প্রোগ্রাম দে, খেয়ে বাঁচিঃ কাঙ্গালিনী সুফিয়া

প্রকাশঃ ডিসেম্বর ২৬, ২০১৭

ছবিঃ আবু সুফিয়ান জুয়েল

মেরিনা মিতু।।

পান থেকে চুন খসলেই স্বামী আমারে মারতো। একদিন আমাকে এতো মারধর করলো যে, আমি অজ্ঞান হয়ে গেছিলাম। পেটে তখন আবার আমার একমাত্র সন্তান পুষ্প। অজ্ঞান হওয়ার পর লোকটা মনে করলো আমি বোধহয় মরেই গেছি। তাই সাথে সাথে আমারে বস্তার মধ্যে ভরে নদীতে ফালায় দেয়। পরে একদল জেলে আমারে জালের মধ্যে পায়। আমার পুষ্প আর আমি দুর্ভাগ্যবশত বেঁচে গেছিলাম সেদিন।

ব্ল্যান্ডারে ভাত তরকারি একসাথে ব্ল্যান্ড করতে করতে এভাবেই জীবনযুদ্ধের অজানা সব কথা জানান কাঙ্গালিনী সুফিয়া। হালদার বংশের মেয়ে আনিতা ক্ষ্যাপী কিভাবে কাঙ্গালিনী সুফিয়া হয়ে উঠেছে সে গল্প অনেকেরই অজানা। একইসাথে অজানা কাঙ্গালিনীর বর্তমান অবস্থা। কেমন আছে সেই কাঙ্গালিনী? কোথায় আছেন আর কি হালে আছেন? সুরের তালে সেই প্রশ্ন কি কারো মনে উদয় হয়? নাকি বাংলার ঐতিহ্যবাহী লোক সংস্কৃতির এই নান্দনিক ব্যক্তিত্বের অস্তিত্ব অজানার মধ্যে থেকেই ধুলোই মিশে যাবে? শায়িত হবে চিরনিদ্রায় সেই অমায়িক সুরে বাঁধা সব সুর!

মেয়ে পুষ্পর সঙ্গে কাঙ্গালিনী সুফিয়া ছবিঃ আবু সুফিয়ান জুয়েল

সুদীর হালদারের সাথে বিয়ে মিষ্টি স্বরের মেয়ে আনিতা ক্ষ্যাপীর। সুরের মূর্ছনায় যাদু নিয়েই পৃথিবীতে আসে আনিতা। কথা বলতো নিজের বাঁধা সুরে গানে গানে। ভাবার আগেই বাঁধতে পারতো কথা, দিতে পারতো সুর। তবে সুখ ছিলোনা সংসারে। স্বামী সুদীর হালদার ছিলো বেজায় রাগী। কথার আগে হাত চলতো সুদীর হালদারের। মার খেয়ে খেয়ে আনিতার সুরে রাগ ক্ষোভ অভিমান মিশে একাকার হয়ে যেতো।

‘আমারে মারলে আমি চুপ করে মাইর খাইতাম, একটা শব্দও করতাম না। পরে গিয়া গান বাঁধতাম, তাতে করে আমার সব কষ্ট চলে যেতো’ এই বলে ফিক করে হেসে দেয় এই আলাপের আনিতা ক্ষ্যাপী আর পরিচয়ের কাঙ্গালিনী সুফিয়া।

স্বামীর হাতে নিয়মিত মার খেতে খেতে একদিন জানতে পারে সে মা হতে চলেছে। মনে মনে ভেবেছিলো এইবার বুঝি স্বামী কিছুটা আদর-সোহাগ করবে। এই বুঝি তার সকল কষ্টের সমাপ্তি হলো। তবে সেই ধারনাকে মিথ্যে বানিয়ে দিয়ে স্বামী সুদীর হালদার তাকে এতোটাই মারধর করলো যে মার খেয়ে অজ্ঞান হয়ে যায়। তখন মারকুটে স্বামী ভাবলো তার মার খাওয়া বউ বোধহয় এবার মরেই গেলো। তাই বউ আর আশাতীত সন্তান উভয়কেই বস্তায় ভরে ফেলে দিলো ইছামতি নদীতে। ভেসে গেলো আনিতা? নাহ! স্বামীর জন্য দুর্ভাগ্য কিংবা বাংলার লোক সংস্কৃতির জন্য সৌভাগ্যবশত বেঁচে যায় আনিতা এবং তার আশাতীত সন্তান একমাত্র মেয়ে পুষ্প। পরদিন ইছামতিতে একদল জেলের জালে আনিতা আটকা পরে, আর সেই জেলেরাই তাকে বাঁচাই। সৃষ্টিকর্তা আর প্রকৃতির অশেষ কৃপায় মৃত্যুর সন্নিকট থেকে ফিরে আসে আনিতা, যা অভাবনীয়।

আনিতার ফিরে আসাটা ছিলো মেঘের ঘনঘটায় পূর্ব আকাশে সূর্য উঠার মতো। একইসাথে পুনরায় দেশ স্বাধীন আর বিজয়ের সাক্ষী হওয়ার সৌভাগ্য নিয়ে ফেরত আসা। আচ্ছা বুঝতে পারলেন না? আনিতা ক্ষ্যাপী আমাদের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন একজন কন্ঠযোদ্ধাও ছিলেন। দেশ স্বাধীনের আগে এই আনিতা ক্ষ্যাপী থাকতো মুর্শিদাবাদে। মৃত্যু থেকে ফেরার পর আর শ্বশুরবাড়ি ফেরা হয়নি তার। কিছুদিন পরই জন্ম নেয় তার ফুটফুটে মেয়ে পুষ্প। যুদ্ধ চলাকালীন তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে থাকতেন মেয়েকে নিয়ে। মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে থেকে তাদের গান শুনাতেন। তার গানের মাধ্যমে যোদ্ধাদের উৎসাহ দিয়ে তিনিও একজন যোদ্ধা। একজন কন্ঠযোদ্ধা। আর এই মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে থাকাকালীনই আনিতার জীবন নতুন করে মোড় নেয়। আর সে মাধ্যম হলো, মুক্তিযোদ্ধা মান্দার ফকির।

‘মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে যখন ছিলাম, তখন আমার মান্দার ফকিরের সাথে একরকম ভাব হয়ে যায়। সেটা এক অন্যরকম ভাব’ বলেই আনিতা গান ধরে আপন মনে নিজের বাঁধা কথায়। ভাবার আগেই সুর দিয়ে দেয় তাতে।

দেশ স্বাধীনের তিন বছর পর ফরিদপুরে মান্দার ফকিরের সাথে আনিতা ক্ষ্যাপীর বিয়ে হয়। বিয়ের সময় আনিতা ক্ষ্যাপীর নাম হয় সোফিয়া খাতুন। যে আজ কাঙালিনী সুফিয়া। সুফিয়া মান্দার ফকিরের দ্বিতীয় স্ত্রী। স্বামী, মেয়ে পুষ্পকে নিয়ে নতুন সংসারের বেশিদিন সুখ ধারণ করতে পারেনি সুফিয়া। বিয়ের বছর দুয়েকের মধ্যেই না ফেরার দেশে চলে যায় মান্দার ফকির। আর সেই থেকেই শুরু হয় মেয়েকে নিয়ে সুফিয়ার তৃতীয় একলা জীবন।

কাঙ্গালিনী সুফিয়া ছবিঃ আবু সুফিয়ান জুয়েল

গান গেয়েই চলে তার ছোট্ট সংসার। আজ শাখা প্রশাখা মিলে অনেক বড় হয়েছে। তবে জীবন সংগ্রামে সবাই আজো সুফিয়ার গানের মাধ্যমে উপার্জনের উপরই নির্ভর্শীল। সুফিয়ার ‘কাঙ্গালিনী’ নামকে স্বার্থক করে তার পুরো পরিবারটিই যেনো কাঙ্গাল। তার মেয়ে পুষ্পকে যার সাথে বিয়ে দেয় সে স্বামী নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে থাকে, খোজ নেয় না পুষ্প কিংবা পুষ্প’র তিন মেয়ে শিল্পী, রাবেয়া এবং দোলার। তাই সংসারে এই ৫ জনের দায়ভার পুরোটা এখনো নিভিয়ে থাকেন ৭০ এর বেশি বয়সের এই সুফিয়া।

প্রথমদিকে নানান সব প্রোগ্রাম থেকে আমন্ত্রন পেতো। সেই প্রোগ্রাম করেই তার সংসার চলতো। বয়সের সাথে সাথে আর আধুনিক সময়ের মিশ্রণে পিছিয়ে যায় তার বাঁধানো সুর। তার কাছ থেকে সুর নিয়ে অনেকেই আজ বেশ নামী জায়গায় আসন পেতে রয়েছেন, যারা আজ তার দিকে ফিরেও তাকায় না। তারপরেও তাদের প্রতি কোনো রাগ নেই সুফিয়ার। বরঞ্চ বারবার অনুরোধ করেছেন সেই নামী ব্যক্তিদের নাম যেনো সামনে না আসে। এই মুহুর্তে তার শুধু একটাই চাওয়া, কোনরকম খেয়ে পড়ে বেঁচে থাকা।

দীর্ঘ ছয় ঘন্টা তার সাথে গল্প করার মধ্যে দিয়ে তার জীবনের সকল অজানা ঘটনা জানতে জানতে বেশ কতোক গান শুনতে শুনতে সময় যখন বেশ যাচ্ছিলো, হঠাৎ এই বরেণ্য শিল্পীর দুচোখ ভরে জল পড়া শুরু হয়। গানের শেষে তিনি টিম বিডিমর্নিং কে জানান, তার নিজের চাওয়া আর আক্ষেপ সম্পর্কে একইসাথে বলেন তার শেষ ইচ্ছাগুলোর কথা।

‘আমি কাঙ্গালিনী সুফিয়া। আমি সুফিয়া। আমি সুফিয়া। আমি কারো থেকে ভিক্ষা করে খাবো সে জিনিস আমি ভাবতেই পারিনা, কিন্তু পেটের ক্ষিধায় নিজেরে ধরে রাখতে পারিনা। যখন ঘরে চাল শেষ হয়ে যায় তখন সবজি সিদ্ধ করে খাই। তাও আবার ব্ল্যান্ডার করে খাই। সাধের দাঁত সব পালাই গেছে আমারে একলা রেখে। তাই ভাত তরকারি সব একসাথে করে ব্লান্ডারে জুস বানাই খাই। কখনো কখনো অনেক সময় ধরে কারেন্ট থাকেনা, আমার খাওয়াও বন্ধ থাকে। গান গাইতে গাইতে অপেক্ষা করি কখন কারেন্ট আসবে। একসময় গলার স্বরও কমে যায়। আমার সরকার আমারে একটা ঘর বানায় দিছেন। কিন্তু ঘরের মধ্যে থাকলেই কি আর বাঁচা যায় পেটে ভাত না থাকলে? তখন এর ওর কাছে চাই। তাও এমনি চাইনা, গান শুনাইয়া টাকা চাই। আপনারা যদি পারেন আমার কথা সবাইরে জানায়েন। আমারে মাসে অন্তত দু চারটা প্রোগ্রাম আইনা দেন। আমি ভিক্ষা না, গান দিয়া বাঁইচা থাকতে চাই। আর গুরুরে (সুফিয়া) আজ যারা চিনেন না তাদেরকেও কিছু বলে যাই। কে জানে কতোদিন আছি এই সাধের দুনিয়াই। আপনারা আজ অনেক বিখ্যাত, পাশের বাড়ির টিভিতে আপনাদের দেখি আমি। আপনারা এখন আর আমারে চিনেন না, আমি কিন্তু আপনাদের চিনি। আপনাদের সুরে আমি বেঁচে থাকবো চিরকাল। তাই আমারে ভুলে গিয়েও লাভ নাই। আপনাদের সাথে সাথে আমি বেঁচে থাকবো আরো সহস্র বছর। শুধু কষ্ট একটাই আজ আমি পেটেও কাঙ্গাল। ভাত নাই পেটে আমার’।

দেশ বরেণ্য সংগীত শিল্পী কাঙ্গালিনী সুফিয়া আজ অবস্থান করছেন রাজবাড়ী সদরে। ২০১৫ সালে বাংলাদেশ সরকারের বদৌলতে নিজ নামে এক খন্ড জমি পান। আর তারই এক কোণায় ছোট একটি ঘর বানিয়ে দেয়া হয় সুফিয়াকে। সেই থেকেই এই নান্দনিক শিল্পী জীবনের বাকি সংগ্রামটুকু এখানে থেকে করছেন। আমরা কারো নাম নিয়ে জপি যখন তার অস্তিত্ব পরলোকে গমন করেন। তার আগে আমরা সুরের মধ্যেই ডুবে থাকি। লোক সংস্কৃতিতে অনন্য অবদান রাখা এই শিল্পীর খোঁজ পেতেও আমাদের সময় নিতে হয়েছে দুদিন। আমরা জানিনা তার আকুতিগুলো, তার আক্ষেপগুলো। অথচ তিনি বিরামহীনভাবে আমাদের দিয়ে যাচ্ছেন সুরের মুর্ছনা। শিল্পীরা দিয়ে যায়, নিয়ে যায় অপ্রকাশিত সব অভিমান।

কমেন্টস