কেউ খায় বুদ্ধি বেঁচে, কেউ খায় শরীর বেঁচেঃ ভোগের রাণীর মরণ ভয়

প্রকাশঃ আগস্ট ১৭, ২০১৭

মেরিনা মিতু।।

সূর্য ডুবার পরপরই রাজধানীর “মানিক মিয়া এভিনিউ” রূপ নেয় নতুন রঙে। হকারদের রমরমার সাথে তাল মিলিয়ে হাক ডাক চলে কামনাময়ী ভাসমান যৌনকর্মীদের, নিজেদের উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য! আর তাদের এই উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে সন্ধ্যা থেকেই চলে কামনায় জাগ্রত সব দালালদের!

গতকাল সন্ধ্যায় বন্ধুদের সাথে আড্ডা শেষে যখন বাড়ি ফিরছিলাম, তখন পরিচয় হয় সালমার সাথে। পরিচয়ের পর্বটা খানিক নাটকীয় ছিলো। ফুটপাতের ধারে বকুল গাছে হেলান দিয়ে ভয় আর আতঙ্ক জর্জরিত অবস্থায় ফোনে চেঁচিয়ে যাচ্ছেন আর অকথ্য ভাষায় কাউকে গালমন্দ করে যাচ্ছিলেন। আগ্রহ থেকে কাছে গিয়ে দাঁড়ায় আর পরিচয় হয়ে যায় সালমার সাথে। আলাপ করে জানতে পারি সে একজন ভাসমান যৌনকর্মী।

তার সমস্যার কথা জানতে চাইলে সে প্রথম দু তিনবার কথা ঘুরিয়ে দেয়, তবে পরে যখন আশ্বাস দিতে পেরেছি যে আমি এ ব্যাপারে তাকে কোনো ভাবে সাহায্য করতে পারি তখন সে তার সমস্যার কথা জানায়।

সে বলে, “দেহেন আফা, আমার লজ্জা নাই, আমাদের লজ্জা থাকতে হয় না। তাই আপনারে কিলিয়ার কইরা কই। আমি একজন যৌনকর্মী।  কেউ খায় বুদ্ধি বেঁচে, কেউ খায় শরীর বেঁচে। আমার কাছে এটাই আমার পেশা। দেড় মাস আগে একদিন সন্ধ্যায় একজনের লগে ফোনে কন্টাক্ট হইলো  যে আমি তার লগে দু ঘন্টা থাকুম আর সে আমারে ১৫০০ টাকা দিবে। কথা মতো আমি তার লগে তার বাসায় গেলাম। সলিমুল্লাহ রোডের এক বাসায় নিচ তলায় থাকে। নাম বলছে আপন, ভার্সিটিতে পড়ে বললো সে।

যাক, আমি দু ঘন্টা তার কথা মতো কাজ করলাম। এবার যখন টাকা চাইলাম তখন সে আর টাকা দিতে চাইলো না। বলে কিনা মানুষ ডাইকা আমারে ধরায় দিবে। কইলাম, দেখো তুমি হইলা ছাত্র মানুষ, পুলিশ ডাকলে আমার সমস্যা নাই বরং তোমার সমস্যা হবে, তাই টাকা দাও আমি চইলা যাই। এই কথা কইতেই আমার গলা টিপে ধরছে, চেয়ার  উঠাইয়া আমারে  এলোপাথারি মাইর ধইর করলো।  তখন আমার আর টাকার ধান্ধা নাই, কোনোরকম জান নিয়া বের হইয়া আইলাম । সে ছেলেে সেই থেকে আমারে ফোন দিয়া যাইতে বলে , আমি কইলাম টাকা দাও আমি আসুম, আমার কাজই এটা। তয়, টাকা না দিলে তো আর আমি যামু না। কিন্তু সে ছেলে আমাকে টাকাও দিবোনা আবার আমাকে ব্লেইকমেইল করে অন্য কারো নাম্বার থেকে  ডেকে নিয়া যায় আর মাইরধর করে।  এ নিয়া থানায় পর্যন্ত গেলাম , কোনো বিচার পাইলাম না। “

প্রসঙ্গতে সে কিভাবে এ পেশায় জড়িত হলো তা জানতে চাইলে সে জানায় যে , তার দেশের বাড়ি গাজীপুরে। তার বাপ দিনমুজুর ছিলো, মা এর ওর বাড়ি কাজ করতো। তার বয়স যখন দশ বছর তখন তার পাশের বাসার এক চাচা তার সাথে খারাপ কাজ করে। ভয়ে সে কাউকে বলে নাই। সুযোগে সেই চাচা প্রায়ই তাকে ডাকতো। ব্যাপার টা জানা জানি হয়ে গেলে তার বাবা তারে বাড়ি থেকে বের করে দেয়। কি করবে বুঝতে না পেরে সে ঢাকায় তার এক বান্ধবীর (আকলিমা) কাছে চলে আসে। আকলিমা ঢাকায় এক গার্মেন্টস এ কাজ করতো । ঢাকায় এসেও রক্ষা মেলেনি সালমার। ভোর হলেই আকলিমা বের হয়ে যেতো। আকলিমার বাসার বাড়িওয়ালা একদিন সেই সুযোগে ঘরে ঢুকে জোর জবরদস্তি করে ধর্ষণ করে। কাউকে বললে বাসা থেকে বের করে দিবে এই থ্রেডে ভয় পেয়ে সে আকলিমা কে কিছু জানাই নি।

একসময় সইতে না পেরে সে আকলিমা কে সব জানাই। তখন সে জানতে পারে আকলিমা সব জানতো আগে থেকেই। আর এই কাজের জন্য আকলিমা নিয়মিত বাড়িওয়ালার থেকে টাকাও নিতো। সব জানার পর সালমা সেখান থেকে বেরিয়ে যায়। অপরিচিত শহরের ব্যস্ত মানুষের ভিড়ে সালমা দু রাত রাস্তায় কাটায়। সেখানেও সে রক্ষা পায়নি জানোয়ারের খাবল থেকে। এক পর্যায়ে তার পরিচয় হয় “দূর্জয় নারী” সংস্থার রোকেয়ার সাথে। দূর্জয় নারী সংস্থা হলো ভাসমান যৌনকর্মীদের নিয়ে একটি সংঘ। তখন থেকে সালমা পেটের দায়ে আর সমাজের কলঙ্ক গায়ে জড়িয়ে এ পেশার সাথে জড়িত।

সালমারাও প্রতিদিন পালিয়ে বাঁচে। স্বপ্ন, আশা সব পিছে রেখে লজ্জার জলাঞ্জলি দিয়েও তাদের রেহায় নেই। প্রতিনিয়ত আতঙ্কে থাকতে হচ্ছে তাদের।  যেহেতু তাদের কোনো সম্মান নেই বিচারপতি সমাজের চোখে তাই তাদের কোনো নিরাপত্তার বিধান নেই, নেই তাদের নাগরিত্বের অধিকার ।

কমেন্টস