বাংলাদেশিদের জন্য ফ্রান্স থেকে বিমান ছিনতাই করেছিলেন যে যুবক!

প্রকাশঃ ফেব্রুয়ারি ১০, ২০১৮

আরিফুল ইসলাম আরিফ।।

জ্যাঁ কুয়ে একজন বাঙালীপ্রেমী ফ্রান্সের যুবক। যিনি ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশিদের ত্রাণ পাঠাতে ফ্রান্স থেকে পাকিস্তান এয়ার ওয়েজের ৭২০বি উড়োজাহাজটি ফ্রান্সের ওর্লি বিমানবন্দর থেকে ছিনতাই করেছিলে বাংলাদেশের যুদ্ধে কবলিত নিপীড়িত মানুষের পাশে দাড়ানোর জন্য।

৩ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে ২৮ বছর বয়সের একজন ফরাসি যুবক জ্যাঁ কুয়ে বেশ কৌশলীয় চিন্তায় অনেক ভেবেচিন্তে পরিকল্পনা করেই  দিনটি বেছে নেন পিআইএ’র বিমান ছিনতাই করার জন্য। কেননা এদিন এই বিমানবন্দরেই আসবার কথা ছিলো জার্মান চ্যান্সেলর উইলি ব্র্যান্ডিট এবং ফরাসী রাষ্ট্রপতি পম্পিডু’র। কুয়ের ধারনা ছিলো এই দিন এই দু’জনকে নিয়ে নিরাপত্তারক্ষীরা ব্যস্ত থাকবেন আর এই ফাঁকে তিনি তার কাজ হাসিল করবেন।

পাকিস্তান এয়ার ওয়েজের ৭২০ বি উড়োজাহাজটি ছিনতাই করবার পেছনে তাঁর উদ্দেশ্য ও দাবি ছিলো একটাই, সেটা হচ্ছে ভারতীয় শরনার্থী শিবিরে লক্ষাধিক বাংলাদেশিরা অমানবিক জীবন-যাপন করছেন পাকিস্তানি হানাদারদের নিপীড়ন ও বিভিন্ন কারণে। দেশ ছেড়ে চলে আসা এই অসহায় মানুষদের ২০ টন ঔষধ (মেডিকেল ইকুইপমেন্ট এবং সংশ্লিষ্ঠ দ্রব্যাদি) এবং যথাযথ পরিমাণে খাদ্য সরবরাহ করতে হবে।

কে এই জ্যাঁ কুয়ে?

জ্যাঁ কুয়ের ফ্রান্সের একজন স্থানীয় নাগরিক। আলজেরিয়াতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে, ১৯৪৩ সালের ৫ই জানুয়ারি জ্যাঁ কুয়েরের জন্ম। কিন্তু বাবা সামরিক কর্মকর্তা হওয়ায় জন্মস্থলে থাকা হয়নি তার। এরপর পুরো পরিবারসহ স্থায়ীভাবে বাসবাস শুরু করেন ফ্রান্সে। কুয়ে ফরাসী সেনাবাহিনীতে চাকুরী করতেন, কিন্ত একটা সময়ে ভালো না লাগায় সেনাবাহিনী থেকে স্বেচ্ছা-অবসর নেন জ্যা কুয়ে। সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রিত জীবন তাকে আটকে রাখতে পারে নি। স্বাধীনচেতা হয়ে থেকে গেছেন সারা জীবন। ছোটবেলা থেকেই তার যেটা ভালো লাগতো সেটাই করতেন তিনি। মানবতার হয়ে কাজ করেছেন নিজের ইচ্ছা মতো।

মানবতার জন্য তিনি দৌঁড়েছেন ভারতে, ওয়েস্ট ইন্ডিজে, অস্ট্রেলিয়াসহ সারা বিশ্বে। হঠাৎ একদিন সংবাদ মাধ্যম থেকে জানতে পারেন পূর্ব পাকিস্তান নামে একটা জায়গার নাম, যেখানকার অধিবাসীরা পাকিস্তানের সঙ্গে আর থাকতে চাইছে না। সেই এলাকায় তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ ভাষা আর জাতীসত্ত্বায় তারা পাকিস্তানীদের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। তাদের ন্যায্য দাবি অধিকারে আন্দোলন করছিল তারা। সেখানে জনগনের ভোটে নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে কেন্দ্রীয় সরকার উল্টো সেনাবাহিনী লেলিয়ে দিয়েছে সাধারণ মানুষের ওপরে, আর সেই সেনাবাহিনী নির্মমে ধর্ষণ ও গণহত্যা চালাচ্ছে।

এই খবর জানার পর জ্যাঁ কুয়ে আমাদের দেশের জন্য কিছু করার পরিকল্পনা করেন। দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পনা করেন এই এত বড় অপারেশনের জন্য। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে যে হতাহতের খবর তিনি জানতে পারছিলেন সংবাদপত্র এবং অন্যান্য মিডিয়ার মাধ্যমে, সে খবরে তাঁর মন প্রাণ আকুল হয়ে উঠেছিলো বাংলাদেশের জন্য। তিনি জানতেন ধরা পড়লে ও ব্যর্থ হলে তার অনের বড় শাস্তি হতে পারে। তিনি জানতেন কাজটিতে অনেক ঝুঁকি রয়েছে। কিন্তু তারপরেও হাজার মাইল দূরের এই ভিনদেশী ফরাসী তরুণ বাংলাদেশের জন্য তাঁর জীবনকে বাজি রেখেছিলেন।

এক মানবিকতা আর মানুষ ছাড়া হয়ত আপাতঃদৃষ্টিতে তাঁর কোনো দায়িত্বই ছিলোনা অথচ শুধুমাত্র আমাদের জন্য এই মানুষটি একটি গোটা প্লেন ছিনতাই করেছিলেন। শুধু আমাদের দেশের বিপদে থাকা মানুষের জন্য।

প্রসঙ্গত, জ্যা কুয়ে কখনও বাংলাদেশে আসেননি। যে দেশটার জন্যে তিনি এমন আত্মত্যাগ করেছিলেন, সেই দেশটা দেখতে কেমন, সেখানকার মানুষগুলো কেমন সেটা জানা হয়নি তার। মানবতার ডাকে সাড়া দিতে তিনি, হাজার মাইল দূরের থেকেও আমাদের অসহায়ত্ব সময়কে অনুভব করেছেন। তার কর্মপন্থাটা সঠিক ছিল না হয়তো কিন্ত সেই মূহুর্তে তার এটা ছাড়া অন্য কিছু করারও কিছু ছিলো না। এমন একটা ঘটনার পর তিনি আলোড়ন সৃষ্টি করে ফেলেছিলেন বিশ্বজুড়ে।

জ্যাঁ কুয়ের একটি রিভলবার আর একটি ভুয়া বোমা নিয়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন। তাঁর ব্যাগে বোমা আর হাতে পিস্তল নিয়েই তিনি প্লেনের ককপিটে চলে যান এবং পাইলটের মাথায় পিস্তল ধরে দাবি রাখেন বাংলাদেশের জন্য যথাযথ পরিমাণ ত্রাণ আর মেডিকেল সরঞ্জাম না পাঠানো হলে তিনি এই প্লেনকে উড়িয়ে দেবেন।

অর্লি এয়ারপোর্টের রেডিও তারবার্তায় তিনি মেসেজ পাঠান,  পিআইএ-৭১১ বিমানটা থেকে এসেছে মেসেজ, যেটা এই মূহুর্তে দাঁড়িয়ে আছে রানওয়েতে। বার্তায় লেখা- “এই বিমানটা আমি ছিনতাই করেছি, আমার কথা না শুনলে পুরো বিমান উড়িয়ে দেবো আমি। আমার ব্যাগে বোমা আছে!” তারপর মেসেজটা চলে যায় উপরস্থ অফিসারের কাছে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই রেড এলার্ট জারি করা হয় অর্লি এয়ারপোর্টে। পুলিশের গাড়ি আর দমকল কর্মীদের গাড়িতে ছেয়ে যায় পুরো বিমানবন্দর।

নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্মরত অফিসাররা ততক্ষণে যোগাযোগ করতে সক্ষম হয়েছে হাইজ্যাকার জ্যা কুয়ের সঙ্গে।তার দাবি, কি তার উদ্দেশ্য জানতে চায় নিরাপত্তা কর্মিরা। ওপাশ থেকে জ্যাঁ কুয়ের  জবাব দেন, পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতাকামী মানুষের জন্যে বিশ টন ঔষধ বিমানে তুলে দিতে হবে, তাহলেই কেবল মুক্তি পাবে বিমানের নিরীহ যাত্রীরা।

তাঁর এমন কথা শুনে হতবাক সকলে।এরপর তাকে জানানো হয় তার কথা রাখা হবে।বিকেল সোয়া পাঁচটায় তাকে এই আশ্বাস দিয়েছিলেন রেডক্রসের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্তৃপক্ষ।

এরপর ঔষধে ভর্তি একটা বড় ট্রাক এসে দাঁড়ালো রানওয়েতে, বিমানের কার্গোতে তোলা হতে লাগলো সেগুলো। রেডিওতে জানানো হয়, এখানে তার চাহিদার অর্ধেকটা আছে। বাকী অর্ধেক আরেকটা ট্রাকে করে আনা হচ্ছে। সন্ধ্যে সাতটায় সেই ট্রাকটাও এসে দাডায় বিমানের পাশে। প্রথম ট্রাকটা আসার পরেই কুয়ে প্রতিশ্রুতি মোতাবেক নারী আর শিশুসহ আটজন জিম্মিকে মুক্তি দিয়েছিলেন।

নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষে কিছুটা চালাকি করেছিলো যা ধরতে পারেননি জ্যা কুয়ে। তাকে ধরার জন্যে ফাঁদ পেতেছিল তারা, এজন্যেই দুই ধাপে পাঠানো হয়েছিল ঔষধের চালান, যাতে সময় পাওয়া যায়, আর প্রথম ট্রাকের সঙ্গে থাকা লোকজন বিমানের ভেতরের অবস্থাটাও দেখে আসতে পারে। বিমানবন্দর তখন ছেয়ে ফেলেছে কমান্ডোরা, তবে বিমানটা থেকে নিরাপদ দূরতে অবস্থান করছিল তারা। দ্বিতীয় ট্রাকের সঙ্গে ওয়্যারহাউজম্যানের পোষাকে এসেছিলেন কয়েকজন কমান্ডো।

এই সময় উড়োজাহাজের টেকনিশিয়ান হিসেবে দুইজন কর্মী প্লেনে ঢুকে পড়ে। কিন্তু তারা ছিলো ছদ্মবেশের পুলিশ। শেষ পর্যন্ত যা হয়, একটা পর্যায়ে গ্রেফতার হলেন মহান বীর জ্যাঁ কুয়ে।

তাঁকে প্রসিকিউট করা হবে, এই মর্মে ঘোষনাও দেওয়া হলো কিন্তু সে সময়কার যত সাক্ষী ছিলেন এবং যারা এই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন তাঁরা প্রত্যেকেই সাক্ষ্য দিলেন যে জ্যাঁ কুয়ে যা করেছেন তা মানবতার জন্য, মানুষের জন্য। কারো ক্ষতি তিনি করতে চাননি, সে উদ্দেশ্য তাঁর ছিলোই না। কিন্তু শেষ রক্ষা তাঁর হয়নি। ফরাঁসি সরকার তাঁকে ৫ বছরের কারাদণ্ড দেন। কারাদণ্ড থেকে বের হবার পরেও জ্যাঁ কুয়ে বসে থাকেন নি।

জ্যাঁ কুয়ে কাজটি সম্পন্ন করতে ব্যর্থ হলেও এই মহান অভিযানের প্রতি সম্মান রেখে ফঁরাসি রেডক্রস এবং ‘Knights Hospitaller’  বাংলাদেশকে ২০ টন মেডিকেল সরঞ্জাম ত্রাণ হিসেবে পাঠায়।

বাংলাদেশের নাগরিক হয়ে দেশেকে ভালোবেশে দেশের কত যুবক আর তরুণ মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয় অনেকে আবার হয়েছিলো রাজাকার, আল-বদর, আল শামস। সাহায্য করেছিলো পাকিস্তানী হানাদার আর্মিকে। খুন করেছিলো লক্ষ লক্ষ বাংলাদেশী মুক্তিকামী মুক্তিযোদ্ধাদের। অথচ,  হাজার হাজার মাইল দূরে থেকেও শুধু সংবাদ মাধ্যম থেকে বাংলাদেশের যুদ্ধে নিপীড়িত মানুষদের সম্পর্কে জেনে একজন ফঁরাসি যুবক জ্যাঁ কুয়ে বাংলাদেশের জন্য নিজের জীবনে বাজি রেখে অনেক পরিকল্পনায় ছিনতাই করেছিলেন একটি বিশেষ বিমান। সম্পূর্ণ অচেনা অজানা এক দেশের জন্য খেটেছেন ৫ বছরের জেল । এমন একটা মানুষের জন্য সকল বাংলাদেশিদের পথ্য থেকে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা ভালোবাসা।

কমেন্টস