মোহাম্মদ (সঃ) আলখেল্লা ও তরবারি সংরক্ষিত তোপকাপি প্রাসাদ দেখার স্বপ্নপূরণ

প্রকাশঃ মার্চ ৬, ২০১৭

এ এস এম সুজা ।।

তুরস্কের তোপকাপি প্রাসাদ ভ্রমণের পর মনে হয়েছে ৭০০ বছরের ইতিহাস যেন মনের চোখে দেখছি। মনে হচ্ছিল কানে ভাসছে সুলতান সেলিমের হুংকার’। ১৭ বছর ধরে লালিত স্বপ্ন পূরণ হওয়ার পর সুদূর ইস্তাম্বুল থেকে এইভাবে বিডিমর্নিংকে মনের কথা জানালেন খোজায়েলী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণসংযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের পি এইচ ডি শিক্ষার্থী জাহিদুল ইসলাম সরকার। ভ্রমণের পথে পথে ইতিহাসকে জানার বিশেষ সুযোগের কথাও বলেন তিনি। তুরস্কের ইস্তাম্বুলের ইতিহাস নির্ভর রাজ দরবার তোপকাপি প্রাসাদ শুধু ইতিহাস নয় ইসলাম ধর্মের নেতা ও শেষ নবী মোহাম্মদ (স.) স্মৃতি বিজড়িত তরবারিও সংরক্ষিত আছে এই দরবারে।

মোহাম্মদ (সঃ) আলখেল্লা ও তরবারি সংরক্ষিত তোপকাপি প্রাসাদ দেখার স্বপ্ন পূরণ

দুই মহাদেশে অবস্থানকারী মুসলিম ইতিহাসের দেশ তুরস্ক। বিশ্বের ইতিহাস পরিবর্তনের সাথে সাথে পরিবর্তিত হয়েছে তুরস্কের ইতিহাসও। অনেকে বলেছেন তুরস্কের ইতিহাসই বিশ্বের ইতিহাসকে পরিবর্তিত করেছে। আজকের তুরস্ক সব চেয়ে বড় শহরের নাম ইস্তাম্বুল যেটি সাত হাজার বছরে সাত বার পরিবর্তন হয়েছে। ইস্তাম্বুলের পূর্ব নাম ছিল বাইজেন্টিয়াম, কনস্টানটিনি,কনস্টান্টিনোপল, কনস্টান্টিপোলিশ, স্টিম্পল, এস্তানবুল, ইস্তাম্বুল। আজ থেকে ৯৪ বছর আগে অর্থাৎ ১৯২৩ সালে মোস্তফা কামাল আতাতুর্কে যে সংস্কার কাজ শুরু করেছিলেন তাঁর হাতধরে আধুনিক তুরস্কের সূচনা।

ইস্তাম্বুলের নামবদলের মতোই এর ইতিহাসে বদলেরও আছে নান পর্যায়। খ্রিস্টপূর্ব সময় থেকেই এ শহর বিভিন্ন দেশের দখলে ছিল। সর্বশেষ অষ্টাদশ ও উনিশ শতকে ব্রিটিশ, ইতালি ও ফ্রান্সের যৌথ বাহিনীর দখলেও ছিল দীর্ঘদিন। ইস্তাম্বুলের দশটি স্থান যে কোনো পর্যটকের তালিকায় থাকে সেগুলো হচ্ছে ১. তোপকাপি রাজপ্রাসাদ, ২. হাগিয়া সোফিয়া চার্চ, ৩. নীল মসজিদ তথা সুলতান আহমেদ ক্যামি, ৪. প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘর, ৫. গ্র্যান্ড বাজার, ৬. সুলাইমানি মসজিদ, ৭. সেন্ট স্যাভিয়র চার্চ, ৮. ডলমাবাস প্রাসাদ, ৯. কেমব্রিতা বাথ্স্ এবং ১০. বসফরাস ত্রুজ।এশিয়া ও ইউরোপের বুকে তুরস্কের অবস্থান। এক রাষ্ট্র দুই মহাদেশে। তুরস্কের ৭,৫৫,৬৮৮ বর্গকিলোমিটার ভূ-খণ্ড এশিয়া মহাদেশে আর ২৩,৭৬৪ বর্গকিলোমিটার ইউরোপে। তাই ইস্তাম্বুলের ইটের ফাঁকে সভ্যতার চিহ্ন দেখা যায়।

বর্তমানে বিশ্বের কয়েকটি ঝামেলাপূর্ণ দেশের মধ্যে তুরস্ক একটি। জঙ্গি হামালা অন্যান্য রাষ্ট্রের সাথে তাল মিলিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়া অনেকটায় কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে এই মুহূর্তে সেখানকার ঐতিহ্যবাহী স্থাপনায় নিরাপত্তা আছে কি না সেই বিষয়ে জানতে চাইলে জাহিদ সরকার বলেন, তুরস্ক সরকার পর্যটকদের জন্য আধুনিক সব সুবিধার ব্যবস্থা করেছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে। সবার জন্য উন্মুক্ত। শিশু ও ৬০ উর্ধ্বের জন্য প্রবেশাধিকার একদম ফ্রি শিক্ষার্থীদের জন্য মাত্র ২০ লিরা দিয়ে একটি মিউজিক কার্ড করালে সারা বছর সব সরকারি জাদুঘর ভ্রমণ ফ্রি।

মোহাম্মদ (সঃ) আলখেল্লা ও তরবারি সংরক্ষিত তোপকাপি প্রাসাদ দেখার স্বপ্ন পূরণ

এখানে বসেই হয়ত সুলতান সুলেমান ও হুররাম সুলতানা তুর্কিস কফিতে চুমুক দিয়ে প্রেমালাপ করতো। তোপকাপির প্রাঙ্গন থেকে দেখা বসফরাস, গোল্ডেন হর্ণ ও মর্মর সাগর। তিনটি অনিন্দ সুন্দর জায়গা দেখা, তাও পাহাড়ের ওপর থেকে, রাজপ্রাসাদে বসে। এমন ভিউ কি বিশ্বের আর কোন প্রাসাদের আছে? তোপকাপি প্রাসাদের বারান্দায় বসে সুলতানের মতো মনের মানুষের সাথে কথা বলা ও তুর্কিস খাবারের স্বাদ আস্বাদনের সুযোগ করে দিয়েছে তুর্কির সরকার। ভেতরে প্রবেশ করেও না খেয়ে ফিরে এলাম আমার সুলতানার কথা ভেবে। ভাবলাম থাক আগামী গ্রীষ্মে বউ তুরস্কে আসলে একসাথে আসব আবার। এমন রোমান্টিক স্থানে একসাথে সাগরের সৌন্দর্য উপভোগ করব দুজনে। কিন্তু গ্রীষ্ম কতদূর। অপেক্ষায় রইলাম।

তুর্কি সুলতানের রোজা ভাঙার স্থান। রমজানে মাগরিবের আযান দিলে বসফরাসের জলে হারিয়ে যেত সূর্য। এখানে বসে ইফতার করতেন সুলতান। মোঘল সম্রাট আর তুর্কি খলিফাদের মধ্য বড় পার্থক্য ছিল তুর্কি অনেক বেশি ধর্মপ্রাণ মুসলমান ছিলেন। নামাজ, রোজা, দান সাদকায় নিবেদিত ছিলেন। শিরক ও বেদায়াতের বিষ তাদের স্পর্শ করতে পারেনি। পতনের যামানার কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে অধিকাংশ সুলতান ছিলেন ধার্মিক।

তপকাপি প্রসাদ ও দিল্লির লাল কেল্লার তুলনা করতে গিয়ে জাহিদ সরকার  বলেন ‘ হেরেমের গল্পগুলোর বেশিরভাগই পশ্চিমা সাহিত্যিকদের কল্পবিলাস। তোপকাপির আজো চকচক করছে। দিল্লীর লাল কেল্লায় দেখেছিলাম লুটেরা ইংরেজরা কিভাবে খুচিয়ে খুচিয়ে খাস দরবারের দেয়াল থেকে মূল্যবান পাথরগুলো তুলে নিয়ে গিয়েছিল। ভাবছিলাম ইশ যদি প্রসাদটিকে অবিকৃত দেখতে পারতাম! যা দেখছি তাতো দিল্লীর মোঘল প্রাসাদ নয় যেন বহু দস্যুর হাতে ধর্ষিতা বৃদ্ধার কঙ্কাল। শুরু ইট পাথরই আছে। তাই এতো সুন্দর। তোপকাপি দেখে সত্যিকারের প্রাসাদ কেমন ছিল অনুভব করা যায়।

সুলায়মানি তলোয়ারের বিশেষ গল্প অনেক আগে জানা জাহিদের কিন্তু দীর্ঘ অনেক বছর পর সেই স্বপ্নের তরবারি নিজ চোখে দেখে নিজের যোগাযোগ মাধ্যমের তুলে ধরেন সাবলীলভাবে ।’সুলায়মানি তলোয়ারের কথা জানেন অনেকে। শৈশবে পাঠকাঠির তলোয়ার বানিয়ে ভাবতাম ইশ আমার যদি একটি জাদুকরী সুলায়মানি তয়োয়ার থাকতো! এটা সুলায়মানের বাবা সুলতান সেলিমের তলোয়ার। সেলিম ছিলেন বিখ্যাত সেনাপতি। হেরেমের সুখ-বিলাস তাকে টানতে পারেনি। হুকুমাতের ২০টি বছর ঘোড়ার পিঠে যুদ্ধের ময়দানে কাটিয়ে দিয়েছেন। সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যকে একত্র করে খিলাফাতকে পুনরায় চালু করেছেন। মক্কা মদীনার নিরাপত্তা বিধান করেছেন। এই মহান বীরের নামে এরদোগান বসফরাসের তৃতীয় ব্রিজের নামকরণ করেছে।

মোহাম্মদ (সঃ) আলখেল্লা ও তরবারি সংরক্ষিত তোপকাপি প্রাসাদ দেখার স্বপ্ন পূরণ

তুর্কিরা ছিল বীরের জাতি। তুর্কি তলোয়ারের তেজে ৭০০ বছর ইউরোপ ছিল কম্পমান। তুর্কিরা দাপিয়ে বেরিয়েছে ইউরোপ, আফ্রিকা আল এশিয়া। শত শত জালিম শাসকের তখতে তাউস উল্টে দিয়ে কায়েম করেছিল ন্যায় বিচার আর নিরাপত্তার সালতানাত। ১৭ বছর ধরে স্বপ্ন দেখছিলাম। তোপকাপি প্রাসাদ দেখার। এখান থেকে তুর্কি সুলতানরা বিশ্ব শাসন করেছে। তিন মহাদেশ বিস্তৃত সালতানাত।প্রাসাদ তো নয় যেন একটি শহর। ৫০০০ মানুষ বাস করত এখানে। মজার ব্যাপার হল, আগ্রার প্রাসাদ বা লাল কেল্লা লুট হয়েছিল জাঠ, মারাঠা আর ইংরেজদের হাতে কিন্তু এই প্রাসাদে কেউ লুট করতে পারেনি। ফলে সব হিরা জহরতসহ রয়ে গেছে অবিকৃত।’

৪০০ বছর পরও যৌবনদীপ্ত আছে সুলতান সুলাইমানের রাজপ্রাসাদ। চলুন ঘুরে আসি। বাংলাদেশের স্থাপনাগুলো সংরক্ষণের ব্যাপারে তিনি বলেন, কি চমৎকারভাবে তাদের ইতিহাসকে তুলে ধরেছে নতুন প্রজন্মের সামনে। আফসোস লাগছিল বাংলাদেশের ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর করুণ অবস্থা ভেবে। আমরাও কি পারি না আমাদের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসকে জাতির সামনে তুলে ধরতে। যে ইতিহাসের নিদর্শন দেখে যুবকদের ধমনীতে আত্মবিশ্বাস আর আত্মমর্যাদার রক্তস্রোত বইবে। নতুন উদ্যমে শক্তিশালী বাংলাদেশ গড়ার প্রেরণা পাবে।

Advertisement

কমেন্টস