ভাষা আন্দোলনের নিভৃতচারী গবেষক এম আর মাহবুবের কর্মযজ্ঞ

প্রকাশঃ ফেব্রুয়ারি ২৭, ২০১৮

ফারুক আহমাদ আরিফ-

ভাষা আন্দোলনের পথ ধরেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা। ১৯৪৭ থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ৯ বছর ধরে চলা এই আন্দোলনের নানা ইতিহাস, ঐতিহ্যকে উপলক্ষ করে রচনা করা যেত ভাষা আন্দোলনের দলিলপত্র। নির্মাণ করা যেত ভাষা আন্দোলন জাদুঘর কিন্তু কোনটাই হয়নি। জাতির বিস্মৃতির অন্তরালে হারিয়ে যাচ্ছে অনেক কিছুই।

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনের সৈনিকদের কয়েকজনকে গুলি করে হত্যার প্রতিবাদে তৎকালীন মূখ্যমন্ত্রী (প্রধানমন্ত্রী)র বাসভবন বর্ধমান হাউজকে বাংলা একাডেমি করার লক্ষ্যে ছাত্রদের দাবির মুখে আত্মসমর্পন করেছিল সরকার।

তারই পথ ধরে ১৯৫৫ সালে ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর নেতৃত্বে বর্ধমান হাউজ পরিণত হয় বাংলা একাডেমিতে। শুরুতে প্রতিষ্ঠানটি বাংলা ভাষার উৎকর্ষ সাধনে কাজ করলেও বর্তমানে বাংলা ভাষা নিয়ে তাদের কাজের পরিমাণ খুব কম। ভাষা আন্দোলন নিয়ে কোন গবেষণা নেই। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস-ঐতিহ্য সংরক্ষণ, বাংলাকে বিশ্ব দরবারে তোলে ধরতে সময়োপযোগী তেমন উদ্যোগও তাদের মধ্যে দেখা যাচ্ছে না।
প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি মাসকে কেন্দ্র করে অমর একুশে গ্রন্থমেলার আয়োজনই যেন তাদের প্রধান ও প্রথম কাজ!

প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বাংলা একাডেমি এগিয়ে না আসলেও ভাষা আন্দোলন নিয়ে গবেষণা করতে ব্যক্তি পর্যায়ে এগিয়ে এসেছেন অনেকেই। তাদের মধ্যে ‘ভাষা আন্দোলন গবেষণাকেন্দ্র ও জাদুঘর’ এর নির্বাহী পরিচালক এম আর মাহবুব অন্যতম।

দীর্ঘ ৩৫ বছর যাবত ভাষা আন্দোলন নিয়ে গবেষণা করে চলেছেন। ইতিমধ্যে ৫২টি গ্রন্থ রচনা করেছেন ভাষা আন্দোলন নিয়ে।

চলতি বছর গৌরব প্রকাশন থেকে প্রভাতফেরি, বাংলা হোক জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা, জানা অজানা ভাষা আন্দোলন, একুশের ডায়েরি, একুশের যত প্রথম, ঢাকা মেডিকেল কলেজ: সেবা সংগ্রাম ঐতিহ্য ও সংবাদপত্রে রাষ্ট্রভাষাসহ ৭টি গ্রন্থ বেরিয়েছে। পাঠক মহলে জাগিয়েছেও সাড়া।

প্রভাতফেরি বইটিতে মূলত ভাষা আন্দোলনে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির স্মরণে ১৯৫৩ সাল থেকে শহিদদের জন্যে শহিদ মিনারে ফুল দেয়া ও মোনাজাতের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। প্রভাতফেরি কি করে মধ্যরাতফেরিতে পরিণত হয়েছে সেই বিষয়টি তথ্য-উপাত্ত্ব দিয়ে জনসম্মুখে এনে আবার প্রভাতফেরির দাবি জানানো হয়েছে।

‘বাংলা হোক জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা’ বইটিতে জাতিসংঘের সপ্তম দাপ্তরিক ভাষা করার দাবিগুলো যৌক্তিকভাবে তুলে ধরা হয়েছে। একটি ভাষা কি করে জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা হতে পারে। তার সামাজিক ও অর্থনৈতিক দিকসহ সার্বিক বিষয়টি এখানে উল্লেখ করা হয়েছে। অবশ্য ইতিমধ্যে কোন কোন গণমাধ্যম তারা বাংলাকে জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা করার দাবিতে নানা ধরনের কর্মসূচি হাতে নিয়েছে।

‘জানা অজানা ভাষা আন্দোলন’ বইটিতে ভাষা আন্দোলনের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ৮০০ প্রশ্ন ও তার উত্তর দিয়ে সাজানো হয়েছে বইটি। সংক্ষেপে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ভাষা আন্দোলন নিয়ে জানতে সহায়ক বইটি।

‘একুশের ডায়েরি’ বইটিতে ব্রিটিশ লেখক ন্যাথানিয়েল ব্র্যাসি হলহেড রচিত এ গ্রামার অব দ্যা বাঙালি ল্যাঙ্গুয়েজ বইয়ের সূত্র থেকে শুরু করে ২০১৭ সালের ১২ এপ্রিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সকল দাপ্তরিক কাজে ইংরেজির সাথে বাংলা তারিখ ও সন ব্যবহার শুরু পর্যন্ত বাংলা ভাষার নানা বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। রয়েছে বাংলা ভাষার বিকাশের ধারাবাহিকতা।

‘একুশের যত প্রথম’ বইটিতে ভাষা আন্দোলনের প্রতিটি প্রথম কাজের উল্লেখ করা হয়েছে। আন্দোলন করতে গিয়ে কে প্রথমে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে? কে প্রথম দাবি উত্থাপন করা হয়েছে? প্রথম শহিদ কে ইত্যাদি বিষয়ে সাজানো বইটি।

‘ঢাকা মেডিকেল কলেজ: সেবা সংগ্রাম ঐতিহ্য’ বইটি অধ্যাপক ডা. মনিলাল আইচ লিটু ও এম আর মাহবুবের যৌথ উদ্যোগের ফল। ভাষা আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় রয়েছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রাঙ্গণে। আহত ভাষাসৈনিকদের সেবা, নিহতদের স্মৃতি রক্ষার্থে শহিদ মিনার তৈরি, ২১ ফেব্রুয়ারি ৫২ পরবর্তী আন্দোলন পরিচালনায় বিশেষ ভূমিকা ছিল প্রতিষ্ঠানটি। এখানকার ডাক্তার, নার্স, কর্মচারী, ছাত্র-ছাত্রীদের অবদানটি ইতিহাসে ততটা স্থান পায়নি। বইটিতে যেসব বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। এসেছে অনেক অজানা বিষয়।

‘সংবাদপত্রে রাষ্ট্রভাষা ১৯৪৭ থেকে ৫৬’ বইটিতে তৎকালীন বঙ্গ দেশ, পাকিস্তান, ভারত, চীনসহ নানা দেশের সংবাদপত্রে ভাষা আন্দোলনের প্রকাশিত সংবাদগুলো নিয়ে বইটি সাজানো। ভাষা আন্দোলনের ৬৬ বছর পর এমন একটি বই রচনা নিঃসন্দেহে ভাষা আন্দোলনের একটি আকর।

ভাষা আন্দোলন নিয়ে গবেষণা সম্পর্কে এক আলাপচারিতায় এম আর মাহবুব বলেন, “আমি কলেজে প্রভাষকের চাকরি বাদ দিয়ে দীর্ঘ ৩৫ বছর যাবত ভাষা আন্দোলন নিয়ে গবেষণা করে যাচ্ছি। আমার ধ্যান-জ্ঞান সব কিছুই ভাষা আন্দোলনকে ঘিরে। কাজ করতে গিয়ে কয়েক শ ভাষাসৈনিকের সাক্ষাৎকার সংগ্রহ করেছি। আমি বিশ্বাস করি ভাষা আন্দোলন নিয়ে আরো বৃহৎ পরিসরে গবেষণা হওয়া প্রয়োজন।”

গৌরব প্রকাশনের সত্বাধীকারী স. ম ইফতেখার মাহমুদ বলেন, “প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলো মোনাফার দিকে লক্ষ্য রেখে বই প্রকাশ করলেও আমি ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস-ঐতিহ্যকে তুলে ধরতে বই প্রকাশ করছি।

আমি মনে করি আমাদের স্বাধীনতার প্রথম বৃক্ষ হচ্ছে ভাষা আন্দোলন। এর ইতিহাস বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরা আমাদের দায়িত্ব।”

ভাষা আন্দোলনের এই নিভৃতচারী গবেষক প্রতিনিয়ত উপহার দিয়ে চলছেন ভাষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক দলিলপত্র। ভাষাসৈনিকদের নানা স্মৃতি কথা। তাঁর গবেষণায় সমৃদ্ধ হচ্ছে বিশ্ব সাহিত্যাঙ্গন।

কমেন্টস