বিদেশি ভেবে ভুল করবেন না, আমি বাংলাদেশের ছেলেঃ অমিত সিনহা

প্রকাশঃ মার্চ ২৬, ২০১৮

ছবিঃ আবু সুফিয়ান জুয়েল ও শুভ রহমান

পেশায় তিনি চিকিৎসক। পরিবারের ইচ্ছাতেই এই পেশা বেছে নিয়েছেন। কিন্তু ভেতরের শিল্পমন দমে থাকেনি। মিডিয়ায় কাজের আসক্তি তাকে পেয়ে বসেছিলো। আর তাই চিকিৎসাসেবার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎকে দূরে ঠেলে মিডিয়ার অনিশ্চিত পথে পা বাড়ান। পথে হোঁচট খান। নিজেকে ভেঙে নতুন করে গড়ার উদ্যমে এগিয়ে যান তিনি। বলছি জনপ্রিয় টিভি সিরিজ ‘সাত ভাই চম্পা’র মহারাজ খ্যাত অভিনেতা অমিত সিনহার কথা। প্রগতিশীল এই অভিনেতার চলমান ক্যারিয়ার এবং ব্যক্তি অমিতকে জানতে কথা হলো বিডিমর্নিং এর সাথে। সাক্ষাতে ছিলেন নিয়াজ শুভ-

মিডিয়ায় কাজের শুরুটা কিভাবে?

অমিত সিনহাঃ ২০০৫ সালে আমার মিডিয়া যাত্রা শুরু হয়। এখানে কাজ শুরুর পেছনেও একটি গল্প আছে। একসময় আমি পুরোদস্তুর রাজনীতিবিদ ছিলাম। ২০০১ সালে নির্বাচনের পর আমাকে ক্যাম্পাস থেকে বের করে দেয়া হয়েছিলো। দেড় বছর আমি ক্যাম্পাসের বাইরে ছিলাম। চার বছর আমার পড়াশোনা বন্ধ ছিলো। আমার ব্যাচের সবাই ডাক্তার হয়ে গেছে। আমি খুব হতাশ হয়ে পড়েছিলাম। তখন আমার কুমিল্লার এক বন্ধু তার টিউশনির টাকা দিয়ে আমাকে না জানিয়েই আমার ফটোশুটের ব্যবস্থা করে। সেই ফটোশুটের ২/৩ দিন পরই আমার প্রথম কাজের অফার আসে। তখন থেকেই শুরু।

মাঝে বিরতি দিয়েছিলেন কেন?

অমিত সিনহাঃ আমি র‍্যাম্পে কাজ করতাম। মাঝে মাঝে ফটোশুট, বিজ্ঞাপনের কাজ করা হয়েছে। ২০১০ পর্যন্ত মিডিয়াতে কাজ করেছি। এরইমধ্যে আমার এমবিবিএস শেষ হয়। কুমিল্লায় আমার একটি চাকরিও হয়ে যায়। তখন আমি ভাবলাম মিডিয়ায় দৌড়াদৌড়ি তো অনেক হলো এবার একটু অন্যরকম জীবন-যাপন করি। তখন আমি মিডিয়ায় কাজ ছেড়ে ডাক্তারি করি।

ফের মিডিয়ায় আসার সিদ্ধান্ত…

অমিত সিনহাঃ র‍্যাম্পের ছেলেমেয়েরা আসলে অভিনয় করতে চায় না। তারা শো করতেই বেশি পছন্দ করে। আমিও শো করতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতাম। তবে সিনেমা করার ইচ্ছা অবশ্যই ছিলো। ২২ বছর পর ২০১৪ সালে আমার স্কুলবন্ধু খিজির হায়াত খানের সাথে দেখা হয়। আমাদের স্কুলের রি-ইউনিয়ন ছিলো। সেখানে আড্ডার ফাঁকে খিজির জানায়, আমি একটা নতুন সিনেমা বানাবো সেজন্য একটি নতুন মুখ চাচ্ছি। তুই করবি? আমিও ভাবলাম চেষ্টা করে দেখি। ‘প্রতিরুদ্ধ’ নামের সেই ছবির জন্য আমাকে আট মাস মার্শাল আর্টের প্রশিক্ষণ নিতে হয়েছে। যদিও সেই সিনেমার কাজটি শেষ করা হয়নি। সেই ছবির মাধ্যমেই আমার পুনরায় ফিরে আসা।

স্বপ্ন পূরণের প্রথম ধাপটি কেমন ছিলো?

অমিত সিনহাঃ খিজির হায়াতের সিনেমায় আমার প্রথম শটটি ছিলো পুরান ঢাকার চকবাজারে। শটটা ছিলো এমন, আমি গাড়িতে ড্রাইভারের সিটে বসা, ক্যামেরাটা শুধু সামনে থেকে উঠবে। আমার সামনে কালো কাপড় দেয়া ছিলো। কাপড়টা উঠলো, ক্যামেরাটা উঠলো আমি দেখলাম আমার সামনে প্রায় সাত-আটশো মানুষ। হঠাৎ ভেতরে কেমন একটা অনুভূতি হলো। তখন আমার মনে হলো, এটাই সেই জায়গা যেটা আমি চেয়েছি।

কিন্তু যখন সিনেমাটার কাজ বন্ধ হয়ে গেলো তখন আমি মানসিকভাবে ভেঙে পরি। কারন আমি একটি স্বপ্ন নিয়ে এসেছিলাম। সেই স্বপ্নের পথে হাঁটা শুরু করেছিলাম। হঠাৎ সেই পথচলা থেমে যাওয়ায় আমি আমার আগের পেশায় ফিরে যাই। কিন্তু ডাক্তারি পেশায়ও মনোনিবেশ করতে পারি না। ওই বিরূপ সময়টাতে আমাকে গাইড করে আমার বেষ্ট ফ্রেন্ড নওশাবা।

নওশাবার সাথে বন্ধুত্বের শুরু…

অমিত সিনহাঃ নওশাবা ছিলো ‘প্রতিরুদ্ধ’র নায়িকা। সেখান থেকেই আমাদের বন্ধুত্বের শুরু। এখনো সে আমার প্রিয় বন্ধুর তালিকায় শীর্ষে।

‘প্রতিরুদ্ধ’ বন্ধ হওয়ার পরবর্তী সময় কিভাবে কাটে?

অমিত সিনহাঃ ‘প্রতিরুদ্ধ’র হিরোর যে লুকটা আমি প্রায় দুই বছর সেই লুকে ছিলাম। ছোট ছোট চুল, ছোট ছোট দাঁড়ি। একটা সময় সেই লুকটায় আমাকে অস্থির করে তুলতো। তখন নওশাবা আমাকে আমার লুক পরিবর্তন করতে বলে। আমি চুল বড় করে নিজের লুক পরিবর্তন করলাম।

‘সাত ভাই চম্পা’র সঙ্গে যুক্ত হলেন কিভাবে?

অমিত সিনহাঃ নওশাবা একদিন আমাকে ফোন দিয়ে বললো, বাংলাদেশে বড় একটা টিভি সিরিজ হচ্ছে আমার মনে হয় তুই একটু চেষ্টা করে দেখ। আমি বললাম, দেখ আমি আসলে ফিল্ম করবো, এসব টিভি সিরিজ আমাকে দিয়ে হবে না। তখন নওশাবা আমাকে বুঝালো এই সিরিজের স্কেলটা আসলে অনেক বড়। আমি আসলে সেভাবে গুরুত্ব দেইনি। নওশাবাই আমাকে যাওয়ার জন্য চাপ দিতে থাকে। একদিন আমি তাদের অফিসে গেলাম। আমি যখন যাই ততদিনে সিরিজটির মূল চরিত্রের সবাইকে ঠিক করা হয়ে গেছে।

তারপর…

অমিত সিনহাঃ আমি গিয়ে অডিশন দিয়ে চলে আসি। সেখান থেকে আসার এক সপ্তাহ পর ‘সাত ভাই চম্পা’র কাস্টিং ডিরেক্টর আমাকে ফোন দিয়ে আমাকে ঢাকা আসতে বলেন। জানানো হয় মহারাজের চরিত্রে তারা আমাকে ভাবছেন। আমি অবাক হয়ে যাই। দুই মাসে আমি চারবার অডিশন দেই। আমাকে কাস্ট করা নিয়ে একটা সময় এই সিরিয়ালের পরিচালকের সঙ্গে চ্যানেল আইয়ের দূরত্ব সৃষ্টি হয়।

সিরিয়ালটি নিয়ে আপনার প্রস্তুতি কেমন ছিলো?

অমিত সিনহাঃ প্রথম থেকেই নিজের মধ্যে রাজাকে ধারণ করতে পারিনি। আস্তে আস্তে আমি মহারাজ হয়ে উঠেছি।

সিরিয়ালটি মোট কত পর্বের?

অমিত সিনহাঃ ৩০০ পর্বের। প্রথম লট শেষ হয়েছে। প্রথম লটে ৫২ পর্ব দেখা যাবে।

‘সাত ভাই চম্পা’র সাথে আপনার চুক্তি কতদিনের?

অমিত সিনহাঃ আমার সাথে দুই বছরের চুক্তি হয়েছে। তবে আমি চাইলে অন্য কোন ছবির কাজও করতে পারবো। কিন্তু এই ঘরানার অন্য কোন সিরিয়াল করতে পারবো না।

শুটিংয়ের কোন মুহূর্ত স্মৃতিতে গেঁথে আছে?

অমিত সিনহাঃ আউটডোরে শুটিংয়ের সময় সকল অ্যাকশন দৃশ্য আমি নিজেই করেছি। একটা শট ছিলো ৩০ ফুট উঁচু একটি টাওয়ার থেকে আমি রশিতে ঝুলে তাঁবুতে ঢুকবো। আমি যখন ২০ ফুট উপরে তখন আমার একটা হাত ছুটে যায়। আমাদের টিমের যারা ছিলো সবাই সেখানে ছুটে আসে। অ্যাকশন ডিরেক্টর এডওয়ার্ড ফ্রান্সিস গোমেজ ও আমার শারীরিক প্রশিক্ষক দেবাশীষ ঘোষ আমার পা নিজেদের কাঁধে ধরে রেখেছিলেন। এটি আমি কখনো ভুলবো না।

কেমন সাড়া পাচ্ছেন?

অমিত সিনহাঃ খুব ভালো সাড়া পাচ্ছি। নেগেটিভ, পজেটিভ মিলিয়েই মন্তব্য আসছে। দর্শকদের নেগেটিভ মন্তব্য আমার জন্য পজেটিভ। কারণ আমি তাদের ধরিয়ে দেয়া ভুল থেকে শিখতে চাই। আমি নিজেকে যোদ্ধা মনে করি। শেষ না দেখা পর্যন্ত আমার আগ্রহের কমতি থাকে না।

কোন ধরণের কাজে আগ্রহী?

অমিত সিনহাঃ আমি আমার পরিধি জানি। আমাকে দিয়ে কি হবে, আর কি হবে না সেটি আমার কাছে স্পষ্ট। সব কাজ আমাকে দিয়ে হবে না। আমার নিজের একটা রুচি আছে। আমি অ্যাকশন সিনেমা করতে চাই। আমার দেখা মতে বাংলাদেশে অ্যাকশন হিরো নেই। আমি নিজেকে সেই জায়গায় নিতে চাই।

হাতে নতুন কোন সিনেমা আছে?

অমিত সিনহাঃ আমি একসাথে অনেক কাজ করতে চাই না। আমার হাতে দুটি সিনেমার প্রস্তাব এসেছিলো আমি করতে চাইনি। আমার হাতে এখন যে কাজগুলো আছে সেগুলো শেষ করে নতুন কাজে নামতে চাই। আমি চলতে চলতে শিখি। যেহেতু অভিনয়ে আমার তেমন অভিজ্ঞতা নেই, আমি চাইলেই একটি চরিত্রে ঢুকতে পারি না। চরিত্রকে বুঝে নিজের মধ্যে ধারণ করতে আমার কিছু সময় লাগে।

যৌথ প্রযোজনার ছবিতে আপনাকে দেখা যাবে?

অমিত সিনহাঃ যৌথ প্রযোজনার সকল নিয়মকানুন মানা হলে কাজ করতে আমার আপত্তি নেই। বাংলাদেশের একজন অভিনেতা হিসেবে আমি ভাড়ায় যেতে রাজি আছি। এটি অনেক বেশি সম্মানের। কারণ সেখানকার অভিনেতাদের টক্কর দিয়ে যদি আমরা কাজ করি সেটা আমাদের মানকে উন্নত করে।

অনেকেই ভাবছে আপনি বিদেশি অভিনেতা…

অমিত সিনহাঃ (হেসে) কেউ বিদেশি অভিনেতা ভাবলে ভালোই লাগে। তবে বিদেশি ভেবে ভুল করবেন না, আমি বাংলাদেশের ছেলে। বাংলাদেশি অভিনেতা হিসেবে আমি গর্বিত। কাজের মাধ্যমে আমি এদেশকে বিশ্বেমঞ্চে তুলে ধরতে চাই।

ডাক্তারি পেশা ছেড়ে মিডিয়ায় কেন?

অমিত সিনহাঃ মিডিয়ায় কাজ করে আমি নিজের খোঁড়াক পূর্ণ করি। আমি পেশায় একজন চিকিৎসক হলেও সেখান থেকে টাকা কামানোর কোন চিন্তা আমার নেই। ডাক্তারি মানুষের সেবার জন্য আর মিডিয়ায় কাজ আমার নিজের জন্য। আমি মিডিয়ায় নিয়মিত কাজ করে যেতে চাই।

মিডিয়ায় কাজের ক্ষেত্রে পরিবারের সাপোর্ট…

অমিত সিনহাঃ মিডিয়ায় আমার পথচলায় পরিবারের সাপোর্ট নেই বললেই চলে। আমি এখনো যুদ্ধ করে যাচ্ছি। আমার পরিবার আসলে চিন্তা করতে পারছে না, আমার উজ্জ্বল ক্যারিয়ার ফেলে আমি কেন মিডিয়ায়?

আমি ডাক্তার হয়েছি আমার পরিবারের ইচ্ছায়। তারা চেয়েছে আমি ডাক্তার হই। কিন্তু আমার ইচ্ছা ছিলো আমি চারুকলায় পড়বো। ছোটবেলা থেকেই আমার এমন চিন্তাভাবনা ছিলো। সিলেট মেডিক্যাল কলেজে ‘অঙ্গীকার’ নামক একটি কালচারাল সংগঠন ছিলো। আমি সেখানে যুক্ত হই। পড়াশোনার চেয়ে আমি সেখানে কাজ করে বেশি মজা পেতাম।

আপনি নিজের কাজে সন্তুষ্ট?

অমিত সিনহাঃ আমি নিজেই নিজের সমালোচক। আমার সাথে থাকা সবাই ঠিক বললেও কেন জানিনা নিজের কাজে আমি সন্তুষ্ট হতে পারি না। আমি সবসময় নিজের ভুল খুঁজে বের করার চেষ্টা করি। আমি নিজেকে নিজে চ্যালেঞ্জ করতে ভালোবাসি।

মিডিয়ার কন্টকময় পথচলায় কাউকে পাশে পেয়েছেন?

অমিত সিনহাঃ আমি তিনটি মানুষের কাছে কৃতজ্ঞ। তারা যদি আমাকে সাপোর্ট না দিতো আমি এতদূর আসতে পারতাম না। মডেল অমিত থেকে অভিনেতা অমিত হওয়ার পেছনে কাজী নওশাবা আহমেদ, রিপন নাগ এবং খিজির হায়াত খান আমার পাশে ছিলেন।

এতক্ষণ সময় দেয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

অমিত সিনহাঃ আপনাকেও ধন্যবাদ।

কমেন্টস