এখন পর্যন্ত বছরের সেরা চলচ্চিত্র “জালালের গল্প”

প্রকাশঃ সেপ্টেম্বর ৬, ২০১৫

শেখ সাখাওয়াত সৌরভ।।

 

খুবই চমৎকার একটা প্লট ধরে এগিয়ে গেছে “জালালের গল্প”। তাল মিলিয়ে উন্মোচিত হয়েছে বহু পুরাতন রীতি-নীতি, হিংসা, রাজনীতি, অন্যায়, ব্যাভিচার, ক্ষমতা আর কুসংস্কারের গল্প। বহু বছর ধরে এমনটা হয়ে আসছে আর এই জালালের গল্পটাও যেন চক্রাকারে চলছে। সিনেমার নাম অনুযায়ী এটা জালাল নামের নদীতে ভেসে আসা এক ছেলে ও তার পারিপার্শ্বিক অবস্থার গল্প। সিনেমায় জালালের তিনটা বয়সের অবস্থাকে ফ্রেমবন্দি করা হয়েছে; নবজাতক, ৮/৯ বছর আর ১৮/২০ বছরের জালাল। তিন সময়ের তিনটা আলাদা গল্প জালালকে ঘিরে গড়ে উঠেছে।

 

এখন পর্যন্ত বছরের সেরা চলচ্চিত্র “জালালের গল্প”

তিনটা সময়ের মধ্যে ব্যক্তিগতভাবে আমার প্রথম গল্পটা বেশি ভাল লেগেছে। এটার উপস্থাপনও ছিল চমৎকার। মজার ব্যাপার হচ্ছে পরের দুইটা গল্পের মত এটাতে তেমন কোন স্টারকাস্ট ছিল না, যারাই ছিলেন তারা পর্দায় পুরোটা সময় মাতিয়ে রেখেছেন। জালালের প্রথম পালক বাবার চরিত্রে নূরে আলম নয়ন অসাধারন পারফর্ম করেছেন, একবারের জন্যও মনে হয়নি তিনি অভিনয় করেছেন। উনার স্ত্রীর চরিত্রে মিতালি দাশ উনার সাথে পাল্লা দিয়ে অভিনয় করে গেছেন। এই ভদ্রমহিলাকে অভিনয়ে প্রথম দেখলাম, গ্রামের সাধারন গৃহবধুর চরিত্রে দারুণ মানিয়ে গেছেন আর নিজের সাবলীল অভিনয় দিয়ে আরো ভাল লাগা তৈরি করেছেন। মূলত এই গল্পে গ্রামীন কুসংস্কারগুলো দারুণ ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন ডিরেক্টর আবু শাহেদ ইমন। নদীতে পাতিলের মধ্যে বাচ্চা ভেসে আসা, তাকে দিয়ে যে ব্যবসা আর কুসংস্কারগুলো তৈরি হয় তা ডিরেক্টর অত্যন্ত যত্নের সাথে উপস্থাপন করেছেন এই অংশে।

 

এখন পর্যন্ত বছরের সেরা চলচ্চিত্র “জালালের গল্প”দ্বিতীয় গল্পটা ভাল লেগেছে এটাতে বেশ কিছু সিমবোলিক প্রেজেন্টেশনের কারনে, এই অংশে ছবিটার সিনেমাটোগ্রাফি ছিল অসাধারন। কুকুর, হাঁস, কবুতর, মুরগি, বিড়ালের মত প্রানী ছাড়াও পুরো প্রকৃতিকে সিনেমায় যেভাবে প্রতিকী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে তা ছিল সত্যিই চমৎকার। এই গল্পে জালালের দ্বিতীয় পালক বাবা মায়ের চরিত্রে ছিলেন তৌকির আহমেদ আর শর্মীমালা। সন্তান জন্ম দিতে না পেরে আগের দুই স্ত্রী মারা গেছে। এদিকে নিজের কোন সন্তান না হওয়াতে ভোটে জিততে না পারায় তৃতীয়বারের মত তৌকির আহমেদ বিয়ে করেন শর্মীমালাকে। শুরু হয় সন্তান জন্ম দেয়ার জন্য নানা পদ্ধতি, ঝাড়ফুঁক আর কবিরাজের নোংরামি। গল্পে শর্মীমালা যতটুকু সুযোগ পেয়েছেন নিজের সর্বোচ্চটা দিয়েছেন। “মৃত্বিকা মায়া”র জন্য কিছুদিন আগেই এই নতুন চলচ্চিত্র অভিনেত্রী জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন সেরা অভিনেত্রী হিসেবে, এবার এই সিনেমার জন্য সামনে পার্শ্ব চরিত্রেও পুরস্কার পেয়ে যেতে পারেন। এই অংশে সারপ্রাইজ হিসেবে পর্দায় ছিলেন ফজলুল হক, তারেক মাসুদের “রানওয়ে” চলচ্চিত্রের পর আবার তাকে চলচ্চিত্রে অভিনয় করতে দেখে ভাল লাগলো। এখানে নয় বছরের জালাল চরিত্রে শিশুশিল্পী ইমনও অনেক ভাল করেছে। তাকে হাত পা বেঁধে পানিতে ভাসিয়ে দেয়ার সময় তার আহাজারি আর আর্তনাদে দর্শকেরও দম বন্ধ হয়ে আসে।

 

এখন পর্যন্ত বছরের সেরা চলচ্চিত্র “জালালের গল্প”শেষ অংশটা অবশ্য প্রত্যাশা পুরোটা পূরণ করতে পারেনি। এই অংশের শুরুতে বেশ কিছুটা সময় মূল সিনেমার সাথে গল্পের রিলেট করা যাচ্ছিল না, অবশ্যে আস্তে আস্তে এগিয়ে শেষদিকে দারুণ মানিয়ে গেছে। এখানে ১৮/২০ বছরের জালাল চরিত্রে আরাফাত রহমান বেশ ভাল করেছে, মজার ব্যাপার হচ্ছে ওর সাথে নয় বছরের জালাল চরিত্রের ইমনের চেহারাতেও অনেক মিল। এই অংশের বড় আকর্ষন ছিল মোশারফ করিম, পরিচালক সিনেমায় তাঁকে খুব বুদ্ধিমত্তার সাথে ব্যবহার করেছেন। মোশারফ করিম এই সিনেমার মার্কেটিং এর জন্য অনেক বড় একটা দিক, সাধারন অনেক দর্শকই এই একটা কারণেই হলে যাবে। তবে মোশারফ করিম ভাল করেছেন, যারা মোশারফ করিমের কাজ কম দেখেছেন তাদের কাছে খুব ভাল লাগবে। আর যারা নিয়মিত দেখেন তাদের কেউ বিরক্ত হতে পারেন একই ধরনের অভিনয় করার একঘেঁয়েমির জন্য, সেই একই ভাবে চিৎকার করে ধমক দিয়ে কথা বলা। তবে জালালের গল্পের এই চরিত্রে মোশারফ করিম সত্যিই অনেক ভাল পারফর্ম করেছেন, সমস্যাটা মনে হয়েছে শুধু এই একঘেঁয়েমি টাতেই। মোশারফ করিম ছাড়াও এই অংশে ছিলেন মৌসুমি হামিদ। এই প্রথম কোন সিনেমায় মৌসুমি হামিদকে ভাল লাগলো। প্রায় এক মাসের মধ্যে তার তিনটি সিনেমা রিলিজ পেয়েছে কিন্তু এটা ছাড়া কোনোটাতেই ডিরেক্টররা মৌসুমিকে ভালভাবে ব্যবহার করতে পারেনি। জালালের গল্পে নিজের সুযোগটাকে কাজে লাগিয়ে মৌসুমি নিজের সেরা টুকু দিতে চেষ্টা করেছেন। এই অংশের পুরোটা জুড়ে চমৎকার কিছু ডায়ালোগ ছিল।

 

এখন পর্যন্ত বছরের সেরা চলচ্চিত্র “জালালের গল্প”সব কিছু মিলিয়ে জালালের গল্প একটা দারুণ সিনেমা। কিছু সীমাবদ্ধতা থাকলেও সিনেমা হিসেবে এটার প্রায় প্রত্যেকটা দিকই ছিল চমৎকার। সিনেমায় বিভিন্ন সময় জুড়ে নানান সিমবলিক প্রেজেন্টেশনের জন্য এটাতে বাড়তি ভাল লাগা তৈরি হয়। এই সিনেমায় কোন গান ব্যবহার করা হয়নি, কিন্তু পুরো সিনেমায় চিরকুটের করা ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর ছিল অসাধারন। সেতারা, বাঁশি সহ দেশিও বাদ্যযন্ত্রে এমন দূর্দান্ত ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর খুব কম সিনেমাতেই পেয়েছি। সাউন্ড ডিজাইনার হিসেবে ছিলেন রিপন নাথ। জালালের গল্পের সিনেমাটোগ্রাফি ছিল অসাআআআআধারন! এই সিনেমার পজেটিভ দিকগুলোর কথা বললে শুরুতেই থাকবে মিউজিক আর বরকত হোসেন পলাশের সিনেমাটোগ্রাফি। সিনেমার কালার গ্রেডিং সাধারন মানের হলেও চিত্রনাট্য, আর্ট ডিরেকশন, লোকেশন আর সেট ডেকোরেশন ছিল দারুণ। এই সিনেমার সব কিছুই এত চমৎকারভাবে প্রেজেন্ট করার জন্য এর মূল কৃতিত্ব হচ্ছে সিনেমার পরিচালক আবু শাহেদ ইমনের। দক্ষতার সাথে এত যত্ন করে বানানো যে বুঝাই যায় না এটা উনার প্রথম সিনেমা। নিঃসন্দেহে এখন পর্যন্ত এ বছরের সেরা চলচ্চিত্র জালালের গল্প।

 

 

Advertisement

কমেন্টস