‘ঘুড়ি’ স্বপ্ন দেখে, স্বপ্ন দেখায়

প্রকাশঃ আগস্ট ২২, ২০১৭

মেরিনা মিতু।।

“ছোট দেশটাকে নিয়ে ছোটখাটো স্বপ্নই দেখি। হঠাৎ হয়তো কখনো ঘুম ভেঙে দেখবো এখানে কোনো খিদে নেই, রাস্তার পাশে কেউ হাত পেতে নেই, সবুজ দেশটা সবুজ…আরো সবুজ। এসব স্বপ্ন কাঁধে নিয়েই ‘ঘুড়ি’তে পথচলার শুরু। অবশ্য ঘুড়ির মূলমন্ত্র মোটেও সব পরিবর্তন করে ফেলা না, তবুও ঘুড়ি স্বপ্ন দেখে, স্বপ্ন দেখায়। যদি কখনো দেশটা হঠাৎ বদলে গিয়ে স্বপ্নের মতো হয়ে যায় তাহলে বলতে তো পারবো, হ্যা আমিও ছিলাম, আমিও ছিলাম”…এভাবেই আবেগের সহীত নিজের স্বপ্নের কথা আর ‘ঘুড়ি’র কথা বলে যাচ্ছিলেন সংগঠনটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক তৌকির তাসনিম অয়ন’।

‘নাজরীন-আলোয়-ঘুড়ি ফাউন্ডেশন’ একটি তরুণ সামাজিক সংগঠন, যার মূলে রয়েছে কিছু স্বপ্নবাজ তরূণ-তরুণীরা। প্রত্যেকেই তারা স্কুল, কলেজ কিংবা ভার্সিটিতে পড়াশোনা করছে। পড়াশোনার ফাকে ফাকে হাত খরচের টাকা দিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে স্বপ্নের ‘ঘুড়ি’ কে। ২০১৪ সালের ৭ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে ‘শহর আমার দায়িত্ব আমার’ ইভেন্টের মাধ্যমে শুরু হয় ‘ঘুড়ি’র পথচলা। ব্যক্তিগত উদ্যোগে শুরু হলেও পরবর্তীতে একে একে সংযুক্ত হয় আরো বেশ কিছু তরুণ প্রাণ। ইভেন্টটির কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে পারি, ধারাবাহিকভাবে তারা জিয়া উদ্যান ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান পুরোটা পরিষ্কার করেন নিজেরাই এবং ডাস্টবিনগুলোতে তারা সচেতনতামূলক প্লে কার্ড লাগিয়ে দেন। পরবর্তীতে তার নিজেরাই প্রতীকী ডাস্টবিন হয়ে হাতে পলিব্যাগ আর ময়লার ঝুড়ি নিয়ে কাওরানবাজার থেকে মহাখালী পর্যন্ত র‍্যালি করেন।

13975559_1088870617834552_4567392216570737046_o

এ প্রসঙ্গে সংগঠনটির সহকারী সাধারণ সম্পাদক আরিফুল ইসলাম মতামত দেন যে, একদিনেই টিম ঘুড়ির পক্ষে সম্পূর্ণ শহরটা পরিষ্কার করা সম্ভব না, তবে কার্যক্রমগুলোর মাধ্যমে যদি দুইটা মানুষের মানসিকতা বদলাতে পারি সেটাই হলো টিম ঘুড়ির পাওয়া।

‘সহযোদ্ধা যতজনই থাকুক, বাতাসরূপীর মানুষগুলোর ভালোবাসা যতদিন থাকবে, ঘুড়ি উড়বেই’…এই বলতেই চোখ ছলছলিয়ে উঠে সংগঠনটির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক সামিউল সাজিদের।

‘ঘুড়ি’ তাদের কাছে অতি আবেগের জায়গা। ভালোবাসার জায়গাও বটে। তাইতো বিশ্ব ভালোবাসা দিবসেও ব্যক্তিগত গন্ডি পেড়িয়ে তারা বেড়িয়ে পড়ে সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষগুলোর মধ্যে খানিকটা ভালোবাসা বিলিয়ে দেয়ার তাগিদে।

14 february

প্রাণবন্ত সেচ্ছাসেবক শায়লা ছোয়া এবং আশরাফুল আলমের থেকে শুনছিলাম ভালোবাসা দিবসে তাদের কার্যক্রমের কথা। ভালোবাসার প্রতীকী লাল গোলাপ আর কিছু খাবার নিয়ে হাজির হয়েছিলো শহরের একেক কোণায়। সামর্থ হয়েছিলো প্রায় সাড়ে চারশো সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের কাছে তাদের ভালোবাসা পৌঁছে দিতে।

স্বপ্নবাজেরা যেনো নিজেদের সবটুকু আবেশ ঢেলে দেয় অপরিকল্পিত সমাজের মানুষগুলোর মনে। মৌসুমী ফলের ভরাডুবিতেও তারা সব ধরনের ফল-ফলাদি নিয়ে হাজির হয় প্রায় দুই শতাধিক পথশিশুদের মাঝে।

fol utsob

সেদিনকার কথা বর্ণনা করতে গিয়ে কার্যনির্বাহী সদস্য কাজী আতাপ জাহিন বলেন, ‘মৌসুমি ফলগুলো পেয়ে বাচ্চারা এতো উৎফুল্ল ছিলো যে কয়েক মুহূর্তের জন্য মনে হলো আমার বন্ধুদের শহরের দামী রেস্টুরেন্টে নিয়ে ভালোমন্দ খাওয়ানোর পরও বিপরীতে এতোটা খুশী হয় না’।

‘বাবার সাথে ঈদ শপিং শেষ করে যখন বাড়ি ফিরি চোখে পড়ে রাস্তার বাচ্চাদের দিকে, ঈদের নতুন জামা দুরের কথা শরীর ঢাকার মতোও কাপড়টা তাদের নেই।

eid

টিম ঘুড়ি থেকে আমরা প্রায় আটশো পথশিশুকে ঈদে নতুন জামা দিতে পেরেছি, মনে হয়েছে আত্নাটা তাতে খানিকটা শান্ত হয়েছে’ বলতে বলতেই চুপ হয়ে যায় ইভেন্ট ম্যানেজার জেনিফার।

টিম ঘুড়ির তথ্য সম্পাদক মাহমুদ হাসান তরি বলেন, এর বাইরে আমরা সুবিধাবঞ্চিতদের শিক্ষা ও সাস্থ্য সেবা দিয়ে থাকি।

12743588_982411991813749_454095353055578867_n

ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট ও কালশী মিলিয়ে টিম ঘুড়ির পরিচালনায় দুটো স্কুলে সর্বমোট ৮২ জন শিশু বিনামূল্যে পড়াশোনা করছে, এছাড়াও আমরা ব্লাড ডোনেট ক্যাম্পেইন নিয়ে কাজ করি। গত শীতে প্রায় ১২০০ গরীব দুঃখীদের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরন করতে পারি আমরা। তার সাথে যুক্ত করে সেচ্ছাসেবক জানায় গত বছর আমরা বনভাসি মানুষদের জন্য ৭২ হাজার টাকার ত্রাণ পাঠাতে সক্ষম হয়েছি।

সবশেষে, সংগঠন টির ভাইস প্রেসিডেন্ট মেহেদি আদনান শুভ জানায়, বেকারত্ব দুরীকরণেও ‘ঘুড়ি’ সমান ভূমিকা পালন করছে। ইতিমধ্যে নরসিংদীতে আমরা এ প্রকল্প শুরু করেছি।

13502910_1061861440535470_5251461712606398713_o

ঘুড়ি মূলত স্বপ্ন দেখে, স্বপ্ন দেখায়। তরুণ প্রাণের সৃষ্টিশীলতার পথ আরো প্রশস্ত করতে টিম ঘুড়ির উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই।

কমেন্টস