শিশু থেকে ভরা যৌবনে ইলিশ

প্রকাশঃ অক্টোবর ১২, ২০১৭

রাগিব আহসান-

মাছে ভাতে বাঙালি…এ প্রবাদ বাক্যটি একমাত্র আমাদের দেশের জন্যই প্রযোজ্য। আমাদের দেশটি নদীমাতৃক দেশ।স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় এখানকার মিঠা পানি বেশী হওয়ায় এখানে মাছের সংখ্যা ও বেশি এবং মানুষের পছন্দের খাবার ও মাছ।

ইলিশ কিন্তু সকলের উপরে। কেননা ইলিশ প্রত্যকের বিশেষ পছন্দের মাছ। ভারতবর্ষ বিভাগের অনেক আগে থেকে ইলিশ মাছ বাঙালিদের কাছে ঘরে ঘরে রসনাব্যঞ্জক মাছ হিসেবে পরিচিত হয়ে আসছে। ইলিশের সাথে বাঙালির নৃতাত্ত্বিক সম্পর্ক রয়েছে। ইলিশ বাঙালির জাতীয় মাছ ও। কিন্তু আজ আমরা ইলিশ মাছকে ভুলতে বসেছি। দেশের বেশিরভাগ অঞ্চলে নৌপথে কিংবা ফুলবাড়িয়ার রেলস্টেশন হতে ইলিশ সরবরাহ হতো। আবার গোয়ালন্দ হতে কোলকাতায় ইলিশ রপ্তানি হতো। ঢাকা শহরের শ্যামবাজার, গেন্ডারিয়া কিংবা ঠাটারীবাজারে ইলিশের প্রাপ্যতায় ভরপুর ছিল। তখন ভোর হতেই সোয়ারীঘাটের পাইকারী বাজারে ইলিশ মাছ পাহাড়ে স্তূপাকৃত থাকতো।

বরিশাল, চাঁদপুর হতে ইলিশ নৌযানে ঢাকা শহরে প্রবেশ করতো। কিন্তু আমাদের দেশে মাঝখানে ইলিশের ব্যাপক ঘাটতি দেখা গেছে।কিছুদিন আগেও আমাদের দেশে ইলিশের হাহাকার চলছিল।এক কেজি ওজনের একটি ইলিশের দাম ছিল ১০০০ টাকা যা অনেকের জন্যই অসম্ভব হয়ে যেত।মানুষ তার পছন্দমত মাছ খেতে পেত না। বর্ষাকালে ইলিশের ভরপুর সময়েও পর্যাপ্ত ইলিশ পাওয়া না যাওয়ায় দাম বেড়ে যেত আর তাই মানুষ তার এত পছন্দের ইলিশ পেত না। যেখানে মানুষ হাত বাড়ালেই ইলিশ পেত সেখানে মানুষ ইলিশ মাছ ছিল নিতান্ত শখের খাবার যা প্রত্যেকের কেনার সাধ্যের মধ্যে ছিল না। কিন্তু প্রত্যকের তা পূরণের অনেক প্রচেষ্টা ছিল। কিন্তু বাংলার মানুষ ইলিশকে আবার ফেরত পেতে চায়। তাই বাংলাদেশ সরকার কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন সম্প্রতি২০১৬ অক্টোবরের ১৫ তারিখ থেকে ২২ দিন ডিমওয়ালা ইলিশ ধরা বন্ধ। ৯ ইঞ্চির ছোট আকারের ইলিশ অর্থাৎ জাটকা ধরা বন্ধ।

তা ছাড়া ইলিশ রপ্তানিও বন্ধ করে দিয়েছেন সরকার। যদি এভাবে নিয়ম মেনে চলি তবে আমরা আবার ইলিশ ফিরে পেতে পারি। আর সেই অনুযায়ী কাজ করায় তার ফলপ্রসূ অনুসারে এখন বাংলার মানুষ আবার ইলিশকে ফেরত পাচ্ছে। মাছের রাজা ইলিশের ভরপুর যৌবন চলছে দেশের বিভিন্ন বাজারে বাজারে। টানা দেড় মাস ধরে ভোলার মেঘনা, তেতুলিয়া,ইলিশা নদীতে ধরা পরছে ঝাঁকে ঝাঁকে রুপালী ইলিশ।

ভোলার মৎস্য ব্যবসায়িরা জানিয়েছে, মৌসুমের চেয়ে এখন ইলিশ ধরা পরছে দ্বিগুনেরও বেশি। সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় পাইকারী বাজারে ইলিশের দামও আগের চেয়ে কম।

মৎস্য বিভাগ সূত্রে জানা যায়, জলবায়ু ও নদ-নদীর পানি প্রবাহের তারতম্যের কারণে ইলিশ ধরা পড়ার মৌসুমও অনেকটা বদলে গেছে। যে কারণে পদ্মা, মেঘনা, তেতুলিয়া ও ইলিশা নদীতে ধরা পরছে ঝাঁকে ঝাঁকে রুপালী ইলিশ। গতবছরের আগস্টের শেষে কিছু ইলিশ পাওয়া গেলেও নভেম্বরের শুরুতে ইলিশের নদ-নদীগুলো প্রায় ইলিশশূন্য হয়ে পড়েছিল। যার কারণে অনেক জেলে তাদের মাছ ধরার জাল ও আনুসঙ্গিক সরঞ্জাম শিকোয় তুলে রেখেছিলেন। নভেম্বরের শেষ দিকে প্রকৃতিকে অবাক করে নদ-নদীতে আবারও ইলিশ ধরা পড়ার ধুম লেগে যায়। বর্তমানে ইলিশের সমারোহ রীতিমত তাক লাগানোর মত। ভরা মৌসুমেও এত ইলিশ মেলেনি বলে জানিয়েছে ভোলার ইলিশা জেলেরা। ফলে জেলেপল্লীতে বইছে ইলিশ উৎসবের আমেজ। রাতদিন শীতকে উপেক্ষা করে ভোলার জেলেরা জাল ও ট্রলার নিয়ে পাড়ি জমাচ্ছেন নদীর গহীনে। রাশি রাশি ইলিশ শিকার করে মেঘনা তেতুলিয়া ইলিশার জেলেরা ঘাটে ফিরছেন ভরপুর আনন্দ নিয়ে।

মেঘনা নদীর জেলেরা জানান, গত বছর একই সময় এত ইলিশ কেউ চোখেও দেখেননি। গত দেড়মাস ধরে নদীতে ইলিশের সমারোহ ভোলার জেলেদের কপালে নতুন আশার আলোর সঞ্চার করেছে। অমৌসুমে আশার চেয়ে বেশি ইলিশ পড়ছে বলে জেলেদের পক্ষে মহাজনের দাদনের টাকা সহজেই পরিশোধ করাও সম্ভব হচ্ছে। গত দেড় মাসের ভোলা সদরের কোড়ারহাট, নাছির মাঝি, তুলাতলী, হেতনারহাট, ভোলাখাল, ভাংতিরখাল,খরকিকাটির মাথা,দাশেরহাট, বিশ্বরোডঘাট,লালমোহনের নাজিরপুরঘাট, মঙ্গলসিকদার বাতিরখালঘাট, চরফ্যসনের বেতুয়াঘাট, বকশিঘাট, কচ্ছপিয়াঘাট, মনপুরার হাজিরহাটঘাট, সাকুচিয়ার তালতলিরঘাটসহ বিভিন্ন মৎস্যঘাটগুলোতে প্রায় নয় কোটি টাকার ইলিশ কেনা-বেচা হয়েছে।

ভোলাখাল মাছঘাটের মাছ ব্যবসায়ি হোসেন জানিয়েছেন, গত এক সপ্তাহে তিনি ঢাকার সোয়ারীঘাট ও কাপ্তান বাজারে প্রায় ২৫ লাখ টাকার ইলিশ পাঠিয়েছেন। ভোলার উল্লেখযোগ্য মাছঘাট খরকি কাঠিরমাথা, ভাংতিরখাল ও বিশ্বরোড মাছঘাট থেকে প্রতি সপ্তাহে অন্তত এক দেড় কোটি টাকার ইলিশ ঢাকা ও বরিশাল আড়ৎতে পাঠানো হচ্ছে।ইলিশ ইলিশ আর ইলিশ চারদিকে যেন ইলিশেরই ছড়াছড়ি। আবার বাংলার গ্রামে ফিরে পাওয়া যায় সেই চেনা ঘ্রাণ ইলিশ ভাজার মিষ্টি ঘ্রাণ।বাঙলার মানুষ আবার খুশি তার ইলিশ পেয়ে।এ যেন সত্যি ইলিশের নবযৌবনা, বাঙালি ও ফিরে যাবে সেই ইতিহাস ঐতিহ্যের মাছে ভাতে বাঙালি।

লেখক: সমাজকর্মী ও সাধারণ সম্পাদক; বাংলাদেশ স্টুডেন্ট কাউন্সিল

কমেন্টস