বেইজিং এখন গোলাপ রাণীর

প্রকাশঃ আগস্ট ২৪, ২০১৬

আইরীন নিয়াজী মান্না।। 

 কবি লিখেছেন : ‘জোটে যদি মোটে একটি পয়সা/খাদ্য কিনিও ক্ষুধার লাগি,/দুইটি যদি জোটে অর্ধেকে/ফুল কিনো হে অনুরাগী।’ রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন-‘বিদেশে অচেনা ফুল/পথিক কবিকে ডেকে কহে/ যে দেশ তোমার কবি/ সেই দেশ আমারো কি নহে? কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছেন-‘ভিক্ষা যদি নাই দাও, কুকুর লেলিয়ে দিওনা। আঘাত করবার মধ্যে এক ধরনের সৌন্দর্য্য থাকে। আমি কবি। আমি আঘাত করলেও ফুল দিয়ে আঘাত করি। অসুন্দর-কুতসিতের সাধনা আমার নয়। আমার আঘাত বর্বরের, কাপুরুষের আঘাতের মতো নিষ্ঠুর নয়…। ফুল কে না ভালোবাসে। ফুলের আছে সৌন্দর্য, মাধুর্য, পবিত্রতা এবং মন হরণ করা মনোরম সুবাস।

ফুল নিয়ে বিশ্বের বড় বড় কবিরা নানা রকম কবিতা লিখেছেন। পৃথিবীতে হাজার রকমের ফুল রয়েছে। তবে সব ফুলের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় গোলাপ। গোলাপের মধ্যে আবার লাল গোলাপ বেশি জনপ্রিয়। লাল গোলাপ রোমান্টিকতার প্রতীক। বেইজিংয়ে এখন গোলাপ মৌসুম। কত রং আর রূপের যে গোলাপ হতে পারে তা চীন না এলে হয়তো অজানাই থেকে যেত। ঠিক এসময় আমার অফিস চীন আন্তর্জাতিক বেতারের (সিআরআই) বিশাল আঙ্গিনাজুড়ে নানা রকমের হাজার হাজার গোলাপ ফুটে আছে। দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। বড় বড় সড়কের আইল্যান্ড, ফুটপাত, পথ-ঘাট, পার্ক, অফিস-বাড়ির আঙ্গিনাজুড়ে ফুটে আছে লাল, সাদা, হলুদ, গোলাপী, নীল, কমলসহ কত না রংয়ের গোলাপ। লতানো ডালের গোলাপের ঝারগুলো অফিস বিল্ডিংগুলোর সৌন্দর্য বাড়িয়ে দিয়েছে।

সর্বত্র গোলাপের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে পথচারিরা ছবি তুলছে দিনভর। ফুলের রাণী গোলাপ মুগ্ধতা বিলিয়ে যাচ্ছে সারাবেলা। গোলাপ এক প্রকার সুপরিচিত ফুল যা আধুনিক মানুষের কাছে সৌন্দর্যের প্রতীক ও ভালোবাসার প্রতীক। Rosaceae পরিবারের Rosa গণের এক প্রকারের গুল্ম জাতীয় গাছে গোলাপ ফুল ফোটে। পৃথিবীতে প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ প্রজাতির গোলাপ রয়েছে। এই সমস্ত প্রজাতির মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন উপ-প্রজাতী। সব মিলিয়ে প্রায় ৫৫০টি আলাদা আলাদা গোলাপের অস্তিত্ব রয়েছে পৃথিবীজুড়ে।

লাল গোলাপ ভালবাসার বিশ্বজনীন প্রতীক। ফুলের জগতে একমাত্র লাল গোলাপই ভালবাসার এত কাছাকাছি যেতে পেরেছে। তাই বিশেষ মানুষটিকে মনের উষ্ণতার কথা জানাতে লাল গোলাপ অতুলনীয়। ভালবাসা শিল্পকলার জগতে একটি বিশেষ স্থান দখল করে রয়েছে। তেমনি লাল গোলাপও শিল্পকলার বিভিন্ন শাখা যেমন, চিত্রকলা, গান, কবিতা, গল্প, নাটক, ভাস্কর্য স্থান করে নিয়েছে!

বর্তমানে সারা বিশ্বে যে লাল গোলাপ দেখা যায়, তার সাথে আমাদের পরিচয় ইউরোপ করিয়ে দিলেও তা মূলত এসেছিল চীন থেকে! তবে যেখান থেকেই আসুক না কেন, লাল গোলাপ বর্তমানে সারা বিশ্বের মানুষের মনে ভালবাসার প্রতীক হিসেবে ঠাঁই করে নিয়েছে। গোলাপ পাঁপড়ির গড়ন ও বিন্যাসে একরূপ নান্দনিকতা রয়েছে যা মানুষকে আকৃষ্ট করে। সুগন্ধী গোলাপের ঘ্রাণও মানুষের প্রিয়। শুনলে অবাক হতে হয়, গোলাপের নিজস্ব কোনো গন্ধ নেই। গন্ধ উত্পাদনের কোনো ক্ষমতা গোলাপের নেই । গোলাপী বর্ণ ছাড়াও লাল, হলুদ, সাদা, সবুজসহ নানা বর্ণের গোলাপ দেখা যায়।

গোলাপ গাছের কাণ্ডে কাঁটা থাকে। এর পাতার কিনারাতেও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কাঁটা রয়েছে। গোলাপের আদি নিবাস এশিয়া। অল্প কিছু প্রজাতির আদি বাস ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও উত্তর পশ্চিম আফ্রিকা। ফুলের সৌন্দর্য ও সুবাসের জন্য গোলাপ বিশ্বজুড়ে বিখ্যাত। সবচেয়ে প্রাচীন গোলাপের বয়স ২ কোটি ৬০ লক্ষ বছর থেকে ৩ কোটি ৮০ লক্ষ বছর। কবে, কোথায় ও কখন প্রথম গোলাপ চাষ শুরু হয়েছিল তার সঠিক বিবরণ জানা যায়নি। তবে প্রাচীনকালে গ্রীস, রোম, মধ্যপ্রাচ্য ও চীনে গোলাপের আবাদ ছিল। গোলাপ উত্তর গোলার্ধ থেকে ক্রমে দক্ষিণ গোলার্ধে বিস্তৃতি লাভ করে। পাশ্চাত্যের দেশগুলির গোলাপ ছিল সাদা ও হালকা রঙের, ফুল দিত খুব অল্প দিন আর প্রাচ্যের গোলাপ ছিল হলুদ, লাল প্রভৃতি কড়া রঙের। বছরের অনেকটা সময় ধরে ফুল ফুটতো।

প্রাচ্য আর পাশ্চাত্যের গোলাপের সংকরায়ণের মাধ্যমে ঘটেছে এক পুষ্পবিপ্লব। উদ্ভব হয়েছে মনমাতানো অজস্র জাতের গোলাপ। ইতিহাস : গ্রীক উপকথায় আছে প্রেমের দেবী ভেনাসের পায়ের রক্ত থেকে গোলাপের জন্ম। আরব দেশীয় কাহিনীতে আছে সাদা গোলাপকে বুলবুলি পাখি আলিঙ্গন করায় বুলবুলি পাখি গোলাপের কাটায় আহত হয়। ফলে বুলবুলির রক্ত হতে সাদা গোলাপ থেকে লাল গোলাপের জন্ম। হিন্দু পৌরাণিক কাহিনীতে বলা হয়েছে, বিষ্ণু একদিন ব্রহ্মাকে ‘পদ্ম’ শ্রেষ্ঠ ফুল বললে ব্রহ্মা বিষ্ণুকে স্বর্গে নিয়ে যান। সেখানে তিনি হালকা রঙের একটি সুগন্ধি গোলাপ দেখান বিষ্ণুকে। গোলাপ সমন্ধে এ ধরনের নানা গল্প আছে।

ব্যবহার : প্রাচীনকাল থেকেই গোলাপ বহুল ব্যবহূত ফুল। ইতিহাসখ্যাত রাজা-রানীর কাছে গোলাপ সর্বদাই আদৃত হয়েছে। অনেক ধর্মীয় অনুষ্ঠানে বাংলাদেশসহ ভারতিয় উপমহাদেশে গোলাপপানি ব্যবহার করা হয়। মুগল সম্রাজ্ঞী নূরজাহানের আবিস্কার করা ‘আতর-ই-জাহাঙ্গীর’ থেকে গোলাপের আতর প্রচলিত হয়। গোলাপ দিয়ে জেলি, মিষ্টি, হালুয়াসহ নানা ধরনের খাদ্যসামগ্রী সুগন্ধি করা হয়। ভেষজ হিসেবেও গোলাপ গাছ ব্যবহার করা হয়। গোলাপের ফল ভিটামিন ‘সি’ সমৃদ্ধ। গোলাপ ফুল যে শুধু সৌন্দর্যের প্রতীক, তা-ই নয়। এর রয়েছে বহুমুখী ব্যবহার। গোলাপের পাপড়ি থেকে জ্যাম, জেলি প্রস্তুত করা হয়। পার্সি, চীন ও ভারতে গোলাপজলের প্রচলন ঘটেছে। সুগন্ধির জন্য গোলাপজল ব্যবহার করা হয়। গোলাপ ফুলের সুবাসকে কাজে লাগিয়ে পারফিউম, সাবানসহ বিভিন্ন প্রসাধনী সামগ্রী তৈরি করা হয়। গোলাপে গেনারিয়ল নামে এক ধরনের অ্যারোম্যাটিক অ্যালকোহল জাতীয় পদার্থ পাওয়া যায়। যা এর সুগন্ধের জন্য দায়ী। অর্নামেন্টারি উদ্ভিদ হিসেবে গোলাপের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য। গোলাপ থেকে তেলও উত্পাদিত হয়।

চাষাবাদ : দিনে অন্ত:ত ৫ ঘণ্টা সূর্যালোক পায় এমন আবহাওয়া গোলাপের জন্য উপযুক্ত। অতি বৃষ্টিযুক্ত স্থানে রোপন করা যাবে না। ফুল বেশি ধরে সাধারণত নভেম্বর থেকে এপ্রিল মাসে। তবে অগাস্ট থেকে মার্চ পর্যন্ত লাগানোর উপযুক্ত সময়। সবচেয়ে ভাল সময় সেপ্টেম্বর-অক্টোবর। যে কোনো উর্বর ও নিষ্কাশিত জমিতেই গোলাপ ভাল জন্মে।

 

Advertisement

কমেন্টস