ্নে রক্ষণশীল সৌদি আরবের সাম্প্রতিক কিছু সিদ্ধান্ত সবাইকে রীতিমতো বিস্মিত করেছে। ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে সৌদি আরব প্রথমবারের মতো দেশটির নারীদের প্রার্থী ও ভোটার হওয়ার সুযোগ করে দেয়। গত মাসের শেষ দিকে নারীদের গাড়ি চালানোর অনুমতিসংক্রান্ত একটি আদেশ জারি করেন সৌদি বাদশাহ। আদেশটি ২০১৮ সালের জুনে কার্যকর হবে। এ মাসেই সৌদি আরবের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীদের মুঠোফোন ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

তা ছাড়া সম্প্রতি দেশটির একটি স্টেডিয়ামে প্রথমবারের মতো নারীদের প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। সৌদি আরবের এসব পদক্ষেপ নারীর অধিকারের ব্যাপারে দেশটির কট্টর নীতিতে কিছুটা হলেও নমনীয়তার আভাস দেয়।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সৌদি আরবের বন্ধুত্ব বেশ পুরোনো। সামরিক সহায়তাসহ বিভিন্ন বিষয়ে রিয়াদ এত দিন ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভর করে আসছিল। এবার রিয়াদের ওয়াশিংটন-নির্ভরশীলতার নীতিতেও বদল লক্ষণীয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বী রাশিয়ার দিকে ঝুঁকেছে সৌদি আরব। মস্কোর সঙ্গে দীর্ঘ দিনের শত্রুতা ঘুচিয়ে বন্ধুত্বের পথে হাঁটছে রিয়াদ।

চলতি মাসের শুরুর দিকে রাশিয়া সফর করেন সৌদি বাদশাহ। এই প্রথম কোনো সৌদি বাদশা রাষ্ট্রীয় সফরে রাশিয়া গেলেন। বাদশার সফরকালে রাশিয়া থেকে অস্ত্র কেনার চুক্তি করেছে সৌদি আরব। দুই দেশের মধ্যে জ্বালানি চুক্তিও হয়েছে। বাদশাহ সালমানের রাশিয়া সফরকে ‘ঐতিহাসিক’ হিসেবে বর্ণনা করা হচ্ছে। তাঁর মস্কো সফর রাশিয়ার ব্যাপারে সৌদি আরবের নতুন দৃষ্টিভঙ্গিই বহিঃপ্রকাশ। একই সঙ্গে ওয়াশিংটনসহ অন্যদের জন্যও এই সফর একটি বার্তা—রিয়াদের নীতির বদল ঘটছে।

২০১৬ সালের এপ্রিলে সৌদি সরকার বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংস্কার পরিকল্পনা অনুমোদন করে। ‘ভিশন ২০৩০’ নামের এই মহাপরিকল্পনার পেছনে আছেন মোহাম্মদ বিন সালমান। মহাপরিকল্পনার লক্ষ্য দেশটির তেলনির্ভর অর্থনীতিতে বৈচিত্র্য আনা। তেলের রাজস্বের ওপর নির্ভরশীলতা কমানো। তেলের বাইরে অন্য খাতে ভালো কর্মসংস্থান সৃষ্টি। রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি সৌদি আরামকোর একটি অংশ বেসরকারীকরণও এই মহাপরিকল্পনার অন্তভুক্ত। ‘ভিশন ২০৩০’ বাস্তবায়িত হলে সৌদি অর্থনীতিতে তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন আসবে।

প্রসঙ্গত, বছর তিনেক আগে সৎভাই আবদুল্লাহর মৃত্যুর পর তাঁর উত্তরসূরি হিসেবে সৌদি আরবের সিংহাসনে আরোহণ করেন সালমান। সিংহাসনে বসেই গুরুত্বপূর্ণ পদে রদবদল আনেন তিনি।

ভাতিজা মোহাম্মদ বিন নায়েফকে করেন ক্রাউন প্রিন্স, অর্থাৎ রাজবংশের পরবর্তী উত্তরসূরি। আর ছেলে মোহাম্মদ বিন সালমানকে করেন ডেপুটি ক্রাউন প্রিন্স। তাঁকে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর পদ দেওয়া হয়।

পছন্দের ছেলেকে আগে থেকেই প্রস্তুত করছিলেন সালমান। সে অনুযায়ী চলতি বছরের জুনে বাদশাহ তাঁর ৩১ বছর বয়সী ছেলেকে ক্রাউন প্রিন্স বা যুবরাজ ঘোষণা করেন। উত্তরসূরির পদ থেকে সরিয়ে দেন ভাতিজা নায়েফকে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে বাদশাহ ক্ষমতা নিজের হাতে কেন্দ্রীভূত করেছেন।

কমেন্টস