মাই বাইসাইকেল (প্রমোসহ)

প্রকাশঃ মে ৯, ২০১৬

ড. ফাহমিদুল হক

চলচ্চিত্র ‘মোর ঠেঙ্গারি’ দেখার সুযোগ হলো। অং রাখাইন পরিচালিত চাকমা ভাষায় নির্মিত বাংলাদেশের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র এটি, যা ইংরেজিতে ‌‌‘মাই বাইসাইকেল’ নামে বেশি পরিচিত।

বেশি পরিচিতও বলা যাবে না, কারণ চলচ্চিত্রটি এখনও সেন্সর সার্টিফিকেট পায় নি, ফলে বেশি মানুষ দেখার সুযোগও পায়নি।

কমল নামের চাকমা যুবক শহরে কাজ শেষে ছ’মাস পরে বাড়ি ফেরে স্ত্রী ও পুত্রের কাছে, সঙ্গে নিয়ে আসে এক সাইকেল। সেই সাইকেল দিয়ে সে আয়ের একটা উপায় বের করে। গ্রাম থেকে বাজারে সে মানুষ বা মালপত্র পরিবহণ করতে শুরু করে, ভাড়া হিসেবে সে কিছু টাকা নিতে থাকে। এই কাজ শুরুর পর তার পরিবারে কিছুটা স্বাচ্ছন্দ্য, কিছুটা সুখ ফিরে আসে। কিন্তু গ্রামের কিছু নেশাখোর চাকমা তরুণ তার কাছে চাঁদা চায়। সে অস্বীকৃতি জানায়। একদিন ঘুম থেকে উঠে দেখে তার সাইকেল কারা যেন ভেঙ্গে-চুরে পাহাড়ের নিচে ফেলে রেখেছে। সে সাইকেল মেরামত করতে শহরের উদ্দেশে রওয়ানা দেয়। কাপ্তাই হ্রদে এক নৌকায় করে ভাঙ্গা সাইকেল নিয়ে যেতে যেতে সে লক্ষ করে, বিপরীত দিক থেকে আরেক নৌকায় করে কে যেন আরেকটা নতুন সাইকেল নিয়ে আসছে।

চমৎকার এক গল্প। আধুনিকতার অভিঘাতে কীভাবে জীবনে গতি ও উন্নয়ন আসে, তা যেমন গল্প থেকে আমরা বুঝতে পারি, তেমনি আধুনিকতার উপাদানগুলো কীভাবে সরল জীবনে জটিলতা টেনে আনে তাও এই চলচ্চিত্রে ফুটে উঠেছে।

গল্প যতটুকু বললাম, তাতে সেন্সর সার্টিফিকেট না পাবার কোনো কারণ খুঁজে পাওয়া যাবে না। তবে গল্পের মৃদু এক অনুষঙ্গের কথা বলা হয়নি, যেমন বলিনি অন্য আরো ছোটখাটো ঘটনার কথা। ভাঙ্গা সাইকেল আবিষ্কারের পর কমল ও তার পরিবার যখন বিপর্যস্ত, ঠিক তার পরই তাদের দুর্দশাকে আরও বাড়িয়ে তুলতে চার-পাঁচজন উর্দিপরিহিত মানুষ এই পরিবারের উঠোন অতিক্রম করে যায়। যাবার সময় তাদের বুটের নিচে চাপা পড়ে কমলের ছেলের খেলনা গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে যায়।
এইবার মনে হয় কিছু একটা আন্দাজ করা যাচ্ছে, কেন সেন্সর সার্টিফিকেট পাচ্ছে না চলচ্চিত্রটি।

ক্যামেরায় হ্রদ ও পাহাড়ের নিখাদ সৌন্দর্য উঠে এসেছে। তবে ফোরগ্রাউন্ড-ব্যাকগ্রাউন্ড ফোকাস করার ক্ষেত্রে অনেক সময় শটের অপপ্রয়োগ দেখা গেছে। আবহসংগীতে পিয়ানো ও অন্যান্য পশ্চিমা যন্ত্রানুষঙ্গ ব্যবহার না করে চাকমা ঐতিহ্যের টিউন ব্যবহার করলে বেশি ভালো হতো। সেরা শটটি শেষে আমরা দেখি, যখন কমল ভাঙ্গা সাইকেল নিয়ে হ্রদের মাঝখানে, একটি অতিকায় যন্ত্রচালিত নৌকা চলে যায়, সেই জলযান সৃষ্ট ঢেউয়ে কমলের ক্ষুদ্র ডিঙিটি অসহায়ের মতো দুলতে থাকে। অতিরিক্ত লেগেছে শেষ দৃশ্যেই নতুন সাইকেলের পাশাপাশি আরেক নৌকায় নতুন মোটরবাইকের আগমণটি। নতুন একটি সাইকেল আসাটাই প্রয়োজনীয় দ্যেতনা সৃষ্টির জন্য যথেষ্ট ছিল, মোটরবাইকের আদৌ কোনো দরকার ছিল না।

দেশে আলোর মুখ না দেখলেও, বিদেশে চলচ্চিত্রটি ভালোভাবেই গৃহীত হচ্ছে–বেশ কয়েকটি উৎসবে ডাক এসেছে, একটি-দুটি পুরস্কারও জুটেছে।

 

Advertisement

কমেন্টস