বাটারফ্লাই ইয়াং ইনথুসিয়াস্ট এওয়ার্ডের উৎসর্গনামা

প্রকাশঃ ডিসেম্বর ৫, ২০১৭

আফলাতুন কাইসার জিলানী-

২০১৩ সাল, নটরডেম কলেজের হেরিংটন বিল্ডিং এর ৩০১ নাম্বার রুমে বসে বিমুগ্ধ হয়ে মিজান স্যারের মুখে প্রফেসর দ্বিজেন শর্মা স্যার, প্রফেসর জাকির হোসেন স্যারের প্রকৃতিবিষয়ক অসাধারণ কাজগুলোর গল্প শুনতাম।

সে সময় প্রকৃতি নিয়ে কাজ করার তীব্র এক বাসনা জন্মে মনে। অনেক উৎসাহ উদ্দীপনা নিয়ে তখনকার অন্যতম জনপ্রিয় মাসিক বিজ্ঞান সাময়িকীতে প্রজাপতির জীবনচক্র নিয়ে লেখা জমা দিয়েছিলাম। লেখা জমা দেয়ার দিন এডিটর আমাকে পুরাণ ঢাকার বিরিয়ানী খাওয়ালেন বটে কিন্তু আমার লেখা আর ছাপালেন না। অনেক কষ্ট পেয়েছিলাম। কিন্তু প্রজাপতির পিছনে ছুটে চলা থামেনি। বোটানিকাল গার্ডেন, রমনা পার্ক, জাবি ক্যাম্পাসে ফিল্ড ট্রিপে গেলেই নতুন প্রজাপতি চিনার চেষ্টা করতাম। এই পথ চলায় সাথে পেয়েছি নিঃস্বার্থ প্রকৃতিপ্রেমি কাউসার ভাইয়াকে আর সুহান ভাইয়াকে।

সেদিন প্রকাশক আমার লেখা প্রকাশ করেনি বটে তবে চার বছর পর পৃথিবীর খ্যাতনামা একজন প্রজাপতিবিষয়ক বিজ্ঞানীর সাথে একি প্রোগ্রামে প্রজাপতি নিয়ে বৈজ্ঞানিক লেখনিতে প্রজাপতি এবং প্রজাপতির আবাসস্থল সংরক্ষণের জন্য ‘বাটারফ্লাই ইয়াং ইনথুসিয়াস্ট’ পুরস্কার গ্রহণ করার সুযোগ হয়েছে।

প্রজাপতির লার্ভাল হোস্ট প্ল্যান্ট নিয়ে লেখা সায়েন্টিফিক পেপারটি প্রকৃতিবিষয়ক ম্যাগাজিন ন্যাচার স্ট্যাডি ডাইজেস্টের পরবর্তী সংখ্যায় প্রকাশিত হবে।

মিজানুর রহমান ভূঁইয়া স্যারের প্রতিষ্ঠিত প্রকৃতি স্কুল নটরডেম ন্যাচার স্ট্যাডি ক্লাবের হাত ধরেই আমার প্রকৃতি নিয়ে কাজের যাত্রা শুরু হয়। এই প্রচারবিমুখ মানুষটির সংস্পর্শেই গড়ে উঠেছে প্রকৃতিবিষয়ক জনপ্রিয় লেখক প্রয়াত শেখর রায় এবং আ ন ম আমিনুর রহমানসহ দেশ বিদেশে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য প্রকৃতিপ্রেমি।

এই নিসর্গী ১৯৮৪ সাল থেকে প্রকৃতি এবং প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণের মাধ্যমে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ পৃথিবী রেখে যাওয়ার লক্ষ্যে নিভৃতে কাজ করে যাচ্ছেন। নটরডেম কলেজ থেকে অবসর নিয়ে তিনি থেমে যাননি। ন্যাচার স্ট্যাডি ক্লাবের একি লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন ন্যাচার স্ট্যাডি সোসাইটি অফ বাংলাদেশে (এনএসএসবি)। এনএসএসবি প্রকৃতি সংরক্ষণ নিয়ে মানুষকে সচেতন করার জন্য কাজ করে যাচ্ছে নিরলসভাবে।

আমার এই পুরস্কার উৎসর্গ করছি নীরব প্রকৃতিপ্রেমি মিজানুর রহমান ভূঁইয়া স্যারকে। আপনার হাত ধরে গড়ে উঠুক আরো অসংখ্য প্রকৃতিপ্রেমি এই কামনা করি।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের কীটতত্ত্ব শাখার উদ্যোগে আয়োজিত ব্যতিক্রমী এই প্রজাপতি মেলায় ‘বাটারফ্লাই ইয়াং ইনথুসিয়াস্ট এওয়ার্ড’ ছাড়াও বিশ্বব্যাপী প্রজাপতির ওপর গবেষণায় বিশেষ অবদান রাখার জন্য জাপানের গ্র্যাজুয়েট ইউনিভার্সিটি ফর এ্যাডভান্সড স্টাডিসের অধ্যাপক ড. কেনটারো আরিকাওয়া’কে ‘বাটারফ্লাই এওয়ার্ড-১৭’ প্রদান করা হয়।

প্রকৃতি এবং প্রকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণে আমরা নিতান্তই উদাসীন। প্রকৃতির প্রতি মানুষের অপার ঔদাস্যে অভিমান করে প্রয়াত দ্বিজেন শর্মা স্যার তার পৃথিবীর গভীরতম অসুখ প্রবন্ধে বলেন, খট খট আওয়াজে হটাৎ আমার চিন্তায় ছেদ পড়ে। পাহাড়ের ওপরে কারা গাছ কাটছে। জলমর্মর চাপা পড়ে। প্রতিধ্বনিত এই নিঝুম শব্দস্রোত কর্ণবিধারী হয়ে ওঠে। অসহ্য। আমি ওপরের দিকে তাকাই। জমাট অন্ধকারে কিছুই দৃষ্ট হয় না। খাসিয়াপুঞ্জির আলোর ফুলকিতে পরিবেশ আরো ভৌতিক হয়ে ওঠে। প্রকৃতির ওপর বলাৎকাররত কারা এই লম্পট? করাতকল, ইটভাটার মালিকদের লোক? না, সরাসরি তারা কেউ নয়। এ হলো ঘনীভূত লোভের লোলজিহবা। আমি চিকো মেন্দিস নই। এই জিহ্বা টেনে ধরার মত সাহস আমার নেই। অসহায় আমি ঠায় দাঁড়িয়ে থাকি। খট খট আওয়াজ ক্রমে কফিনের পেরেক ঠোকার শব্দের মত ভয়ংকর হয়ে ওঠে। এ কার কাফিন? সম্ভবত আমাদের সকলের, গোটা মানব জাতির।’

কমেন্টস