কত লোক জিজ্ঞেস করে, আগস্ট মাস আইলে জিজ্ঞেস করে, বঙ্গবন্ধুর কন্যা জিজ্ঞেস করলো না আমারে! (ভিডিও)

প্রকাশঃ আগস্ট ১৬, ২০১৭

বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে নস্যাৎ করতে চেয়েছিল একটি কুচক্রী মহল। বঙ্গবন্ধুকে নিজ হাতে কাফন-দাফন করিয়েছিলেন মিস্ত্রি আব্দুল হালিম শেখের ছেলে আয়ুব আলী শেখ
চলতি বছরের ১৪ মে গোপালগঞ্জে বঙ্গবন্ধু যাদুঘরে বিডিমর্নিংকে তিনি বিশেষ একটি সাক্ষাৎকার দেন। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেন বিডিমর্নিং এর হেড অব নিউজ ফারুক আহমাদ আরিফ। ক্যামেরায় ছিলেন বিডিমর্নিং এর গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি এম আরমান খান জয় ও হেমন্ত বিশ্বাস কৃষ্ণা। আজ সাক্ষাৎকারের প্রথম পর্ব প্রকাশ করা হলো।

ফারুক আহমাদ আরিফ: বঙ্গবন্ধুকে হত্যার সংবাদটি আপনারা কীভাবে পেলেন?
আয়ুব আলী শেখ: বঙ্গবন্ধু একটা ওয়ারলেস বসাইছিলেন টঙ্গিপাড়ার খবরাখবর রাখার জন্যে। এই ওয়ারলেসের কাছে গিয়ে বসতো টঙ্গিপাড়ার লোকজন। আমি সেখানে…। বলতিছে যে বঙ্গবন্ধুর জন্যে কবর খোদ। আগে বলছে ১১টা কবর খোদ। পরে বলছে না একটা কবর খোদ। পরে একটা কবর খুদে বইসা রইছে পরে আড়াইটার দিকে…।

ফারুক আহমাদ আরিফ: আপনারা কইটার দিকে এই খবরটা শোনলেন?
আয়ুব আলী শেখ: আমরাতো সকালেই শুনছি। রেডিওতে বুলেটিন দিছে, বার বার বলতিছে ঘোষণা দিছে, বলছে, আমি মেজর ডালিম বলছি-স্বৈরাচারী সরকারকে হত্যা করা হয়েছে। বার বার বুলেটিন দিচ্ছে। আমরাতো টঙ্গিপাড়ার মানুষ বিশ্বাস করি নাই। বঙ্গবন্ধুর আগরতলার মামলা যার জন্যে কবর খোদলো খানেরা, তারা বঙ্গবন্ধুকে মারে নাই। বাঙালি হয়ে বঙ্গবন্ধুকে মারবে এটা আমরা বিশ্বাস করি নাই। যখন বঙ্গবন্ধুর লাশ নিয়ে আসলো তখন হাসপাতালের লোকেরা।

Capture

ফারুক আহমাদ আরিফ: কখন লাশটা নিয়ে আসলো? ১৬ আগস্ট।
আয়ুব আলী শেখ: দুইটা থেকে আড়াইটার দিক। ১৬ আগস্ট। সেই কফিন বক্সা এইটা। পেরেক মারা।

ফারুক আহমাদ আরিফ: লাশটা এনে রাখলো কোথায়?
আয়ুব আলী শেখ: নামলো পুরানা ডাক বাংলা। বঙ্গবন্ধু টঙ্গিপাড়ায় আসলে যে ডাক বাংলোয় থাকতো সেখানে। সেই ডাক বাংলার মাঠে আইসা হেলিকপ্টার নামলো। হেলিকপ্টার নামার পর হাসপাতালের স্টাফ তারা তাঁর (বঙ্গবন্ধুর) পরিবারের কাছে খবর দিল। বাড়ির মরব্বিরা আইলো।

ফারুক আহমাদ আরিফ: ওদের নাম মনে আছে?
আয়ুব আলী শেখ: আছে।

ফারুক আহমাদ আরিফ: বলেন তো।
আয়ুব আলী শেখ: আব্দুল হাই মেম্বার ছিল। জরদিস পোতা, জহুর। তারা হাসপাতাল থেকে লাশ আনলো। তখন আরকি আমাকে ডাকলো। আমি মিস্ত্রি কাজ করি। আমাদের গোষ্ঠীই মিস্ত্রি। আমার বাপ-চাচারা মিস্ত্রি। আমার দাদা করতেন। আমি মিস্ত্রি কাজ করি। তখন অামার বয়স ছিল ১৭ থেকে ১৮ বছর। একজন হাবিলদার এসে আমারে ডাইকা নিল।

ফারুক আহমাদ আরিফ: আপনি কোথায় কাজ করছিলেন?
আয়ুব আলী শেখ: আমি এক বাড়ি কাজ করতেছিলাম।

IMG_6472

ফারুক আহমাদ আরিফ: কোথায়?
আয়ুব আলী শেখ: টঙ্গিপাড়া ফকির বাড়িতে কাজ করতে ছিলাম। () বাড়ি। তখন একজন হাবিলদার সাব আমাকে খোঁজতে আসে।

ফারুক আহমাদ আরিফ: নামটা মনে আছে?
আয়ুব আলী শেখ: নাম আমার মনে নাই। হাবিলদার সাব আমারে ডাইহা নিয়া আসলো। তখন আমি খাতি বইছি। তিনি বললেন, তুমি তাড়াতাড়ি আইসো-কফিন বক্স খুলতে হবে। অনেক লোক দাঁড়ায় রইছে তারা দেখতে পারতেছে না, কোন কাজ করতে পারতেছে না। তহন আরকি অামি তার সাথে চলে আসলাম। আমার গায়ে সেন্টু গেঞ্জি, গামছা আমার ঘাড়ে। হাতুড় আর ছেনি নিয়া উনার সাথে চইল্যা আসলাম। আসার পরে দেখি আশেপাশে সব লোক আছে, তাদের ঢুকতে দেয় না। আমি হাবিলদারের সাথে চইল্যা আইলাম আমারে কিছু কয় না। পরে আইস্যা আমি ঢালা খুললাম। এইটার ভিতর থইয়া ঢালাডারে পেরেক মাইরা রাখছে। আইসা ডালাটা খুললাম। খুলল্যা উঁচা করছি, দেখি প্রথমেই সাদা কাপড়। বরফ দিয়ে ঢাকা। বঙ্গবন্ধুর বুকের উপর বরফ, মুখের উপর বরফ। আর পানি আর ই বরফ গলে গলে পানি বের হচ্ছে, রক্তগুলো বেরচ্ছে। এই ঢালারে নিচে নামাইয়্যা তার উপরে বঙ্গবন্ধুর ড্যাডবডিটা (মৃতদেহ) রাখছি। দেহি শুয়ানো অবস্থায় বঙ্গবন্ধুর চশমাটা তার দুই ঠ্যাঙের মাঝখানে। আর ওই পাইপ খাতো বঙ্গবন্ধু ওই পাইপডা দুই ঠ্যাঙের মাঝখানে। উনার পড়নে ছিল পাতলা একটা লুঙ্গী, পাতলা গেঞ্জী আর পাতলা পাঞ্জাবি আর পাতলা গেঞ্জী। এই এই জায়গায় ছিদ্র (বুক, পেটের দিকে ইঙ্গিত করে) ১৭ থেকে ১৮ টা ছিদ্র। ঐ দেইখা আমার মাথা ভিরকি দিছে। বঙ্গবন্ধুরে মাইরা ফেলছে, দেশে আরও কত মানুষরে মারবে। সবাই মর্মান্তিক আহত। কারো মনে কোন শান্তি নাই। সবার মনে হাহাকার পইড়া গেছে। আমি পইড়া যাইবো এইরহম ধারণা অইছে। ..আমি ধইরা দাঁড়াইছি। পরে কিছুক্ষণ দাঁড়ানোর পরে, বঙ্গবন্ধুরে গোসল দিতে হবে। তখন মেজর বলতিছে রাখেন এইভাবে। তখন সেইখানে মৌলভী সাব ছিল।
IMG_6474
ফারুক আহমাদ আরিফ: মানে বাড়ির পাশেই।
আয়ুব আলী শেখ: বাড়ির পাশেই অই জায়গায়। যখন গোসল দেওয়া শুরু করলাম তখন দেখলাম। বঙ্গবন্ধুর পাঞ্জাবিটা ফাড়লাম, গেঞ্জিটাও ফাইড়া দেখি। উনার বডিটা পুরা দেখা যাচ্ছে। তখনতো লোকজন ধারে কাছে নাই। লোকজন অনেক কম। তখন দেখলাম এই সাইডে ছোটগুলি, ওই সাইডে বড়গুলি (বুকের বামপাশ দেখিয়ে) আর হাতের মনে করেন কাইটা কাইটা গ্যাছে।
কতো লোক আইসা জিজ্ঞেস করে, আগস্ট মাস আইলে জিজ্ঞেস করে। বঙ্গবন্ধুর কন্যা জিজ্ঞেস করলো না আমারে! একে একে সবাই চইলা গ্যাছে। মরব্বিরা যারা ছিল সবাই চইল্যা গেছে। আমিও চৈলা যাবো, আমিও তো থাকবো না, সত্যি ভাসবে না। বঙ্গবন্ধুরে এই চোখি দেখেছি। এখনো ঘুমাইলে দেহি বঙ্গবন্ধু আছে। এই ১৫ আগস্টে (১৬ আগস্ট লাশ দেখেন) রক্ত মাখা বঙ্গবন্ধু শোয়া। রক্তভেজা কাফনে সুইয়া, আমার মনে ভাইসা রইছে। তাই নেত্রী অামারে জিজ্ঞেস করলো না।   এমনে মানুষ শুনেতো অনেককিছু উপলব্ধি করতে পারে না। চোখে যা দেখে অইডা আমার মনে হয় মানুষ স্বপ্নেও দেখে, খোয়াবেও দেখে। যেডা মানুষ দিনে দেহে সেডা রাত্রেও দেহে। আমি খোয়াবেও দেহি আমার কথা কেউ জিজ্ঞেস করে না। আমি খুব অবহেলিত। আমি স্টোক করেছি। আমার হাতে পায়ে বল পাই না।

ফারুক আহমাদ আরিফ: কতদিন আগে স্ট্রক করলেন?
আয়ুব আলী শেখ: মাসখানেক আগে (এপ্রিল-২০১৭) স্ট্রক করছিলাম। আমার কোনো অসুবিধা হয়নাই। কাম করতে পারি না কীভাবে আমি চলমু। একমাত্র আল্লাহই জানে। আল্লাহই সবকিছু দেখে, আল্লাহই চালাবে। ইতিহাস সত্য, ইতিহাস একদিন আমার কথা জিজ্ঞেস করবে। আমি সবি জানি বঙ্গবন্ধুর। মন্ত্রী মিনিস্টাররা যারা দেখতে পারে নাই, আমার চোহে আমি দেখছি। এইজন্যই আমি মনে করি আমার কিছু চাওয়া-পাওয়ার নাই। আমি যে এক অবস্থায়/ব্যভস্থায় আমি যে একটা অবহেলায় পড়ছি। আমি যে একটা অবদান রাখছি, আমি কোন স্বীকৃতিই পালাম না। সেটাই অামার দুঃখ। আমি তো জানতি পারলাম না, আমার কথা সবাই জানবে, ইতিহাসে জানবে। পেপারে বঙ্গবন্ধুর ছবি থাকবে। জানাজায় কয়জন লোক ছিল, তারা কারা কারা? তাদের কোন ছবি নাই ছবি থাকবে।

(ভিডিও যুক্ত হবে)

কমেন্টস