আমাদের স্বপ্নের বিস্ফোরণ ঘটাবে কে?

প্রকাশঃ নভেম্বর ১৩, ২০১৭

ছবি-সংগ্রীহীত।

বিডিমর্নিং ডেস্ক-

গত ২৫ অক্টোবর, ২০১৭ বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে ‘জাতীয় পাঠাগার আন্দোলন-জাপাআ’ উদ্বোধন করলো ১০টি পাঠাগার।এ সময় প্রতিটি পাঠাগার প্রতিনিধির হাতে তুলে দেন বই। পাঠাগারগুলো উদ্বোধন করেছেন ব্রিটিশ কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. মতিউল আলম।

প্রতিটি গ্রামে অন্তত একটি করে পাঠাগার গড়ার মাধ্যমে কোটি পাঠক সৃষ্টির লক্ষ্যে, ব্যক্তি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত দেশের সকল পাঠাগারকে একই মঞ্চে একত্রিত করতে ও প্রতিষ্ঠার পর বন্ধ পাঠাগারগুলোকে পুন:রায় চালু করতে কাজ করে যাচ্ছে জাপাআ।

অনন্য এই উদ্যোগের সষ্ট্রা তরুণ উদ্যোক্তা ও লেখক ইঞ্জি. আরিফ চৌধুরী শুভ। ২০১৫ সালের ২২ জানুয়ারী সংগঠনটির যাত্রা শুরু। পাঠাগার উদ্বোধন অনুষ্ঠানে পাঠক ও পাঠাগার প্রতিনিধিদের মুখোমুখি হন জাতীয় পাঠাগার আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি ইঞ্জি. আরিফ চৌধুরী শুভ। পাঠকদের জন্যে বিডিমনিং এর পক্ষ থেকে তার বক্তব্যের সংক্ষেপিত ও সংযোযিত অংশ প্রকাশ করা হলো।

প্রিয় সুধি ও মঞ্চের আলোকিত মুখ, সবাইকে আমার সালাম জানাই। এই মঞ্চ আজ আপনারা আলোকিত করেছেন। তাই আমরা আনন্দিত। অভিনন্দিত পাঠাগার আন্দোলন পরিবারও। বাকি জীবনে এমন আনন্দ নিয়েই আমরা বেঁচে থাকতে চাই। আর প্রত্যেকেই বেঁচে থাকতে চাই প্রত্যেকের জীবনের প্রধান চালিকা শক্তি স্বপ্ন নিয়ে।

আমার কাছে জীবনের আরেক নাম স্বপ্ন। জীবন বেঁচে থাকে স্বপ্নের বাড়িতে। তাই না? আমাদের প্রত্যেকের মনে অন্তত একটি করে স্বপ্নের বাড়ি রয়েছে। প্রত্যেকের স্বপ্ন দিয়ে সেই বাড়ি প্রতিনিয়ত সজ্জিত হয়। এ বাড়ি বৃক্ষের মতো যেমন বৃদ্ধি পায়, তেমনি শ্রোত হারানো নদীর মতো মরেও যায়। আমরাও মরে যাব একদিন। কিন্তু আমরা স্বপ্ন দেখি বলে হতাশাগুলো মরে যায়। জিতে যাই আমরা।

স্বপ্ন দেখি বলে মরুভূমির বালিতে শিশির জমে। স্বপ্নহীন জীবনে দীর্ঘ হতাশারা জয়ী হয়ে ফড়িংয়ের মতো নাচে। এটা তারুণ্যেও জন্য লজ্জার। আজকের তারুণ্য ফড়িং এর জীবন নয়। আমরা প্রত্যেকেই স্বপ্নের রাজত্বে একাকি বাস করি। স্বপ্নের রাজত্বে যৌথ স্বপ্নরা সবচেয়ে বেশি সফল। একাকি স্বপ্নের চেয়ে যৌথ স্বপ্ন পৃথিবীকে আলোকিত পথ দেখায়। আশা করি জাতীয় পাঠাগার আন্দোলন এই পৃথিবীর মনুষ্য স্বপ্নগুলোর বিস্ফোরণ ঘটাতে পারবে।আজকের দিনটি আমার কাছে স্বপ্নের মতো। কিন্তু এটি কঠিন বাস্তব ও সত্য। এই বাস্তবতা আপনারা এনে দিয়েছেন। আমি মার্টিন লুথার কিং এর মতো স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসি।

আজ এখানে যারা দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পাঠাগার গড়ার জন্যে উপস্থিত হয়েছেন, আমার মতো আপনারাও একাকি এই স্বপ্ন দেখেছেন নিশ্চয়। অবশেষে আমরা সবাই স্বপ্নের মোহনায় মিলিত হয়েছি। আমাদের স্বপ্ন সত্য, সৎ ও মঙ্গলজনক। সারাদেশের পাঠাগার গড়ার স্বপ্নগুলোকে আমরা এক মোহনায় মিলাতে চাই। প্রত্যেকের স্বপ্নের বিস্ফোরণ ঘটাতে চাই। এটা কিভাবে ঘটাবো সেটি আপনারা বলে দিবেন। জাতীয় পাঠাগার আন্দোলনের মাধ্যমে এই স্বপ্নের বিস্ফোরণ ঘটাতে চাই। আমাদের প্রত্যেকের মনে রাখা উচিত আমাদের স্বপ্নের বিস্ফোরণ ঘটাবে কে? আমি বলবো আমাদের প্রত্যেকের স্বপ্নের বিস্ফোরণ আমাদেরকেই ঘটাতে হবে। তাহলেই স্বপ্নের পৃথিবী সফল হবে আজ ও আগামীর জন্যে।

আমরা এক সাথে চলতে চাই। আশা করি আমাদের শুরুটা আমাদের গন্তব্যে পৌঁছার জন্যে যতেষ্ঠ উপযুক্ত ও সময়ের দাবি। এই মুহুর্তে আমাদের মস্তিষ্কে একটা আন্দোলন করা দরকার। সেটি হলো পাঠাগার আন্দোলন। আশা করি আমরা এই আন্দোলনে একসাথে চলতে পারবো আজ এবং আগামীতে। আপনারা কত মূল্যবান কাজ রেখে আজ যেখানে উপস্থিত হয়েছেন, সেটিও একজন আলোকিত মানুষের আন্দোলন। তাঁর স্বপ্নের বিস্ফোরণ। তাই আমি আবারো বলছি আমাদের স্বপ্নের বিস্ফোরণ আমাদেরকেই ঘটাতে হবে। তিনি আজ অসুস্থ না হলে আমার কথাগুলো এই মঞ্চে বসেই শুনতেন। এই মুহুর্তে খুব মিস করছি আলোকিত মানুষ চাই এর প্রবক্তা ও বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারকে। জাতীয় পাঠাগার আন্দোলনের পক্ষ থেকে তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।

আজ এই মঞ্চে উপস্থিত হয়েছেন ব্রিটিশ কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক প্রফেসর ড. মতিউল আলম। তিঁনি শুধু জাতীয় পাঠাগার আন্দোলনের প্রোগ্রামে অংশগ্রহণের জন্যে সুদূর কলম্বিয়া থেকে দেশে এসেছেন। এই প্রোগ্রাম শেষেই তিনি বিমানবন্দরের দিকে রওয়ানা দিবেন। প্রোগ্রাম সংক্ষিপ্ত করার জন্যে এই মুহুর্তে আমার মোবাইলে একটি ক্ষুদে বার্তাও এসেছে তার পক্ষে। এতটাই ভালোবাসেন বই আর বইয়ের আন্দোলন তা তিনি আজ আমাদের মাঝে উপস্থিত হয়ে প্রমাণ করলেন। আমি হৃদয় থেকে তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।

শিক্ষায় ভ্যাট বিরোধী আন্দোলনের সময় তার সাথে আমার পরিচয়। এভাবে পরিচিত হয়েছি তারুণ্যের প্রাণ ও আমাদের অনেকেরই প্রিয় ব্যক্তিত্ব ফারুক ওয়াসিফ, সহকারি পুলিশ কমিশনার আশরাফ উল্লাহ, সাংবাদিক ও উদ্দিপ্ত তারুণ্যের প্রিয়মুখ সাংবাদিক আরিফুল সাজ্জাত, গ্লোবাল এইচ টির চেয়ারম্যান তানবীরুল মাহিমসহ আরো অনেকের সাথে। মিস করছি অনুউস্থিত আরো অনেককে। এদের প্রত্যেকের চোখে সমাজ পরিবর্তনের এক দীপ্ত শক্তি আমি দেখেছি। ফারুক ওয়াসিফের লেখা আমাকে শিহরীত করে। আমার আলোকিত পাঠাগারে কমপক্ষে তার ১০০টিরও বেশি কলাম কাটিং রয়েছে। তার বইও আমার অনেক প্রিয়। ভ্যাট আন্দোলনের সময় ফারুক ওয়াসিফের লেখা শিক্ষার্থীদের দারুন আন্দোলিত করেছে।

আন্দোলনে জয়ী হওয়ার পরের দিন প্রথম আলোর দাওয়াতে আমি যখন প্রথম আলো অফিসে উপস্থিত হই তখন আমার চোখ দিয়ে আগুন বের হচ্ছিল। রোদে রোদে আন্দোলন করতে করতে পুরো শরীর জন্ডিসের দখলে চলে গেছে। আমার পকেটে টাকা ছিল না ঔষধ কেনার। ফারুক ওয়াসিফ আমার চেহারার দিকে তাকিয়ে পকেট থেকে কিছু টাকা জোর করে হাতে দিয়ে বললেন, যাও ঔষধ কেনে খেয় আর বাসায় রেস্ট কর একটানা। তোমরা আমাদের প্রজন্মের জন্য, উচ্চ শিক্ষার জন্যে যা করলে তা সত্যি কিংবদন্তিরই কাজ। ইতিহাসকে নতুন করে ভাবালে আরেকবার। তিঁনি অন্যদের মতো ফেবুতে কিংবদন্তির উপাধি দিয়ে বিজয়ী অভিনন্দনও জানিয়েছেন আমাকে।

যেদিন প্রথম প্রফেসর মতিউল আলম কলম্বিয়া থেকে আমাকে ফোন করেছেন, সেদিন প্রথমেই জিজ্ঞেস করেছেন আমি কি শুধু আন্দোলনই করি নাকি পড়াশুনা ও ঠিক মতো খাওয়া দাওয়া ও করি। চ্যানেল ২৪ এর আরিফুল সাজ্জাত সজীব যখনই আমাকে দেখতেন ঠিক একই প্রশ্ন করতেন। এটা শুধু তাদের ক্ষেত্রেই সম্ভব, যাদের অভিন্ন হৃদয়ে মানবতা আর নিষ্পাপ ভালোবাসা রয়েছে। অহিংস আত্মাগুলোকে একত্রিত করার অদম্য রয়েছে। আমাদের মধ্যে বয়সের প্রার্থক্য আছে ঠিকই, কিন্তু আমাদের স্বপ্নের পার্থক্য নাই। এই অভিন্ন স্বপ্নই আজ আমাদেরকে একমঞ্চে একত্রিত করেছে। ভবিষ্যতে আমরা আরো বড় পরিসরেও একত্রিত হব পাঠাগার আন্দোলনের হয়ে।

আমরা একঝাঁক অভিন্ন হৃদয় জাতীয় পাঠাগার আন্দোলনের মাধ্যমে সারাদেশে ব্যক্তি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত সকল পাঠাগারকে একটি ছাতার নিচে আনতে কাজ করিছ। যে সকল পাঠাগারগুলো প্রয়োজনীয় সহযোগিতার অভাবে চালু হবার পর বন্ধ হয়ে আছে, সেগুলোকে পুনরায় চালু করার উদ্যোগ নিয়েছি। প্রতিটি গ্রামে একটি করে নতুন পাঠাগার স্থাপনের জন্যে উদ্যোগি মানুষকে খুঁজে পাঠাগার স্থাপন করছি। পাঠাগার স্থাপনের মাধ্যমে একদিন কোটি পাঠক সৃষ্টি হবে আমাদের বিশ্বাস। আমরা বিশ্বাস করি সংস্কৃতমনা ব্যক্তিরা কখনো হিংসা ও প্রতিশোধ প্রবন হন না।

আজ আমরা সারাদেশে ১০টি পাঠাগার উদ্বোধন করেছি। এই সংখ্যা ভবিষ্যতে ১০ লাখেও পৌঁছাতে পারে। পাঠাগার আন্দোলন ছড়িয়ে পড়তে পারে সারাবিশ্বে। আমরা বিশ্বাস করি দেশের প্রতিটি পরিবার হয়ে উঠবে একটি পাঠাগার। প্রতিটি মনে বাস করবে একটি পাঠাগার। প্রতিটি গ্রামে যদি একটি করে পাঠাগার থাকতো, তাহলে বাংলাদেশের ৬৮ হাজার গ্রামে ৬৮ হাজার পাঠাগার থাকার কথা। কিন্তু সারাদেশে সরকারি পাঠাগারের সংখ্যা ৭১টি এবং বেসরকারি পাঠাগারের সংখ্যা প্রায় ১১৬৮টি। এই সংখ্যারও গরমিল থাকতে পারে। আমাদের জনসংখ্যার তুলনায় এটি সত্যি আমাদের জন্যে কখনো সুখবর হতে পারে না।

পৃথিবীর প্রথম পাঠাগার, ‘ভ্যাটিকান পাঠাগারটি’ও ব্যক্তি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আশা করি আমরা প্রত্যেকে উদ্যোগি হলে আমাদের দেশ পাঠাগারে পাঠাগারে ভরে উঠবে। তার জন্যে আমাদের যেমনি বেশি বেশি করে পড়তে হবে, তেমনি সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে জাতীয় পাঠাগার আন্দোলনের পাশে নি:স্বার্থ ভাবে দাঁড়াতে হবে। আশা করি সরকার ও বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান আমাদের পাঠাগার গড়ার স্বপ্নের বিষ্পোরণ ঘটাতে এগিয়ে আসবেন।

বক্তব্য শেষ করার আগে আপনাদেরকে আমাদের স্লোগানটি শোনাতে চাই। শুধু পাঠাগার গড়লেই হবে না। আমাদের পাঠাগার গড়ার আগে বেশি বেশি পড়তেও হবে। তাই আমি স্লোগান দিয়েছি ‘বই পড়ি পাঠাগার গড়ি’। জাতীয় পাঠাগার আন্দোলনের মঙ্গল কামনা করি। সবার দীর্ঘায়ু কামনা করি। সবাইকে আবারো সালাম জানচ্ছি।

কমেন্টস