জয়-পরাজয়

প্রকাশঃ ডিসেম্বর ২, ২০১৬

আবু খায়ের আনিছ-
সীমা তার সীমানা অতিক্রম করে গিয়েছে। জীবন ক্রমাগত চাপ দিয়ে যাচ্ছে পিছনে ফিরে যেতে কিন্তু অদম্য ইচ্ছাশক্তিটুকু বাঁচিয়ে রেখেছিল এতদিন। এবার শেষ পেরেকটা আটকে গিয়েছে বলে। তীরে এসে তরী ডোবানোর মত অবস্থা এখন। দিন কাল আর এগিয়ে যেতে চাইছে না। জীবনের প্রয়োজনেই এবার সব ছেঁড়ে ছুড়ে কোন একটা কাজে লেগে যেতে হবে।

শুরুটা এমন ছিল না, উচ্চ-মধ্যবিত্ত পরিবার থেকেই আসা হয় এই শহরে, কিন্তু সময়ের দৌড়ে সময় বদলে যায়। সব কিছু ভালোই চলছিল হঠাৎ করে পারিবারিক বিরোধে জড়িয়ে বিপদের পথে পা বাড়ায় সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটি, তারপর ব্যবসায়িকভাবে একের পর এক ব্যর্থতা পুরো পরিবার, জীবনের দৃশ্যপটটাই পাল্টে দেয়।

শহরের এক সময়ের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী হয়ে পড়ে সরকার ঘোষিত দেউলিয়া। ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে ঘর বন্দি হয়ে পড়ে সমাজ সেবক সেই মানুষটি। নিজের সন্তানের কাছেই এখন সে অপরাধী, স্ত্রী মা ভাই বোন সবার চোখেই নিকৃষ্ট মানুষদের একজন। অথচ একটা সময় উক্ত সকলের চোখের মণি ছিল, যখন প্রয়োজন মত চাহিদা পূরণ করতে পারত।

একমাত্র বড় ছেলেকে দিয়ে আর কিছু হবে না এটা তিনি বুঝে গিয়েছেন, তবু শেষ চেষ্টা করে দেখেছেন কিন্তু কিছুতেই কিছু করতে পারছেন না। অন্য সব মানুষের মত স্বপ্ন বিলাসী ছিলেন বটে কিন্তু সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ণ করতে গিয়ে যে এতটা মাশুল গুনতে হবে তা ঘুনাক্ষরেও ভাবতে পারেননি তিনি। সখ করে ছেলেকে প্রাইভেট ভার্সিটিতে ভর্তি করিয়েছিলেন, পড়াশোনা করে ছেলে বড় কিছু হবে এই আশায়। বড় মেয়েকে ভর্তি করিয়েছেন দেশের প্রথম সারির সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে। যখন এত কিছু করেছেন তখন কি বুঝতে পেরেছিলেন যা করছেন তার কতটুকু বাস্তবায়ণ হবে। পারেননি, আর পারেননি বলেই অবস্থা এখন এমন যে, মেঝো মেয়েটা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবে সেই অর্থ জোগাড় করতে পারছেন না, ছোট মেয়েটার স্কুলে যাওয়া বন্ধ, ঘরে এক বেলা খাবার জুটে না। বড় মেয়েটার সেমিস্টারের টাকা দিতে পারেন না তাই তার পড়ালেখাও বন্ধ হবার উপক্রম। ছেলের পড়ালেখার খরচ জোগাতে গিয়ে ঋণ করে দেনাদারের ভয়ে ঘরে বন্দি হয়ে গিয়েছেন।
ছেলের আর মাত্র তিন সেমিস্টার বাকী, এমন অবস্থায় সে পড়ছে মহা বিড়ম্ভনায়। এমন অবস্থায় পড়ালেখা ছেড়ে দিয়ে কিছু করবে সেই সাহস হয় না, ঠিক সাহস নয়, নিজের সুন্দর একটা ভবিষ্যতের এমন অপমৃত্যু মেনে নিতে পারে না, শেষ চেষ্টা করে যায় এর ওর দোয়ারে দৌড়া দৌড়ি করে। শেষ রক্ষা আর হয় না, এই শহর যাকে দেয় তাকে সব উজার করে দেয় আর যাকে দেয় না তার দিকে মুখ তুলেও তাকায় না।
মেয়েদের বিয়ে দিবেন সেই অবস্থাটাও নেই এখন বাবার, বুড়ো মায়ের চিকিৎসা করাবেন নাকি এক বেলা পেটে ভাত জুটাবেন তার উপায়ন্তর করতেই দিশে হারা। এরি মাঝে দুইবার হার্ট স্টোক করে কোন রকমে বেঁচে গিয়েও মরার মত আছেন কোন রকমে।

বলছিলাম আমার বাবার কথা, এই শহরে এখন আমার মাথার উপরে আর কিছু অবশিষ্ট নেই। সীমান্তে পৌঁছে আবার পিছিয়ে যাওয়া ছাড়া আর উপায় নেই।

বাংলাদেশে মেধার অভাব নেই, আমার মত কোটি কোটি মেধা অনাদরে মরে যাচ্ছে বীজে সুপ্ত থাকা অবস্থায়। এমনিতেই বাংলা সাহিত্য এত সমৃদ্ধ যে আমার মত এমন হাজার লেখক হারিয়ে গেলেও এই ভাণ্ডারের কিছু যায় আসে না।

শুরুর বছর দুই কোন সমস্যা ছিল না, কিন্তু শেষ একটা বছর এমন অবস্থায় কেটেছে যে কোন কোন দিন না খেয়েও থাকতে হয়েছে। লোক লজ্জার ভয়ে কাউকে কখনো বলতে পারিনি, কিন্তু তাই বলে চেষ্টা যে করি নাই কিছু করার তা কিন্তু নয়। মাঝে একটা কাজের ব্যবস্থা করেছিলাম ফ্রিলান্সিং এর। মাস ছয়েক ভালোই পার করেছিলাম কিন্তু শেষে এসে বায়ার মোটা অংকের একটা টাকা না দিয়ে পালিয়ে যায়। আবার শুরু হয় অভাব, এখন আর দিন যাচ্ছে না। লেখালেখিটা আসলেই আর করা সম্ভব নয়, পড়াশোনা শেষ করতে পারছি না, পেটের চিন্তা করছে হচ্ছে, বোন, মা, বাবা সবাইকে দেখতে হবে। সন্তানের কাছে বাবা ক্ষমা চায় এর চেয়ে বড় কষ্ট সন্তানের জন্য হতে পারে না। আমার বাবা তাই করেছে, হাত জোড় করে বলেছে আমায় ক্ষমা কর বাবা আমি আর পারছি না। হয়ত আর বেশিদিন বেঁচে থাকাও আর আমার হবে না। এই সংসারটা তোর দিকেই তাকিয়ে আছে, তুই যদি এদের না দেখিস তবে আমার আত্মাও শান্তি পাবে না।

বন্ধুর মেসে বসে আছি, বাসা ভাড়ার টাকা দিতে পারি নাই বলে বাড়িওয়ালা ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিয়েছে। বাড়িওয়ালার দোষ নেই বিন্দুমাত্র, তিন মাসের ভাড়া বাকী, চলতি মাস শেষ হলে চার মাস হত। শুধু ভাড়া হলেও হয়ত মালিক মেনে নিত, বিদ্যুৎ বিল, পানির বিল, গ্যাসের বিল মালিক নিজের পকেট থেকে দিয়েছে এটা তো আর মেনে নেওয়া যায় না। এই কয়টা দিন কোন রকমে হাতে পায়ে ধরে থেকে গিয়েছিলাম, কিন্তু শেষ রক্ষাটা করতে পারলাম না। এক কাপড়ে ঘর থেকে বের হয়ে আসতে হল, টাকা দিতে পারলে জিনিসপত্র দিবে নয়ত ও মুখো হলে আর হাড়গোড় আস্ত রাখবে না।

একটা কাজের আমার খুব প্রয়োজন এই মুহুর্তে, কিন্তু কাজ সে আমায় দেখে পালিয়েছে। পড়াশোনা বন্ধ করতে চাইছি না তাই বহু চেষ্টা করলাম যদি টিউশনি নামক সোনার হরিণ দেখা পাওয়া যায়। কিন্তু বৃথা চেষ্টা, এই শহরে কেউ আমাকে চিনে না, আর অপরিচিত কাউকে টিউশনি দেওয়া হয় না। বেশ কয়েকটা পার্ট টাইম চাকরির চেষ্টা করলাম কিন্তু এখানেও ব্যর্থ। দুয়েক জায়গায় যাও ব্যবস্থা হয়েছে কিন্তু সেই সময়ে আমার ক্লাস থাকায় আর সেটা করা হয়ে উঠেনি। দুশ্চিন্তায় পড়া উঠে গেছে চাঙ্গে, পড়ার টেবিলে বসলেই হিসাব আসে মাথায়, মালিক পাবে এত, ওমুক বন্ধু পাবে এত, বোনের সেমিস্টার পরীক্ষা দিতে পারছে না, নিজের পরীক্ষা দিতে পারব কিনা, কালকের শিটটা টাকার জন্য আনতে পারব কিনা, কাল দুপুরে খাবার পাব কোথায় ইত্যাদি ইত্যাদি হাজার অংক। আর এই অংক কষতে গিয়ে জীবনের অংকে ভুল করে যাচ্ছি বারবার।

লেখক, কোন বিষয়ে লিখা হচ্ছে আজ। কাধের উপর হাত দিয়ে প্রশ্ন করে পথিক। হাত দিয়ে তার হাতটা সরিয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে গেলাম, পথিকের কাছে লুকিয়ে কি হবে? কোন কিছুই লুকায়নি তার কাছে, এমন কিছু আমার জীবনে চলছে তা আগে থেকেই জেনেছিল। আনুষ্ঠানিক জানাটা বাকী ছিল, এত দিনের পুরুনো বন্ধু যে সব কিছুই জানে তবু এই অবস্থার কথাটা বলতে লজ্জাই লাগছিল। জানি পথিক কিছু করতে পারবে না, তবু দেখুক এই ভেবে উঠে গিয়ে বিছানায় বসে একটা বই দিয়ে মুখ ডেকে শুয়ে পড়লাম।

চোখের সামনে শুধুই অন্ধকার, আর সেই অন্ধকারেই দেখতে পাচ্ছি চব্বিশ বছরের এক যুবক কিছু একটা হাতড়ে বেড়াচ্ছে কিছু একটা ধরে অন্ধকার ভেদ করে আলোর দিকে এগিয়ে আসতে।
ঘুমিয়ে পড়, এখন এগারটা বাজে ঠিক রাত দুটোর সময় ডেকে দিব। এক জায়গায় যেতে হবে আমার সাথে।
বললাম, পথিক তুমি আমার অবস্থাটা নিশ্চয় বুঝতে পারছ, সুতরাং এই সময় আর কোথাও আমার পক্ষে যাওয়া সম্ভব নয়।
তুমি না গেলে কি লিখবে এই উপখ্যান?
তুমি নিজেই লিখ, লেখালেখিটা আমাকে দিয়ে আর হবে না। আমি নিজেই জানি না কালকের সকালটা আমার কেমন হবে? তোমার মেস থেকে বের হয়ে আমি কোথায় যাব।
শান্ত্বনার বাণী আমি দিতে পারি না, আর এই মুহুর্তে তোমাকে শান্ত্বনা দেওয়াটা হচ্ছে নিকৃষ্ট বোকামীর একটা। তবে আশার পথ আমি দেখাতে পারি।
কি হবে তাতে? আমার আর আমার পরিবারের পেটে ভাত যাবে তাতে?
পথিক কোন কথা না বলে বের হয়ে গেল। এমন পরিস্থিতিতে আমিও হয়ত তাই করতাম। এই ধরণের প্রশ্নের কোন উত্তর হয় না।
মন ভালো নেই, লাইট নিভিয়ে দিয়ে শুয়ে পড়লাম। পাশের ঘরে পথিকের গলা শুনতে পেলাম, কারো কাছ থেকে দুইশত টাকা ধার করছে।
ঠিক রাত দুটোই আমাকে ডেকে তুলল। চল বের হতে হবে।
কোন কথা না বলে ফ্রেস হয়ে পথিকের একটা শার্ট প্যান্ট পড়ে তার সাথে বের হয়ে এলাম। পথিকের মামার অবস্থাও ভালো না, কয়েকদিন হল অসুস্থ তাই উনিও যে পথিককে টাকা দিতে পারছেন না বুঝতে পারছি। যে ছেলে গোল্ডলিফ ব্যতিত সিগারেট খায়নি কখনো সে এখন একদম সস্তা সিগারেট খাচ্ছে। এই সিগারেট খাওয়া নিয়েও কম কথা শুনতে হয়নি। খারাপ কাজে কথা শুনতে আপত্তি নেই, কাজটা আসলেই খারাপ এটা বুঝতে পারি দুই জনেই, আর মাসিক তিন চারশ টাকা এর পিছনে ব্যয় করা যে শুধু অপচয় নয় মরার উপরে খাঁড়ার ঘা তাও বুঝতে পারি।

একটা সিগারেট ধরিয়ে আমাকে দিয়ে বলল, টেনে দাও সিগারেট কম খেতে হবে এখন থেকে। আমি আর কিছু বললাম না, মাথা নিচু করে তাকে অনুসরণ করছি আর সিগারেট টানছি। আমার মাথায় শুধু একটাই চিন্তা, এই মুহুর্তে পড়শোনাটা ছেড়ে দিয়ে কি করব? আর ত মাত্র নয়টা মাস যদি কোনভাবে শেষ করতে পারতাম তাহলে হয়ত একটা অবস্থানে নিজেকে নিয়ে যেতে পারতাম।
পথিকের ফোন বাজছে, ফোন তুলেই বলল ভাই আর একটু অপেক্ষা করুণ আমরা এই চলে এলাম বলে।
ফোন রেখে দিয়ে বলল, একটু দ্রুত হাট, আমাদের জন্য একজন দাঁড়িয়ে আছে। সিগারেটটা তার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে জোরে হাটা শুরু করলাম। আমাকে নীরব থেকে পথিকও আর কোন কথা বলছে না।

রাতের ঢাকা শহরে মধ্যরাতে হাটার অভ্যাস আমাদের জন্য নতুন কিছু নয়, এই শহরের বুকে মাঝে রাতের সব দৃশ্যই আমাদের নখদর্পনে। মানুষ ঘুমায় এখানে কিন্তু শহর ঘুমায় না, এই শহরের কোন ক্লান্তি নেই, শুধু মাঝে মাঝে একটু নিঃশ্বাস নেওয়ার প্রয়োজনেই হয়ত রাতকে বেছে নেয়। সব সময় এই নিঃশ্বাস ভারি হয়ে যায় কিছু মাতাল চালকের গাড়ির চাকার পিষ্টনে। শো শো শব্দ করে ট্রাকগুলো চলে যায় যেন দুনিয়ায় তার চেয়ে বেশি তাড়া কারো নেই, পারলে বিমানের মত করে উড়ে যায়।

দারুস সালাম রোড ধরে এগিয়ে গিয়ে মিরপুর মাজার রোড হয়ে সামনে যেতেই দেখলাম কয়েকজন লোক দাঁড়িয়ে আছে একটা ট্রাকের পাশে। পথিকের ফোন বেজে উঠতেই সে হাত উচুঁ করে ইশারা করে বুঝিয়ে দিল আমরা চলে এসেছি। অন্ধকারের আলো ছায়ায় ঠিক মত কাউকে দেখতে পেলাম না, এগিয়ে যেতেই আমাদের উদ্দেশ্য করে একজন বলল, চলুন দেরী হয়ে গিয়েছে। এগিয়ে গিয়ে পথিক ট্রাকের সামনে উঠে বসল, আমাকেও উঠতে হল তার সাথে সাথে। অন্য পাশ দিয়ে সেই লোকটা এসে উঠল। বাকীরা পিছনে উঠেছে বুঝতে পারলাম।
কুশলাদী বিনিময় পর্ব শেষ করে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিল ড্রাইভারের সাথে, ড্রাইভারের নাম আলামিন। লাইটের আলোয় দেখলাম, লম্বায় আমাদের প্রায় সমান বয়স ঠিক বোঝা যাচ্ছে না তবে আমাদের চেয়ে খুব বেশি হলে তিন চার বছরের বড় হবে অর্থাৎ আঠাশ বা ঊনত্রিশ হবে।

বেড়িবাধ ধরে এগিয়ে যেতে লাগল ট্রাক, আলামিন তার সিগারেটের প্যাকেট থেকে আমাদের দুইজনকেই সিগারেট বের করে দিল। পথিক টুকটাক কথা বলছে, কেমন যাচ্ছে দিনকাল, ভাড়া কেমন, বালুর দাম কেমন ইত্যাদি। কারো সাথে কথা জমিয়ে তুলতে উস্তাদ পথিক, ঠিক এই কাজটাই করছে। হঠাৎ করেই একটা প্রশ্নে আমার মনযোগ কেড়ে নিল পুরোপুরিভাবে। আপনার বোন কেমন আছে?
পথিকের দিকে তাকিয়ে একটা মুচকি হাসি দিয়ে বলল, ভালো আছে ভাই। শুধু একটু সমস্যা করে ছোট ভাইটা।

একটা বালুর টেকের উপর এসে গাড়ি ভিড়িয়ে নেমে গেল গাড়ি থেকে আলামিন, আমি পথিককে খোঁচা দিয়ে বললাম ঘটনা কি?
নিজের কানেই শুনতে পাবে সব, একটু অপেক্ষা কর। বিদ্রুপের একটা হাসি দিল পথিক। আমি মুখ ঘুরিয়ে নিলাম।
আবার বলল, তোমার এই পেঁচা মুখটা দেখতে ইচ্ছা করছে না, তবে কথা দিতে পারি এই মুখটা এমন থাকবে না কিছু সময় পর।
আমি আর সেই দিকে মুখ না ফিরিয়ে গলা বের করে ট্রাকে বালু কি করে উঠাচ্ছে তাই দেখতে লাগলাম। একটা ভেকু দিয়ে মাত্র চার বার বালু তুলে ফেলে দিল, তাতেই পুরো ট্রাক বালু ভর্তি হয়ে গেল। উল্টো পাশ দিয়ে আলামিন এসে উঠল ভিতরে। গাড়ি চালু করে এগিয়ে যেতে লাগল।

চলন্ত অবস্থায় ড্রাইভারের সাথে কথা বলতে নেই, এটা আইন। আর ট্রাক ডাইভারদের প্রতি আমার অন্যরকম দৃষ্টি ছিল সব সময়। জীবনে যত ট্রাক ড্রাইভার দেখেছি এদের অধিকাংশ নেশাখোর, জুয়াসক্ত, এমনকি নারী আসক্ত। সারা রাত ট্রাক চালায় তারপর অর্ধবেলা মরার মত পড়ে পড়ে ঘুমায়। তারপর শুরু হয় এই সব কু-কাম। মহাসড়কে সব থেকে বেশি ভয় আমার এদের নিয়েই।

কথার শুরুটা পথিক করল। এখন আপনার ট্রাক কয়টা?
আলামিন একবার পথিকের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, আপনাদের দোয়ায় দুটো কিনে নিয়েছি আর দুটোতে অংশীদার আছে।
বাহ! বেশ ভালো।
আপনার ভাই এর কি হয়েছে বলছিলেন তখন?
আর বলবেন না ভাই, আমার হাড্ডি পর্যন্ত জ্বালিয়ে খাবে এই। এই বয়সে দুটো পয়সার মুখ দেখেই যা তা শুরু করেছে।
শুরু থেকে বলবেন? আপনার জীবনের গল্পটা শুনতেও আমি আগ্রহী যদি আপনি বলেন।
আমার মত ড্রাইভারের আবার জীবন, এই সব শুনেই কি হবে।
পথিক কোন উত্তর দিল না, শুধু একবার আমার দিকে আর আলামিনের মুখের দিকে তাকিয়ে রাস্তার দিকে ফিরে তাকালো।
বুঝতে পারলাম, নাই কাজ তো খই ভাঁজ এই অবস্থা হতে যাচ্ছে, এই শেষ রাতে একজনের জীবনের গল্প শুনতে হবে। পরক্ষণেই মনে হল বিষয়টা মন্দ নয়, হয়ত এখান থেকেই জানতে পারব অনেক কিছু। প্রত্যেকটা মানুষ যেমন একে অন্য থেকে আলাদা তেমনি তার গল্পগুলোও আলাদা। কিছু বিষয় মাঝে মাঝে মিলে যায় শুধু নয়ত সম্পূর্ণই ভিন্ন প্রতিটা মানুষ।

প্যাকেট থেকে সিগারেট বের করে আমাদের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল আলামিন। এই দীর্ঘশ্বাস কোন লুকায়িত কষ্টের তা বুঝতে এক মুহুর্ত দেরী হল না আমার। আমিই বললাম, দেখুন আমরা যদি আপনার কোন কষ্টের স্মৃতি মনে করিয়ে দিয়ে থাকি তাহলে আন্তরিকভাবে দুঃখিত। আপনার গাড়ি চালাতে সমস্যা হলে আপনি বরং সেই দিকেই নজর দিন, গল্প পরেও করা যাবে।

আলামিন একবার আমার মুখের দিকে তাকিয়ে চুপ করে রইল কিছু সময়, তারপর বলল, পথিক ভাই ছোট ভাইটা খুব সমস্যা করছে। বাজে পাল্লায় পড়ে গিয়েছে, কত আর বয়স হবে এই বয়সেই নেশা, জুয়া থেকে শুরু করে খারাপ জায়গায় যাওয়া আসা শুরু করেছে। আমি কিছু বলতে পারছি না, আপনি যদি একটু বুঝিয়ে বলে দিতেন?
আচ্ছা সে চেষ্টা করা যায় কিন্তু তাতে আসলে কাজ হবে কিনা তা বলতে পারছি না, তবে যদি তাকে আমার হাতে ছেড়ে দেন তবে আমি একটা ব্যবস্থা করতে পারব বলেই আশা রাখি।

আমি আপনার উপরে ভরসা করি, আপনি যা ভালো হবে তাই করবেন।
কিছু সময় চুপ থেকে হঠাৎ করেই আলামিন বলে উঠল, আমার বাড়ি ময়মনসিংহের গ্রামের নামটা আমি ভিন্ন করে দিলাম নওবীর। সংসারে বাবা,মা ছোট একটা বোন আর যে ভাই এর কথা বলছিলাম সে ছিল। খুব গরিব ঘরে জন্ম নিয়েছিলাম বলেই হয়ত খুব ছোট বেলা থেকেই পরিশ্রম করে খাবার জোগাড় করতে হত।
বাবা রিক্সা চালাইত, কিন্তু উনার বদ অভ্যাস ছিল মদ খাওয়ার। প্রায় প্রতিদিন রাতেই বাড়ি ফিরতেন মদ খেয়ে আর মায়ের উপর চলত নানা অত্যাচার। গ্রামের প্রাইমারি স্কুলে ফ্রি পড়াশোনা করার সুযোগ পেয়ে ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত পড়েছিলাম তারপর আর পড়া হয়নি, পেটের দায়ে তিনচাকার প্যাডেল ঘুরাতে শুরু করি। ছোট বোনটা তখন দুই বছরের মাত্র, আর ভাইটা নয়। এগার বছর বয়স থেকেই জীবনের সাথে যুদ্ধ শুরু করি।
খুব ভালো না হলেও সংসার কোন মতে চলে যাচ্ছিল, বাবা তার আয়ের টাকা দিয়ে মদ খায় আর রাতে বাড়ি ফিরে আমাদের সবার সাথে খুব খারাপ আচরণ করে। আর আমি এই বয়সে যে টাকা কামাই করতাম তা দিয়েই মা কোন রকমে সংসার চালাতে শুরু করে।

আমাদের বসত বাড়ি বলতে দাদার চাচাত ভাই এর দান করা বাড়ি ভিটে ছাড়া আর কিছুই ছিল না, তাও সেখানে থাকতাম আমার দুই চাচা ও এক ফুপু সহ গাদাগাদি করে। ছনের চালের ঘর, মাটির দেওয়াল। অভাব আমাদের নিত্য সঙ্গি, দু-বেলা দুমুঠো খাবার জুটে না। এক সময় বাধ্য হয়েই ছোট ভাইটাও পড়াশোনা বন্ধ করে দিয়ে রিক্সা চালাতে শুরু করে।
হঠাৎ একদিন বাবা এক মহিলাকে নিয়ে বাড়ি আসে মাঝ রাতে। আমার মাকে ঘর থেকে বের করে দিয়ে সেই মেয়েকে নিয়ে ঘরে উঠে। মায়ের আহাজারীতে বাতাস ভারী হয়ে উঠে সেই রাতে, দাদা কাকার দোয়ারে গিয়ে কেদেঁ কি হবে জানতে চান, কিন্তু কেউ কোন সদুত্তর দিতে পারে না। মহিলাকে তাও কেউ জানতে পারে না, কিন্তু গ্রামে তো এভাবে কোন অচেনা মেয়েকে ঘরে রাখা যায় না, লোক মুখে সেই ঘটনার কথা রাতেই গ্রামে রটে যায়। পরেরদিন গ্রামের মুরুব্বিরা বাবাকে জিজ্ঞেস করে মহিলাটি সম্পর্কে। প্রথমে ঘটনা ধামাচাপ দিতে চাইলেও পরে বাবা স্বীকার করে নেয় সে এই মহিলাকে বিয়ে করেছে আর এখন থেকে এখানেই থাকবে। বাবার এমন বক্তব্যের পর আর কারো কিছু বলার থাকে না।

আমাদের ঘর থেকে বের করে দিয়ে বাবা সেই মহিলাকে নিয়ে ঘর করা শুরু করে, আমাদের জায়গা হয় রান্না ঘরের আধারে। নিজের বাবার প্রতি একটা ঘৃণার সৃষ্টি হয় সেই রাতেই।
আমার বয়স তখন চৌদ্দ বছর, এক রাতে বাবা মাকে খুব মারে। আর সেই রাতেই মাকে বলে আমি বাড়ি থেকে বের হয়ে পড়ি। চলে যায় গ্রাম ছেড়ে অনেক দূরে, সেখানে এক ট্রাক ড্রাইভার এর সাথে পরিচয় হয়। তার সাথেই কাজে লেগে পড়ি গাড়ির মাল নামানো, গাড়ি ধোয়া মুছার কাজ। আর শিখতে থাকি ড্রাইভারি। মাঝে মাঝে লুকিয়ে লুকিয়ে মায়ের সাথে দেখা করে আসতাম। সাথে কিছু পয়সাও দিয়ে আসতাম।
তারপর হঠাৎ একদিন সেই মহিলা বাবাকে রেখে চলে যায়। তার কিছুদিন পরেই জানতে পারি বাবা ক্যান্সারে আক্রান্ত। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই বাবার মারা যান।

ততদিনে আমি গাড়ীর ড্রাইভার হয়ে গিয়েছি, অপেক্ষা শুধু বয়স আর লাইসেন্স। কিন্তু সংসারের এই অবস্থা থেকে মন কিছুতেই ভালো রাখতে পারি না। পেটের তাগিদেই ট্রাকের সাথে লেগে রইলাম।
গাড়ি এসে থামল হাইওয়ের এক পাশে। বালুর ট্রিপ নামাতে হবে, ট্রাক থেকে নেমে একটা দোকানের দিকে এগিয়ে গেলাম। চা, বিস্কুট খেতে খেতে আরো কিছু কথা হল পথিকের সাথে। আমি আশে পাশে ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলাম। মেইন রোড থেকে নেমে একটা রাস্তা চলে গিয়েছে গ্রামের দিকে।

আধা ঘণ্টা পরে ট্রাক আনলোড হলে আবার এস উঠে বসলাম। ততক্ষণে ভোরের আলো ফুটে উঠেছে, গাড়ি আবার চলা শুরু করল।
পথিক জিজ্ঞেস করল, তারপর?
কথার উত্তর না দিয়ে ট্রাক গিয়ে দাঁড়াল একটা হোটেলের সামনে। বুঝলাম সকালের খাবার খাবে। নেমে হাত মুখ ধুয়ে খাওয়া শেষ করে আবার রওনা করলাম।
আলামিন আবার বলা শুরু করল।
আঠার বছর বয়সে গাড়ীর ড্রাইভিং লাইসেন্স পাই, আর তখন থেকেই গাড়ি চালানো শুরু করি। প্রথম দিকে গাড়ি পেতে খুব সমস্যা হলেও উস্তাদের সাথে ভালো সম্পর্ক থাকায় উনিই একটা গাড়ির ব্যবস্থা করে দিলেন। তারপর আর পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি।

আমার কোন দুঃখ নেই এখন আর, ছোট বোনটা পড়ালেখা করছে, ওর চাহিদার সবটুকু পূরণ করে চলেছি সব সময়। একটা সময় আমার মা বোন অন্যের দেওয়া যাকাতের কাপড় আর ফেতরার টাকা দিয়ে চলত, এখন আমি নিজে ফেতরা যাকাত দেই।
অন্য সবার মত আমার জীবনেও উৎসব আসে, আমিও উপার্জন করি, একটা সময় শুধু মানুষের দিকে তাকিয়ে দেখতাম। পথিক ভাই মানুষের জীবনে কখন কার কি হয় তা কেউ বলতে পারে না, সময়ের সাথে সাথে অনেক কিছুই বলদে যায়। আমার বাড়ি গেলেই বুঝতে পারবেন।
এতক্ষণে আমি বুঝতে পারলাম আমাদের যাত্রার গন্তব্য কোথায়। পথিকের মুখের দিকে একবার তাকাইলাম, পথিক আমার দিকে তাকিয়ে আবার মুখ ফিরিয়ে আলামিনকে প্রশ্ন করল, বিয়ে করেছেন?
এত কষ্টের কথা বলে গেলেও একটি বারের জন্য তার মুখে আমি কোন দুঃখবোধ দেখি নাই, এমনকি একটা দীর্ঘশ্বাস পর্যন্ত না, কিন্তু এই প্রশ্ন শুনার সাথে সাথেই একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে হেসে উঠল।
বুঝলাম এখানেও লুকিয়ে আছে কোন কাহিনী। এবার আমিই বললাম এখানেও তাহলে কাহীনি আছে।
মাথা নাড়িয়ে বলল, কিছুটা সেই রকমই, তবে সেগুলো আমি ভুলে গিয়েছি। অভাবের পেটে কত কিছুই হয়, আবার পেট ভরে গেলে সব মিলিয়ে যায়। আমার বেলাতেও তাই হয়েছে।
ঘণ্টা দেড়েক পরে গাড়ি এস নামল একটা গ্রাম্য রাস্তা ধরে। তারপর গলি পথ ধরে এগিয়ে গিয়ে একটা বাড়ির সামনে দাঁড় করিয়ে বন্ধ করে দিল। বুঝতে পারলাম আমরা চলে এসেছি। গাড়ী থেকে নেমে আলামিনকে অনুসরণ করে একটা বাড়ির ভিতরে গিয়ে প্রবেশ করলাম।

মাঝ বয়সি একজন মহিলা বের হয়ে এসেই পথিককে বলল, তুমিই পথিক। তোমার কথা কত শুনেছি বাবা। আমি হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম। পথিক যে আলামিনের পূর্ব পরিচিত সেটা আমার জানা ছিল না।
তিন রুমের একটা হাফ বিল্ডিং ঘর, টাইলস করা। জানালায় থাই গ্লাস লাগানো, বেশ দামী পর্দা ঝুলছে সেখানে। একটা রুমে নিয়ে বসতে দিল আমাদের। কিছু সময় পরেই তের চৌদ্দ বছরের একজন মেয়ে এল শরবত নিয়ে।
পথিক জিজ্ঞেস করল, কোন ক্লাসে পড়?
মেয়েটি মুচকি হেসে উত্তর দিল, ক্লাস নাইনে। তারপর ঘর থেকে বের হয়ে গেল। শরবত খেয়ে পথিক গিয়ে দাঁড়াল জানালার কাছে।
আমি খাটে হেলান দিয়ে বসে আছি, কিছু সময় পরে আলামিন এল ঘরে, সাথে আরেকটা ছেলে। চেহেরার মিল দেখে বুঝলাম এই সেই ভাই যার কথা গাড়িতে বসে বলছিল আলামিন।

পথিক তাকে নিয়ে আরেকটা রুমে চলে গেল। পাশের রুম থেকে মায়ের গলা শুনতে পেলাম, দেখ বাবা এত কিছু করিস না, মানুষ ভাবে তুই চেরাগ পেয়েছিস। আমার এই ঘরে থাকতে ইচ্ছা করে না, শুধু মনে হয় বাইরে থেকে কেউ তাকিয়ে আছে। তুই আমার ঘরের জানালা পাল্টে দে বাবা। উচ্চ স্বরে আলামিন এর হাসির শব্দ শুনতে পেলাম।
হাসতে হাসতে এই ঘরে এসে বলে উঠল, এই হচ্ছে আমার মা। অতিকষ্টে দিন যাপন করেছেন সারাটি জীবন তাই এখন আর এগুলো সহ্য হয় না।
আমি একটু মুচকি হেসে বললাম, ঘর দিয়েছেন কত দিন হল।
এই ত মাস চারেক হবে, বোন বড় হচ্ছে বিয়ে দিতে হবে না, কি বলেন।
তা তো দিতেই হবে, কথা শেষ করার আগেই দরজায় দাঁড়িয়ে মেয়েটি ইশারা করলে আলামিন উঠে গিয়ে একশ টাকার একটা নোট বের করে দিল বোনের হাতে।
দুপুরের খাওয়া দাওয়া করে সেখান থেকে রওনা করলাম তিনজন। আমি পথিক আর আলামিনের ভাই। একবার কানে কানে জিজ্ঞেস করলাম পথিককে, তাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছ?
রিহ্যাব সেন্টারে। এক কথায় উত্তর। আমিও আর কোন কথা বললাম না।
জয় পরাজয় প্রত্যেকটা জীবনেই থাকে, আমরা সাধারণ মানুষ অসাধারণ হয়ে উঠা মানুষের গল্প শুনি, তাদের জীবনী পড়ে নিজেরা শিক্ষা নেই, প্রেরণা পায়।

আমাদের আশে পাশে এমন অনেক মানুষ আছে যারা এমনি করে তাদের জীবনকে বদলে দিয়েছে, কখনো তাদের দিকে আমরা তাকাই না আর তাকালেও আমাদের থাকে শুধু আফসোস বা হতাশা। আমরা জীবনে দুটো কাজ বেশি করি, ভাগ্যকে দোষারোপ করা আর আফসোস করা।
কথাগুলো এক নাগাড়ে বলে গেল পথিক, আমি শুধুই নিরব শ্রোতা হয়ে শুনে গেলাম। আমি নিজেই ত জানি না আমার এখন কি করণীয়, হয়ত আলামিনের জীবন আমার কাছে শিক্ষা হয়ে থাকবে কিন্তু তাতে আমার কি কিছু হবে? আমি যে এখন আর আলামিন নয়।

Advertisement

কমেন্টস