আবেগময় হুইল চেয়ার ও বাংলাদেশের মহরম আলীর বিশ্ব জয়ের গল্প 

প্রকাশঃ সেপ্টেম্বর ৭, ২০১৭

মেরিনা মিতু।।

হালকা বেগুনী আর চকমকা লাল-নীল আলোর সাথে উত্তেজনায় বশীভূত গানের সুরে সুরে আমাদের প্রত্যেকের পা জোড়া যখন তাল খুঁজে নিচ্ছে, ঠিক তখনই হঠাৎ এই নির্মল পরিস্থিতির কাছে একেবারেই অসামঞ্জস্য অনেকটা বেসুরাভাবে হাত তালির শব্দ পাচ্ছিলাম। বেসুরের পিছন ছুটে কাছে পৌঁছে দেখি একটি নক্ষত্র জ্বলজ্বল করতেছে। হুইল চেয়ারে আসন গেড়ে বসা নক্ষত্রটির হাত দুটো টেনে নিয়ে আমার পা জোড়া সেদিন সুরে নতুন তাল খুঁজে পেয়েছিলো।

আশা ইউনিভার্সিটি কর্তৃক পরিচালিত “আশা বানমুন ২০১৬” তে একজন ডেলিগেটস হিসেবে অংশগ্রহণ করতে গিয়ে পরিচয় একজন ব্যক্তিত্বের সাথে। সেদিনের সেই স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে মস্তিষ্কে গল্পের দুটো চরিত্র ঘুরপাক খাচ্ছে তবে ঠিকঠাক সাজানোর অভাবটা বেশ টের পাচ্ছি। শুরুটা কিভাবে হবে আর শেষ টা কিভাবে তা ভাবতে ভাবতেই সব যেন হারিয়ে যাচ্ছে মাটি থেকে আকাশ ছোয়ার মতো আর কি।

যাক, সব সমাপ্তির স্বাদ একরকম নয় ঠিক তেমনি সব অর্জনের পিছনেও থাকে না জানা সব গল্প। গল্পের দিকে এগোই।গল্পের প্রধান চরিত্র অর্থাৎ নায়কের পার্টে রয়েছেন মোঃ মহরম আলি। আর গল্পের আকর্ষণ অর্থাৎ নায়িকার চরিত্রে রয়েছে তার বিশেষ আকাঙ্ক্ষিত আর আবেগময় স্বপ্নালু ভালোবাসা “একটি হুইল চেয়ার”।

প্রথমেই গল্পের চমক নিয়ে বলি, স্বপ্নালু এই “হুইল চেয়ার” এ আসন গেড়ে বাস/ট্রেন/জাহাজের মাধ্যমে এশিয়া, ইউরোপ এবং আমেরিকা এই তিন মহাদেশের প্রায় ২৫,৮২৮ কিলোমিটার, ১৯ টি দেশ (বাংলাদেশ, ইন্ডিয়া, নেপাল, তিব্বত, চীন, কাজাখস্তান, রাশিয়া, ইউক্রেন, পোল্যান্ড, জার্মানি, সুইজারল্যান্ড, লিয়েখটেনস্টেইন, অষ্ট্রিয়া, ইতালি, ভেটিকান সিটি, চেক রিপাবলিক, বেলজিয়াম, ইংল্যান্ড এবং ইউএসএ) পাড়ি জমান।

c.Mohoram_full body_2in1

আচ্ছা, এক ব্যক্তি বিশ্ব ভ্রমণ করেছেন তা নিয়ে এতো কিসের আয়োজন? মূলে যাই তাহলে এবার, বিশ্ব ভ্রমণ করেছেন তাতো কথা না, কথা হলো বিশ্ব ভ্রমণের পিছনে রয়েছে তার এক বিশেষ উদ্দেশ্য। সেকি গল্পটা আন্তর্জাতিক মানের কোনো চোরাকারবারি আর হুইল চেয়ারের মধ্যে ব্লু ডায়মন্ড লুকিয়ে রাখার মতো কিছু নয়তো! হাহাহহাহা। না, তা না। আচ্ছা চলুন সহজ করে বুঝিয়ে বলছি।

বিশ্ব ভ্রমণে মহরম এক মহৎ উদ্দেশ্য মাথায় নিয়ে মনে স্বপ্নের জাল বুনতেছিলেন তার স্বপ্নালু হুইল চেয়ারে বসে বসে। আর তা হলো,  জাতি সংঘের সদর দপ্তরে বিশ্বের সকল প্রতিবন্ধীদের জন্য একটি ফান্ড কার্যকরী করার উদ্দেশ্যে তার “ওয়ার্ল্ড ডিজএ্যাবিলিটি ফান্ড” কনসেপ্ট’টি জমা দেয়া।

তার ভাষ্য মতে বর্তমানে পৃথিবীতে প্রতিবন্ধীদের উন্নয়নের জন্য জাতি সংঘসহ সরকারি/বেসরকারি পর্যায়ে অনেক তহবিল রয়েছে, তবে কোন কেন্দ্রীয় আন্তর্জাতিক তহবিল নেই। অবশ্য স্বপ্নের জাল বুনেই থেমে থাকেনি এই উচ্চাভিলাষে ডুবে থাকা মানুষটি। ২০১২ সালের ১৩ই জানুয়ারি নিউ ইয়র্কে অবিস্থিত জাতিসংঘের সদর দপ্তরে এবং বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনে তার এই কনসেপ্ট’টি অফিসিয়ালি উপস্থাপন করেছেন এবং জমাও দিয়েছেন।

তিনি বলেন, যদিও এটি একটি সুদূর প্রসারী এবং দীর্ঘমেয়াদী কাজ। এটি একান্তই তার নিজস্ব উদ্যোগ হলেও, অর্জনটা হবে সবার। এ কাজ এগিয়ে নিতে তাই বেশ সময় ও পরিশ্রমের সাথে সাথে অর্থেরও দরকার রয়েছে।

তিনি নিজেকে মূল্যায়ন করলেন এভাবে – যেহেতু আমি তৃতীয় বিশ্বের একটি গরীব দেশের অতি সাধারণ নাগরিক তাই আমার এই তহবিল ধারণাটি বিশ্ব দরবারে পৌঁছানোর জন্য ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করতে হবে। ভিন্নপন্থা খুঁজতে গিয়ে তিনি ভাবলেন যদি হুইল চেয়ারে করেই বাস/ট্রেন/জাহাজে করে ঢাকা থেকে ইউএস-এর বাণিজ্যিক রাজধানী নিউ ইয়র্কে পৌঁছান তবে কেমন হয়?  যে ভাবা সেই সিদ্ধান্ত নিলেন। হে অবশ্যই হুইল চেয়ারে করে বিশ্ব ভ্রমণ একটি ভিন্ন ধারণা, সেই সাথে একটি দৃঢ় প্রত্যয়ও বটে।

আচ্ছা ভালো কথা, গল্পের প্রধান চরিত্রের জন্মস্থান সম্পর্কে জানতে চাচ্ছেন নিশ্চয়! দেশ এলাকার সাথে ব্যক্তিগত চরিত্রকে আরো সুন্দর কল্পনা করা যায়, কি বলেন? মহররমের জন্ম, বেড়ে উঠা, শিক্ষার উচ্চ মাধ্যমিক স্তর সবই ছিল নাটোর জেলার সদর উপজেলার দক্ষিণপুর গ্রামে। ১৯৮৬ সালের ২৯ শে জুলাই এই নক্ষত্রের আবির্ভাব হয় দুনিয়াই। আর ঠিক দেড় বছর বয়স থেকেই স্বপ্নালু হুইল চেয়ারের সূত্রপাত শুরু হয়। খানিকটা সহজ করে বলি, মহরমের বয়স যখন ১৮ মাস তখন তার পোলিও হয়।

তার বাম হাতের সাথে সাথে বাম পা টাও শক্তিহীন হয়ে পড়ে। বাবা মা অনেক চিকিৎসাও করিয়েছেন, তা করাতে গিয়ে বাবা তার পৈত্রিক জমিও বিক্রি করেছেন। যদিও সবই ছিল কবিরাজি চিকিৎসা, যার ফলাফল ছিলো শূন্য। পরবর্তীতে অবশ্য ডাক্তার দেখিয়েছেন, তবে ততোদিনে যা হওয়ার হয়েই গেছে। প্রথম দিকে এক পায়ে লাফিয়ে লাফিয়ে হাটতে পারলেও বয়সের সাথে সাথে শারীরিক পরিবর্তনের সাথে তাল মিলিয়ে শেষ রক্ষাও হয়নি, ঠায় মেলে হুইল চেয়ারে।

মহরমের শিক্ষাজীবন কি খানিক তুলে ধরবো? আমি গল্পের ঠিক এই জায়গাটায় খুব বেশিই আত্নবিশ্বাসী যে তার শিক্ষাজীবনের ঘটনাগুলো আমার আপনার আর আমাদের ভবিষ্যতের জন্য অনেক বেশি কার্যকরী হবে। বাবা-মার গাফিলতিও ঠিক বলা যায় না তবে নির্দিষ্ট সময়ে স্বাভাবিকভাবে তার স্কুলজীবন শুরু হয়নি। বাড়ির পাশে মোড়ের মধ্যে বসে বসে এর সাথে ওর সাথে গল্পের ছলেই তার দিন কাটতো। কেউ কেউ এস তার মাকে বলতো, হুদায় বসায় না রেখে একটা বাঁটি দিয়া বসাও। ছোট মহরম সেদিন বুঝেনি এই কথার মানে। পাড়া-প্রতিবেশিদের এমন হাজার ফোঁড়ন শুনতে শুনতে দিন কাটার পরও তার মা তাকে তার অন্যান্য ভাইবোনদের থেকে আলাদা করে দেখেননি। সেই থেকে আজও মহরম কোথায় আলাদা সুবিধা পাওয়ার আশা করেন না, বরং হুইল চেয়ারে বসে বসেই সব বাধা বিপত্তি পার করে যাচ্ছেন।

মহরমের বয়স যখন নয় কি দশ তখন বাড়ি থেকে ১০০ গজ দূরে অবস্থিত ব্র্যাকের উদ্যোগে পরিচালিত প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করানোর আকাঙ্খা নিয়ে তার মা তাকে নিয়ে যায়। তবে ভাগ্য যেন মহরুমের জন্যই কেবল ব্যাপক অসহায়। স্কুলে নাচের ক্লাসটা ছিল তখন বাধ্যতামূলক, শুধুমাত্র নাচতে পারবে না বলে মহরমকে তারা ভর্তি করতে চাইলো না। তবে এলাকাবাসীর দাপটে তারা মহরমকে স্কুলে নিতে রাজি হয়, তবে শর্ত থাকে একাধিক। মহরম স্কুলের ছাত্র থাকলেও স্কুলের আনুষ্ঠানিক নথিপত্রে তার কোনো নাম থাকবে না, স্কুলে যখন ভিজিটর আসবে তখন তাকে বাইরে থাকতে হবে, স্কুলের পুরানো বই খাতা নিয়ে শুরু হলো মহরমের শিক্ষার প্রাথমিক স্তর।

পরবর্তীতে তিনি বাড়ি থেকে ১ মাইল দূরে অবস্থিত স্থানীয় এক স্কুলে ভর্তি হোন মাধ্যমিক স্তরে। সেখানেও প্রকৃতি তার সহায় হলো না, স্কুলে যাওয়ার রাস্তাটা ছিলো কাঁচা, তার চাচাতো ভাই সাইকেলে করে তাকে স্কুলে নিয়ে যেতো, তবে বর্ষার সময় পড়ে যেতেন বিপাকে, যার ফলে বছরে সব মিলিয়ে চার/পাঁচ মাস স্কুলে যেতে পারতেন। সব মিলিয়ে তিনি তিনবারে এসএসসি পাশ করতে সক্ষম হোন। তারপরেও তিনি হাল ছাড়েননি। নিজের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে বিশেষ সুবিধা চাননি। নিজের মেধা আর দৃঢ়তা দিয়ে এগিয়ে গিয়েছেন। পর্যায়ক্রমে এইচএসসি পাশ করে ঢাকায় আশা ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা চলাকালীন ও নিজের মেধা আর সৃজনশীলতার পরিচয় দিয়ে গেছেন।

যে ভয়ের তাড়ায় ছুটছিলাম তাই হলো দেখি। গল্পের তাল হারায় ফেললাম। কি বিপদ বলুন তো? আচ্ছা গল্পের শেষ টা কিভাবে করবো?

Advertisement

কমেন্টস