রূপার শেষ আর্তনাদের স্মৃতি ‘সেই বাসটি’ পাচ্ছে তাঁর পরিবার

প্রকাশঃ ফেব্রুয়ারি ১২, ২০১৮

'সেই বাস'

নারী ডেস্ক স্পেশাল-

রূপার কথা কি মনে আছে? খানিক মনে করিয়ে দিই। জাকিয়া সুলতানা রুপা। সেই রূপা, টাঙ্গাইলের মধুপুরে চলন্ত বাসে যাকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছিলো। রুপার আর্তনাদের স্মৃতি ‘সেই বাসটি’ রূপার পরিবারকে দিয়ে দেয়ার আদেশ এসেছে আদালত থেকে। 

‘সেই বাসটি’। রুপার সাথে ঘটে যাওয়া অজানা সেই ভয়ংকর অভিজ্ঞতার সাক্ষী হলো ‘সেই বাস’। একটি চলন্ত বাস। স্বাভাবিকের তুলনায় দ্রুত গতিতে চলছে। বাসের পিছনের নোংরা সিটে টেনে হিচড়ে  ভাগ করে নিচ্ছে কিছু নরাধম। রূপার চোখে তখন তাঁর অসম্পন্ন সব স্বপ্নের হাতছানি। বাঁচার আকাংখ্যা। কিন্তু রেহায় পায়নি সে। মৃত্যুর শেষ আর্তনাদ টাও বাসের বাইরে যেতে পারেনি। ‘সেই বাসের মধ্যেই ছটফট করে শেষ হয়ে গেলো কারো মেয়ে, কারো বোন আর একজন রূপা। অজানা আর্তনাদের স্মৃতিমাখা সেই বাসটি পাচ্ছে রূপার পরিবার।

আজ সোমবার সকালে জেলার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক আবুল মনসুর মিয়া মামলায় বাসের চালক ও তার সহযোগীসহ চার জনের ফাঁসি, এক জনকে এক লাখ টাকা জরিমানা ও সাত বছরের কারাদন্ডের পাশাপাশি এই আদেশ দিয়ে রায় ঘোষণা করেন।

উল্লেখ্য, গত বছরের ২৫ আগস্ট বগুড়া থেকে ময়মনসিংহ যাওয়ার পথে ছোঁয়া পরিবহনের একটি বাসে (ঢাকা-মেট্রো-ব-১৪-৩৯৬৩) রূপাকে গণধর্ষণ করেন পরিবহন শ্রমিকরা। বাসেই রূপাকে হত্যার পর মধুপুর উপজেলায় পঁচিশমাইল এলাকায় বনের মধ্যে তাঁর মরদেহ ফেলে রেখে যায়। এলাকাবাসীর কাছ থেকে খবর পেয়ে পুলিশ ওই রাতেই অজ্ঞাতপরিচয় নারী হিসেবে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে। তারপরে রূপার পরিবার সুবিচারের দাবিতে মামলা লড়তে থাকেন।

অভিযুক্ত অপরাধীরা

যাদেরকে মৃত্যুদন্ড দিয়েছেন তারা হলেন ছোঁয়া পরিবহনের চালক হাবিবুর রহমান, তার সহকারী শামীম, আকরাম ও জাহাঙ্গীর। অপর আসামি ওই পরিবহনের সুপারভাইজার সফর আলীকে দেয়া হয় সাত বছরের কারদন্ড। সেই সাথে সফর আলীকে এক লক্ষ টাকা অর্থদন্ড দেওয়া হয়।

সারাদেশে তোলপাড় ফেলা এই মামলার রায় নিয়ে সন্তোষ হয়ে মানবধিকার কর্মীরা সবাই আশস্ত হয়ে জানিয়েছেন তাদের মন্তব্য। তাদের মনে করছেন, রূপার এই মামলার রায় থেকে নতুন এক দৃষ্টান্তের সূচনা হয়েছে। যা দেশ ও জাতির জন্য, বিশেষত নারীর নিরাপত্তার জন্য একটি আদর্শ হয়ে থাকবে।

এই রায়ে সন্তোষ জানিয়ে রূপার ভাই হাফিজুর রহমান বিডিমর্নিং কে বলেন, ‘আমার বোনটাকে হয়তো আমি পাবো না, কিন্তু সুবিচার পেয়েছি। আর কোনো ভাই যেনো তাদের বোনের লাশ বইতে না হয়। আর কোনো রুপাকে যেনো বলি হতে না হয়। সকল রুপারা নিরাপদে থাকুক। আমার বোন আজ যেখানেই আছে, হয়তো তাঁর আজ মুক্তি হলো’। বলতেই কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন হাফিজ।

রাষ্ট্রপক্ষে মামলা পরিচালনাকারী আইনজীবী আতাউর রহমান আজাদ ও এস আকবর খান দ্রুততম সময়ে বিচার শেষ করায় সন্তোষ জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘এত অল্প সময়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে এ ধরনের মামলার রায় ইতিপূর্বে লক্ষ্য করিনি। যারা ধর্ষণ ও নারীর প্রতি সহিংসতায় লিপ্ত তারা এই রায় থেকে  শিক্ষা নেবে। এ রায়ের মধ্য দিয়ে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।’

তবে আসামিপক্ষে মামলা পরিচালনাকারী আইনজীবী শামীম চৌধুরী দয়াল ও দেলোয়ার হোসেন দাবি করেছেন, তারা ন্যয়বিচার পাননি। শামীম বলেন, ‘রাষ্ট্রপক্ষ আদালতে যেসব সাক্ষ্য প্রমাণ উত্থাপন করেছে সেখানে দোষ প্রমাণ হয়নি। যে আলামত রাষ্ট্রপক্ষ সংগ্রহ করেছে সেখানেও রূপা প্রমাণ হয়নি। আমরা এ রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করব।’

কমেন্টস