মৃত্যুবার্ষিকীতে ইমনকে স্মরণ করে যা বললেন সামিরা

প্রকাশঃ সেপ্টেম্বর ৬, ২০১৭

সুমাইয়া আকরাম ।।

ঢাকাই ছবির ধূমকেতু যেন সালমান শাহ্‌। এসেই জয় করে নেন সবার মন কিন্তু টেকে বেশি দিন। ১৯৯৬ সালের আজকের এই দিন ৬ই সেপ্টেম্বর রহস্যজনক মৃত্যু হয় সালমানের। তার স্ত্রী সামিরার দাবি আত্মহত্যা করেছিলেন তিনি, গলায় ফাঁস দিয়ে। কিন্তু সালমানের পরিবার এটিকে খুন দাবি করে সামিরাকে তুলে খুনীর কাঠগড়ায়। ২১ বছর পেরিয়ে গেলেও আজও সালমানের পরিবার ও ভক্তরা খুনের দাবিতেই অটল।

ক্যারিয়ারের মাত্র ৪ বছরেই নিভে গেল সেই উজ্জ্বল নক্ষত্র। তবে থামেনি আজও সালমান শাহর জয়জয়কার। এখনো কোনো সিনেমা হলে সালমান শাহের ছবি মুক্তি পেলে সেখানে ভিড় জমে দর্শকের। কেউ কেউ বলে থাকেন, সালমানের মতো জনপ্রিয় নায়ক হয়তো আর কখনোই কোনোদিন জন্মাবে এই না এই ইন্ডাস্ট্রিতে।

প্রিয় এই নায়কের সবকিছু জানতে চান ভক্তরা। কেমন ছিলো তার লাইফস্টাইল, জীবন দর্শন, মানসিকতা, ব্যবহার? দিনে দিনে অনেক কিছুই জানা হয়ে গেছে। তবে শাহরিয়ার চৌধুরী ইমন নামের যুবকের নাম কেমন করে সালমান শাহ হয়ে গেল সেই গল্পটি অনেকেরই জানা নেই। গল্পটা জানালেন সালমানের স্ত্রী সামিরা।

তবে সম্প্রতি এক জনপ্রিয় সংবাদমাধ্যমের সাক্ষাৎকারে সামিরা দীর্ঘ ২১ বছরের নীরবতা ভেঙ্গে সালমানের মৃত্যু নিয়ে নানা প্রশ্নের জবাব দেন। তিনি সেখানে সালমানের অনেক অজানা কথাও। জানালেন, স্বামীকে কখনোই তিনি সালমান নামে ডাকতেন না। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ইমন নামেই সম্বোধন করেছেন।

সামিরা জানান, ‘ইমনের সঙ্গে পরিচিত হবার পর থেকেই দেখেছি শোবিজে কাজ করা নিয়ে ওর অনেক আগ্রহ। ওর নানা ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম সবাক চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’র একজন অভিনেতা। তার মায়ের মধ্যেও গান ও অভিনয়ের প্রতি দুর্বলতা আছে। ইমনের বাবা ও মা আলমগীর কুমকুমের পরিচালনায় একটি ছবিতে নায়ক-নায়িকা হিসেবে অভিনয়ও করেছিলেন। কিন্তু পরিচালকের অকাল মৃত্যুতে সেই ছবিটি আর মুক্তি পায়নি। বলা চলে শোবিজে কাজ করার নেশাটা ইমনের রক্তেই ছিলো। আমিও ওর এই আগ্রহটাকে সম্মান করতাম।’

সামিরা বলেন, ‌‘শোবিজে কাজ করা নিয়ে ইমনের অন্য রকম আগ্রহ ছিলো। শুরুর দিকে সে র‌্যাম্পে হেঁটেছে। তেমনই একটি ফ্যাশন শোতেক অংশ নিতে গিয়ে আমার সঙ্গে পরিচয় ও সেই সূত্রে প্রেম-বিয়ে। অনেকদিনের সংগ্রামে ১৯৯২ সালের মাঝামাঝিতে ইমন চলচ্চিত্রের অভিনয়ের প্রস্তাব পায়। অবশেষে সেই বছরের ৩ আগস্ট মহরতের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে ইমন সিনেমার নায়ক হিসেবে যাত্রা করলো ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ সিনেমা দিয়ে।’

তিনি আরও বলেন, ‘৯২ সালের ২০ ডিসেম্বর আমাদের বিয়ে হয়। কিন্তু ইমনের নাম বদলের সময় তখনো বিয়ে হয়নি আমাদের। প্রেমের উত্তাল দিনগুলো পার করছি। খুব সম্ভবত জুলাইয়ের শেষদিকের কথা। একদিন ইমন এসে বললো সিনেমার প্রস্তাব এসেছে। নামটাকে বদলে নেয়া প্রয়োজন। সিনেমায় অভিনয়শিল্পীদের নামকে খুব গুরুত্ব দেয়া হয়। অনেক নায়ক-নায়িকাই পারিবারিক নামের বাইরে গিয়ে অন্য নামে পরিচিতি পেয়েছেন। ইমনেরও নাম বদল করতে বলেছিলেন প্রযোজক ও পরিচালক। এসব ক্ষেত্রে সাধারণত সিনেমার পরিচালকরাই নাম রেখে থাকেন। তবে ইমন আমার কাছে ছুটে এসেছিলো কারণ সে আমাকে খুবই গুরুত্ব দিতো। আমাকে সে সবকিছুর ভাগ দিতো। সেই আনন্দই হোক কিংবা বেদনার। দুজন মিলে সিদ্ধান্ত নিলাম সালমান নাম রাখার। বলিউডে তখন সালমান খান খুব জনপ্রিয়। নতুন আসা এই নায়ক যুবক-যুবতীদের স্বপ্নের মানুষে পরিণত হয়েছেন। সেই নাম থেকেই নেয়া হলো সালমান। এই নামটি সহজেই দর্শকের মনে জায়গা পাবে বলে ধারণা ছিলো আমাদের।’

সামিরা বলেন, ‘সালমান ঠিক করার পর আমি বললাম, নিজের নামেরও কিছুটা অংশ থাকা উচিত। তাই শাহরিয়ারের ‘শাহ’ নামের শেষে রাখতে বললাম। সে খুবই খুশি হলো। এভাবেই ইমন হয়ে গেল সালমান শাহ। ৯২ সালের আগস্টে সোহানুর রহমান সোহানের ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ ছবিতে চুক্তিবদ্ধ হয় ইমন। মৌসুমীর বিপরীতে ছবিটি মুক্তি পেয়েছিলো পরের বছরের ১০ মার্চ। ইমনের সাবলীল অভিনয় অনায়াসেই দর্শকের মনে দাগ কেটে গেল।’

সালমানের স্ত্রী বলেন, ‘প্রথম ছবিতে মাত্র ২৫ হাজার টাকা পারিশ্রমিক নিয়েছিলো ইমন। তবে ছবিটি মুক্তি পাবার পর আকাশ ছোঁয়া সাফল্য পায়। জনপ্রিয় হয়ে যায় ইমন-মৌসুমী জুটিও। সবখানেই তাদের চাহিদা বাড়তে থাকে। বাড়তে থাকে পারিশ্রমিকও। ধারাবাহিকতায় শাবনূরের সঙ্গে ‘তুমি আমার’ ছবির জন্য প্রথমবারের মতো ১ লাখ টাকা পারিশ্রমিক নেয় সে। এরপর বেশ লম্বা একটা বিরতি শেষে আবারও ‘দেনমোহর’ সিনেমায় ইমন ও মৌসুমী একসঙ্গে অভিনয় করে। সেই ছবিতে দেড় লাখ টাকা নেয় ইমন। এগুলো যখন সুপার-ডুপার হিট করে তখন ধীরে ধীরে তার পারিশ্রমিকও বেড়ে যায়। সর্বশেষ ছটকু আহমেদের ‘বুকের ভেতর আগুন’ সিনেমার জন্য সে দশ লাখ টাকা নিয়েছিলো। এই পারিশ্রমিকে ইমন হয়ে উঠেছিলো সবচেয়ে দামি নায়ক।

আরও বেশ কিছু ছবি নিয়ে আলোচনা হচ্ছিলো। সেগুলোতে পারিশ্রমিক আরও বাড়তো। তারমধ্যে একটি ছবি ছিলো সেসময়ের নতুন মুখ পপির বিপরীতে। কিন্তু চির অভিমানী ইমন হঠাৎ করেই সব পারিশ্রমিকের বাইরে চলে গেল। তার পারিশ্রমিক এখন কেবলমাত্র ভক্তদের ভালোবাসা।’

সবশেষে সামিরা আক্ষেপ করে বলেন, ‘যে ইমন আমাকে তার সবচেয়ে বেশি ভালোবেসেছে সেই ইমনের ভক্তরাই আজ মুখরোচক গল্পে মজে গিয়ে কোনো প্রমাণ, যুক্তি ছাড়াই আমাকে সবচেয়ে বেশি ঘৃণা করে। সেই আমাকে নিয়েই নোংরা গল্প ছড়ানো হয়েছে। এটা আমার জন্য কতো বড় বেদনার তা কাউকে বুঝিয়ে বলতে পারবো না। ইমন কী কখনো এটা মেনে নিতো? কোনোদিন না। যারা আজ ইমনের মৃত্যুর জন্য আমাকে দায়ি করছেন তারাও সেটা ভালো করে উপলব্দি করেন। আমার আফসোস, ইমন বেঁচে থাকতে দেখে যেতে পারলো না কী জনপ্রিয়তাই না সে অর্জন করেছিলো। এটা উপলব্দি করলে সে এভাবে নিজেকে শেষ করে দিতে পারতো না।’

সামিরা শেষে সালমানের জন্য সবার কাছে দোয়া চেয়ে বলেন, ‘আপনারা সালমান শাহকে ভালোবাসুন। কিন্তু ইমন নামটি নিয়ে সবাই তার জন্য দোয়া করবেন। তার জন্য এখন দোয়াই অনেক বেশি প্রয়োজন এবং সেটাই হবে ভক্তদের কাছ থেকে পাওয়া ইমনের সেরা উপহার।’

কমেন্টস