বাংলাদেশে স্টার হতে হলে অনেক মুখোশ পরতে হয়ঃ নওশাবা

প্রকাশঃ মার্চ ৪, ২০১৮

ছবিঃ আবু সুফিয়ান জুয়েল

স্পষ্টবাদী নায়িকা। অভিনেত্রী হিসেবে দর্শকের কাছে নিজের অবস্থান স্পষ্ট রাখতে চান। ভিন্নধর্মী চরিত্রে বার বার নিজেকে প্রমাণ করেছেন। দর্শকের মনের বাগানে ফুল হয়ে সুবাস ছড়াতেই অভিনয়কে বেছে নিয়েছেন। তিনি ‘ঢাকা অ্যাটাক’ খ্যাত অভিনেত্রী কাজী নওশাবা আহমেদ। ছবিটির সাফল্যের পর ঢাকাই চলচ্চিত্রে মধুর সময় পার করছেন তিনি। সেই রেশ এখনো কাটেনি। এরইমধ্যে ওপার বাংলার নন্দিত নির্মাতা অরিন্দম শীলের ‘বালিঘর’ সিনেমায় কাজের জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন। প্রিয় অভিনেত্রীর চলমান ক্যারিয়ার এবং ব্যক্তি নওশাবাকে জানতে কথা হলো বিডিমর্নিং এর সাথে। সাক্ষাতে ছিলেন নিয়াজ শুভ-

বর্তমান কাজের ব্যস্ততা?

নওশাবাঃ কয়েকটি সিনেমার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি। চারটি সিনেমার ডাবিং শেষ। আশা করি, এ বছর ছবিগুলো মুক্তি পাবে।

মুক্তি প্রতীক্ষিত ছবিগুলোর নাম কি?

নওশাবাঃ এন রাশেদ চৌধুরীর ‘চন্দ্রাবতী’, তানিম রহমান অংশুর ‘স্বপ্নবাড়ি’, মিজানুর রহমান লাভলুর ’৯৯ ম্যানসন’ এবং আরেকটি ‘আলগা নোঙর’।

ছবিগুলোতে দর্শকদের জন্য কি চমক থাকছে?

নওশাবাঃ কোনো চরিত্রের পুনরাবৃত্তি নেই। আপনারা আমাকে ঢাকা অ্যাটাকে যেভাবে দেখেছেন সামনে হয়তো আর সেভাবে দেখবেন না। স্বপ্নবাড়িতে আমি খুবই একটা রহস্যময়ী চরিত্র,  ৯৯ ম্যানসনে একদম সাধাসিদে স্বভাবের একটা মেয়ে, চন্দ্রাবতীতে সীতার চরিত্র এবং আলগা নোঙরে এতিম মেয়ের চরিত্রে।

‘বালিঘর’ ছবিতে  আপনার চরিত্র…

নওশাবাঃ আমাকে দেখা যাবে জয়া চরিত্রে। সে তার নিজের ভালোলাগার থেকে অন্যের ভালোলাগাকে বেশি গুরুত্ব দেয়। চলতি মাসের ২০ তারিখ আমার অংশের শুটিং শুরু হবে।

কোন ধরনের চরিত্রে আগ্রহী?

নওশাবাঃ যেটাতে আমি বিশ্বাস করি। আমি সেই ধরনের চরিত্র করতে আগ্রহী যেটা আমি না। এমন কোন চরিত্র কখনোই করবো না, যেটা সমাজকে ধ্বংস করে। আমি খুবই সমাজ সচেতন।

কিছু চরিত্র থাকে পুতুলের মতো। আমি সেই ধরনের চরিত্রে কাজ করে শো-পিছ হতে চাই না। আমি দেখতে সুন্দর, আমার সুন্দর ফিগার আছে, আমি নাচতে পারি তাই কোন ছবিতে আমাকে পুতুল বানিয়ে রাখবে এমনটা হবে না। আমাকে অভিনয়ের সুযোগ দিতে হবে। আমি শো-পিছ না, আমি অভিনেত্রী। যেখানে অভিনয় আছে, সেখানেই আমি আছি।

অভিনয়ের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করার সময় পান কতটুকু?

নওশাবাঃ আমি তৎক্ষণাৎ অভিনেত্রী না। অনেক সময় শুটিং স্পটে স্ক্রিপ্ট দেয়া হয়। এমন পরিস্থিতিতে আমার মানসিক ধর্ষণ হয়। প্রথম কথা হচ্ছে কিছু মানুষ থাকে যারা একনজর দেখলেই প্রস্তুত হয়ে যায়, আমি কিন্তু তেমন মানুষ নই। আমার মিনিমাম কিছু টাইম লাগে। স্ক্রিপ্টটি আমি আমার মতো করে পড়ি, নিজের মতো করে ভাবী। কিন্তু ভাগ্যের এমনই পরিহাস, মাঝে মাঝে টাকার কারণে এমন পরিস্থিতিতে আমাদের অনেক কাজই করতে হয়।

ঢাকাই সিনেমার বর্তমান অবস্থা…

নওশাবাঃ আমাদের দেশে অনেক ভালো কাজ হয়। গেলো দুই ঈদে দর্শক অনেক ভালো ভালো সিনেমা দেখতে পেয়েছে। সামনে আরো চমক আসবে। আপনারা সবাই হলে গিয়ে বাংলা ছবি দেখুন।

দুই পর্দার মধ্যে পার্থক্য কতটুকু?

নওশাবাঃ নাটক এখনো অনেক গুছানো না। কিন্তু সিনেমা পারতপক্ষে নাটকের চেয়ে অনেক গুছানো। নাটক যদি একক পরিবার হয়, তাহলে সিনেমা হচ্ছে যৌথ পরিবার। সিনেমা একদম গোপন প্রেমের মতো।

পর্দার নওশাবা ও বাস্তবের নওশাবার অমিল?

নওশাবাঃ (হেসে) পর্দায় খুব শান্ত দেখা গেলেও বাস্তবে কিন্তু তেমন নই। বাস্তবেরটা একদম ঝাঁসি কি রানী। আমি একদম নরম না তা ঠিক নয়, আমি আসলে খুব স্পষ্ট। খুব বেশি হয়তো মানুষকে,  মানে মানুষ যেটা শুনতে পছন্দ করে সেটা বলতে পারি না। কিন্তু আমার মনে হয় যে আমার এ সত্যতাটার কারণে আমি বন্ধু হিসেবে ভালো। কারণ আপনি যদি আগুনে ঝাঁপ দিতে যান তখন যদি বলি, ‘দে ঝাঁপ দে’ আমি ওইটা না। আমি শুধু বলবো ‘আগুনে ঝাঁপ দিচ্ছিস দে, পুড়লে আমার কাছে আসিস না।’

স্পষ্টবাদী হওয়ায় কোন সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন?

নওশাবাঃ প্রতিদিন,  প্রতিনিয়ত। এই মূহুর্তে ধরুণ,  আমাকে আপনার খুব ভালো লাগছে,  আহারে আপু কি সুন্দর করে স্মার্টলি স্পষ্ট কথা বললেন,  এটা শুনতে ভালো লাগে। কিন্তু আমি যাদেরকে বলি তারা হয়তো স্পষ্ট কথাটা শুনতে অভ্যস্থ না। কারণ সব নায়িকারা তো এইভাবে কথা বলে না।

আমার আসলে এত মুখোশ পরতে ইচ্ছা করে না। খুব সাধারণ থাকতে ইচ্ছা করে। একজন নায়িকা মানেই যে, সে সবসময় খুব ভাব ধরে থাকবে তেমন নয়। রাস্তায় অন্যায় কিছু দেখলে প্রতিবাদ না করে থাকতে পারি না। আমি নায়িকা, রাস্তায় ঝামেলা করলে খারাপ খবর প্রকাশ হবে এই ভয়ে বসে থাকার পাত্রী নই আমি। আপনি যদি ভুল করেন, আপনি যেই হোন না কেন আমি আপনার ভুলটা ধরিয়ে দিবো। আমি ভুল করলেও সেটি ধরিয়ে দেয়ার সুযোগ দিবো। এত দূরের মানুষ হওয়ার ইচ্ছা নেই, আমি কাছের মানুষ হতে চাই। আমি আপনাকে লিখে দিতে পারি, আমি কখনো অনেক বড় কিছু হতে পারবো না। কারণ বাংলাদেশে স্টার হতে হলে অনেক মুখোশ পরতে হয়।

তাহলে বাংলাদেশে যারা স্টার তারা কি খারাপ?

নওশাবাঃ সেই মুখোশটাকে আমি খারাপ বলছি না। যারা পরেন তাদেরকেও আমার খারাপ মনে হয় না। কিন্তু আমি মুখোশ পরতে পারবো না। সবাইকে খুশি করে কথা বলা, যেটা ভুল সেটিকে ভুল না বলা, আমি যেটা না আমার দ্বারা সেই কাজটি করানো- এমন কিছুই সম্ভব না।

মুখোশহীন নওশাবার জনপ্রিয়তা কমে যাচ্ছে না?

নওশাবাঃ আমাকে নতুন প্রজন্মের মানুষ খুব পছন্দ করে। কারণ আমি স্পষ্টবাদী, সমাজ সচেতন। আমি আসলে খুব দূরের কোন তারা হতে চাই না। আমি গাছ হতে চাই, যাকে প্রতিদিন পানি দিবেন আর আমি সুন্দর করে ফুল ফুটাবো। আমি আপনার বাগানের আপনার গাছটা হবো। (হেসে) কিন্তু আমি তো গোলাপ, একটু কাঁটাও আছে।

অনেক ক্ষেত্রেই তারকাদের ব্যাক্তিজীবন বেশ সমালোচিত…

নওশাবাঃ দিনের শেষে দর্শক আমাদের টিকিট কেটে দেখতে যায়। আমরা কি কালারের জামা পরেছি সেটা তাদের জানার ইচ্ছা থাকতেই পারে। কেউ যদি আমার সাথে সেলফি তুলতে চায়, তাতে যদি আমি বিরক্ত হই সেটা বেমানান। আমি তো খ্যাতিই চেয়েছি। আমার ব্যক্তিগত জীবনটি অবশ্যই আমার একান্ত। কিন্তু সেটারও একটি পরিমিতি বোধ থাকবে।

একজন স্টার, একজন অভিনেত্রী সেও কিন্তু মানুষ। ধরুণ কোন কারণে আমার মন খারাপ, তখন যদি কোন ভক্ত আমার সাথে ছবি তুলতে চায় তাকে আমি বলতেই পারি ভাইয়া আজ আমি ছবিটা তুলবো না। কিন্তু সেই ভক্ত যদি মনে করে তারকা খ্যাতির জন্য আমরা অহংকার করছি সেটা ভুল। ভক্তদের বুঝতে হবে আমরাও মানুষ।

কার সঙ্গে নিজের একান্ত সময় কাটাতে চান?

নওশাবাঃ আমার কাছে মেয়ের উপর কিছু নেই। মেয়ের আমাকে তেমন প্রয়োজন নেই কিন্তু আমার মেয়েকে খুব প্রয়োজন। ওকে ছাড়া আমি পাগল হয়ে যাই। আমি যত ক্ষত-বিক্ষতই হই মেয়েই আমার একমাত্র প্রশান্তি। মেয়ের সঙ্গে আমার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। আমার মেজাজ খারাপ হলে ও সেটি বুঝে যায়। মেয়েকে ছাড়া আমি একদম থাকতে পারি না।

মেয়ের সঙ্গে কোন কাজটি কখনোই করতে চান না?

নওশাবাঃ আমি ওকে শুটিংয়ে নিতে চাই না। কারণ যখন আমি কোন চরিত্রে ঢুকে যাই, তখন হয়তো তার মনে কোন প্রশ্ন জাগতে পারে। আমি আমার মেয়ের মনটা ভাঙতে চাই না। আমি যখন মেয়েকে সময় দিবো, তখন পৃথিবীর আর কাউকে সময় দিবো না।

মেয়ের সঙ্গে বিশেষ কোন স্মৃতি…

নওশাবাঃ মেয়ে হওয়ার পর আমি আরেকবার জন্ম নিয়েছি। আমি বাবার একমাত্র মেয়ে। আমি বাসায় কখনো ছোট কোন মেয়েকে পাইনি। তাই আমি আমার মেয়ে প্রকৃতির মাঝে আমার বোনকে খুঁজি, বান্ধবীকে খুঁজি, মাকে খুঁজি। মেয়ের সাথে আমি কখনো বড়দের মতো আচরণ করি না। প্রকৃতি পুরোটাই একটি মেমরী। ওকে ছাড়া আমার কিছু নেই।

এতক্ষণ সময় দেয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

নওশাবাঃ আপনাকেও ধন্যবাদ।

কমেন্টস