আমি সুব্রত বাইন বলছি…

প্রকাশঃ জুলাই ৩১, ২০১৭

মনিরুল ইসলাম।।

মেয়ের বিয়ে। দম ফেলার ফুরসত নাই। এদিক ওদিক ছোটাছুটি করতে হচ্ছে। নানারকম যোগাড়-যন্ত্র নিয়ে ছালাম সাহেব ব্যস্ত। বিয়ের সাত দিন বাকি। ছেলেটি আমেরিকা থেকে ফ্লাই করেছে। ঢাকায় এলে তাকে কাজে লাগানো যাবে। ক’দিন তিনি ব্যবসার কাজেও সময় দিতে পারছেন না। কিছু কিছু মানুষকে নিজে গিয়ে দাওয়াত দিতে হয়। রাস্তায় ট্রাফিকের খারাপ অবস্থা। রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির প্রতিযোগিতা চলছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় কেটে যায়। টেবিলে নাস্তা দেয়া হয়েছে। আজ গন্তব্য সচিবালয়। কয়েকজন মন্ত্রীকে দাওয়াত দেবেন। মেয়েটা ক্লাশে গেছে। স্ত্রী মারা গেছে পাঁচ বছর। ছেলেমেয়ের কথা চিন্তা করে ছালাম সাহেব আর বিয়ের কথা ভাবেন নি।

দুই বছর হলো ছেলেটা নিউইয়র্কে। এত বড় বাড়িতে দুজন মাত্র মানুষ। মেয়েটাকে তিনি বড় ভালোবাসেন। স্ত্রী মারা যাওয়ার পর সে-ই তার একমাত্র বন্ধু। বড়ঘরে মেয়ের বিয়ে হচ্ছে। আয়োজনে কোনোরকম ঘাটতি রাখতে চান না। টাকার চিন্তা নাই। আল্লাহ তাকে যথেষ্ট দিয়েছেন। ছালাম সাহেব নাস্তার টেবিলে। পাউরুটিতে জেলি মাখাচ্ছেন। ফোন বেজে ওঠে। স্ক্রিনে অপরিচিত নম্বর দেখে ইতস্ততঃ করেন। জরুরি ফোনও হতে পারে। তিনি ফোন ধরেন।

ছালাম সাহেব, ‘ওয়ালাইকুম আস সালাম’ বলে জবাব দেন। ওপাশের প্রশ্নের জবাবে তিনিই আবদুছ ছালাম স্বীকার করেন। ছালাম সাহেব ওপাশে কে তা বোঝার চেষ্টা করেন। তিনি কন্ঠের মিল খোঁজার চেষ্টা করেন। না মিলছে না, পরিচিত কেউ না। অভ্যাসবশতঃ পরিচয় জিজ্ঞাসা করেন। পরিচয় না দিয়ে ‘বসের সাথে কথা বলেন’ বলে আরেকজনকে ফোন দিয়ে দেয়। এবার গুরুগম্ভীর কন্ঠ ওপাশে- ‘আমি সুব্রত বাইন বলছি’। কোন সুব্রত বাইন জানতে চাইলে শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইন বলে পরিচয় দেয়। ছালাম সাহেব এক মূহূর্ত চিন্তা করেন। বুঝতে চান সুব্রত বাইনের সাথে তার কোনো কাজ থাকতে পারে কিনা।

‘আমার কাছে কি চান?’- ছালাম সাহেব জানতে চান। সুব্রত বাইন নিজেই বলতে থাকে। তার দলের ছেলেদের সাথে পুলিশের গোলাগুলি হয়েছে। চারটা ছেলে গুরুতর আহত। তিনজন পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে। পাঁচটা অস্ত্র হাতছাড়া হয়ে গেছে। সুব্রত বাইনের এখন অনেক টাকা দরকার। আহত ছেলেদের চিকিৎসা করাতে হবে। যারা গ্রেপ্তার হয়েছে তাদের জামিন করাতে হবে। উকিলের সাথে ৪০ লাখ টাকার কন্ট্রাক্ট হয়েছে। অস্ত্রসহ ধরা পড়েছে তাই টাকার অংক বেড়েছে। নতুন করে অস্ত্র কিনতে হবে। বিদেশি অস্ত্র। তাতেও অনেক টাকা লাগবে। আহতদের বিদেশে নিতে হবে। অনেক খরচ। সুব্রত বাইন এক কোটি টাকার হিসেব দেয়। কিন্তু সুব্রত বাইন বিবেকহীন নয়। ছালাম সাহেবের মেয়ের বিয়েতে অনেক খরচ হবে। সুব্রত বাইন তাই বিবেচনা করে ছালাম সাহেবের কাছে মাত্র পঞ্চাশ লাখ টাকা সাহায্য চায়। সুব্রত বাইন সন্ত্রাসী হলেও ছালাম সাহেবের সাথে খুব ভদ্র ব্যবহার করছেন।

আমি সুব্রত বাইন বলছি...

ছালাম সাহেব বড় ব্যবসায়ী। জীবনে অনেকবারই অপ্রীতিকর অবস্থায় পড়েছেন। পুলিশের হর্তাকর্তাদের সাথে তার সুসম্পর্ক। ফলে কখনোই ঘাবড়ান নাই। এবারও বিচলিত হন না। তিনি কেন টাকা দেবেন বলতেই সুব্রত বাইনের সূর কিছুটা চড়া। চিবিয়ে চিবিয়ে বলে, ‘আপনার মেয়েতো নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে পড়ে। বিবিএ শেষ করেছে। এমবিএতে ক্লাশ করছে। নয়টার দিকে ধানমন্ডির বাসা থেকে বের হয়ে ক্লাশে যায়। ফিরতে ৩/৪টা বেজে যায়। ছেলেকেতো আমেরিকায় পাঠিয়েছেন। কিন্তু সেও তো দেশে আসছে। চুপচাপ করে টাকা দিয়ে দেন, আপনারই ভালো হবে। না’হলে আপনার মেয়ে বাসায় না এসে হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে যাবে। এসিড চেনেন তো। আপনার ছেলেকে কেটে সাত টুকরো করবো। ভয় নেই আমাদের ও বিবেক আছে। এক টুকরো আপনাকেও পাঠিয়ে দেবো।’

ছালাম সাহেবের সমস্ত শরীর কেঁপে ওঠে। তিনি ঘাবড়ে যান। তাঁর সমস্ত তথ্যই সুব্রত বাইন জানে। সুব্রত বাইন ফোন কেটে দেয়। ছালাম সাহেব নির্বাক হয়ে যান। তিনি জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে। তার কিছু হলে মেনে নেবেন। কিন্তু তার আদরের ছেলে মেয়ে। না, তাদের কোনো ক্ষতি তিনি ভাবতেই পারেন না। তাঁর সমস্ত সম্পত্তি তিনি দিয়ে দিতে পারেন তবুও ওদের কোনো ক্ষতি মেনে নেবেন না। টলতে টলতে তিনি ড্রইংরুমে যান। ধপাস করে সোফায় বসে পড়েন। তার মনে হয় এই কয় মিনিটে তার বয়স বিশ বছর বেড়ে গেছে। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আসছে। কলিং বেল চেপে পানি চেয়ে নেন। বারবার মেয়ের মুখ চোখের সামনে ভাসছে। সেদিন ট্রাফিক সিগন্যালে একটা ভিক্ষুক পয়সা চেয়েছিল। তার মুখের দিকে তাকিয়ে তার গা গুলিয়ে গিয়েছিল। মেয়েটার সমস্ত মুখমণ্ডল এসিডে পুড়ে বিকৃত। এখন আবার ঐ মেয়েটার বিকৃত মুখ চোখের সামনে দেখতে পান। হঠাৎ মনে হয় তিনি মেয়ের খবর নিচ্ছেন না কেন। মেয়ের ফোন অনেকক্ষন ধরে রিং হতে থাকে। ওপাশ থেকে সাড়াশব্দ নাই। ছালাম সাহেব বড় বিপন্ন বোধ করতে থাকেন।

আবার সুব্রত বাইনের ফোন। কাঁপা গলায় ছালাম সাহেব হ্যালো বলেন। সুব্রত বাইন তার মতামত জানতে চায়। তার সাঙ্গপাঙ্গরা তার বাসার সামনে অবস্থান করছে-সুব্রত বাইন তাও জানিয়ে দেয়। ছালাম সাহেব ততক্ষণে মনস্থির করে ফেলেছেন। পঞ্চাশ লাখ কোনো টাকাই নয় তার কাছে। তিনি টাকাটা দিয়ে দেবেন। ওপাশে সুব্রত বাইনের অধৈর্য কন্ঠ। কি মনে করে সুব্রত বাইন কিছুটা ডিসকাউন্ট দিতে চায়। পঞ্চাশ নয় চল্লিশ লাখ টাকা দিলেই হবে। ছালাম সাহেব মনে মনে সুব্রত বাইনের তারিফ করেন। লোকটা ততটা খারাপ নয়। তিনি তো পুরোটাই দিয়ে দেবেন। সুব্রত বাইন কিভাবে টাকাটা নেবে তা জানাতে আবার ফোন দেবে বলে ফোন ছেড়ে দেয়। আবার রিং হয়, ছালাম সাহেব ফোন ধরেন। মেয়ে ক্লাশ করছে। নিরাপদেই আছে। ছালাম সাহেব নিজের গাড়ি পাঠাবেন। ছালাম সাহেব কোনো ঝুঁকি নিতে চান না। তার গাড়িতে দু’জন আর্মড গার্ড থাকে। তারা নিরাপত্তা দিয়ে মেয়েকে বাসায় নিয়ে আসবে। ছালাম সাহেব মনে মনে কিছুটা স্বস্তিবোধ করেন। তিনি আজ আর সচিবালয়ে যাবেন না।

আরেকটি ফোন আসে। ছালাম সাহেবের বন্ধু, পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। তাঁর মিটিং পড়েছে, ছালাম সাহেবের সাথে আজ দেখা হবে না বলার জন্যই ফোন করেছেন। কি ভেবে ছালাম সাহেব তাকে সুব্রত বাইনের কথা খুলে বলেন। সব শুনে তিনি ছালাম সাহেবকে না ঘাবড়ানোর পরামর্শ দেন। ছালাম সাহেবকে তিনি সরাসরি তার অফিসে আসতে বলেন। রাস্তা কিছুটা ফাঁকা। কিছুক্ষণের মধ্যেই ছালাম সাহেব বন্ধুর অফিসে পৌঁছে যান। ডিআইজি সাহেব সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তার কক্ষে ডাকেন। তারা এই ধরনের কমপ্লেন প্রায়ই পান। পুরোটাই প্রতারক চক্রের কাজ। ছালাম সাহেব কনভিনসড হন না। তার ছেলেমেয়ের পুরো ডিটেইল্স কোথায় পেলো। যৌক্তিক প্রশ্ন। এত খুঁটিনাঁটি তথ্য সুব্রত বাইন কোথায় পেলো (চলবে..)।

ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলামের ফেসবুক থেকে নেয়া

কমেন্টস