কারবালা ও আশুরা কিছু বিভ্রান্তি কিছু ভ্রষ্টতা

প্রকাশঃ সেপ্টেম্বর ৩০, ২০১৭

ইয়াহইয়া শহিদ।।

হক ও বাতিলের দ্বান্দ্বিক লীলাক্ষেত্র এই পৃথিবী।  পৃথিবী সৃষ্টির প্রথম প্রভাত থেকে শুরু হয়েছে সত্য-মিথ্যার বিরামহীন পথচলা। এই পথচলা অব্যাহত থাকবে পৃথিবীর শেষ প্রভাত পর্যন্ত। এ যেন পৃথিবীর অমোঘ বিধান।  প্রথম সূর্যোদয় থেকে যে রকম সত্যকে লালন করে চলছেন এক দল, ঠিক মিথ্যার অনুসরণ করে আসছে প্রতিপক্ষদল। কিন্তু সত্যের জয় এবং মিথ্যার পরাজয়ও যেন পৃথিবীর অমোঘ বিধান। ইসলামের পতাকা যখন পতপত করে উড়তে শুরু করেছিলো পৃথিবীর আকাশে, তখনই ইসলাম বিরোধীদের নানা চক্রান্তের ফাঁদে পা দিয়ে ধ্বংস হয়েছেন অনেক বিশ্বাসীরা। কিন্তু নিঃশেষ হয়া যায়নি তাঁরা। এখনো আছে তাঁরা বিজয়ীরূপে।

ইসলাম বিরোধীদের চক্রান্ত থেকে মুক্তি পায়নি আশুরা কারবালাও। আশুরা কারবালা নিয়েও তারা ছড়িয়েছে চক্রান্তের ফাঁদ। আর সেই ফাঁদে আটকা পড়ে আছে অনেক বিশ্বাসীরা। তাদের চক্রান্তের ফাঁদ থেকে রক্ষা পেতে আমাদের জানতে হবে আশুরা কারবালার মূল ইতিহাস। জানতে হবে আশুরা কারবালার যোগসূত্র।

আশুরা কি!

আরবি নববর্ষের প্রথম মাস মুহাররম মাসের দশ তারিখের দিনকেই আশুরা বলা হয়। আশরুন থেকেই আশুরা। আশরুন আরবি শব্দ। অর্থ হচ্ছে দশ। তাই মুহাররমের দশ তারিখকে আশুরা বলা হয়। অনেকে ধারণা, এই দিনে দশটি বড় বড় ঘটনা ঘটেছিলো, তাই এই দিনকে আশুরা বলা হয়ে থাকে। এমন ধারণা ভুল। কারণ এর কোনো সঠিক প্রমাণ কোরআন হাদিসের কোথাও নেই।

আশুরার তাৎপর্যঃ

১) একাদিক বিশুদ্ধ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত যে, এই দিন মুসা আ. ও তাঁর উম্মতকে ফেরাউনের হাত থেকে রক্ষা দিয়েছিলেন আল্লাহ। মুসা আ. এই কৃতজ্ঞতা স্বরূপ সেদিন রোযা রাখতেন।  মদিনার ইহুদীরাও সেই দিনের স্মরণে রোযা রাখত। নবিজি সা. মদিনায় আসার পরে দেখলেন তারা আশুরার দিনে রোযা রাখে। নবিজি সা. জিজ্ঞাসা করলেন তোমরা কেন আশুরার দিনে রোযা রাখ! তারা বলেছিলো এই দিন আমাদের পূর্বপুরুষ ফিরাউনের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছিলেন, তাই রোযা রাখি। তখন নবিজি সা. সাহাবিদের আশুরার রোযা রাখার আদেশ দেন।
(মুসলিম, হাদিস নম্বর ২৬৫৩)

২) রমযানের রোযা ফরজ হওয়ার আগে আশুরার রোযা ফরজ ছিলো। রমযানের রোযা ফরজ হওয়ার পরে আশুরার রোযার ফরজের বিধান রহিত হয়ে যায়। পরে আশুরার রোযা মুস্তাহাবের স্তরে চলে আসে। এবং এই দিনের রোযা রমযানের রোযার পরে সর্বশ্রেষ্ঠ  ঘোষণা দেয়া হয়।

হযরত জাবের রা. সূত্রে বর্ণিত আছে-‘রাসুলুল্লাহ সা. আমাদের আশুরার রোযা রাখার নির্দেশ দিতেন এবং এর প্রতি উৎসাহিত করতেন। এ বিষয়ে নিয়মিত তিনি আমাদের খবরাখবর নিতেন। যখন রমযানের রোযা ফরজ করা হলো, তখন আশুরার রোযার ব্যাপারে তিনি আমাদের নির্দেশও দিতেন না এবং নিষেধও করতেন না। আর এ বিষয়ে তিনি আমাদের খবরাখবরও নিতেন না।
(মুসলিম শরিফ-১১২৮)

আরো অনেক হাদিস দ্বারা এই দিনের রোযার ফজিলত স্বীকৃত।

একটি প্রসিদ্ধ ভ্রান্তির অপনোদনঃ

উল্লিখিত হাদিস থেকে আমরা এ কথাও বুঝতে পারলাম, আশুরার ঐতিহ্য আবহমানকাল
থেকে চলে আসছে। অনেকেই না বুঝে অথবা ভ্রান্ত প্ররোচনায় পড়ে আশুরার ঐতিহ্য বলতে রাসুল সা.-এর প্রিয়তম দৌহিত্র, জান্নাতের যুবকদের দলপতি হজরত হুসাইন রা. -এর শাহাদাত ও নবী পরিবারের কয়েকজন সম্মানিত সদস্যের রক্তে রঞ্জিত কারবালার ইতিহাসকেই বুঝে থাকে। তাদের অবস্থা ও কার্যাদি অবলোকন করে মনে হয়, কারবালার ইতিহাসকে ঘিরেই আশুরার সব ঐতিহ্য, এতেই রয়েছে আশুরার সব রহস্য। উপরোল্লিখিত হাদিসের আলোকে প্রতীয়মান হয়, আসলে বাস্তবতা কিন্তু এর সম্পূর্ণ বিপরীত। বরং আশুরার ঐতিহ্যের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে প্রাচীনকাল থেকেই।

হজরত হুসাইন রা.-এর মর্মান্তিক শাহাদাতের ঘটনার অনেক আগ থেকেই আশুরা অনেক তাৎপর্যপূর্ণ ও রহস্যঘেরা দিন। কারণ কারবালার যুদ্ধ সংঘটিত হয় ৬১ হিজরির ১০ মহররম। আর আশুরার রোযার প্রচলন চলে আসছে ইসলাম আবির্ভাবেরও বহুকাল আগ থেকে। তবে এ কথা অনস্বীকার্য যে আবহমানকাল থেকে আশুরার দিনে সংঘটিত বিভিন্ন ঘটনা যেমন অপরিসীম গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি হিজরি ৬১ সনে আশুরার দিন কারবালার ময়দানের দুঃখজনক ঘটনাও মুসলিম জাতির জন্য অতিশয় হৃদয়বিদারক ও বেদনাদায়ক। প্রতিবছর আশুরা আমাদের এই দুঃখজনক ঘটনাই স্মরণ করিয়ে দেয়। তবে এও বাস্তব যে এ ঘটনাকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে না পেরে আজ অনেকেই ভ্রষ্টতা ও কুসংস্কারের অন্ধকারে নিমজ্জিত।

আশুরার দিনে কারবালা কেন আগে আসে!

আমি প্রথমেই বলেছি, ইসলাম বিরোধীদের চক্রান্ত চলে আসছে সেই সোনালি যুগ থেকেই। ইহুদীরা তাদের চক্রান্ত সফল করতে মুসলমানদের ভেতরে ঢুকিয়ে দিয়েছিলো মুসলিম নামধারী কিছু মুনাফিকদের।  উসমান রা. এর শাহাদাতের পর থেকেই সেই মুনাফিক দল মুসলমানদের  মধ্যে দ্বন্দ্বের সূত্রপাত ঘটায়। এবং এরই ধারাবাহিকতায় ঘটে সিফফিনের যুদ্ধ ও কারবালার কাহিনী।  আর সেই মুনাফিক দলের নামই হচ্ছে শিয়া সম্প্রদায়। আর ইসলামের অধিকাংশ ইতিহাস তাদের হাতেই রচিত। তারা ইসলামের ইতিহাস লেখতে কারবালাকে এমনভাবে উপস্থাপন করেছে, যা পড়লে বুঝা যায় কারবালাকে ঘিরেই আশুরার ঐতিহ্য।  আশুরার এতো সম্মান এতো মর্যাদা কেবল কারবালার জন্যই। তাজিয়া মিছিল, শোক র‍্যালি, হায় হুসাইন বলে চিৎকার করাই যেন আশুরার শিক্ষা। কিন্তু বাস্তবতা কি তাই!

দুঃখের বিষয় হচ্ছে আমরা এই ইতিহাস পড়ে বড় হয়েছি। এবং সেভাবেই আমাদের মানসিকতা গঠন হয়েছে। আমরা কখনো বুঝিনি যে, এটা ইসলাম বিরোধী শক্তির চক্রান্ত। এখনো সময় আছে ইসলামের সঠিক ইতিহাস খুলে পড়ুন। ইসলাম সম্পর্কে জানুন। ভ্রান্তির বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে সঠিকের উপর চলুন।

Advertisement

কমেন্টস