‘বসুন্ধরা’ ছাড়া দেশের অন্যসব মিডিয়া জঙ্গিদের ‘বন্ধু’!

প্রকাশঃ মার্চ ৩, ২০১৭

ইসতিয়াক ইসতি।।

একটি ঘটনা কিংবা তথ্য উপস্থাপনের ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের ভূমিকা কেমন হওয়া উচিত তা গণমাধ্যমকর্মী কিংবা শিক্ষক যারা আছেন তারা ভাল বুঝতে পারেন। আর সত্যটা বলতে পারেন যারা সরেজমিনে উপস্থিত ও ভুক্তভোগী।

সকল তথ্য সংবাদ হয় না বরং সংবাদ তখনি হয় যখন এটি ব্যক্তি স্বার্থের উর্ধ্বে গিয়ে জনগণের নিয়ে করা হয়। নর্থ-সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় যে জায়গায় অবস্থিত সেটা বসুন্ধরা গ্রুপের আওতায়। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন আবাসিক হল না থাকায় দেশের বিভিন্নস্থান থেকে আসা শিক্ষার্থীরা বেশিরভাগই এই এলাকায় বসবাস করে। এখন প্রশ্ন হল গণমাধ্যমে আসা ‘জঙ্গি’ ছাত্ররা এতদিন বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় বসবাস করে কীভাবে যদি তারা ‘জঙ্গি ‘হয়ে থাকে। আর জঙ্গি যদি না হয় তাহলে তাদের কোন তথ্যের ভিত্তিতে ‘জঙ্গি’ বলা হলো? আর তারা যদি ‘জঙ্গি’ হয় প্রশাসন আগে থেকে জানলো না এতো বড় ঘটনা হয়ে গেল! তাহলে এতে বাংলাদেশের নিরাপত্তাকর্মীদের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলা হয় না কি? এবং গণমাধ্যম আগে থেকে জানলে তারা কেন বলেনি। এসব জঙ্গিদের এখন কি হবে। খুব অন্যরকম বিষয় যে তারা সবাই ছাত্র এবং এটা একটি ছাত্র আন্দোলন অন্যান্য গণমাধ্যমের তথ্যমতে।

বসুন্ধরা মিডিয়া গ্রুপের (ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেড) ক্রস চেক না থাকলেও বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থার দায়িত্ব পালনে বিন্দু পরিমাণ কমতি ছিল না। যারা মালিক পক্ষের চাপে নিজেদের ‘শহীদের রক্তের সমান মান ‘কলমের কালিকে বিসর্জন দিল তাদের কি হবে? সাংবাদিকতা কি শুধু একটা চাকরি? তাহলে এদের কথা কেন জনগণ বিশ্বাস করবে কিংবা এরাই কেন দেশ ও রাষ্ট্রের আয়নার ভূমিকা পালন করবে।

বাংলাদেশে প্রথম জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটে ১৯৯৯ সালে। ২০০১ সালের ১৪ এপ্রিল রমনা বটমূলে ছায়ানটের বাংলা নববর্ষবরণ অনুষ্ঠানে বোমা বিস্ফোরণ, ২০০৬ সালে বাংলা ভাইকে গ্রেফতার, ২০১৬ সালে গুলশানের কূটনৈতিক এলাকায় হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় জঙ্গি হামলা পর্যন্ত দেশে ঘটে যাওয়া প্রতিটি জঙ্গি হামলার সময় দেশের গণমাধ্যমগুলো কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সংবাদ প্রকাশ করেছেন এবং দেশের জঙ্গি নির্মূলে সংবাদ মাধ্যম অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে। কিন্তু বুধবার রাত থেকে ঢাকার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকাতে শুরু হওয়া ছাত্র অন্দোলনকে জঙ্গি হামলা বলে অপপ্রচারণা করেছে বসুন্ধরা গ্রুপের গণমাধ্যমগুলো।

যেখানে দেশের প্রধান প্রধান গণমাধ্যমগুলো এই আন্দোলনকে ছাত্র আন্দোলন বলে সংবাদ প্রকাশ করছে। কিন্তু বসুন্ধরা গ্রুপের গুটি কয়েক সংবাদ মাধ্যম আন্দোলনটিকেই জঙ্গি হামলা বলে অপপ্রচার চালাচ্ছে। যা হলুদ সাংবাদিকতাকেও হার মানায়।

একটু জেনে রাখা দরকার হলুদ সাংবাদিকতা কাকে বলে? হলুদ সাংবাদিকতার জন্ম হয়েছিল সাংবাদিকতা জগতের অন্যতম দুই ব্যক্তিত্ব যুক্তরাষ্ট্রের জোসেফ পুলিৎজার আর উইলিয়াম রুডলফ হার্স্টের মধ্যে পেশাগত প্রতিযোগিতার ফল হিসেবে। এই দুই সম্পাদক তাদের নিজ নিজ পত্রিকার ব্যবসায়িক স্বার্থে একে অপরের অপেক্ষাকৃত যোগ্য সাংবাদিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত কর্মচারীদের অধিক বেতনে নিজেদের প্রতিষ্ঠানে নিয়ে আসার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছিলেন। এক পর্যায়ে ব্যক্তিগত কেলেংকারির চাঞ্চল্যকর খবর ছেপে তারা পত্রিকার কাটতি বাড়ানোর চেষ্টা করেন। পুলিৎজারের নিউ ইয়র্ক ওয়ার্ল্ড ও হার্স্টের নিউ ইয়র্ক জার্নালের মধ্যে পরস্পর প্রতিযোগিতা এমন এক অরুচিকর পর্যায়ে পৌঁছিয়ে যায় যে, সংবাদের বস্তুনিষ্ঠ পরিবর্তে পত্রিকার বাহ্যিক চাকচিক্য আর পাঠকদের উত্তেজনা দানই তাদের নিকট মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়।

ফ্র্যাঙ্ক লুথার মট হলুদ সাংবাদিকতার পাঁচটি বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছেন: ১. সাধারণ ঘটনাকে কয়েকটি কলাম জুড়ে বড় আকারের ভয়ানক একটি শিরোনাম করা। ২. ছবি আর কাল্পনিক নক্সার অপরিমিত ব্যবহার। ৩. ভুয়া সাক্ষাৎকার, ভুল ধারণার জন্ম দিতে পারে এমন শিরোনাম। ৪. ভুয়া বিজ্ঞানমূলক রচনা আর তথাকথিত বিশেষজ্ঞ কর্তৃক ভুল শিক্ষামূলক রচনার ব্যবহার। সম্পূৰ্ণ রঙিন রবিবাসরীয় সাময়িকী প্রকাশ, যার সাথে সাধারণত কমিক্স সংযুক্ত করা হয়। ৫. স্রোতের বিপরীতে সাঁতরানো পরাজিত নায়কদের প্ৰতি নাটকীয় সহানুভূতি।

মূল কথায় ফেরা যাক, বুধবার রাত ১০টার দিকে বসুন্ধরায় অ্যাপোলো হাসপাতাল গেইটে মোটরসাইকেল রাখাকে কেন্দ্র করে আবাসিক এলাকাটির নিরাপত্তারক্ষীদের সঙ্গে তপুসহ আরও দুই নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রের কথা কাটাকাটি হয়। এক পর্যায়ে নিরাপত্তারক্ষীরা তাদের ওপরে হামলা করে। এ খবর শুনে আরও ১০/১৫ জন ছাত্র সেখানে গেলে তারাও মারধরের শিকার হন। তারা ঘিরে ধরে তপুকে এবং তাকে ফিল্মি স্টাইলে পেটাতে থাকে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। তাদের ওপরও নারকীয় হামলা চালায় নিরাপত্তারক্ষীরা।

এ ঘটনার জের ধরে গতকাল বৃহস্পতিবার নর্থ সাউথের শিক্ষার্থীদের তীব্র আন্দোলনের তুলকালাম কাণ্ড ঘটে যায় বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায়। কিন্তু বসুন্ধরা গ্রুপের সংবাদ মাধ্যমগুলো পুরো ঘটনার উল্টা অবস্থান নিয়ে এই আন্দোলনকে জঙ্গি হামলা বলে প্রচার শুরু করে।

তাদের ইলেক্ট্রনিক, প্রিন্ট ও অনলাইন মিডিয়া যেভাবে প্রচার করেছে সংবাদটি, “রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় তুচ্ছ ঘটনাকে পুঁজি করে জঙ্গি চক্রের ভয়াবহ তাণ্ডবের অপচেষ্টা নস্যাৎ করে দিয়েছে র‌্যাব ও পুলিশসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। জঙ্গি চক্রের অপচেষ্টাকে ভণ্ডুল করে বৃহস্পতিবার (২ মার্চ) সন্ধ্যা নাগাদ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে তারা। বুধবার (১ মার্চ) মধ্যরাতের পর থেকে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকাজুড়ে চরম অরাজকতা তৈরির চেষ্টা চালায় ওই জঙ্গি চক্র। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উস্কে দিয়ে এবং তাদের সঙ্গে মিশে গিয়ে এ অরাজকতা চালানোর অপচেষ্টা চালাতে থাকে তারা। বৃহস্পতিবারও (২ মার্চ) তারা নারকীয় তাণ্ডব চালানোর অপচেষ্টা করে রাজধানীর এক প্রান্তের শান্ত-নিরাপদ ও সম্ভ্রান্ত আবাসিক এলাকা হিসেবে পরিচিত বসুন্ধরায়”।

কিন্তু দেশের প্রধান প্রধান গণমাধ্যমগুলো যেখানে উল্লেখ করছে এটি একটি ছাত্র আন্দোলন। সেখানে বসুন্ধরা গ্রুপের মিডিয়ার এমন সংবাদ সত্যিই সাধারণ মানুষ ও বিশ্বের সামনে সামনের দেশের গণমাধ্যমগুলোর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে।

কালেরকণ্ঠে “অপপ্রচার চালিয়ে জঙ্গি তাণ্ডব” শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ করে। যাতে লেখা হয়, “গুলশানে রক্তাক্ত হামলাসহ দেশে বেশ কয়েকটি জঙ্গি হামলার ঘটনার পর রাজধানীর বারিধারায় বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এলাকাটির কয়েকটি গেট রাতে বন্ধ রাখা এবং নিয়মিত তল্লাশিসহ বেশ কিছু নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে পুলিশের পক্ষ থেকে। এই নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে উগ্রপন্থী জঙ্গিগোষ্ঠীর ভয়ংকর তাণ্ডবের শিকার হয়েছে রাজধানীর এই শান্তিপূর্ণ অভিজাত আবাসিক এলাকা বসুন্ধরা। পরে র‌্যাব-পুলিশ এবং বসুন্ধরা গ্রুপের সতর্ক তৎপরতায় আরেকটি বড় ধরনের পরিকল্পিত জঙ্গি হামলার অপচেষ্টা রুখে দেওয়া সম্ভব হয়েছে”।

এক কথার দেশের অন্য গণমাধ্যমগুলো যেদিকে হেঁটেছে, তার বিপরীত দিকে অবস্থান নিয়ে হলুদ সাংবাদিকতার প্রমাণ দিয়েছে বসুন্ধরা গ্রুপের গণমাধ্যমগুলো।

‘দেশের ভেতরেই সার্বভৌম আরেক দেশ বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা। এই এলাকার বাপ মা এইখানের সিকিউরিটি গার্ড স্যাররা। তাদের এতই ক্ষমতা যে কোথাও গাড়ি পার্ক করা যাবে না, একসাথে দাঁড়িয়ে আড্ডা দেয়া যাবে না, তাদের নির্দেশ ছাড়া একটা গাছের পাতাও নড়বে না। ছাত্র/ছাত্রীদের সাথে দুর্ব্যবহার এবং কথায় কথায় রিকশা চালক, সিএনজি চালকদের চড় থাপ্পড় দেয়া এদের নিত্য-নৈমিত্তিক রুটিন। শুধু তাই নয় স্যারেরা রেগে গেলে দুই নলা বন্দুক উঁচু করে থ্রেট দেয় গুলি করার। এদের খোলা জিপের শো ডাউন দেখলে আপনার মনে হবে এই বুঝি পাক হানাদার বাহিনী আসছে…।

মনে প্রশ্ন আসতেই পারে এদের এত ক্ষমতা কিসের! এদের কাছে বসুন্ধরাবাসী এবং স্টুডেন্টরা অসহায় কেন! ভাই এদের ক্ষমতার মূল উৎস টাকার। সোবহান সাহেবের এই গুণ্ডাবাহিনী তাদের এলাকায় পুলিশকেও পাত্তা দেয় না। তাদের হাতে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হওয়ার ঘটনা এটাই প্রথম নয়, প্রতিনিয়ত হচ্ছে…ফেসবুকে এভাবেই নিজের মতামত জানিয়ে পোস্ট করে ফয়সাল মাহমুদ নীল।’

বুধবার রাত ১০টার দিকে বসুন্ধরায় অ্যাপোলো গেইটে মোটরসাইকেল রাখাকে কেন্দ্র করে আবাসিক এলাকাটির নিরাপত্তারক্ষীদের সঙ্গে তপুসহ আরও দুই নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রের কথা কাটাকাটি হয়।এক পর্যায়ে নিরাপত্তারক্ষীরা তাদের ওপরে হামলা করে। এ খবর শুনে আরও ১০/১৫ জন ছাত্র সেখানে গেলে তারাও মারধরের শিকার হন। এরপর রাত থেকেই বিক্ষোভ শুরু করেন নর্থ সাউথের শিক্ষার্থীরা। রাতে একদফা বিক্ষোভের পর বৃহস্পতিবার সকাল থেকে ফের বিক্ষোভ শুরু করে তার সহপাঠীরা।

বিকালের দিকে এই বিক্ষোভ শান্ত হলেও সন্ধ্যার পর থেকে আবার সোশ্যাল মিডিয়াতে সোচ্চার হয়ে উঠে ছাত্ররা। সবাই কালেরকণ্ঠ, বাংলাদেশ প্রতিদিন, নিউজ২৪ এবং বাংলানিউজ২৪ এ প্রকাশিত নিউজের লিংক এবং ভিডিওসহ বিভিন্ন পোস্ট দিতে শুরু করে দেয়।

সর্বশেষে একটা প্রশ্ন থেকেই যায় দেশের গণমাধ্যমের যদি এই হাল হয় তাহলে যখন যাবে কোথায়? এবং নর্থ সাউথ বিশ্ব বিদ্যালয়য়ের এই জঙ্গি ট্যাগ আর কত দিন?

 

Advertisement

কমেন্টস