একটি স্বপ্নের স্বাধীন দেশ ও একটি টি-৩৩

প্রকাশঃ আগস্ট ২১, ২০১৭

মো:জুনায়েদ, এন.আই.এম.সি প্রতিনিধিঃ

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ আর দীর্ঘ নয় মাসে তিরিশ লক্ষ বাঙালীর প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা, বাঙালী হিসেবে আমাদের সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন। এ অর্জনকে আমরা ধারণ করি সর্বোচ্চ সম্মানে। যাঁরা এ অর্জনের পথ সুগম করার জন্য জীবন বাজি রেখেছেন, যাঁরা প্রাণ দিয়েছেন, তাঁরা জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে গিয়ে শহীদ হওয়া এবং যুদ্ধে সর্বোচ্চ বীরশ্রেষ্ঠ খেতাব পাওয়া ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান তাদেরই একজন।

মাতৃভূমিকে ভালবেসে সংসার,পরিবার সবকিছু নিয়ে জুয়া খেলতে নেমেছিলেন তিনি, তাই তো আবার ফিরে গিয়েছিলেন শত্রুর ঘাঁটিতে, বুকের গহীণ অলিন্দে লুকিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন স্বাধীনতার আগুন।

৯ মে কর্মস্থলে ফিরে গিয়ে জঙ্গি বিমান দখল এবং সেটা নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। মনে মনে একসময় পরিকল্পনাও করে ফেললেন। সব বাঙালি পাইলটের মতো পাকিস্তানে অবস্থিত মতিউর রহমানকে ইতিমধ্যেই ‘গ্রাউন্ডেড’ করা হয়েছে, অর্থাৎ তাঁদের আর বিমান চালাতে দেওয়া হচ্ছে না। মতিউর রহমানকে ফ্লাইট সেফটি অফিসারের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে এখন তিনি প্রশিক্ষণ ফ্লাইটের প্রশিক্ষক। চালাতে না পারলেও তিনি বিমানের কাছে যেতে পারেন।

২০ আগস্ট সকালবেলা মতিউর রহমান  নতুন ইউনিফর্ম পরে নিজের গাড়িতে করেই অফিসে গেলেন। অফিসে বসে তিনি লক্ষ রাখছিলেন পাকিস্তানি শিক্ষানবিশ পাইলট অফিসার রশিদ মিনহাজের ওপর। ২১ বছর বয়সী মিনহাজ কন্ট্রোল টাওয়ারের অনুমতি পেয়ে গেলে তিনি তাঁর কাছ থেকে বিমানটির নিয়ন্ত্রন নিয়ে নেবেন।

পরিকল্পনা অনুসারে অফিসে এসে শিডিউল টাইমে গাড়ি নিয়ে চলে যান রানওয়ের পূর্ব পাশে৷ সামনে দুই সিটের প্রশিক্ষণ বিমান টি-৩৩।পাইলট রাশেদ মিনহাজ বিমানটি নিয়ে দ্বিতীয় বারের মত একক উড্ডয়নের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কন্ট্রোল টাওয়ার ক্লিয়ারেন্সের পর মিনহাজ বিমানটি নিয়ে রানওয়েতে উড্ডয়নের প্রস্তুতি নিলে মতিউর রহমান সেফটি অফিসারের ক্ষমতাবলে বিমানটি থামাতে বলেন।

বিমানে ত্রুটি আছে মনে করে প্রশিক্ষক মতিউরের ইশারায় থেমে যান মিনহাজ। বিমান থামিয়ে মিনহাজ অক্সিজেনের মাস্ক খোলামাত্রই মতিউর তাঁর নাকে ক্লোরোফর্ম মাখা রুমাল চেপে ধরেন। কিছু বোঝার আগেই পরাস্ত হন মিনহাজ। মতিউর দ্রুত পেছনের ককপিটে বসে বিমানের নিয়ন্ত্রণ নেন। লক্ষ্য, সীমান্তের ওপারে ভারতের জামনগর বিমানঘাঁটি।

জ্ঞান হারানোর আগে রাশেদ মিনহাজ কন্ট্রোল রুমে জানাতে সক্ষম হন তিনিসহ বিমানটি হাইজ্যাক হয়েছে। পাকিস্তানের রাডারকে ফাঁকি দেওয়া বা ক্ষেপণাস্ত্র আক্রমণ এড়াতে কিংবা ভালোমতো পর্যবেক্ষণের জন্য মতিউর খুব নিচুু দিয়ে বিমান চালাতে থাকেন। বিমানটি ছোট পাহাড়ের আড়ালে থাকায় কেউ দেখতে না পেলেও কন্ট্রোল টাওয়ার মিনহাজের বার্তা শুনতে পায় এবং রাডারে বিমানের অবস্থান বুঝে অপর চারটি জঙ্গি বিমান মতিউরের বিমানকে ধাওয়া করে। কিন্তু মতিউর তখন সবকিছুর উর্ধ্বে। মতিউর করাচির খাঁচা ছিঁড়ে ছুটে গেল মহাশূন্যে টি-৩৩ বিমানের দুর্দম পাখায় তার স্বপ্নের স্বাধীন স্বদেশ মনে করে ফেলে তার মাহিন, তুহিন, মিলি সর্বস্ব সম্পদ।তিনি উড়েছিলেন আকাশে, কোটি মানুষের মতো তাঁর চোখেও ছিল স্বপ্নের স্বাধীন দেশ স্থাপনের প্রত্যাশা। কিন্তু তিনি তা দেখে যেতে পারেননি।

প্রায় ভারতের সীমান্তে পৌঁছে যাওয়া অবস্থায় রাশেদ মিনহাজ জ্ঞান ফিরে পান এবং বিমানটির নিয়ন্ত্রন নিতে চেষ্টা করেন।এ সময় রাশেদের সাথে মতিউরের ধ্বস্তাধস্তি চলতে থাকে এবং এক পর্যায়ে রাশেদ ইজেক্ট সুইচ চাপলে মতিউর বিমান থেকে ছিটকে পড়েন। বিমানটি কম উচ্চতায় উড্ডয়ন করার ফলে একসময় রাশেদ সহ বিমানটি ভারতীয় সীমান্ত থেকে মাত্র ৩৫ মাইল দূরে থাট্টা এলাকায় বিধ্বস্ত হয়। মতিউর রহমানের সাথে প্যারাসুট না থাকাতে তিনি নিহত হন। ৩৫ মাইল পার হতে সময় লাগত মাত্র সাড়ে তিন মিনিট। এই সাড়ে তিন মিনিট কিংবা ৩৫ মাইলের হিসাবটাই ইতিহাস বদলে দিতে পারত। কিন্তু সৃষ্টিকর্তা পাশা খেলেন না, তাই ৩৫ মাইল পার হয়ে সূর্য ছিনিয়ে আনা হয়নি ফ্লাইট লেফটেনেন্ট মতিউর রহমানের। মাত্র সাড়ে তিন মিনিটের রেসে হেরে যায় বাজির ঘোড়া।

২০ই আগস্ট, ১৯৭১ এ মতিউর রহমান এবং রাশেদ মিনহাজ স্ব স্ব দেশের জন্য মৃত্যুবরণ করেন। বাংলাদেশ সরকার মতিউর রহমান কে তাঁর সাহসী ভূমিকার জন্য বীরশ্রেষ্ঠ উপাধিতে ভূষিত করে এবং রাশেদ মিনহাজ কে পাকিস্তান সরকার সম্মানসূচক খেতাব দান করে। প্রসঙ্গতঃ একই ঘটনায় দুই বিপরীত ভূমিকার জন্য দুইজনকে তাদের দেশের সর্বোচ্চ সম্মানসূচক খেতাব প্রদানের এমন ঘটনা বিরল।

Advertisement

কমেন্টস