ঈদের দিনের সালামি বিড়ম্বনা: কিছু আনন্দ আর কিছু বেদনা

প্রকাশঃ সেপ্টেম্বর ৮, ২০১৭

ছাফওয়ান নাঈম, নোবিপ্রবি প্রতিনিধি-

এইবারসহ চারবার। প্রতি ঈদে মেজো মামি সালামি দিবেন, আগে থেকেই বলে রাখেন। তিন তিনবার মিস হলেও, এবার আর মিস হয়নি। বলার আগেই সালামি নিয়ে হাজির। নানু ভাইয়া ছোট বেলা থেকেই সালামি দেন। মাঝে কয়েক ঈদ বাকি ছিল। এরপর আবার দিয়েছেন। মাঝে মাঝে নিজে না দিয়ে নানুর হাতে দিতে বলেন। এবারও তেমনটাই হয়েছে। আর বড় মামা সেই যে কখন সালামি দিয়েছেন! “ভুলেই গেছি” কথাটা নাহয় বললাম না!

প্রতিবার আমাদের কুরবানির গরু দাদা জবাই করে থাকেন। গতবছর জবাই করতে গিয়ে হোচট খেয়েছেন, পরে আমার সহযোগিতায় জবাই সম্পন্ন করেছিলেন। এবার, ঈদের দুদিন আগেই ডেকে গরু জবাইয়ের কথা বললেন। এবং কি দোয়া পড়তে হবে, কাদের কথা স্মরণ রাখতে হবে সব মনে করিয়ে দিলেন।

ঈদের দিন সকালে ফজর পড়ে দ্বিতীয়বার ঘুম থেকে উঠে কিছুক্ষণ কোরআন তিলাওয়াত করে ঈদের নামাজ পড়ার পরেই বুকের মধ্যে কেমন যেন ফিনফিন করে উঠলো। আমাকে বুঝি আজ গরু জবাই করতে হবে! সাথে সাথে ওই নিষ্ঠুর পাষাণ্ডগুলোর কথাও মনে পড়লো। যারা পশু হত্যা মহাপাপ বলে চিৎকার চেঁচামেচি করে, আর নিরিহ রোহিঙ্গাগুলোকে দিনের আলোয় নির্বিচারে হত্যা করে। সামান্য একটা গরু জবাই করতে গিয়ে এত ভয় লাগছে, কিভাবে তারা এই মানুষগুলোকে হত্যা করে! ওহ! এরা মানুষ নয়, এরা মুসলমান! মুসলমান হওয়াটাই বুঝি এদের অপরাধ!

হালকা নাস্তা করে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে পশু জবাইয়ের স্থানে গিয়ে উপস্থিত হলাম। ভিতরে ভিতরে ভয় কাজ করছিল। এরপরও সবাই গরুকে যখন শক্ত করে ধরলো, যার জন্য কোরবানি দিচ্ছি তার সেখানো বাসায় দোয়া পড়ে জবাই করে ফেললাম। সবাই মিলে বাকি কাজগুলো সম্পন্ন করে গোস্ত নিয়ে বাড়ি ফিরলাম। রান্নাবান্না করার পর রুটি আর গোস্ত খেয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে বড় আপুর বাসায় চলে গেলাম। সেখানে আমলার আচারটা খুব ভাল লেগেছিল। আমাদের সাথে একমাত্র ভাগ্নেটা আসার জন্য কান্নাকাটি করতেছিল, পরে তাকে সালামি দিয়ে শান্ত করে চলে এলাম নানার বাড়ি।

বড় মামা দেরীতে বাড়ি আসবে বলে এবার দেরী করেই নানার বাড়ি গেলাম। কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলতে বলতেই সন্ধা হয়ে গেল। ক্ষুধা না থাকায় কিছু না খেয়েই অনেক রাত পর্যন্ত আলাপচারীতায় কাটিয়ে দিলাম। কারেন্ট না থাকায় ঘুমও আসছিলোনা। পরের দিন সকালে গোস্ত রুটির দাওয়াত থাকায় সকালের নিয়মিত ঘুমটা আজ হয়নি। নাস্তার মাঝে আলাপচারীতা জমে উঠে। যে যার মত মজা করতেছেন, আর খাচ্ছেন। এক পর্যায়ে, আমার নিকট আমার সাংবাকিতা করা নিয়ে জানতে চাইলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র যোবায়ের হোসেন মুন্না মামা। কিছুকথা শুনলেন, কিছু পরামর্শ দিলেন, কিছু উপদেশ দিলেন। ভালই কাটলো সেদিনের সকাল বেলা।

এবার, গরু জবাই আর তা সম্পূর্ণ করা ছাড়াও বিভিন্ন কাজে বেশি ব্যস্ত থাকায় প্রতিবারের মত সবাইকে সস্থা উপায়ে মেসেঞ্জারে সুভেচ্ছা জানানো হলোনা। যে কয়জন আমাকে শুভেচ্ছা জানিয়েছে, তাদের রিপ্লাই দিতেও বড্ড দেরী করে ফেলেছি। অনেকে কল দিয়েও পায়নি। সবার কাছেই “দুঃখিত” বলা ছাড়া ভিন্ন উপায় দেখছি না।

গরু জবাই করায় দাদা এবার হাদিয়াও দিলেন। তবে, কয়েকবছর হয়েগেছে তিনি ঈদের সালামি দেন না। বাবা আর মা ও এখন আর সালামি দেন না। আমাদের হবু মামিকেও (সেজো) সালামির কথা বলে রেখেছি। তিনি সালামি দিবেন বলে কথা দিয়েছেন। আর, বড় মামা যেহেতু অনেক বেশি কাজা করে ফেলছেন, বড় মামী আসলেই সেটা আদায় করতে হবে। আমার সালামি চাই-ই-চাই।

সবার চোখে মনে হয় অনেক বেশি বড় হয়ে গেছি। না হয়, যারা কয়েক ঈদ আগে সালামি দিতেন, তারা এখন আর কেন সালামি দেয় না! একটা কথা বলি, আমি আপনাদের সেই ছোট ছেলেটি ছোটই আছি। বড় হইনি এখনো। সালামি পাওয়ার জন্য হলেও অন্তত এই কথাটা মেনে নেন।

কিছু আনন্দ আর কিছু বেদনার মধ্যো দিয়ে ঈদ-উল আযহা কেটে গেছে। ঈদের আনন্দের মধ্যে এবার নতুন একটি বিষয় যোগ হয়েছে। “ফুটন্ত বার্তা” নামক ম্যাগাজিন এ মেধাবী মুখ হিসেবে ছোট ভাইয়ের সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়। যেটা মনটাকে আনন্দে ভরপুর করে দেয়। সে ২০১৭ সালে এসএসচিতে A+ পেয়েছিল। যতবেশী আনন্দই থাকুক না কেন? মনের আঙ্গিনায় অধিকাংশ স্থান ধরে বেদনাই ভরপুর ছিল।পাশের দেশেই মুসলমান ভাই গুলার উপর ইতিহাসের নিকৃষ্টতম নির্যাতন চেঙ্গিস খানকেও বোধহয় হার মানাবে। আল্লাহ তাদেরকে যেন তার কুদরতি হাতে হেফাযত করেন, দয়াময় প্রভুর নিকট এই দোয়াই করি।

কমেন্টস