রোহিঙ্গাদের সাহায্য করায় জাতি হিসেবে আমাদের আত্মবিশ্বাস বাড়ছেঃ মনিরুজ্জামান শিপু

প্রকাশঃ অক্টোবর ১৮, ২০১৭

মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নৃশংসতা ও বর্বতার মুখে গত ২৫ আগস্ট থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে লাখ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী। তাদের মধ্যে বেশির ভাগই শিশু। আতঙ্ক, বর্বরতার চিহ্ন, ক্ষুধা তাদের চেহারায় স্পষ্ট। স্বজন হারানোর ব্যথা ভুলে জীবন বাঁচানোর চেষ্টাই যেন এখন তাদের মূল লক্ষ্য। রোহিঙ্গাদের উপর নির্যাতনের ঘটনায় সারা বিশ্বে সমালোচনার ঝড় বইছে। রোহিঙ্গা সম্পর্কে জনসাধারণের ভাবনা জানতে গ্রাফিটির মাধ্যমে রং তুলির আবেশ ছড়িয়েছিলেন ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস, বাংলাদেশের মিডিয়া স্টাডিস এন্ড জার্নালিজম ডিপার্টমেন্টের সিনিয়র লেকচারার এ এফ এম মনিরুজ্জামান শিপু। তার সেই চিন্তাধারার কথা জানতে কথা হলো বিডিমর্নিং এর সাথে। সাক্ষাতে ছিলেন নিয়াজ শুভ-

গ্রাফিটির মূল উদ্দেশ্য কি?

মনিরুজ্জামান শিপুঃ মানুষের ভেতরের চিন্তা-ভাবনাটাকে জাগ্রত করার জন্যই গ্রাফিটি করা হয়। আমাদের এবারের ক্যানভাসে রোহিঙ্গাদের কিছু কিছু বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। এখানে মানুষ তাদের নিজের মতবাদ প্রকাশ করতে পারে। নিজেকে আত্মতৃপ্তি দিতে সক্ষম হয়। মানুষের ভেতরের ভাবনাটা জাগ্রত করে সেটির পরিস্ফুটনই আমাদের উদ্দেশ্য।

এবার কোন বিষয়ে লিখতে বলা হয়েছে?

মনিরুজ্জামান শিপুঃ সাধারণ মানুষরা যারা এতে অংশ নিয়েছে, তাদের বলা হয়েছে রোহিঙ্গা নিয়ে আপনার ভাবনা প্রকাশ করুন। এই আর্টটা এমন একটি ধরণে করা হয়, যেখানে যে কেউ রং দিয়ে নিজের মনের ভাবনা প্রকাশ করে। যখন তাদের একটি বিষয়ে লিখতে বলা হচ্ছে বিষয়টি নিয়ে তারা হয়তো আগে ভাবেনি কিন্তু লেখার মুহূর্তে তাদের মধ্যে ভাবনার জন্ম নেয়।

এতে কি তাদের উপর কোন প্রভাব পড়ে?

মনিরুজ্জামান শিপুঃ তারা রোহিঙ্গা সম্পর্কে পত্রিকায় পড়ছে, টিভিতে দেখছে, লোকমুখে শুনছে, নিজের কিছু মনে হয়েছে, হয়তো সে কখনো কিছু বলেনি তাই লেখার মুহূর্তে তার চিন্তাটা গভীর নাও হতে পারে। কিন্তু যখন সে একটা কিছু লিখে ফেলে তখন সেটি তার মাথার ভিতর কাজ করতে থাকে। সে বিষয়টির সাথে জড়িয়ে পড়ে। তখন সে ভাবে আমি এভাবে না লিখে তো অন্যভাবেও লিখতে পারতাম। ঠিক সেই মুহূর্ত থেকেই বিষয়টি নিয়ে তার ভাবনার পরিধি বাড়ে। একটা সময়ে গিয়ে সে বিষয়টি সম্পর্কে পরিপূর্ণ জানতে পারে।

কি ধরণের মন্তব্য এসেছে?

মনিরুজ্জামান শিপুঃ কেউ লিখেছে ওদের এ দেশ থেকে বের করে দেয়া উচিত। কেউ লিখেছে ওদের সাহায্য করা উচিত। আবার কেউ লিখেছে ওরা আমাদের বন্ধু।

ছবিতে রোহিঙ্গাদের কোন দিকগুলো তুলে ধরা হয়েছে?

মনিরুজ্জামান শিপুঃ ছবিটার বাম পাশে ছিলো সু চি’র ড্রাকুলার মতো চেহারা। তার সামনে থেকে সবাই পালিয়ে চলে আসছে। মাঝখানে দেখা যাচ্ছে অনেক রোহিঙ্গারা এদেশে এসে সাহায্য চাচ্ছে। পাশাপাশি দেখানো হয়েছে তারা বেশ ক্ষুধার্ত। তারা আমাদের সাহায্য চায়। শেষের দিকে দেখানো হয়েছে, তারা বেশ নিরাপদে আছে। ঘরবাড়ি দেখা যাচ্ছে, বাচ্চাগুলো উঠোনে দাঁড়িয়ে আছে। বয়স্ক মানুষগুলোর হাসিমাখা মুখটাও নজর কাড়ে।

কি ধরণের রং ব্যবহার করা হয়েছে?

মনিরুজ্জামান শিপুঃ ক্যানভাসের উপর পুরো ছবিটি করা হয়েছে। মূলত এ ধরণের কাজে একলিক কালার ব্যবহার করা হয়। তবে এখানে প্লোরোসেন একলিক কালার ব্যবহার করা হয়েছে। কারণ এই কালারটি লাইট পেলেই জ্বলজ্বল করে উঠে। সিনেমা ব্যানার, রিকসা পেইন্টিংয়ে যে কালারগুলো ব্যবহার করা হয় ওই ধরণের কালারগুলোই এখানে ব্যবহার করা হয়েছে।

এতে কি কোন সুফল এসেছে?

মনিরুজ্জামান শিপুঃ মানুষের মাঝে এই ম্যাসেজটা দেয়ার ফলে কিছু তো লাভ হচ্ছেই। এমনিতে যখন আমরা পত্রিকায় পড়ি, টিভিতে দেখি, কারো বক্তব্য শুনি কিংবা ছবি দেখি তখন সেটা সবসময় একপক্ষের থাকে। একদিক থেকে ম্যাসেজ আসছে সাধারণ মানুষ আমরা শুধু শুনছি। কিন্তু নিজের মতামত প্রকাশের কোন প্ল্যাটফর্ম নেই। নিজের মন্তব্যটাকে আমরা সামনে নিয়ে আসতে পারছি না। যে কারণে নিজের ভেতরের চিন্তাটা জাগ্রত হয় না। নিজের অভিমতটা জাগ্রত হয় না। যে জিনিসের কোন রূপ নেই, সেটি কখনো পরিপূর্ণতা পায় না। কিন্তু যখন এমন হয় যে, মানুষ তার নিজের মতামত বলতে পারছে, লিখতে পারছে তখন সে চূড়ান্ত একটি জায়গায় পৌঁছতে পারে। গ্রাফিটির মাধ্যমে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রোহিঙ্গা বিষয়ে নিজেদের মত প্রকাশের একটি জায়গা পেয়েছে। সেখানে তারা তাদের মনের ভাবনাটা তুলে ধরেছে।

লাখ লাখ রোহিঙ্গা আসায় আমরা কি কোন হুমকির দিকে অগ্রসর হচ্ছি?

মনিরুজ্জামান শিপুঃ এটার আসলে দুটো জিনিসই আছে। মানুষ যখন কারো সেবা করে, তাদের দুর্দিনে পাশে দাঁড়ায় কিংবা কারো জন্য ভালো কিছু করতে পারলে মনটা ভালো হয়ে যায়। নিজের প্রতি বিশ্বাস বাড়ে। আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশকে একটি দরিদ্র দেশ হিসেবে ভাবা হয়। সেই জায়গায় অন্য দেশ থেকে আসা একটি জাতির লাখ লাখ মানুষকে যে আমরা সাহায্য করছি এতে অবশ্যই জাতি হিসেবে আমাদের আত্মবিশ্বাস বাড়ছে।

নেগেটিভ কিছু দিকও আছে। কারণ এরা এখন দেশের ভেতরে ছড়িয়ে যাবে। এমনিতেই আমাদের জনসংখ্যা বেশি, অর্থনৈতিক দিক দিয়েও পিছিয়ে আছি। এভাবে যদি এত মানুষ আসতে থাকে তাহলে অবশ্যই আমাদের উপর চাপ বাড়বে। তবে আমরা যে তাদের সাহায্য করছি এতে আমাদের মানবিক উন্নয়ন হচ্ছে।

এতক্ষণ সময় দেয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

মনিরুজ্জামান শিপুঃ আপনাকেও ধন্যবাদ।

কমেন্টস