হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী লাঠিখেলা ও নৌকাবাইচ

প্রকাশঃ ডিসেম্বর ১৮, ২০১৬

মনিরুজ্জামান, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি-

গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী লাঠি খেলা ও নৌকাবাইচ এখনো বেশ জনপ্রিয়। আবহমানকাল ধরে কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী, ভূরুংগামারী এবং ফুলবাড়ী উপজেলাসহ বিভিন্ন উপজেলায় বিনোদনের খোরাক জুগিয়েছে এই লাঠিখেলা ও নৌকাবাইচ। কিন্তু কালের বির্বতনে মানুষ ভুলতে বসেছে এসব বিনোদন।

বাংলার ঐতিহ্যের অংশ এ বিনোদন নিয়ে মানুষের অনেক আগ্রহ রয়েছে। লাঠি খেলার নতুন করে কোন সংগঠন বা দল তৈরি না হওয়ায় হারিয়ে যেতে বসেছে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী লাঠি খেলা। ঢোল আর লাঠির তালে তালে নাচা-নাচি, অন্য দিকে প্রতিপক্ষের হাত থেকে আত্মরক্ষার কৌশল অবলম্বনের প্রচেষ্টা সম্বলিত টান টান উত্তেজনার একটি খেলার নাম লাঠি খেলা। এ খেলা একটি ঐতিহ্যগত মার্শাল আর্ট।

মূলত ঢাকের বাজনার সাথে মার্শাল আর্ট আর লাঠি এই দুইয়ের সংমিশ্রণের নামই লাঠি খেলা। অনুশীলনকারীকে লাঠিয়াল বলা হয়। এই খেলার জন্য লাঠি সাড়ে চার থেকে পাঁচ ফুট লম্বা হয়। তবে প্রতিটি লাঠিই হয় প্রায় তৈলাক্ত। প্রত্যেক খেলোয়ার তাদের নিজ নিজ লাঠি দিয়ে রণকৌশল প্রদর্শন করে। শুধুমাত্র বলিষ্ঠ যুবকেরাই এই খেলায় অংশ নিতে দেখা যায়।

অনেকাংশে আবার শিশু থেকে শুরু করে যুবক ও বৃদ্ধ পুরুষেরাই লাঠি খেলায় অংশ নিয়ে থাকেন। লাঠিখেলার আসরে লাঠির পাশাপাশি যন্ত্র হিসেবে ঢোল, কর্নেট, ঝুনঝুনি ও বিভিন্ন প্রকার বাশি ব্যবহার হয়ে থাকে। এছাড়া সঙ্গীতের পাশাপাশি এ খেলার সাথে চুড়ি নৃত্য দেখানো হয়।

লাঠি খেলা বিষয়ে কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী, ভূরুংগামারী এবং ফুলবাড়ী উপজেলার প্রবীণ লোকেরা জানান, গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী লাঠি খেলা আজ বিলুপ্ত প্রায়। আমাদের অঞ্চলে বিভিন্ন ধরনের লাঠিখেলা রয়েছে। গ্রামের সাধারণ মানুষেরা তাদের নৈমিত্তিক জীবনের উৎসব-বাংলা বর্ষবরণ, বিবাহ, চড়ক পূজা, মহরম, অন্নপ্রাশন ইত্যাদি উপলক্ষে লাঠি খেলার আয়োজন করে থাকেন। এক্ষেত্রে সাধারণত কোনও লাঠিয়াল দলকে ভাড়া করে আনা হয়।

বিগত দশকেও গ্রামাঞ্চলের লাঠি খেলা অল্প হলেও কিছু জায়গায় আনন্দের খোরাক জুগিয়েছে। সাধারণ মানুষের হৃদয়ে ঠাঁই করে নিয়েছিল এ খেলাটি। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসত এ খেলা দেখার জন্য। বিভিন্ন জায়গায় মাঝে মধ্যে এ লাঠিখেলা দেখা গেলেও তা খুবই সীমিত। এ খেলাটি দিন দিন বিলুপ্তি হওয়ার কারণে এর খেলোয়ার সংখ্যাও কমে যাচ্ছে। তৈরি হচ্ছে না কোন নতুন খেলোয়ার। আর পুরনো অভিজ্ঞ খেলোয়াড়রা অর্থাভাবে প্রসার ঘটাতে পারছেন না এ খেলা। নির্মল বিনোদনের খোরাক আর গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য এ লাঠি খেলাটি আর চোখে পড়ে না বললেই চলে।

অন্যদিকে, কুড়িগ্রাম জেলা ১৬টি নদ-নদী দ্বারা বেষ্টিত হওয়ায় এ জেলায় নিয়মিত নৌকাবাইচ অনুষ্ঠিত হত। এক সময় নৌকাবাইচকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠতো ৫ থেকে ১০ দিনব্যাপী মেলা। এমনকি কোন কোন সময় এ মেলা ১ মাস পর্যন্ত চলতো। দুর-দুরান্তের বিভিন্ন জায়গা থেকে বিভিন্ন নৌকার মালিক দাওয়াত পেয়ে এই বাইচে অংশগ্রহণ করে থাকে। রকমারী ডিজাইনের নৌকাতে ভরে যেত সেই নৌকাবাইচের স্থান। একেক নৌকার সম্মুখভাগের ডিজাইন হয় একেক রকম। কোনটার মাথায় হাতি, কোনটার মাথায় ঘোরা, কোনটার মাথায় ময়ূর এর মাথার অংশের ডিজাইনে সজ্জিত হয় খেলায় অংশগ্রহণ করা এ সব নৌকা। অংশগ্রহণকারী চালকদের পোশাকের ডিজাইনও ছিল বিভিন্ন রংয়ের মিশ্রিনে তৈরী। কার নৌকা দেখতে কতটা আকর্ষনীয় এটাও ছিল খেলার একটা অংশ। নৌকার মালিকেরা একটা খেলায় অংশগ্রহণ করতে অনেক টাকা পয়সা খরচ করে থাকে। খেলায় যাওয়ার আগে প্রতিটি মালিক গরু বা মহিষ জবাই করে খেয়ে দোয়া দরুদ পড়ে রওয়ানা হয়ে থাকেন।

বিশেষ রহস্যের বিষয় হলো যে, বাইচ চলাকালীন মালিকরা ইবাদতের স্টাইলে নৌকার সম্মুখভাগে থেকে আল্লাহর নাম জপে থাকেন। এসব খেলায় ৭টি থেকে ২২টি পর্যন্ত দল অংশগ্রহণ করে থাকে। কোন কোন ক্ষেত্রে এর কম বা বেশী হয়েও থাকে। কিন্তু বর্তমানে এ খেলা বিলুপ্ত প্রায়। যদিও দীর্ঘদিন পর গত ৭ ডিসেম্বর, ২০১৬ তারিখে জেলার ধরলা নদীতে ৪ দিনব্যাপী ২০টি দলের অংশগ্রহণে নৌকাবাইচ আয়োজন করা হয়েছিল।

নাগেশ্বরী উপজেলার কচাকাটা, বেরুবাড়ী, কেদার, বল্লভেরখাস, বামনডাংগা, হাসনাবাদ, নেওয়াশী, সন্তোষপুর, নুনখাওয়া, কালিগনঞ্জ, ভিতরবন্দ, সদর উপজেলার ঘোগাদহ, যাত্রাপুরসহ বিভিন্ন জায়গাঘুরে নৌকাবাইচ বিলুপ্তর মত মন্তব্য পাওয়া গেছে প্রবীণদের কাছ থেকে। জনপ্রতিনিধি, প্রবীণ ব্যক্তি ও সচেতন মহল ঐতিহ্যবাহী বিনোদনের খোরাক জোগানো এইসব খেলা ধরে রাখতে সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করেন।

অনেকে মন্তব্য করে বলেন, এসব খেলার মাধ্যমে বিনোদন পেলে তরুণেরা মাদক ছেড়ে এই বিনোদনে আগ্রহী হতো।

কমেন্টস