গল্পের ছলে রয়েছেন স্বপ্ন পূরণে সফল তিনজন তরুণ উদ্যোক্তা

প্রকাশঃ অক্টোবর ৬, ২০১৭

মেরিনা মিতু।।

মনের বুনো জালে শায়িত স্বপ্নগুলোকে পূরণ করার উদ্যমী চিন্তার বহিঃপ্রকাশে একজন উদ্যোক্তার পরিচয় পাওয়া যায়। বয়স ভেদে নিজ অবস্থান থেকে উদ্যমী কিছু নক্ষত্রের উদ্যোগী হয়ে উঠার গল্পের ভেতর ঢুকে নিজের স্বপ্নটাকে দেখে আসার সাহস আমার হয়েছিল। তাদের গল্পই আজ বলবো।

সামাউন আফরাজ ফাহিম

‘স্বপ্ন পূরণের ক্ষেত্রে কাজের ফলাফল কি হবে তার থেকেও বেশি জরুরী নিজের উপর বিশ্বাস রাখা। মনের ভেতরের বাসনাটাকে পড়তে পারলে সব কিছুই অমায়িকভাবে সহজ হয়ে যাবে। সেই সূত্র ধরেই নিজের স্বপ্নটাকে কাল্পনিক থেকে বাস্তবে আকার দিতে পেরেছি’। এভাবেই নিজের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করে উদ্যোক্তা হয়ে উঠার কথা বলছিলেন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘গন্তব্য’ এর উদ্যমী প্রতিষ্ঠাতা সামাউন আফরাজ ফাহিম।

২০১৫ সালের ২৪ জুলাই গন্তব্য আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে কলেজে পড়ুয়া  ৩৫ জন তরুণ-তরুণীদের নিয়ে। বর্তমানে ২৫০ স্বেচ্ছাসেবী নিয়ে এগিয়ে চলেছে সংগঠনটি। সমাজের আমূল পরিবর্তন করা মূল উদ্দেশ্য রেখে তখন থেকে শুরু করে ২০১৭ সালের অক্টোবর পর্যন্ত গন্তব্য মোট ৮টি প্রোজেক্টের মাধ্যমে ২১ টি ইভেন্ট আয়োজন করে। এছাড়াও ওমেন্স ম্যারাথন ১ম ও ২য় আসর, বিশ্ব ব্যক্তিগত গাড়ি মুক্ত দিবস, স্পোর্টস হাব বাংলাদেশের আয়োজনেও তারা  স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন হিসেবে কাজ করেন।

সামাউন ০২ আগস্ট ২০০০ সালে ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজ থেকে ২০১৫ তে এসএসসি পাশ করেন, পরবর্তীতে ২০১৭ সালে স্টামফোর্ড কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করে বর্তমানে স্নাতক ভর্তি যুদ্ধে অংশ নিচ্ছেন। কোনো প্রাপ্তিই সহজলভ্য নয়। পোহাতে হয় নানা ঝামেলা, থাকে সীমাহীন প্রতিবন্ধকতা।

সংগঠনটি গড়ে তুলতে সেই সাথে কাজ করতে গিয়ে কি কি প্রতিবন্ধকতার স্বীকার হতে হয়েছে জিজ্ঞাস করায় খানিক মুচকি হেসে তিনি বলেন, ‘প্রতিবন্ধকতার কথা বলতে গেলে শুরুতে যেতে হবে, বাবার অনুপস্থিতিতে মায়ের কাছে বড় হওয়া থেকে জেদের বশে বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়া এসবই বলতে হবে। শুরুতে যখন এই পরিকল্পনা মাথায় আসে বন্ধুবান্ধবদের জানাই। তারা পাগল বলে, হেসে উড়িয়ে দিতো। রাফাত, দিপু, সাইফুল গন্তব্যের সহ-প্রতিষ্ঠাতা তারা সব সময় পাশে থেকে সমর্থন করে গেছে।পরিবার থেকে আম্মুর সমর্থন পেলেও একসময় লেখাপড়ার ক্ষতি হওয়ার ভয় না করে দেয়, বাড়ি ছেড়ে বের হয়ে যাই, যতোদিন সে মেনে না নিবে ততোদিন বাড়ি ফিরবো না  বলে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করি। পরে অবশ্য লেখাপড়া ঠিক রাখবো সেই শর্তে আম্মু মেনে নেয়। পারিবারিক ঝামেলা কাটিয়ে উঠতেই সম্মুখীন হতে হয় নতুন বাধার। এনজিও এর প্রতি সাধারণ মানুষের ক্ষোভের মুখে বারবার পড়তে হতো, মানুষ ঠকতে ঠকতে আজ এমন পর্যায়ে যে তাদের বিশ্বাস করানো কঠিন হয়ে যায়। তাছাড়াও প্রশাসনের বাধা তো আছেই, রাস্তাঘাটে প্রায়ই স্বেচ্ছাসেবকেদের পুলিশ আটকিয়ে লাঞ্ছিত করে। উল্লেখ্য, সকল আনুষ্ঠানিকতা পালন করে রেজিষ্ট্রেশনের কাগজপত্র জমা দেয়ার পরেও পাঁচ মাসেও কোনো উপায় মেলেনি। যেখানে স্বাভাবিক সময় বড়জোর এক সপ্তাহ’।

একইসাথে স্পষ্টভাষী চোখে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে সামাউন বলেন, ‘এছাড়া এই বছর আমরা একটি দীর্ঘ মেয়াদী প্রোজেক্ট হাতে নিচ্ছি। আদর্শ গ্রাম নামক ইভেন্ট। যেখানে সব দিক দিয়ে উন্নয়ন ঘটিয়ে প্রযুক্তির ব্যবহার কাজে লাগিয়ে উন্নত এক গ্রাম তৈরি করা আমাদের লক্ষ্য। পরবর্তী ১০/১৫ বছরে বৃহত্তর উত্তরবঙ্গের ১০০ টি গ্রাম আদর্শ গ্রামে পরিণত হবে আমাদের হাতট’।

এভাবে লড়ায় করে স্বতস্ফুর্তভাবে এগিয়ে চলেছে সামাউনের স্বপ্নের গন্তব্য। স্বপ্নের সঠিক গন্তব্য তিনি ঠিক করতে পেরেছেন।

আলফাতুন্নেছা মুক্তা

তিন বোনের মধ্যে সবচেয়ে বড় মেয়ে আলফাতুননেসা মুক্তা ষোলতে পা দিয়েছেন। বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ পাবলিক কলেজে একাদশ শ্রেণীতে অধ্যয়নরত আছেন। এই বয়সেই নিজস্ব অনলাইন বিজনেস এর মাধ্যমে বেশ প্রসার করেছেন। নিজের তৈরি জুয়েলারিসহ বর্তমান সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে রুচিসম্মত সব পণ্য নিয়ে সাজিয়ে নিয়েছেন নিজের স্বপ্নের অনলাইন শপ।

প্রতিবন্ধকতায় তেমন পড়তে হয়নি উলটো পরিবার থেকে পেয়েছে সহযোগিতা তা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমার মতে উদ্যোক্তা হতে হলে সবার আগে যা প্রয়োজন তা হল আত্মবিশ্বাস। নিজের দক্ষতার উপর বিশ্বাস করে কাজটি সঠিকভাবে করে যেতে পারলেই একজন মানুষ সফল উদ্যোক্তা হতে পারা যায়। সমাজের লোকজন কে কি ভাববে, কে কি মনে করবে এগুলো নিয়ে মাথা ঘামানো উচিত নয়।

মাইমুনাহ মিম

অনলাইন বিজনেসের মাধ্যমে সবার কাছে বেশ পরিচিত একটি মুখ মাইমুনাহ মিম। আঠারোতে পা দেয়া এই তরুণির কথায় প্রথমেই উঠে আসে উদ্যোক্তা হিসেবে শুধুমাত্র নারী হওয়ার জন্য কি কি প্রতিবন্ধকতার স্বীকার হতে হয়েছে। বন্ধুবান্ধব থেকে ধরে আশপাশের মানুষদের থেকে খুব বাজে কথা শুন্তে হয়েছে বিজনেস নিয়ে! মানসিক ভাবে ভেঙে পরার জন্য এগুলোই যথেষ্ট ছিলো কিনা তা নিয়ে আমার সন্দেহ নেই। কিন্তু কোনো কিছুই ইচ্ছা শক্তি কে দমিয়ে রাখতে পারেনি! প্রতি মাসে মায়ের হাতে নিজের উপার্জন তুলে দিতে পারার আত্নতৃপ্তি তার চোখে মুখে দেখতে পাচ্ছিলাম।

কিভাবে একজন নারীও পারে বাঁধার বিপরীতে কোনঠাসা না হয়ে সামনে এগিয়ে যেতে, নিজের লক্ষ্য ঠিক রাখতে তা বুঝতে ছোট্ট একটি গল্প তার মুখেই আমরা জানবো।

‘২০১৬ তে আমি আমার পেইজে সেল করার জন্য এক মেয়েকে দিয়ে USA থেকে কিছু প্রোডাক্ট আনাতে চাই এবং এই বাবদ তাকে ১১০০০ টাকা বিকাশ করি। পরে সে আমাকে প্রোডাক্ট দেয়নি! টাকা ও না! এটা একটা বড় ধাক্কা ছিল আমার জন্য! তারপর ফ্রেন্ড সার্কেল থেকেও খুব বাজে কথা শুনতে হয়েছে বিজনেস নিয়ে! মানসিক ভাবে ভেঙে পরার জন্য এগুলা যথেষ্ট ছিল কিন্তু কিছুই আমার ইচ্ছা শক্তি কে দমিয়ে রাখতে পারেনি’!

পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর পাশাপাশি তিনি দুজন সুবিধাবঞ্চিত মেয়ের পড়াশোনার ব্যয়ও নিজের কাধে নিয়েছেন।

সবশেষে একজন তরুন নারী উদ্যোক্তা হিসেবে সবার উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, প্রত্যেক টা মেয়ের উচিত নিজে থেকে নিজের যোগ্যতায় নিজের একটা পরিচয় বানানো। যদি আপনি নিজের বিজনেস শুরু করতে চান তাহলে একবুক সাহস এবং তীব্র ইচ্ছা নিয়ে আজই শুরু করে দেন। আশেপাশে অনেক বাজে কথা শুনবেন, অনেকে অনেক কিছু বলবে কিন্তু সব পিছনে ফেলে নিজের মত এগিয়ে যান নিজের স্বপ্ন নিয়ে দেখবেন সফলতা আসবেই।

স্বপ্নের বাস্তবায়ন ঘটাতে এমন কিছু মানুষের সফলতার গল্প আমাদের বরাবর অনুপ্রেরণা জুগায়। স্বপ্ন দেখতে জানার সাথে তা পূরণ করার বাস্তবতা আমাদের উদ্যোগী করে তুলে।

Advertisement

কমেন্টস