‘আমি আমার ছেলেকে নিয়ে জীবনে অনেকদূর পাড়ি দিতে চাই’

প্রকাশঃ ফেব্রুয়ারি ৫, ২০১৮

তামজিদ হোসেন।।

জেসমিন নাহার। বাজারের মধ্যে একমাত্র নারী চা বিক্রেতা। খুব সহজেই তার দিকে চোখ পড়ে যায়, কারণ পুরো বাজারে দোকানদার যখন পুরুষ, সেই পুরুষের ভিড়ে তিনিই একজন যে ওড়নার ঘোমটার ভেতর থেকে হাত বের করে চায়ের কাপে নাড়ছেন। নতুন বানানো পাকা দোকানের হালকা আলো ছায়ায় বসে চা বানাতে ব্যস্ত এই নারীকে বয়সের কথা জিজ্ঞেস করতেই একগাল হেসে উত্তর দিলেন, ‘মেয়েদের বয়স কখনো শুনতে নাই ভাই। বসেন, চা খান’।

জেসমিন নাহারের বাড়ি খুলনা জেলার পাইকগাছা থানার অন্তর্গত গড়ইখালী  গ্রামে। পাঁচ সদস্যের পরিবারে জেসমিনই একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। স্বামী থাকলেও বেকার, তাই পুরো সংসারের দায়ভার তার ভাবনায়। একটিমাত্রই ছেলে যে গ্রামের একটি কলেজেই উচ্চ মাধ্যমিকে পড়ছেন।

চায়ের দোকান কবে থেকে শুরু করেছেন সেই প্রশ্নের উত্তরে উঠে আসে অনেক না জানা সব স্বপ্নের কথা। একইসাথে সামনে আসে স্বপ্নের পথে বাঁধা হয়ে থাকা নানান সব ঘটনা।

‘চায়ের দোকান চালাচ্ছি আজ প্রায় পাঁচ বছর হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এর বাইরে আমি বিভিন্ন রকম কাজ করে থাকি। এই ধরেন, কখনো আমি দিনমজুর হিসেবে খাটি, কখনো ঘরামির কাজ করি, এমনকি কাঠও কেটে থাকি। তবে গত পাঁচ বছরের মতো সময় ধরে বাজারের এই চা দোকানটায় আমার আসল ভরশা’।

সংগ্রামী এই নারী সংসারের হাল ধরতে ঘরে-বাইরে সমানভাবে পরিশ্রম করে থাকেন। তারপরেও যেনো তার দুঃখের শেষ নাই। বাজারে কাজ করেন বলে শুনতে নানা লোকের কথা। এমনকি শান্তি নেই তার নিজ ঘরেও।

তিনি তার স্বামীর দ্বিতীয় স্ত্রী। স্বামী তার ভরণপোষনের দায়িত্ব নেই না, উলটো সহ্য করতে হয় স্বামীর নির্যাতন। তিনি বলেন, ‘বাজারে চা বেচি বলে নানা সময় নানাভাবে আমাকে অপমান এবং অত্যাচার করে । মাঝে মধ্যেই আমার উপর হামলে পড়ে’। কারণ তিনি চান স্বামীর বাড়িতে থাকতে , স্বামীর ঘরের অধিকার পেতে কিন্তু তাঁর স্বামী চাননা তাঁকে নিজের বাড়ি নিতে ।এই অধিকার আদায়ের জন্য থানায় একটি মামলাও করেন এবং বর্তমানে সেই মামলা তিনি লড়ে যাচ্ছেন।

জেসমিনের স্বপ্নের কথা জিজ্ঞাস করায় তিনি বলেন, ‘আমার বাবা একটায় স্বপ্ন। আর তা হলো, আমার একমাত্র ছেলেটারে বড় অফিসার বানাবো। আমি আমার ছেলেকে নিয়ে অনেকদূর পাড়ি দিতে চাই জীবনে। কিন্তু আর্থিক দিক থেকে কতোটা পারবো তা জানা নাই আমার। এই ধরেন, গ্রামে এখন অনেক চায়ের দোকান হয়েছে, তাই আমার ইনকাম তুলনামূলক ভাবে অনেক কম। মাসে এই দোকান থেকে যা আসে তাতে করে সংসারের ভরনপোষনের পর ছেলের পড়াশোনার খরচ চালানো খুব কষ্ট হয়ে যায় আমার জন্য’।

একজণ নারীর একার এতোটা সংগ্রামের কথা শুনে আর কোনো প্রশ্ন খুজে না পেয়ে জিজ্ঞেস করলাম তা আপনার ভবিষ্যত চিন্তাভাবনা কি? উত্তরে তিনি বলেন, ‘আমি আর্থিক ভাবে সফল হতে পারলে অসহায় নারীদের জন্য ভবিষ্যতে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে চাই এবং নির্যাতিত নারীদের পাশে দাঁড়াতে চাই। আর এই মুহুর্তে যদি আর্থিক অনুদান পেতাম তাহলে আমার দোকানটা আরো বড় করতাম’।

এরপর তিনি আবার ব্যস্ত হয়ে যান তাঁর কাজে । তবে মুখখানিতে অনেক আশার আলো। কাজটাকে তিনি আপন করে নিয়েছেন। তাই তো তাঁর কাজে কোনো ক্লান্তি নেই, আছে শুধু দু’চোখ ভারা স্বপ্ন।।

কমেন্টস