ঐতিহাসিক বাহাদুর শাহ পার্কের বর্তমান হালচাল

প্রকাশঃ জানুয়ারি ১৩, ২০১৮

অর্পণ নূয়েল থিগিদী।।

পুরানো ঢাকার লক্ষ্মীবাজারে অবস্থিত বাহাদুর শাহ পার্ক বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার একটি ঐতিহাসিক স্থান। এই পার্কটি ভিক্টোরিয়া পার্ক নামেও পরিচিত। এই পার্ককে রাজধানীর সবচেয়ে পুরোনো পার্কও বলা হয়। পার্কটি ক্ষুদ্র হলেও এর সাথে জড়িয়ে রয়েছে ব্রিটিশ শাসনের একটি বড় ইতিহাস। 

আঠারো শতকের শেষের দিকে আন্টাঘর নামে একটি ক্লাবঘর ছিল। এর সাথেই ছিল একটি ছোট ময়দান। ১৮৫৮ সালে রানী ভিক্টোরিয়া যখন ভারতবর্ষের শাসনভার গ্রহণ করেন তখন ঢাকা বিভাগের কমিশনার এই ময়দানে একটি ঘোষণা পাঠ করে শোনান।  তারপর থেকে এই ময়দানটি ভিক্টোরিয়া পার্ক নামে পরিচিতি লাভ করে।

১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহে এই পার্কটি খ্যাতি অর্জন করার অন্যতম কারণ। ১৮৫৭ সালে ২২শে নভেম্বর ইংরেজ মেরিন সেনারা ঢাকার লালবাগ কেল্লায় অবস্থিত দেশীয় সেনাদের নিরস্ত্র করার উদ্দেশে হামলা করে। এতে সিপাহীরা বাধা দিলে যুদ্ধ বেধে যায়। যুদ্ধে পালিয়ে যাওয়া এবং আহত সিপাহীদের মধ্যে ১১জনকে ধরে আনা হয়। তাদেরকে দোষী সাব্যস্ত করে জনসম্মুখে এই ময়দানে ফাঁসি কার্যকর করা হয়। লাশগুলো অনেকদিন যাবত গাছের সাথে ঝুলিয়ে রাখা হয় স্থানীয় মানুষদের ভয় দেখানোর জন্য এবং তখন সেই এলাকার মানুষেরা পার্কটির আশেপাশে দিয়ে হাঁটতে ভয় পেত। ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ শতবার্ষিকী উপলক্ষে এই স্থানে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয় এবং এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় বাহাদুরশাহ পার্ক। মোঘল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহের নাম অনুসারে এর নামকরণ করা হয় বাহাদুর শাহ পার্ক।

বর্তমানে পুরনো ঢাকার লক্ষ্মীবাজারের গোটা এলাকার প্রাণকেন্দ্র বলতে গেলে এই পার্কটি। ছোট থেকে শুরু করে বড় সব বয়সের মানুষ এই পার্কে প্রতিদিন আসে শরীরচর্চা ও ব্যায়াম করতে। পার্কটির ভিতরে এবং পুরো পার্কটি সবুজ গাছপালা দিয়ে ঘেরা। রয়েছে শিশুদের জন্য খেলাধুলার জন্য ছোট্ট একটি মাঠ এবং তার পাশে রয়েছে ‘‘খাজা হাফিজুল্লাহ’’ স্মৃতিস্তম্ভ।

এছাড়াও ভিতরে টয়লেটের সুন্দর ব্যবস্থা রয়েছে। বিশেষ করে বৃদ্ধ লোকদের এখানে বেশী দেখা যায় হাঁটাহাটি করতে। সকাল-বিকাল সবসময় এই পার্কটি সবার জন্য উন্মুক্ত থাকে। এই পার্কটি ধূমপান মুক্ত এলাকা। যদিও মাঝে মাঝে কিছু অসাধু ব্যক্তিদের নিয়ম লঙ্ঘন করে ধূমপান করতে দেখা যায়। পার্কের কাছাকাছি  রয়েছে  জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ, কবি নজরুল কলেজ, সিটি করপোরেশন মহিলা কলেজ, সরকারি মুসলিম হাইস্কুল, কলেজিয়েট স্কুল, শেরেবাংলা বালিকা উচ্চবিদ্যালয়। বেশিরভাগ সময় পার্কের ভিতরে ছাত্র-ছাত্রীদের আড্ডা দিতে দেখা যায়।

পার্কের ভিতরে সবসময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন দেখা গেলেও পার্কের বাহির ততটা পরিষ্কার এবং গোছানো নয়। বেশির ভাগ সময়ই পার্কটি থাকে পরিচর্যার বাইরে। পার্কের চারপাশ গ্রিল জুড়ে রয়েছে অনেক ছোট ছোট টং এর দোকান। এর সাথে আছে ফলমূল এবং ফুচকা-চটপটির দোকান। দুটিতে ডাল-ভাতেরও দোকান রয়েছে সেখানে। তার ঠিক উত্তরদিকে রয়েছে ময়লা ফেলার ডাস্টবিন যা পার্কের পরিবেশের উপর খুবই খারাপ প্রভাব পড়ছে। ঢাকার ৪২নং ওয়ার্ডের অবস্থিত বাহাদুর শাহ পার্কের বর্তমানে দেখাশুনার দায়িত্ব রয়েছে ওয়ার্ডের কমিশনার হাজী মোহাম্মদ সেলিম।

পুরনো ঢাকার অন্যতম ঐতিহাসিক এই পার্কটি ঐ এলাকার একমাত্র স্থান যেখানে একটু সবুজ প্রকৃতির ছোঁয়া পাওয়া যায়। এই পার্কটি ঐ এলাকার অসংখ্য মানুষের জন্য একটি বিনোদনের জায়গা যেখানে লোকজন ঘর থেকে বের হয়ে বন্ধু-বান্ধব ও প্রতিবেশীদের সাথে একসাথে মিলিত হয় এবং সময় কাটায়।

এছাড়াও এই পার্কে বছরে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন উৎসবে অনেক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। বিশেষ করে পহেলা বৈশাখে এখানে দিনব্যাপী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং মেলার আয়োজন করা হয়।

কমেন্টস